অক্টোবর ১৮, ২০১৭ ১৭:২৮ Asia/Dhaka

গত আসরে আমরা বলেছি, ইসলামের প্রাথমিক যুগে ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে মসজিদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

রাসূলুল্লাহ (সা.) এই মসজিদে বসে উপস্থতি জনতাকে পবিত্র কুরআনের আয়াত শোনাতেন এবং সঙ্গে সঙ্গে তার তাফসিরও উপস্থাপন করতেন। তিনি ধর্মীয় হুকুম-আহকাম শিক্ষা দেয়ার পাশাপাশি ওয়াজ-নসিহতও করেছেন এই মসজিদে বসে।

তাকওয়া বা খোদাভীরুতা, পার্থিব ও পারলৌকিক জীবনের ব্যাখ্যা, শয়তান ও নফসের ধোঁকা থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায়, দুনিয়াবি লোভ-লালসা থেকে বেঁচে থাকার কৌশলসহ নানা বিষয়ে তিনি মানুষকে উপদেশ।  তাঁর বক্তব্য এতটা আকর্ষণীয় ও মধুর ছিল যে, তা শোনার জন্য সাধারণ মানুষ উন্মুখ হয়ে থাকত। সাধারণত অল্প কথায় সংক্ষেপে নিজের বক্তব্য তুলে ধরতেন রাসূলুল্লাহ (সা.)।  তাঁর যেসব খুতবা হাদিসের মাধ্যমে আমাদের হাতে এসে পৌঁছেছে তাতে দেখা যায়, তিনি একটি বিষয়ে কয়েক মিনিটের বেশি বক্তব্য রাখতেন না। কিন্তু অল্প কথার এই বক্তব্যগুলো ছিল গভীর অর্থবহ এবং শিক্ষণীয়। এগুলো উপস্থিত দর্শকের মনে গভীর রেখাপাত করত। জুমার নামাজের খুতবার ক্ষেত্রেও এই নিয়মের ব্যতিক্রম হতো না।

আল্লাহর রাসূল নামাজের ইমামতি করার সময়ও ছোট ছোট সূরা দিয়ে নামাজ পড়াতেন এবং দ্রুত নামাজ শেষ করে দিতেন।  একবার এক সাহাবী  রাসূলুল্লাহ (সা.)’র কাছে এসে বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি অমুকের ইমামতিতে নামাজ আদায় করতে পারি না। কারণ আমি অসুস্থ, বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না আর উনি নামাজ লম্বা করেন।  একথা শুনে রাসূলুল্লাহ ভীষণভাবে ক্ষিপ্ত হন এবং উপস্থিত জনতার উদ্দেশে বলেন, তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ নামাজ লম্বা করে সাধারণ মানুষকে মসজিদ থেকে বিমুখ করে ফেলেছে। যারা জামায়াতের ইমাম হবে তারা অবশ্যই নামাজ সংক্ষিপ্ত করবে। বিশেষ করে জামায়াতে বৃদ্ধ, অসুস্থ ও ব্যস্ত লোক থাকলে অবশ্যই দ্রুত নামাজ শেষ করে দেবে।

রাসূলে খোদার ধর্মীয় শিক্ষার মাহফিল প্রতিদিন অনুষ্ঠিত হতো না। কারণ, সেক্ষেত্রে বিষয়টি সাধারণ মানুষের জন্য ক্লান্তিদায়ক হয়ে উঠত।  তখনকার সমাজে শিক্ষিত ও জ্ঞানী লোক হিসেবে পরিচত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসুদ এ সম্পর্কে বলেন:  আমাদের ক্লান্তির কথা বিবেচনা করে রাসূলুল্লাহ (সা.) কোনো কোনোদিন মাহফিলের আয়োজন করা থেকে বিরত থাকতেন।  কখনো কখনো রাসূলুল্লাহ (সা.)’র ভাষণের সময় আগে থেকে ঘোষণা করে সবাইকে উপস্থিত হওয়ার আহ্বান জানানো হতো। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সাহাবীরা মাহফিলে উপস্থিত হওয়ার জন্য পরস্পরকে দাওয়াত দিতেন। তারা যা শুনতেন মাহফিলের পরে তা নিয়ে পরস্পরের সঙ্গে আলোচনা করতেন যাতে রাসূলের বক্তব্যের কোনো অংশ তাদের স্মৃতি থেকে মুছে না যায়।  কারণ, তারা জানতেন, আল্লাহর রাসূলের মুখ দিয়ে যে কথাই নিঃসৃত হয় তা ওহী এবং আল্লাহর কালাম ছাড়া আর কিছু নয়। সূরা নাজমের তিন ও চার নম্বর আয়াতে যেমনটি বলা হয়েছে: “তিনি (অর্থাৎ আল্লাহর রাসূল) প্রবৃত্তির তাড়নায় কোনো বক্তব্য দেন না। তিনি যা বলেন তা তাঁর উপর নাজিলকৃত আয়াত ছাড়া আর কিছু নয়।”

