নভেম্বর ২৬, ২০১৭ ১৪:৫২ Asia/Dhaka

ইসলাম এবং আসমানি কিতাব কুরআন সব মানুষকে জ্ঞান অন্বেষণের দিকে আহ্বান জানায়। এ কারণে নিজের ঈমানের স্তরকে উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ধর্মীয় জ্ঞান বৃদ্ধিকে প্রতিটি মুসলমান নিজের কর্তব্য বলে মনে করে।

পবিত্র কুরআনে মানুষকে গোটা বিশ্বজগত বিশেষ করে  আসমান ও তারকারাজির বিন্যাস, দিন-রাত্রির আবর্তন, উদ্ভিদ, প্রাণী ও মানুষের সৃষ্টি রহস্য ইত্যাদি নিয়ে চিন্তা ও গবেষণা করতে বলা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে বার বার জ্ঞান অন্বেষণের আহ্বান জানানো হয়েছে যাতে মানুষ তার ঈমানি শক্তিকে বলীয়ান করতে পারে। পবিত্র কুরআনের দিক নির্দেশনার পাশাপাশি রাসূলুল্লাহ (সা.)’র জীবনীও মানুষকে জ্ঞান শিখতে উৎসাহিত করে।  

বিশ্বনবী (সা.)’র নবুওয়াত শুরুই হয়েছিল ইকরা বা ‘পড়ো’ শব্দ উচ্চারণের মাধ্যমে। অথচ আল্লাহর রাসূল তখন পড়তে জানতেন না এবং সে সময়ে আরব ভূখণ্ডে লেখাপড়া জানা মানুষ ছিল না বললেই চলে। নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক দলিলে পাওয়া যায়, ইসলামের আবির্ভাবের সময় মক্কা ও তার আশপাশের শহরগুলোতে স্বাক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন মানুষের সংখ্যা সর্বসাকুল্যে ২০ জনের বেশি ছিল না। তারপরও ‘প্রজ্ঞা মুমিনের অলঙ্কার’, ‘জ্ঞান অন্বেষণের জন্য প্রয়োজনে সুদূর চীন পর্যন্ত যাও’ ইত্যাদি বক্তব্য দিয়ে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা অর্জনের জন্য মানুষকে উৎসাহিত করার চেষ্টা করেছেন বিশ্বনবী (সা.)।  তাঁর এ বক্তব্য শুনে মানুষ বিদ্যা অর্জনে ঝাঁপিয়ে পড়েন; শিক্ষা অর্জনের জন্য চারিদিকে ছড়িয়ে যান।

ইসলাম যে জ্ঞান শিক্ষার প্রচলন ঘটায় তা খোদ সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক স্থাপনের পথ বাতলে দেয়। আর এই শিক্ষা দানের সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান হয়ে দাঁড়ায় মসজিদ। এ সম্পর্কে রাসূলে খোদা (সা.) যেমনটি বলেছেন: ‘যে ব্যক্তি জ্ঞান শিক্ষা করা বা অন্যকে জ্ঞান শিক্ষা দেয়ার উদ্দেশ্যে আমার মসজিদে (অর্থাৎ মসজিদে নববীতে) আসে সে যেন আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে নেমেছে।’ তবে ইসলামের প্রাথমিক যুগে যে শুধু মসজিদে নববীতেই এলম বা জ্ঞান শিক্ষা দেয়া হতো তা নয় বরং কুবা মসজিদসহ অন্যান্য মসজিদেও শিক্ষাদানের এই মহান কাজটি অনুষ্ঠিত হতো।  কিন্তু মসজিদে নববী ছিল কুরআন ও ইসলামি ফিকাহ শাস্ত্র শেখানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। কারণ, এই মসজিদের শিক্ষক ছিলেন স্বয়ং রহমাতুল্লিল আলামিন হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (সা.)। এই মসজিদে দিনের বেশিরভাগ সময় এমনকি রাতের বেলায়ও ধর্মীয় ক্লাস চলত।  বিশ্বনবীর পাশাপাশি তাঁর কাছ থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কয়েকজন বিশিষ্ট সাহাবী কুরআন ও ফিকাহ’র ক্লাস নিতেন।  এ ধরনের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ধারা মুসলিম বিশ্বে টানা প্রায় দুই শতাব্দি ধরে অব্যাহত ছিল।  এরপর স্বতন্ত্র ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্র ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর মসজিদকেন্দ্রীক জ্ঞান শিক্ষাকেন্দ্রগুলোর গুরুত্ব ধীরে ধীরে কমে যেতে থাকে।

