ডিসেম্বর ২৩, ২০১৭ ১৭:০৬ Asia/Dhaka

ইসলাম আবির্ভাবের পরবর্তী চার শতাব্দি পর্যন্ত মসজিদের দ্বিতীয় প্রধান কাজই ছিল ধর্মীয় শিক্ষাদান। সাধারণত মসজিদের বারান্দায় এই কার্যক্রম চলত। শিক্ষকরা মসজিদের বারান্দার কোনো পিলার বা দেয়ালে হেলান দিয়ে বসতেন এবং শিক্ষার্থীরা তাকে কেন্দ্র করে গোল হয়ে বসে ক্লাস করত। এ সময় শিক্ষার্থীরা কোনো কিছু বুঝতে না পারলে ওস্তাদের কাছে প্রশ্ন করার সুযোগ পেত।

খ্রিস্টীয় দশম শতাব্দির বিখ্যাত ভূগোলবিদ আল-মুকাদ্দাসি কায়রোর প্রধান মসজিদে একই সময়ে এ ধরনের ১২০টি ক্লাস অনুষ্ঠিত হতে দেখেছেন।

ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকে আজ পর্যন্ত আলেম, তালেবুল এলম এবং কুরআন-হাদিসসহ ধর্মীয় বই-পুস্তকের সঙ্গে মসজিদ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। সে যুগে ধর্মীয় নতুন কোনো বই বের হলে তার মোড়ক উন্মোচন হতো মসজিদে। ছাপাখানা আবিস্কার হওয়ার আগে যেকোনো লেখক তার বই লেখা শেষ হলে মসজিদে এনে সমবেত জনতার উদ্দেশে সেটি পড়ে শোনাতেন। এখানেই তার নামে বইটি রেজিস্ট্রি হয়ে যেত। পরবর্তীতে মুসলিম বিশ্বে ছাপাখানার প্রচলন শুরু হওয়ার পর মুসলিম লেখকরা তাদের প্রকাশিত বই মসজিদকে উৎসর্গ করতেন। এভাবে পবিত্র কুরআন ছাড়াও হাদিস, তাফসির ও ফিকাহ শাস্ত্রসহ নানা ইসলামি বইয়ের বিশাল লাইব্রেরিতে পরিণত হয় মসজিদ। 

প্রথমদিকে মসজিদে এ রকম বইয়ের সমাবেশ ঘটবে বলে আগে থেকে কোনো ধারণা না থাকায় ইসলামের প্রাথমিক যুগে নির্মিত মসজিদে লাইব্রেরি করার জন্য আলাদা কোনো জায়গা রাখা হয়নি। কিন্তু পরবর্তীতে মসজিদ নির্মাণের আগেই ধর্মীয় ক্লাস ও লাইব্রেরির জন্য আলাদা ব্যবস্থা রেখে নকশা তৈরি হতো। সে যুগে এসব পাঠাগারের বেশিরভাগ বই হয় লেখকের পক্ষ থেকে অথবা কোনো দানশীল ব্যক্তির পক্ষ থেকে দান করা হতো যাতে গরীব শিক্ষার্থীরা এখান থেকে উপকৃত হতে পারে।  বেশিরভাগ মসজিদের পাঠাগার ছিল সাদামাটা ধরনের। তবে বড় বড় কিছু মসজিদে ছিল বিশাল বিশাল লাইব্রেরী এবং এসব লাইব্রেরীতে সব ধরনের দুস্প্রাপ্য বইয়ের সন্ধান পাওয়া যেত। কাজেই দেখা যাচ্ছে, নামাজ আদায় ও ধর্মীয় ক্লাসের পাশাপাশি পাঠাগার হিসেবেও মসজিদের ভূমিকা কোনো অংশে কম ছিল না।  মসজিদুল হারামের পাঠাগারটি ছিল মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঠাগার।  এই পাঠাগারে প্রায় সাড়ে তিন লাখ বই ও হাতে লেখা স্ক্রিপ্ট সংরক্ষিত ছিল।

