জুলাই ৩১, ২০১৭ ২২:১২ Asia/Dhaka

মহান আল্লাহ মসজিদকে নিজের ঘর হিসেবে অভিহিত করেছেন এজন্য যে, বান্দারা যেন তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য এই ঘরে এসে ইবাদত করে। এদিকে, আল্লাহ তায়ালার ইবাদতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হচ্ছে কুরআন মজিদ।

দুনিয়াতে মানুষের জীবন কীভাবে পরিচালিত হতে হবে তার পূর্ণাঙ্গ বিধান রয়েছে এই কুরআনে। ইসলামের শুরু থেকেই মসজিদ ও পবিত্র কুরআন মজিদের মধ্যে রয়েছে নিবিড় বন্ধন। মহানবী (সা.) বলেছেন: “যে কুরআনকে ভালোবাসে মসজিদের প্রতিও তার ভালোবাসা অপরিসীম।” প্রকৃতপক্ষে মানুষের ঈমান শক্তিশালী করার কাজে মসজিদ ও কুরআন পারস্পরিক সহায়তামূলক দু’টি মূল স্তম্ভ হিসেবে কাজ করে। মসজিদের আধ্যাত্মিক পরিবেশের সঙ্গে কুরআনের গভীর সম্পর্ক থাকার কারণে আল্লাহর ঘরে বসে এই মহাগ্রন্থ তিলাওয়াত করলে তা মানুষের অন্তরে অনেক বেশি প্রভাব ফেলে।

এ সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেছেন, মসজিদে এসে কুরআনের একটি আয়াত তেলাওয়াত করলে একটি উটের সওয়াব তার আমলনামায় লেখা হয়, দুই আয়াত অধ্যয়ন করলে দু’টি উটের সওয়াব এবং তিনটি আয়াত তিলাওয়াত করলে তিনটি উটের সওয়াব  পাওয়া যায়। সে সময় মক্কায় উটের এত বেশি কদর ছিল যে, একটি উট পাওয়ার জন্য মানুষ প্রবল পরিশ্রম ও কষ্ট স্বীকার করতেও প্রস্তুত ছিল। এ কারণে মহানবী (সা.) বলেছেন: পার্থিব জীবনের ক্ষণস্থায়ী সম্পদ অর্জনের জন্য মানুষ যেমন যেকোনো পরিশ্রম ও ত্যাগ স্বীকার করতে রাজি থাকে তেমনি আধ্যাত্মিক সম্পদ অর্জনের জন্যও কঠোর পরিশ্রম করতে হবে।

কাজেই আমরা বুঝতে পারলাম, মসজিদে বসে কুরআন তেলাওয়াত, এর আয়াতগুলো মুখস্ত করা ও শেখার গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলামে মসজিদকে এত বেশি মর্যাদা দেয়া হয়েছে যে, যারা মসজিদের সঙ্গে শত্রুতা পোষণ করে, মসজিদকে ধ্বংস করতে এবং ধর্মীয় তৎপরতা বন্ধ করার জন্য মসজিদের কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে চায় তাদেরকে পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে জালিম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সূরা বাকারার ১১৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, যে ব্যাক্তি আল্লাহর মসজিদসমূহে তাঁর নাম উচ্চারণ করতে বাধা দেয় এবং সেগুলোকে উজাড় করতে চেষ্টা করে, তার চাইতে বড় যালেম আর কে হতে পারে? এদের পক্ষে ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় ছাড়া মসজিদসমূহে প্রবেশ করা বিধেয় নয়। ওদের জন্য ইহকালে লাঞ্ছনা এবং পরকালে কঠিন শাস্তি রয়েছে।

আসরের এ পর্যায়ে আমরা মদীনার ‘মাসজিদে সাব’আ’ বা সাত মসজিদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব।