শুরুতেই যেমনটি বলেছি, আসরের এ পর্যায়ে আমরা সিরিয়ার দু’টি বিখ্যাত মসজিদ অর্থাৎ মসজিদে নুকতা ও মসজিদুল আকসাব নিয়ে আলোচনা করব। কারবালার বন্দিদেরকে সিরিয়ার আলেপ্পো শহরে নিয়ে যাওয়ার পথে এজিদ বাহিনী শহরের কাছাকাছি জোশান পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত একটি স্থানে যাত্রাবিরতি করে। পরবর্তীতে এই স্থানে মসজিদে নুকতা নির্মাণ করা হয়।  বর্বর এজিদ বাহিনী ইমাম হোসেইন (আ.)’র খণ্ডিত মস্তক একটি পাথরের উপরে রাখে। পরদিন আবার রওনা দেয়ার সময় যখন মস্তকটি সেখান থেকে তোলা হয় তখন দেখা যায় সেখানে কয়েক ফোঁটা রক্ত লেগে আছে।  আলেপ্পোর অধিবাসীদের কাছে এ খবর পৌঁছার পর তারা ওই পাথরের চারপাশে জড়ো হয়ে কারবালার শহীদদের স্মরণে মাতম করতে থাকে।  তখন থেকে প্রতি বছর আশুরার দিন এই পাথর ও মসজিদকে কেন্দ্র করে শোকানুষ্ঠান পালন করে আসছিলেন ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা। কিন্তু ওয়ালিদ ইবনে আব্দুল মালিক বিন মারওয়ানের শাসনামলে পাথরটিকে অজ্ঞাত স্থানে সরিয়ে ফেলা হয়। এরপর আর ওই পাথরটিকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের শাসনামলে মসজিদে নুকতা নির্মাণ করা হয় বলে ইতিহাস থেকে জানা যায়। শুরুতে এটি ছিল এক গম্বুজবিশিষ্ট ছোট একটি মসজিদ।  পরবর্তীতে হিজরি চতুর্থ শতকে সাইফুদ্দৌলা হামেদানির শাসনামলে মসজিদটির আয়তন বড় করা হয় এবং পরবর্তীতে আরো বহুবার এটির পুনর্নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়। 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ওসমানীয় সম্রাট এই মসজিদকে অস্ত্রাগার হিসেবে ব্যবহার করে। যুদ্ধের শেষের দিকে সাধারণ মানুষ অস্ত্রাগারে হানা দেয় এবং এর ভেতরে থাকা গোলাবারুদ বিস্ফোরিত হয়ে মসজিদটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। এরপর কয়েক দশক ধরে আর কেউ মসজিদটির পুনর্নির্মাণ করেনি।  ১৯৬১ সালে আহলে বাইত (আ.)’র অনুসারীদের প্রচেষ্টায় মসজিদটির নির্মাণকাজ আবার শুরু হয়।  ১৯৬৭ সালে এর নির্মাণকাজ শেষ হয় এবং মুসল্লিরা আবার এখানে নামাজ আদায় করতে শুরু করেন। মসজিদে নুকতা একটি বিশাল মসজিদ যার পুরোটা পাথর দিয়ে তৈরি। এই মসজিদ আলেপ্পোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।

