সূরা লুকমান; আয়াত ১-৬ (পর্ব-১)
কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে আমরা সূরা লুকমানের আলোচনা শুরু করবো। মক্কায় নাজিল হওয়া সূরা লুকমানে ৩৪টি আয়াত রয়েছে। এই সূরায় মহান আল্লাহ আসমান ও জমিন সৃষ্টির ক্ষেত্রে নিজের নিদর্শনাবলী বর্ণনা করার পাশাপাশি নিজ সন্তানের প্রতি হযরত লুকমানের কিছু প্রজ্ঞাপূর্ণ উপদেশ তুলে ধরেছেন। এ কারণে এই সূরার নামকরণ করা হয়েছে লুকমান।
এই সূরার ১ থেকে ৩ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,
الم (1) تِلْكَ آَيَاتُ الْكِتَابِ الْحَكِيمِ (2) هُدًى وَرَحْمَةً لِلْمُحْسِنِينَ (3)
“আলিফ-লাম-মিম।” (৩১:১)
“এগুলো প্রজ্ঞাময় কিতাবের আয়াত।” (৩১:২)
“হেদায়েত ও রহমত সৎকর্মপরায়ণদের জন্য।” (৩১:৩)
সূরা লুকমানের প্রথম আয়াত হচ্ছে কয়েকটি অক্ষরের সমষ্টি। সাধারণত কয়েকটি অক্ষর নিয়েই একটি শব্দ হয় এবং শব্দের নির্দিষ্ট অর্থ থাকে। অর্থহীন অক্ষর সমষ্টিকে শব্দ বলা হয় না। কিন্তু আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআনের ১১৪টি সূরার মধ্যে ২৯টি সূরা শুরু করেছেন কয়েকটি অক্ষর দিয়ে,কোন শব্দ দিয়ে নয়। ওই অক্ষরগুলো প্রত্যেকটি আলাদাভাবে উচ্চারিত হয়। যেমন সূরা লুকমানের প্রথম আয়াতটি আমরা "আলাম" পড়ি না বরং পড়ি-আলিফ-লাম-মিম।
পবিত্র কুরআন নাজিলের আগে আরবি ভাষায় এ ধরনের ভঙ্গিমা ছিল না। মুফাসসিরগণ একে "হরুফে মুকাত্বায়া" বলেন। অর্থাৎ এসব অক্ষর বিচ্ছিন্ন এবং আলাদা আলাদাভাবে উচ্চারিত হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব অক্ষরের পর বর্ণিত আয়াতে কোরআনের অলৌকিকত্ব ও মহত্ত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
আল্লাহ তায়ালা যেন বলতে চান- আমি আমার অলৌকিক গ্রন্থকে এই সব বর্ণমালা দিয়েই সাজিয়েছি; কোন অপরিচিত বর্ণমালা, শব্দ বা অক্ষর দিয়ে নয়। যারা দাবি করে কোরআন অলৌকিক এবং মোজেযা নয়, তারা পারলে এই বর্ণমালা দিয়েই কোরআনের মত গ্রন্থ রচনা করুক। এ ছাড়া, এই কুরআনে কোনো ধরনের বাতিল কথা নেই এবং এর মধ্যে কুসংস্কার স্থান পায়নি। সেইসঙ্গে এটি সত্য কথা বলে এবং সত্য পথের দাওয়াত দেয়।
সব মানুষকে হেদায়েতের জন্য কুরআন নাজিল হলেও কেবলমাত্র আল্লাহর নেককার বান্দারাই এই মহাগ্রন্থের মাধ্যমে হেদায়েতপ্রাপ্ত হন। অপবিত্র আত্মার অধিকারী ও বদকার লোকজন হয় এই কিতাবের বাণী শুনতে রাজি নয় অথবা শুনলেও তাদের কলুষিত অন্তরে এই আয়াতের কোনো প্রভাব পড়ে না এবং তারা হেদায়েত পায় না।
এই তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. প্রজ্ঞার ভিত্তিতে এবং সুস্পষ্ট দলিলের মাধ্যমে প্রাপ্ত হেদায়েত স্থায়ী হয়। এ কারণে কুরআন নিজেকে প্রজ্ঞাপূর্ণ কিতাব বলে পরিচয় দিয়েছে।
২. দয়া ও আন্তরিকতাপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে মানুষের কাছে দাওয়াতের বাণী পৌঁছে দিলেই কেবল এ বাণী মানুষের অন্তরে দাগ কাটে ও মানুষ হেদায়েত প্রাপ্ত হয়।
সূরার ৪ ও ৫ নম্বর আয়াতের মহান আল্লাহ বলেছেন,
الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَهُمْ بِالْآَخِرَةِ هُمْ يُوقِنُونَ (4) أُولَئِكَ عَلَى هُدًى مِنْ رَبِّهِمْ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ (5)
“যারা সালাত কায়েম করে,যাকাত দেয় এবং আখেরাত সম্পর্কে দৃঢ় বিশ্বাস রাখে।” (৩১:৪)
“এসব লোকই তাদের সৃষ্টিকতার পক্ষ থেকে আগত হেদায়েতের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং এরাই সফলকাম।” (৩১:৫)
আগের আয়াতে বর্ণিত ‘মুহসেনিন’ বা ‘সৎকর্মপরায়ণ’ শব্দের ব্যাখ্যা দিয়ে এই আয়াত শুরু হয়েছে। ইহসান বা সৎকর্মের দু’টি বাস্তবায়নযোগ্য দিক এবং একটি বিশ্বাসগত দিক রয়েছে। বাস্তবায়নযোগ্য দিকগুলো হলো নামাজ ও যাকাত এবং বিশ্বাসগত দিকটি হচ্ছে আখেরাতের প্রতি ঈমান।
ধর্মীয় সংস্কৃতিতে আল্লাহর ইবাদত তাঁর সৃষ্টির উপকার করা ছাড়া সম্ভব নয়। ইবাদত ও পরোপকার পরস্পরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বর্তমান পৃথিবীতে ঈমানদার পরিচয়দানকারী এমন বহু মানুষ রয়েছে যারা সারাক্ষণ নামাজ ও রোজাসহ অন্যান্য ইবাদতে মশগুল থাকলেও দরিদ্র ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কথা ভুলে বসে আছে। তারা ভাবে, প্রতিদিনের নিয়মিত ইবাদতগুলোই পরকালে তাদের মুক্তির জন্য যথেষ্ট।