মদীনার যে স্থানে আহযাবের যুদ্ধ হয়েছিল পরবর্তী সময়ে সেখানে পাশাপাশি ছয়টি এবং একটু দূরে আরেকটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল। এই মসজিদগুলোর নাম হচ্ছে- ফাত্‌হ মসজিদ, সালমান মসজিদ, ইমাম আলী (আ.) মসজিদ, ফাতিমা (সা.) মসজিদ, আবুবকর মসজিদ, ওমর মসজিদ এবং দূরের মসজিদটির নাম মসজিদে কিবলাতাইন। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মসজিদটি হলো ফাত্‌হ মসজিদ। এটি একটি পাহাড়ের উপরে নির্মিত হয়েছে। আহযাব বা খন্দকের যুদ্ধের সময় রাসূলুল্লাহ (সা.) এই পাহাড়ের উপরে অবস্থান করেন এবং কাফেরদের আগমন প্রতিহত করার জন্য এর পেছনে খোড়া হয় বিশাল খন্দক। বিশ্বনবী (সা.) এই পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে মুসলমানদের বিজয়ের জন্য দোয়া করেছিলেন। সে দোয়া কবুল হওয়ার কারণে তিনি এখানে শোকরানা নামাজ আদায় করেন এবং পরবর্তীতে এখানে মসজিদ নির্মিত হয়।

বদর ও ওহুদের পর মুসলমানদের বিরুদ্ধে মক্কার কাফেরদের তৃতীয় বড় যুদ্ধ ছিল জাঙ্গে আহযাব বা আহযাবের যুদ্ধ। পঞ্চম হিজরিতে এই যুদ্ধ সংগঠিত হয়। এই যুদ্ধে মক্কার সবগুলো গোত্র একত্রিত হয়ে ইহুদিদের সঙ্গে হাত মেলায় যাতে তাদের ধারণায় মুসলমানদেরকে সমূলে বিনাশ করে দেয়া যায়। কিন্তু ইমাম আলী (আ.)’র অভূতপূর্ব বীরত্ব এবং সাহাবীদের দৃঢ় প্রতিরোধের কারণে ওই যুদ্ধে মুসলমানরা কাফেরদের বিরুদ্ধে বিজয়ী হন। যে জায়গায় দাঁড়িয়ে রাসূলে আকরাম (সা.) এ যুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য দোয়া করেন সেটি পাহাড়ের একটি উঁচু স্থান হওয়ার কারণে এখানে নির্মিত মসজিদটিকে ‘মসজিদুল আ’লা’ও বলা হয়।

মদীনার সাতটি বিখ্যাত মসজিদের আরেকটির নাম সালমান ফারসি মসজিদ। সালমান ফারসি ছিলেন বিশ্বনবীর একজন বিখ্যাত সাহাবী। বর্ণনায় এসেছে, সালমান ছোটবেলায় যরাথ্রুষ্ট ধর্মের অনুসারী থাকলেও কিশোর বয়সে খ্রিস্টান হয়েছিলেন। খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে তিনি সিরিয়ায় গমন করেন এবং সেখানে পাদ্রীদের শীষ্যত্ব গ্রহণ করেন। সিরিয়ার পাদ্রীদের মুখে আরব দেশে একজন নবীর আবির্ভাবের ভবিষ্যদ্বাণী শুনে সেই নবীর সন্ধানে হিজাজে গমন করেন। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর একটি আরব গোত্র তাকে বন্দি করে দাসে পরিণত করে। কয়েক মনিবের হাত ঘুরে তিনি বানু কুরাইজা গোত্রের একজন ইহুদির কাছে বিক্রি হন। ওই ব্যক্তি তাকে মদীনায় নিয়ে যায়। মদীনায় গিয়ে তিনি তার কাঙ্ক্ষিত নবীর সন্ধান পান এবং তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ইসলাম গ্রহণ করেন।সালমান ফারসি আহযাবের যুদ্ধে কাফেরদের প্রতিহত করার উপায় হিসেবে যেসব এলাকা দিয়ে কাফেররা মদীনায় হামলা করতে সেসব জায়গায় খন্দক বা পরিখা খনন করার প্রস্তাব দেন। তাঁর এ কৌশল বিশ্বনবী (সা.)’র পছন্দ হয় এবং এটি বাস্তবায়ন করায় যুদ্ধে মুসলমানরা বিজয়ী হন। এ কারণে সালমান ফারসির নাম অনুসারে এখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়।

