আগস্ট ২৮, ২০১৭ ১৭:৪৩ Asia/Dhaka

আমরা আগের আসরগুলোতে বলেছি, মসজিদ হচ্ছে এমন একটি মেহমানখানা যার মালিক হচ্ছেন খোদ আল্লাহ তায়ালা। মনে হয় মসজিদে যেন তিনি তাঁর অতিথিদের শরীর ও মনে দয়ার পরশ বুলিয়ে দেন।

এই পবিত্র স্থানে মুমিনরা কায়মনোবাক্যে আল্লাহর সামনে নিজেকে  অসহায় হিসেবে উপস্থাপন করে তাঁর দয়া ও করুণা কামনা করেন। আল্লাহর প্রতি আকর্ষণের বহিঃপ্রকাশই হচ্ছে দোয়া। এটি সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে বান্দার সংযোগ স্থাপনের রজ্জুর মতো। মহানবী (সা.) নিজে যেমন মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া ও কান্নাকাটি করেছেন তেমনি নিজের উম্মতকে মনের আকাঙ্ক্ষার কথা আল্লাহর কাছে ব্যক্ত করার জন্য বেশি বেশি দোয়া করতে বলেছেন।

মহান আল্লাহর প্রশংসা এবং তার আসমাউল হুসনা উচ্চারণ করার অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে মসজিদে দোয়া ও মুনাজাত করা। কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে, মসজিদে বসে দোয়া পাঠের বিশেষ ফজিলত রয়েছে। ইমাম সাদেক (আ.) তাঁর অনুসারীদের বলতেন, দুঃখ-কষ্টে পড়লে তারা যেন মসজিদে এসে নামাজ আদায়ের পর কষ্ট থেকে পরিত্রাণের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করে। মসজিদ হচ্ছে আল্লাহর রহমত নাজিল হওয়ার স্থান। এ কারণে আল্লাহর দয়া ও রহমতের প্রয়োজন হলেই মসজিদে গিয়ে তাঁর কাছে চাইতে হবে।

এ সম্পর্কে আবু লুবাবা’র মসজিদে নববীতে আশ্রয় নেয়ার ঘটনা উল্লেখ করা যায়। মদীনার কাছে ইহুদি গোত্র বানু কুরাইজার বিরুদ্ধে মুসলমানদের যুদ্ধের সময় আবু লুবাবা শয়তানের ধোঁকায় পড়ে বিশ্বনবী (সা.)’র যুদ্ধ পরিকল্পনা ইহুদিদের কাছে ফাঁস করে দেন। এক পর্যায়ে তিনি নিজের অপরাধ উপলব্ধি করতে পেরে অনতিবিলম্বে মসজিদে নববীতে চলে যান এবং সেখানকার একটি স্তম্ভের সঙ্গে নিজেকে বেঁধে ফেলেন ও আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করতে থাকেন। এ অবস্থায় কয়েকদিন অতিবাহিত হয়ে যায় এবং এক পর্যায়ে আল্লাহ তায়ালা তার তওবা কবুল করেন।

ইসলামের প্রাথমিক যুগে এভাবে কেউ মারাত্মক অপরাধ করলেই তিনি মসজিদে চলে যেতেন। কারণ, তারা মনে করতেন আল্লাহর বিশেষ দয়া ও ক্ষমা লাভের স্থান হচ্ছে মসজিদ। মহানবী (সা.)ও তাদের এই ধারনাকে অনুমোদন দিয়েছেন। তিনি নিজে আবু লুবাবা’র তওবা কবুল হওয়ার খবর উম্মে সালামাকে দেন। খবরটি যখন মসজিদে পৌঁছায় তখন সবাই আবু লুবাবার হাত পায়ের দড়ি খুলে দেয়ার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু আবু লুবাবা তাদেরকে সে অনুমতি দেননি। তিনি বলেন: না! আল্লাহর রাসূল (সা.) নিজে আমার দড়ি খুলে দেবেন। এরপর এক পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ মসজিদে এসে তার হাত পায়ের রশি খুলে দেন।

