ধরণীর বেহেশত মসজিদ-১৩ (জুমার নামাজের ফজিলত)
মুসলমানদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হচ্ছে জুমার নামাজ যা সাধারণত জামে মসজিদে আদায় করা হয়।
মহানবী (সা.) এই নামাজের গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন: “মে’রাজের রাতে আমি ঊর্ধ্বাকাশে দেখেছি, সেখানে ফেরেশতারা আল্লাহর নামে তসবিহ পড়ে বলছিল: ইয়া আল্লাহ! যারা জুমার নামাজে অংশগ্রহণ করে তাদের তুমি ক্ষমা করে দাও, যারা শুক্রবার গোসল করে পবিত্রতা অর্জন করে তাদের প্রতি তুমি রহমত নাজিল করো।”
শুক্রবার বেলা দ্বিপ্রহরের পরে জোহরের নামাজের পরিবর্তে জামায়াতের সঙ্গে যে দু’রাকাত ফরজ নামাজ আদায় করা হয় তাকে জুমার নামাজ বলে। এই নামাজের ফজিলত সম্পর্কে এতটুকু বলাই যথেষ্ট যে, এই নামাজের নামে পবিত্র কুরআনে একটি সূরা নাজিল হয়েছে। এই সূরায় মুমিনদেরকে জুমার নামাজে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানিয়ে বলা হয়েছে, “যখন মুয়াজ্জিনের ধ্বনি ভেসে আসে এবং তোমাকে নামাজের জন্য আহ্বান জানানো হয় তখন লেনদেন ও বেচাকেনা বন্ধ করে দাও এবং এই ফরজ আমল করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যাও। এটি তোমাদের জন্য সবকিছুর চেয়ে উত্তম যদি তোমরা জানতে।” হাদিসেও এসেছে, যাদের হজে যাওয়ার সামর্থ্য নেই তাদের জন্য জুমার নামাজ হচ্ছে হজের সমতূল্য।
জোহরের চার রাকাত ফরজ নামাজের জায়গায় জুমার দিনে দুই রাকাত ফরজ নামাজ আদায় করতে হয়। বাকি দুই রাকাতের জায়গা করে নিয়েছে জুমার নামাজের দু’টি খুতবা। কাজেই নামাজের সময় যেসব কাজ করা জায়েজ নেই, খুতবার সময়ও সেসব কাজ করা যাবে না। মুসল্লিদেরকে ইমাম সাহেবের খুতবা মনযোগ দিয়ে শুনতে হবে। খুতবার নিয়ম হচ্ছে, এখানে মুসল্লিদেরকে তাকওয়া বা খোদাভীতির দিকে আহ্বান জানানোর পাশাপাশি মুসলিম সমাজের বর্তমান পরিস্থিতি ও সমস্যাবলী তুলে ধরে সে সম্পর্কে করণীয় ঠিক করে দিকনির্দেশনামূলক ভাষণা দেয়া হবে। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের স্থপতি ইমাম খোমেনী (রহ.) তাঁর এক বইয়ে জুমার নামাজ সম্পর্কে লিখেছেন: ইমাম সাহেবের উচিত মুসলমানদের ধর্মীয় ও পার্থিব জীবনের জন্য কল্যাণকর উপদেশ দেয়া, মুসলিম সমাজের ভালো ও মন্দ দিক, অনুকূল ও প্রতিকূল পরিস্থিতি বর্ণনা করা এবং রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিসহ মুসলমানদের দুনিয়া ও আখেরাতের জীবনে প্রয়োজনীয় সব বিষয়াবলী তুলে ধরে সে সম্পর্কে মুসল্লিদের সচেতন করে তোলা।