মসজিদুল আকসাব বা মসজিদে আল-কাসাব সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক মসজিদ। এই মসজিদের আঙ্গিনায় মুয়াবিয়ার নির্দেশে শহীদ হয়ে যাওয়া রাসূলের সাহাবী হুজ্‌র বিন আদি এবং তাঁর ছয় সঙ্গীর মস্তক দাফন করা হয়েছে। হুজ্‌র বিন আদি যৌবনে নিজের ভাই হানি বিন আদিকে সঙ্গে নিয়ে মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)’র কাছে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূলের ওফাতের পর যে মুসলিম বাহিনী সিরিয়া বিজয় করে তার অন্যতম সেনা ছিলেন তিনি। বীরযোদ্ধা হওয়ার পাশাপাশি তাকওয়া এবং ইবাদতের দিক দিয়েও তার জুড়ি ছিল না।

হযরত আলী (আ.)’র শাহাদাত এবং ইমাম হোসেন (আ.)’র ওপর সন্ধি চুক্তি চাপিয়ে দেয়ার পর মুয়াবিয়ার নির্দেশে আলী (আ.)’র অনুসারীদের ওপর চরম নির্যাতন ও নিপীড়ন চালানো হয়। সামান্য ও ভিত্তিহীন অভিযোগে রাসূলের বহু বিশিষ্ট সাহাবীকে হত্যা করা হয়। এসব শহীদের অন্যতম ছিলেন হুজর বিন আদি।  

যখন মুয়াবিয়া তাঁর শিরোশ্ছেদের নির্দেশে দেয় তখন হুজ্‌র ওসিয়ত করে যান তারে শরীর থেকে যেন রক্ত পরিষ্কার করা না হয়, কারণ তিনি কিয়ামতের ময়দানে রক্তমাখা শরীরে মুয়াবিয়ার পথ আটকাতে চান। জল্লাদরা হুজ্‌র ইবনে আদি এবং তাঁর এক ছেলেসহ সাতজনের দেহ থেকে মাথা আলাদা করে ফেলে। এরপর এই সাতজনের খণ্ডিত মস্তক মসিজদুল আকসাবের আঙ্গিনায় এক কবরে দাফন করা হয়। মসজিদের করিডোরে আজও লেখা আছে: ‘এখানে রাসূলুল্লাহ (সা.)’র সাত সাহাবীর কবর রয়েছে।’ তার উপরে সূরা আহযাবের ২৩ নম্বর আয়াত লেখা আছে যাতে বলা হয়েছে:  ‘মুমিনদের মধ্যে কেউ কেউ  আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা পূর্ণ করেছে। তাদের কেউ কেউ মৃত্যুবরণ করেছে (অর্থাৎ আল্লাহর রাস্তায় শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করেছে) এবং কেউ কেউ প্রতীক্ষা করছে। তারা তাদের সংকল্প মোটেই পরিবর্তন করেনি।’ এ ছাড়া পাথরের ওপর খোদাই করে হুজর বিন আদি’সহ সাত শহীদের নাম লেখা রয়েছে।

২০১১ সালে সিরিয়ায় বিদেশি মদদে যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়ার পর উগ্র তাকফিরি জঙ্গি গোষ্ঠী দায়েশ ও আন-নুসরা ফ্রন্টসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী নিজেদের নিয়ন্ত্রিত এলাকার ইসলামি ঐতিহ্যগুলো ধ্বংস করার কাজে হাত দেয়। তারা আল-আকসাব মসজিদে হামলা চালিয়ে হুজর বিন আদি’র কবর খুঁড়ে তাঁর লাশ বের করে এর অবমাননা করার দাবি করে। ইন্টারনেটে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ সংক্রান্ত ছবিও প্রচার করা হয়।  দাবি করা হয় তখনও হুজরের লাশ মৃত্যুর দিনের মতো অক্ষত ছিল। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, হুজর বিন আদিসহ তার ছয় সঙ্গীকে হত্যা করার পর তাদের মাথাগুলোকে শুধু এখানে এনে দাফন করা হয়েছিল; দেহগুলো নয়। দেহগুলোকে কি করা হয়েছিল তা কারো জানা নেই।

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ/১৮