বর্ণনায় এসেছে, একবার ইমাম জয়নুল আবেদীন (আ.)  এক ব্যক্তিকে দেখলেন একজন অত্যাচারী ধনী ব্যক্তির বাড়ির সামনে বসে আছে। তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন: তুমি কেন একজন অহংকারী ও অত্যাচারী ব্যক্তির বাড়ির সামনে ধর্না দিয়েছ? উত্তরে সে বলল: সমস্যায় পড়েছি হুজুর। ইমাম তখন বললেন: উঠে আমার সঙ্গে এসো। আমি এখন তোমাকে এমন একটি ঘর দেখিয়ে দেব যা এই ব্যক্তির ঘরের দরজার চেয়ে উত্তম। সেখানে তুমি এমন একজনের কাছে তোমার সমস্যার কথা বলবে যে তোমাকে এই ব্যক্তির চেয়ে অনেক বেশি উত্তম সমাধান দিতে পারবে।

এরপর তিনি ওই ব্যক্তির হাত ধরে মসজিদে নববীতে নিয়ে গিয়ে বললেন, কিবলামুখী হয়ে দুই রাকাত নামাজ আদায় করো।  এরপর আল্লাহর দরবারে দু’হাত তুলে সানা পাঠ করো এবং রাসূলের শানে দরুদ পাঠাও।  এরপর সূরা হাশরের শেষ আয়াত, সূরা হাদিদের প্রথম ছয় আয়াত এবং সূরা আলে ইমরানের প্রথম দুই আয়াত পাঠ করার পর আল্লাহর কাছে তোমার মনের কথা খুলে বলো। নিঃসন্দেহে তোমার দোয়া কবুল হবে। ইমাম সাদেক (আ.)ও তাঁর অনুসারীদেরকে বিপদের সময় মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় করে আল্লাহর দরবারে সমস্যা সমাধানের জন্য দরখাস্ত পেশ করতে বলতেন। তিনি বলতেন: আমার পিতা ইমাম বাকের (আ.) জোহরের নামাজের সময়  আল্লাহর কাছে মনের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করতেন।  প্রথমে তিনি আল্লাহর রাস্তায় সদকা দিতেন, তারপর উত্তম পোশাক পরে শরীরে সুগন্ধি লাগিয়ে মসজিদে যেতেন এবং সেখানে আল্লাহর কাছে মনের আকাঙ্ক্ষা খুলে বলতেন।

বন্ধুরা, আসরের এ পর্যায়ে আমরা ইরাকের  ‘বুরাসা’ মসজিদ নিয়ে আলোচনা করব। ইরাকের রাজধানী বাগদাদের একটি বিখ্যাত মসজিদের নাম বুরাসা মসজিদ। কয়েক ধাপ সিঁড়ি পার হওয়ার পর এর মূল ফটকে পৌঁছাতে হয়। ফটকের পরে রয়েছে কিছুটা খোলা জায়গা। মসজিদের উত্তর ও দক্ষিণ প্রান্তে দেয়ালের সঙ্গে স্থাপিত বিশাল স্তম্ভে সুন্দর ক্যালিগ্রাফি ও কারুকাজ দূর থেকে যেকোন মানুষের নজর কাড়ে। মসজিদের সামনের দিকে রয়েছে মাকামে হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (আ.)।

বাগদাদের পশ্চিম প্রান্তে কারাখ এলাকায় বুরাসা মসজিদ অবস্থিত।  বহু বছর আগে কারাখ ছিল বাগদাদ শহর থেকে তিন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একটি গ্রাম। কিন্তু ধীরে ধীরে বাগদাদ নগরীর বিস্তৃতির ফলে  গ্রামটি শহরের অন্তর্ভুক্ত হয়ে এই শহরেরই একটি এলাকায় পরিণত হয়েছে।