এ প্রসঙ্গে মক্কা মুকার্‌রামার গুরুত্বপূর্ণ লাইব্রেরি সম্পর্কেও কিছু কথা বলে রাখা প্রয়োজন। ঐতিহাসিক দলিলে এসেছে, মক্কা মুকাররামার এই পাঠাগারের স্থানে বিশ্বনবী (সা.) জন্মগ্রহণ করেছেন।  নবীজি মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের পর ইমাম আলী (আ.)’র ভাই আকিল ইবনে আবু তালেব এবং পরবর্তীতে তার বংশধররা এই ভবনে বসবাস করতেন।  পরবর্তীতে মোহাম্মাদ বিন ইউসুফ আস-সাকাফি এই ঘরটিকে কিনে নেন এবং তাতে ‘দারে ইবনে ইউসুফ’ নামে একটি অংশ যুক্ত করেন।  এরপর আব্বাসীয় খলিফা মেহদির স্ত্রী ও হারুনুর রশিদের মা ১৭১ হিজরিতে ঘরটিকে মসজিদে রূপান্তিরত করেন। বর্তমান আলে-সৌদ রাজপরিবার ক্ষমতা দখল করার পর মসজিদটি ভেঙে ফেলা হয়। এরপর ১৩৭০ হিজরিতে এটির অবস্থান মসজিদুল হারামের অত্যন্ত কাছে হওয়ায় মক্কার সিটি কাউন্সিল মসজিদটিকে পাঠাগারে রূপান্তর করেন।  সাম্প্রতিক সময়ে মসজিদুল হারামের প্রসার ঘটানোর অজুহাতে এটিকে আবার ভেঙে ফেলার চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু মুসলিম বিশ্বের তীব্র প্রতিবাদের মুখে আলে সৌদ সরকার সে সিন্ধান্ত বাস্তবায়ন থেকে পিছিয়ে যায়।   আরো যেসব মসজিদে ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকে গুরুত্বপূর্ণ পাঠাগার ছিল সেসবের মধ্যে রয়েছে, উমাইয়া মসজিদ, দামেস্কের জামে জেইতুনিয়া মসজিদ, বাগদাদ জামে মসজিদ, কায়রো, নাজাফ ও কারবালার জামে মসজিদ। 

সুলতান হাসান মসজিদ, মিশর

সুলতান হাসান মসজিদ

আসরের এ পর্যায়ে আমরা সুলতান হাসান মসজিদ সম্পর্কে আলোচনা করব। মিশরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মসজিদের নাম সুলতান হাসান মসজিদ ও মাদ্রাসা। কায়রো শহরের সালাহউদ্দিন আইয়ুবি টিলার কাছে ১৩৫৯ খ্রিস্টাব্দে এই মসজিদ নির্মাণ করা হয়। ৭,৯০৬ বর্গমিটার এলাকাজুড়ে নির্মিত মসজিদটি মুসলিম বিশ্বের অন্যতম বড় মসজিদ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এই মসজিদের প্রাচীরগুলো ৩৬ মিটার উঁচু এবং এটির সবচেয়ে উঁচু মিনারের উচ্চতা ৬৮ মিটার।

বিশাল এই মসজিদের চার কোণে রয়েছে নীচু ছাদবিশিষ্ট চারটি আলাদা কক্ষ। শাফিয়ি, মালিকি, হানাফি ও হাম্বলি মাজহাবের জন্য এই চারটি কক্ষ বরাদ্দ রয়েছে।  চারটি কক্ষ থেকেই মসজিদের ভেতরের আঙ্গিনায় যাওয়ার পথ রয়েছে এবং চার মাজহাবের পক্ষে বয়ান করার জন্যও রয়েছে আলাদা আলাদ স্থান। এখান থেকে বোঝা যায়, সুলতান হাসান এই চার মাজহাবের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন।