অন্যদিকে এমন অনেক মানুষ আছে যারা শুধু পরোপকারেই ব্যস্ত; আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস বা তার ইবাদত-বন্দেগির দিকে তাদের কোনো খেয়াল নেই। কিন্তু এই দুই আয়াতে বলা হচ্ছে: তারাই মহান আল্লাহর বিশেষ হেদায়েতের অধিকারী এবং দুনিয়া ও আখেরাতে সৌভাগ্যবান যারা যাকাত প্রদান ও পরোপকার করার পাশাপাশি নামাজসহ অন্যান্য ইবাদতে মশগুল এবং যারা তাদের প্রতিটি কাজে পরকালের বিচার দিবসের কথা বিবেচনায় রাখেন।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. ইসলামি সংস্কৃতিতে নামাজ ও যাকাত পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। ঈমানদার ব্যক্তির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যই হবে নামাজ কায়েম ও যাকাত প্রদান।
২. প্রকৃত পূণ্যবান ব্যক্তি হচ্ছেন তিনি যিনি অপরের সমস্যা সমাধানের চিন্তায় বিভোর থাকার পাশাপাশি নিজের আত্মিক উন্নতিতেও সচেষ্ট। একটি করতে গিয়ে তারা আরেকটি ভুলে যান না। ঈমানবিহীন আমল কিংবা আমলবিহীন ঈমানের স্থান ইসলামে নেই।
সূরা লুকমানের ৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَشْتَرِي لَهْوَ الْحَدِيثِ لِيُضِلَّ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَيَتَّخِذَهَا هُزُوًا أُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ مُهِينٌ (6)
“এবং একশ্রেণীর লোক আছে যারা মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে অবান্তর কথাবার্তা সংগ্রহ করে এবং তা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে। এদের জন্য রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি।” (৩১:৬)
এই আয়াতে মানুষের সত্যপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ-অবান্তর কথাবার্তার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। ইতিহাসে এসেছে, কোনো কোনো আরব ব্যবসায়ী ইরানের মতো দেশগুলো সফরে গিয়ে সোহরাব-রুস্তমের মতো কল্পকাহিনী শুনে মক্কায় ফিরে গিয়ে সেগুলো মানুষের কাছে বর্ণনা করত। তারা বলত: মুহাম্মাদ তোমাদেরকে আদ ও সামুদ জাতির যেসব ‘কিচ্ছা-কাহিনী’ শোনাচ্ছে সেগুলো না শুনে বরং আমাদের কাছে এসো। আমরা তোমাদের কাছে এর চেয়েও মজাদার কাহিনী বর্ণনা করব। এভাবে তারা বিশ্বনবী (সা.)’র কাছ থেকে মানুষকে দূরে রাখার চেষ্টা করত। এছাড়া, কিছু মহিলা কবি প্রেমের কবিতা রচনা করে তাদের মধুময় কণ্ঠে লোকজনকে শোনাতো। তারা রাসূলের মুখে বর্ণিত আল্লাহর বাণী নিয়ে ঠাট্টা-মস্করা করত এবং সেগুলোকে মূল্যহীন হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করত।
এ কারণে এই আয়াতে বলা হচ্ছে: যারা সব ধরনের উপায় অবলম্বন করে অনর্থক মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে এবং কোনো দলিল উপস্থাপন ছাড়া আল্লাহর আয়াতকে ভিত্তিহীন প্রমাণের প্রয়াস চালায় তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি এবং দুনিয়া ও আখেরাতে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে অপমান ও লাঞ্ছনা।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. যেসব কথা, কাব্য ও গান-বাজনা মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিরত রাখে তা শুনতে ইসলামে নিষেধ করা হয়েছে।
২. সব মানুষ বিশেষ করে তরুণ সমাজের পথভ্রষ্ট হয়ে যাওয়ার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হচ্ছে গান-বাজনা এবং সিনেমা-নাটক নিয়ে পড়ে থাকা। ডিজিটাল যুগের আধুনিক সব যোগাযোগের মাধ্যমগুলিও এসবের অন্তর্ভুক্ত। এগুলো মানুষকে ইন্দ্রিয়পুজারি করে দেয় যার ফলে তারা আল্লাহকে ভুলে যায়।
৩. ইসলামের শত্রুরা মুসলিম সমাজকে পাপের পথে টেনে নিয়ে যাওয়ার জন্য আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে এই সমাজে যৌনতা ছড়িয়ে দিয়েছে। শত্রুদের এই সাংস্কৃতি আগ্রাসন থেকে নিজে বেঁচে থাকার পাশাপাশি সন্তানদের বাঁচাতে হবে।#