ঐতিহাসিক দলিলে এসেছে, বুরাসা মসজিদের জায়গায় ৩৭ হিজরি সাল পর্যন্ত একটি গির্জা ছিল।  ওই বছর ইমাম আলী (আ.) তাঁর সেনাবাহিনী নিয়ে এই এলাকা দিয়ে যাওয়ার সময় গির্জার কাছে বিশ্রাম নিতে চাইলেন। তখন গির্জার পাদ্রী হযরত আলী (আ.)কে বললেন: আপনি সেনাবাহিনী নিয়ে এখানে নামবেন না।  হযরত আলী (আ.) এর কারণ জানতে চাইলে পাদ্রী বললেন: এই দেশে নবী-রাসূল কিংবা তাদের স্থলাভিষিক্ত ছাড়া কেউ সেনাবাহিনী নিয়ে বাহন থেকে নামে না। এটি আমাদের ধর্মগ্রন্থগুলোতে লেখা আছে।  একথা শুনে হযরত আলী (আ.) বলেন: আমিই নবীর স্থলাভিষিক্ত।

তাঁর কথা শুনে ওই পাদ্রী মুসলমান হয়ে যান এবং বলেন, আপনার কথা আমি বাইবেলে পড়েছি যেখানে লেখা আছে আপনি বুরাসা এলাকায় হযরত মারিয়াম ও হযরত ঈসা (আ.)’র ঘরের কাছে এসে ঘোড়া থেকে নামবেন। এরপর হযরত আলী (আ.) ওই পাদ্রীকে বলেন, আপনি দয়া করে আর কোনো কথা বলবেন  না।  এই কথা বলে তিনি হেঁটে একটু দূরে গিয়ে এক জায়গায় পা দিয়ে মাটিতে আঘাত করেন। এর ফলে সেখান থেকে ফোয়ারার ধারায় পানি বেরিয়ে আসে। হযরত আলী (আ.) তখন সমবেত জনতার উদ্দেশে বলেন: এই হচ্ছে সেই ফোয়ারা যেটি হযরত মারিয়ামের জন্য মাটি ফেটে বের হয়েছিল।

হযরত আলী (আ.) চারদিন এই স্থানে অবস্থান করেন। এ কারণে তিনি চলে যাওয়ার পর তাঁর অনুসারীরা এখানে বুরাসা মসজিদ নির্মাণ করেন। বনি উমাইয়া ও বনি আব্বাসীয় শাসনকালের প্রায় পুরোটা সময় জুড়ে এই মসজিদ ছিল আহলে বাইত আলাইহিমুস সালামের অনুসারীদের সমাবেশস্থল। আব্বাসীয় খলিফা মুকতাদির বিল্লাহর শাসনামলে এই মসজিদের চূড়ান্ত প্রসার ঘটে।  পরবর্তীতে ৩২৯ হিজরিতে আল-রাজি বিল্লাহ’র খেলাফতকালে মসজিদটি পুনর্নির্মিত হয়। পরবর্তীতে আরো বেশ কয়েকবার এটির সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ করা হয়। ২০০৬ সালে উগ্র সন্ত্রাসীরা বুরাসা মসজিদে ভয়াবহ বোমা হামলা চালায়। এতে অন্তত ৬৯ জন মুসল্লি শহীদ ও ১৩০ জন আহত হন।

ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমায় আহলে বাইতের অনুসারীদের কাছে এই মসজিদের মর্যাদা ছিল অপরিসীম।  বুরাসা এলাকার বহু নামীদামী মানুষকে কবর দেয়া হয়েছে এই মসজিদের পাশে।  এ ছাড়া, এই মসজিদে স্থাপিত ধর্মীয় শিক্ষালয় থেকে বেরিয়ে এসেছেন শেখ মুফিদের মতো বুযুর্গ আলেম।#

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ/২৮