গত আসরগুলিতে আমরা যেমনটি বলেছি, রাসূলুল্লাহ (সা.)’র জীবদ্দশায় নির্মিত মসজিদগুলো ছিল অত্যন্ত সাধাসিধে। কারণ, মসজিদ নির্মাণের উদ্দেশ্যই হচ্ছে আল্লাহকে স্মরণ এবং তিনি ছাড়া অন্য সবকিছুকে ভুলে থাকা। কাজেই এমনভাবে মসজিদ নির্মাণ করা উচিত যাতে তা দেখলে আল্লাহকে স্মরণ হয়; অন্য কিছু নয়, নির্মাণশৈলি বা চাকচিক্য নয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আল্লাহর রাসূলের ওফাতের পর মসজিদের সেই সাধাসিধে ভাব গায়েব হয়ে যায়। তবে ইসলামের প্রথম শতাব্দিগুলোতে মসজিদের আধ্যাত্মিক পরিবেশ ধরে রাখার ব্যাপক চেষ্টা ছিল। সেজন্য কিছু কৌশল অবলম্বন করা হয়। যেমন- মুসলিম বিশ্বের অন্য অনেক মসজিদের মতো সুলতান হাসান মসজিদে প্রবেশের পর একসঙ্গে একজন মুসল্লি মসজিদের পুরোটা অংশ দেখতে পেতেন না। ফলে মর্মর পাথরসহ আরো অনেক দামী নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হলেও সেগুলো একসঙ্গে দৃশ্যমান রাখা হয়নি মসজিদের আধ্যত্মিক পরিবেশ ধরে রাখার জন্য।

সুলতান হাসান মসজিদের আরেকটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এটির ভেতরে চার মাজহাবের জন্য আলাদা আলাদা কক্ষ থাকলেও এখানে নামাজের জামায়াত অনুষ্ঠিত হতো একটিই। প্রকৃতপক্ষে এখানে একটির বেশি জামায়াত অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাই রাখা হয়নি। অর্থাৎ সুলতান হাসান চেয়েছিলেন, শাফিয়ি, মালিকি, হানাফি ও হাম্বলি মাজহাবের অনুসারীরা সব মতপার্থক্য ভুলে এক জামায়াতে শরীক হয়ে নামাজ আদায় করবে।

পবিত্র কুরআনের সূরা নুরের ৩৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহর নূরকে এমন এক বাতির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে যে বাতির কাঁচে ঘেরা প্রাচীরের মধ্যে আলোকে সংরক্ষণ করা হয়। বলা হয়েছে- “আল্লাহ নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের জ্যোতি, তাঁর জ্যোতির উদাহরণ যেন একটি কুলঙ্গি, যাতে আছে একটি প্রদীপ, প্রদীপটি একটি কাঁচপাত্রে স্থাপিত, কাঁচপাত্রটি উজ্জ্বল নক্ষত্র সদৃশ্য। তাতে পুতঃপবিত্র যয়তুন বৃক্ষের তৈল প্রজ্বলিত হয়, যা পূর্বমুখী নয় এবং পশ্চিমমুখীও নয়।....” কুরআনের এই আয়াতটি সুলতান হাসান মসজিদের অসংখ্য ঝুলন্ত বাতির গায়ে লেখা রয়েছে।

বিশ্বের সবকিছু আল্লাহর পক্ষ হতে এসেছে এবং সবকিছুই তাঁর কাছে প্রত্যাবর্তন করবে। সূরা বাকারার ১৫৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা এ বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। বলেছেন- ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন।  আসমানের সঙ্গে জমিনের সংযোগ স্থাপনকারী এই আয়াতটি সুলতান হাসান মসজিদের বিভিন্ন স্থানে অত্যন্ত সুন্দর হস্তাক্ষরে লিপিবদ্ধ রয়েছে।  এ ছাড়া, মসজিদটির বিভিন্ন স্থানে দরুদ শরীফ লিপিবদ্ধ করে রাসূলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর পবিত্র বংশধরদের প্রতি সালাম ও দরুদ পেশ করার তাগিদ দেয়া হয়েছে।#

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ/২১