সালমান ফারসি মসজিদের দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে ইমাম আলী ইবনে আবি তালিব (আ.) মসজিদ অবস্থিত। আহযাবের যুদ্ধে মক্কার কাফেরদের পক্ষে যুদ্ধ করতে এসেছিল তখনকার শ্রেষ্ঠ পালোয়ান আমরু বিন আব্দু। সম্মুখ সমরে হযরত আলী (আ.) আমরুকে পরাজিত ও হত্যা করেন। আমরু নিহত হওয়ায় মুশরিকদের মনোবল ভেঙে যায়।

মদীনার বিখ্যাত সাত মসজিদের আরেকটির নাম ফাতিমাতুজ জাহরা (সা.) মসজিদ। এই মসজিদের নামকরণ সম্পর্কে ঐতিহাসিক কোনো দলিল পাওয়া যায় না। ধারণা করা হয়, এখানে সা’দ বিন মুআজ নামের একটি মসজিদ ছিল যেটি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর ফাতিমাতুজ জাহরা মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। সা’দ বিন মুআজ ছিলেন মদীনার আওস গোত্রের প্রধান। তিনি আহযাব বা খন্দকের যুদ্ধে আহত হয়ে পরে শহীদ হন। তার সম্পর্কে বিশ্বনবী (সা.) বলেছেন: সা’দের জানাযায় হাজার হাজার ফেরেশতা অংশগ্রহণ করেন। আহলে সুন্নাতের বিভিন্ন দলিলে এসেছে, সা’দ বিন মুআজের মৃত্যুতে আল্লাহর আরশ কেঁপে উঠেছিল।

সালমান মসজিদের দক্ষিণ দিকে আবুবকর মসজিদ অবস্থিত। এই মসজিদটিও ভূপৃষ্ঠ থেকে খানিকটা উঁচুতে অবস্থিত। কয়েক ধাপ সিঁড়ি পার হয়ে এই মসজিদে পৌঁছাতে হয়। ফাত্‌হ মসজিদের মতো এটিও ওসমানীয় শাসনামলে নির্মিত হয় এবং পরবর্তীতে কয়েকবার এতে সংস্কার আনা হয়েছে। আবুবকর মসজিদের দক্ষিণ-পূর্বে দ্বিতীয় খলিফা ওমরের নামে আরেকটি মসজিদ রয়েছে। ইতিহাস বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, নবম হিজরি শতাব্দি পর্যন্ত এখানে কোনো মসজিদ ছিল না। ঐতিহাসিক দলিলে এখানে প্রথম হিজরি শতাব্দি থেকে যে তিনটি মসজিদের অস্তিত্ব পাওয়া যায় সেগুলো হলো- ফাত্‌হ মসজিদ, সালমান মসজিদ ও আলী ইবনে আবি তালিব (আ.) মসজিদ।

তবে মসজিদে কিবলাতাইনের নামকরণের সঙ্গে আহযাব যুদ্ধের কোনো সম্পর্ক নেই। দ্বিতীয় হিজরির ১৫ শাবান এই মসজিদে রাসূলুল্লাহ (সা.)’র নামাজরত অবস্থায় মুসলমানদের ক্বেবলা মসজিদুল আকসা থেকে মসজিদুল হারামের দিকে পরিবর্তিত হয়েছিল। একই মসজিদে দাঁড়িয়ে যেহেতু হুজুরে পাক (সা.) দুই কিবলার দিকে মুখ করে নামাজ পড়েছিলেন তাই এই মসজিদের নাম কিবলাতাইন বা দুই কিবলা রাখা হয়েছে। বর্তমানে এই মসজিদে রয়েছে দু’টি গম্বুজ, দুটি মিনার এবং দু’টি মেহরাব। মেহরাবগুলোর একটি মসজিদুল হারামের দিকে মুখ করা এবং অন্যটি বাইতুল মোকাদ্দাসের দিকে ঘোরানো।#

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ/৩১