ইমাম রেজা (আ.) বিশ্বনবী (সা.)’র বরাত দিয়ে বলেছেন: জুমার দিনে সব মুসলমান এক জায়গায় সমবেত হয় বলে তাদের উদ্দেশ্যে উপদেশ দেয়ার জন্য খুতবার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সমাজের নেতা এই দিন জনগণকে আল্লাহর আদেশ মানার আহ্বান জানাবেন, তাদেরকে গুনাহ’র শাস্তি সম্পর্কে ভয় দেখাবেন এবং সর্বোপরি তাদেরকে ধর্মীয় দায়িত্ব ও বিধিবিধান সম্পর্কে সচেতন করে তুলবেন। সেইসঙ্গে বিশ্বের যেসব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলীতে মুসলিম উম্মাহর স্বার্থ রয়েছে সেসব ঘটনাবলী বর্ণনা করে সেখান থেকে শিক্ষা নেয়ার বা সে ব্যাপারে করণীয় ঠিক করে দেবেন।
জুমার নামাজের এত বেশি গুরুত্ব রয়েছে যে বিশ্বনবী (সা.) এ সম্পর্কে বলেছেন: নিঃসন্দেহে মহান আল্লাহ জুমার নামাজকে ফরজ করেছেন। উদাসিনতার কারণে অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে যদি কেউ এই নামাজ ত্যাগ করে তাহলে মহান আল্লাহ তাকে অস্থিরচিত্ত করে দেবেন এবং সে কোনো কাজে বরকত পাবে না।
জুমার নামাজ অবশ্যই জামায়াতে আদায় করতে হয়। একাকী জুমার নামাজ পড়া সম্ভব নয়। এ কারণে, জুমার নামাজকে মুসলমানদের সাপ্তাহিক রাজনৈতিক ও সামাজিক মিলনমেলা বলে অভিহিত করা হয়। জুমার দিনে ইমাম সাহেব প্রথম খুতবার শুরুতে মহান আল্লাহর প্রশংসা করবেন, এরপর রাসূলের শানে দরুদ পেশ করবেন এবং তারপর মুসল্লিদেরকে তাকওয়ার দিকে আহ্বান জানাবেন। তিনি পবিত্র কুরআন থেকে একটি ছোট সূরা পড়ে শোনাবেন। দ্বিতীয় খুতবায়ও তিনি মুসল্লিদেরকে তাকওয়ার দাওয়াত দেয়ার পাশাপাশি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির আলোকে মুসলিম উম্মাহর করণীয় সম্পর্কে বক্তব্য রাখবেন।
তো বন্ধুরা, শুরুতেই যেমনটি বলেছিলাম, আসরের এ পর্যায়ে আপনাদেরকে মক্কা ও মদীনার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত শাজারা মসজিদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব। মদীনা শহরের বাইরে অবস্থিত এই মসজিদ মুসলিম সমাজের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যারা আল্লাহর ঘর জিয়ারত করতে মক্কায় প্রবেশ করতে চান তারা ইহরাম না বেঁধে মক্কায় প্রবেশ করতে পারেন না। মক্কায় প্রবেশের আগে যেসব স্থানে বসে হাজ্বিরা ইহরাম বাঁধেন সেসব স্থানকে মিকাত বলা হয়। শাজারা মসজিদ এরকমই একটি মিকাত হিসেবে পরিচিত। বিশ্বনবী (সা.) মক্কায় যাওয়ার সময় এই স্থানে একটি গাছের নীচে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করেছিলেন। আরবি ভাষায় গাছকে বলা হয় শাজারা। রাসূল একটি গাছের নীচে নামাজ আদায় করেছিলেন বলে এই মসজিদের নাম দেয়া হয়েছে শাজারা মসজিদ। বিশ্বনবী (সা.) এই জায়গায় তিনবার ইহরাম বেঁধেছিলেন। প্রথমবার ষষ্ঠ হিজরিতে হুদায়বিয়ার সন্ধির সময়। দ্বিতীয়বার অষ্টম হিজরিতে মক্কা বিজয়ের সময়। আর শেষবার বিদায় হজ করতে আসার সময় এই স্থানে বসে ইহরাম বেঁধেছিলেন আল্লাহর রাসূল।