ইসলামের প্রাথমিক যুগে মসজিদে নারীর উপস্থিতি ছিল লক্ষ্যনীয়। তারা নামাজ আদায় এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)’র বক্তব্য শোনার জন্য মসজিদে যেতেন।  কখনো কখনো নারীদের জন্য আলাদা মাহফিলে বক্তব্য রাখতেন আল্লাহর রাসূল। এ ধরনের মাহফিলে উপস্থিত জনতার নানা ধরনের ধর্মীয় প্রশ্নের উত্তর দেয়া হতো। এ ছাড়া, মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের নানা সমস্যার জন্য ইসলাম কি ধরনের সমাধান দিয়েছে তাও বাতলে দিনে আল্লাহর রাসূল।

শুরুতেই যেমনটি বলেছিলাম, আজকে আসরে আমরা সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের পুরনো অংশে অবস্থিত জামে উমাইয়া মসজিদ নিয়ে আরো কিছু আলোচনা করব।  মসজিদ হচ্ছে আল্লাহর ইবাদত এবং মানুষের কাছে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে দেয়ার স্থান।  রাসূলুল্লাহ (সা.)’র জীবদ্দশায় সব মসজিদ ছিল অত্যন্ত সাদামাটা ও আড়ম্বরহীন।  কিন্তু তাঁর ওফাতের পর ধীরে ধীরে মসজিদের আধ্যাত্মিক গুরুত্ব কমে যাওয়ার পাশাপাশি এর বাহ্যিক চাকচিক্য বাড়তে থাকে।  উমাইয়া শাসনামলে এসে এই অবস্থার চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটে। এ বিষয়টি সম্পর্কে বিশ্বনবী (সা.) ভবিষ্যদ্বাণী করে গিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ঈমানের জোর যখন কমে আসবে তখন মসজিদের বাহ্যিক চাকচিক্য বেড়ে যাবে এবং সেখানে মুসল্লির উপস্থিতিও থাকবে প্রচুর। কিন্তু সেখানে ধর্মীয় শিক্ষার আসর থাকবে না এবং মানুষের অন্তরে নামাজের আধ্যাত্মিক প্রভাব পড়বে না। জামে উমাইয়া মসজিদটি ছিল ঠিক সেরকম। মুসলমানরা সে সময় বিশ্বের চারটি অত্যাশ্চর্য জিনিসের একটি হিসেবে এই মসজিদের নাম নিত।  

আগের আসরে আমরা বলেছি, যে স্থানে উমাইয়া মসজিদটি স্থাপিত হয় সেখানে অতীতে ছিল বিভিন্ন ধর্মের উপাসনালয়। হযরত ঈসা (আ.)’র আবির্ভাবের পর এই স্থানটিকে খ্রীস্টানরা গির্জা হিসেবে ব্যবহার করত। তার আগে অন্যান্য ধর্মের উপাসনালয় ছিল এটি। ৬৩৫ খ্রস্টাব্দে মুসলমানরা সিরিয়া জয় করার পর তারা এখানে নামাজ আদায় করতে শুরু করে। ইসলামের ইতিহাসের প্রথম মেহরাব নির্মিত হয় এই জামে উমাইয়া মসজিদে। দ্বিতীয় খলিফার শাসনামলে সিরিয়ার গভর্নরের দায়িত্বপ্রাপ্ত মুয়াবিয়া স্থাপনাটির একাংশকে মসজিদে রূপান্তর করে বাকি অংশকে গির্জা হিসেবে রেখে দেন। কিন্তু ৭০৫ খ্রিস্টাব্দে ওয়ালিদ বিন আব্দুলমালিক খলিফা হওয়ার পর গির্জার বাকি অংশটুকুও মসজিদের অন্তর্ভূক্ত করেন।  বর্তমানে এই মসজিদে আহলে সুন্নাতের চার মাজহাব অর্থাৎ মালিকি, হাম্বলি, শাফেয়ি ও হানাফি নামের চারটি মেহরাব রয়েছে।