শাজারা মসজিদকে ইহরাম মসজিদ, জুলহুলাইফা মসজিদ এবং আবিয়ারে আলী (আ.)ও বলা হয়। আবিয়ার হচ্ছে আরবি বেএর (بئر) শব্দের বহুবচন। বেএর অর্থ কূপ। আবিয়ার হচ্ছে কূপগুলো। হযরত আলী (আ.) এই এলাকার খেজুর বাগানগুলোতে পানি সেচের জন্য এখানে অসংখ্য কূপ খনন করেছিলেন বলে এই মসজিদকে আবিয়ারে আলী (আ.) বলা হয়। ইরানের বিখ্যাত ভাষাবিদ ফিরুজাবাদি শাজারা মসজিদ সম্পর্কে লিখেছেন: “এই মসজিদটিকে আবিয়ারে আলী (আ.) নাম ছাড়া চেনা সম্ভব নয়।” সর্বপ্রথম নির্মিত এ মসজিদে বিশাল বারান্দা এবং আঙ্গিনা ছিল বলে মনে করা হয়। কিন্তু অষ্টম ও নবম হিজরিতে এসে মসজিদটির শুধুমাত্র দেয়ালগুলো অবশিষ্ট ছিল। ওসমানীয় শাসনামলে ১০৫৮ হিজরিতে ভারতের একজন মুসলমান এই মসজিদটি পুনর্নির্মাণ করেন এবং এতে একটি মিনার সংযুক্ত করেন। এখন থেকে আড়াই দশক আগে রাজা ফাহাদের শাসনামলে মসজিদটিকে আরেকবার পুনর্নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে এই কমপ্লেক্সের আয়তন ৯০ হাজার বর্গমিটার। শুধু মসজিদের আয়তন প্রায় ২৬ হাজার বর্গমিটার যেখানে পাঁচ হাজার মুসল্লি একসঙ্গে জামায়াতে নামাজ আদায় করতে পারেন।
মিকাতের স্থান হিসেবে এতক্ষণ আমরা যে শাজারা মসজিদের বর্ণনা দিলাম সেটি ছাড়াও খোদ মক্কা নগরীতে আরেকটি শাজারা মসজিদ আছে। এই মসজিদটি এই নগরীর অন্যতম পুরনো মসজিদ। তৃতীয় হিজরি শতাব্দির বিখ্যাত ঐতিহাসিক মুহাম্মাদ বিন ইসহাক ফাকিহি এ সম্পর্কে লিখেছেন: রাসূলুল্লাহ (সা.)’র স্মৃতি বিজড়িত যেসব মসজিদে নামাজ পড়া মুস্তাহাব সেসবের মধ্যে শাজারা মসজিদ অন্যতম। এই মসজিদটি মক্কা নগরীর পার্শ্ববর্তী উঁচু পাহাড়ের পাদদেশে এবং ‘আলজিন’ মসজিদের বিপরীত দিকে অবস্থিত। এখানে দাঁড়িয়ে রাসূলে খোদা (সা.) একটি গাছকে ডেকেছিলেন এবং গাছটি তাঁর কথা শুনে হেঁটে আল্লাহর নবীর কাছে চলে এসেছিল।
এরপর তিনি বিশ্বনবীর এই মুজিযা বা অলৌকিক ঘটনাটির স্বীকৃতি হিসেবে পাঁচ প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা তুলে ধরেছেন। এসব বর্ণনার একটিতে বলা হয়েছে, বিশ্বনবী (সা.) রাক্কানা বিন আব্দ ইয়াজিদ বিন হাশেম নামক এক ব্যক্তির কাছে দ্বীনের দাওয়াত তুলে ধরেন। ওই ব্যক্তি তখন বলেছিল, একটি গাছকে ডেকে যদি আপনি নিজের কাছে আনতে পারেন তাহলে আমি ঈমান আনব। এ অবস্থায় নবীজী একটি গাছের দিকে তাকিয়ে বলেন: আল্লাহর ইচ্ছায় তুমি আমার কাছে চলে এস। একথা শুনে গাছ হেঁটে হেঁটে রাসূলের কাছে চলে আসে।#
পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ/২৭