এই মসজিদে এমন একটি ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছিল যা অন্যান্য মসজিদ থেকে এটিকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করে তুলেছে। সে ঘটনাটি ছিল কারবালার হৃদয়বিদারক ঘটনার পর এই মসজিদে ইমাম সাজ্জাদ (আ.) ও হযরত জয়নাব (সা.)’র তাঁদের জ্বালাময়ী ভাষণ।  ৬১ হিজরির ১০ মহররম কারবালার ময়দানে ইমাম হোসেইন (আ.) তাঁর ৭২ জন সঙ্গীসাথীসহ শাহাদাতবরণ করার পর ইমাম সাজ্জাদ (আ.) ও হযরত জয়নাব (সা.)’সহ ইমাম পরিবারের অন্যান্য সদস্য উমাইয়া বাহিনীর হাতে বন্দী হন।  বাহ্যিকভাবে কারবালার ময়দানে বিজয়ী বাহিনী প্রথমে বন্দীদেরকে কুফায় এবং এরপর তৎকালীন শাম বা বর্তমান সিরিয়ায় নিয়ে যায়।  বন্দীদের উপস্থিতিতে উমাইয়া মসজিদে উৎসবের আয়োজন করে ইয়াজিদ। একজন অনুগত খতিবকে মিম্বরে পাঠানো হয় খুতবা দেয়ার জন্য।  ওই খতিব ইমাম আলী (আ.) ও ইমাম হোসেইন (আ.)কে চরমভাবে অপমান করে এবং মুয়াবিয়া ও এজিদের প্রশংসা করে বক্তব্য রাখে।  

ইমাম সাজ্জাদ (আ.) এ অপমানকর বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে নীচ থেকে বলে ওঠেন: হে খতিব, তোমার জন্য দুর্ভোগ! তুমি বান্দার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য আল্লাহর ক্রোধের শিকার হওয়ার পথ বেছে নিয়েছো।  তোমার স্থানটি জাহান্নামের আগুনে পূর্ণ হয়ে যাক। এরপর এজিদের দিকে তাকিয়ে ইমাম বলেন: হে এজিদ! আমাকেও মিম্বরের উপরে উঠে কিছু বলতে সুযোগ দেয়া হোক। আমি মজলুমের পক্ষে এমন কিছু কথা বলতে চাই যাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি রয়েছে। ইয়াজিদ প্রথমে ইমামের এ অনুরোধ রক্ষা করতে চায়নি।  কিন্তু উপস্থিত জনতার চাপে শেষ পর্যন্ত অনুমতি দিতে বাধ্য হয়। ইমাম সাজ্জাদ (আ.) মিম্বরে উঠে মহান আল্লাহর প্রশংসা করার পর এমন জ্বালাময়ী ভাষণ দেন যাতে এজিদের শাসনক্ষমতার ভিত কেঁপে ওঠে।  যে মিম্বরে উঠে ইমাম সাজ্জাদ (আ.) ভাষণ দিয়েছিলেন তা আজও ইমাম সাজ্জাদ মিম্বর নামে অবশিষ্ট রয়েছে।

এ ছাড়া, মসজিদের ভেতরে চারটি স্তম্ভের শীর্ষে রয়েছে একটি গম্বুজ যা মাকামে ইমাম জয়নুল আবেদীন নামে পরিচিত। বলা হয়, ইমাম এখানে বিশ্রাম নিতেন। অবশ্য এতসব ঐতিহাসিক নিদর্শন সম্বলিত মসজিদটি সাম্প্রতিক সময়ে সিরিয়ার বিরুদ্ধে বিদেশি মদদে চাপিয়ে দেয়া জঙ্গিবাদ ও সহিংসতার কবল থেকে রক্ষা পায়নি। বেশ কয়েকবার এখানে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে যার ফলে মসজিদটির ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।#

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ/১৮