ধরণীর বেহেশত মসজিদ- ২৪ (ইয়েমেনের আল কাবির জামে মসজিদ)
আপনাদের হয়ত জানা আছে, ইসলামের প্রাথমিক যুগে দূরদূরান্ত থেকে যেসব মুসলমান মদীনায় আসতেন এবং যাদের থাকার কোনো জায়গা ছিল না তারা মসজিদে নববীতে আশ্রয় নিতেন।
আজকের আসরে আমরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা’র আল কাবির জামে মসজিদ নিয়ে আলোচনা করার পাশাপাশি মসজিদে আশ্রয় নেয়া ব্যক্তিদের সম্পর্কে কিছু কথা বলব।
আগের আসরগুলোতেও আমরা বলেছি, মসজিদের প্রধান কাজ নামাজ আদায়সহ অন্যান্য ইবাদত-বন্দেগী হলেও এখানে অন্যান্য ধর্মীয় তৎপরতা যেমন ওয়াজ-নসিহত, কুরআন তেলাওয়াত, তাফসিরে কুরআন, ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন, এতেকাফ ইত্যাদি কাজও সম্পন্ন হয়। অতীতে দরিদ্র, পথিক ও আশ্রয়হীন ব্যক্তিদেরকে মসজিদে আশ্রয় দেয়া হতো। যখনই দূর থেকে আগত কোনো পথিকের থাকার কোনো জায়গা পাওয়া না যেত তার জন্য মসজিদই হতো উত্তম আশ্রয়স্থল। মদীনার মসজিদে নববী থেকেই শুরু হয় এই সংস্কৃতি। রাসূলুল্লাহ (সা.)’র জীবদ্দশায়ই মসজিদে নববী সংলগ্ন বড় একটি স্থান দরিদ্র মানুষের বসবাসের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। সুফ্ফা নামক ছাদবিহীন এই স্থানটি মসজিদের অংশ না হলেও মসজিদেরই লাগোয়া ছিল। এখানে আশ্রয়প্রাপ্ত ব্যক্তিরা ধীরে ধীরে ‘আসহাবে সুফফা’ বা সুফফার অধিবাসী নামে পরিচিতি পেয়ে যান। এসব মানুষ দিনের বেলায় সূর্যের তাপ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য তাবুর নীচে আশ্রয় নিতেন। তবে রাতের বেলা মসজিদের যেকোনো স্থানে ঘুমানোর অনুমতি তাদের ছিল।
অবশ্য মনে রাখতে হবে, মসজিদ হচ্ছে আল্লাহর ঘর এবং প্রত্যেক মুসলমানের উচিত এই ঘরের সম্মান বজায় রাখা। অতি জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মসজিদে ঘুমানো থেকে বিরত থাকতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.)’র এক হাদিসে এসেছে যে, তিনি বলেছেন, “কোনো কারণ ছাড়া যে ব্যক্তি মসজিদে ঘুমাবে আল্লাহ তায়ালা তাকে এমন বিপদে ফেলবেন যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার কোনো উপায় থাকবে না।” মসজিদুল হারাম এবং মসজিদে নববীর মতো যেসব মসজিদের মর্যাদা যত বেশি সেসব মসজিদে ঘুমানো তত বেশি অন্যায়। তবে আসহাবে সুফফার মসজিদে নববীতে ঘুমানো সম্পর্কে যে ইতিহাস এসেছে তার সঙ্গে ইসলামের এই নির্দেশনার কোনো সংঘর্ষ নেই। কারণ, সুফফার অধিবাসী তারাই ছিলেন যারা মক্কা থেকে হিজরত করে মদীনায় গিয়েছিলেন। তারা নিজেদের ঘর-বাড়ি ও সহায়-সম্বল ফেলে আসার কারণে কপর্দকশূন্য হয়ে পড়েছিলেন। ফলে মসজিদ ছাড়া তাদের আর কোনো আশ্রয়স্থল ছিল না। কাজেই মসজিদে নববীতে তাদের ঘুম ছিল অতি জরুরি বিষয় এবং বিনা কারণে তারা এ কাজ করেননি।
মসজিদ পথিক ও দরিদ্র ব্যক্তিদের জন্য আশ্রয়স্থল হলেও এটি ভিক্ষাবৃত্তি এবং অন্যের কাছে সাহায্য চাওয়ার স্থান নয়। বিশ্বনবী (সা.) আসহাবে সুফফাসহ সে যুগের সব ভিক্ষুককে মসজিদে ভিক্ষা চাইতে নিষেধ করে দিয়েছিলেন। হাদিস শরীফে মসজিদে প্রকাশ্যে বা গোপনে মানুষের কাছে সাহায্য চাইতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। কারণ, মসজিদ হচ্ছে ইবাদত-বন্দেগি, কুরআন পাঠ, মুনাজাত ও অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনের স্থান। কাজেই নামাজের সময় বা এর আগে কিংবা পরে সাহায্য চাওয়া মসজিদের মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তবে এখানে মনে রাখতে হবে, ভিক্ষা করা এবং ভিক্ষুককে ভিক্ষা দেয়া সম্পূর্ণ দু’টি আলাদা বিষয়। মসজিদে ভিক্ষা করতে নিষেধ করা হলেও কেউ সাহায্য চেয়ে ফেললে তাকে সাহায্য দিতে নিষেধ নেই।
সূরা মায়েদা’র ৫৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “তোমাদের বন্ধু তো আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং মুমিনবৃন্দ-যারা নামায কায়েম করে এবং রুকু করা অবস্থায় যাকাত দেয়।” বেশিরভাগ মুফাসসির ও মুহাদ্দিস এ ব্যাপারে একমত যে, এই আয়াতটি হযরত আলী (আ.) সম্পর্কে নাজিল হয়েছে। তিনি মসজিদে নববীতে নামাজরত অবস্থায় নিজের হাতের আংটি একজন ভিক্ষুককে দান করেছিলেন।
এ ছাড়া, মসজিদের ইমাম বা অন্য কোনো দানশীল ব্যক্তি যদি দরিদ্রদের মাঝে বিলিয়ে দেয়ার জন্য মুসল্লিদের কাছ থেকে দান-খয়রাত গ্রহণ করেন তাহলে তাতেও দোষের কিছু নেই।
বন্ধুরা, আসরের শুরুতেই যেমনটি বলেছি, এবারে আমরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা’র আল-কাবির জামে মসজিদ সম্পর্কে আলোচনা করব। এই মসজিদটি সানা জামে মসজিদ নামেও সমধিক পরিচিত।
ঐতিহাসিক বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) ষষ্ঠ হিজরিতে অর্থাৎ মক্কা বিজয়ের আগেই ইয়েমেনের অতি প্রাচীন শহর সানায় আল-কাবির জামে মসজিদ নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। ঐতিহাসিকরা একথাও বলেন যে, মসজিদটি সানা’র ঠিক কোন স্থানে নির্মিত হবে এবং এর ক্বেবলা মসজিদের ঠিক কোথায় হবে তাও সুনির্দিষ্টভাবে বলে দিয়েছিলেন আল্লাহর রাসূল। কাজেই ইসলামের একেবারে প্রাথমিক যুগে নির্মিত মসজিদগুলোর অন্যতম হচ্ছে এই আল-কাবির জামে মসজিদ। কোনো কোনো ঐতিহাসিক মনে করেন, এই মসজিদটি সানার ‘গামদান’ প্রাসাদের পাশে নির্মাণ করা হয়েছিল। গামদান হচ্ছে ইয়েমেনের অন্যতম প্রসিদ্ধ প্রাসাদ। কে এটি নির্মাণ করেছেন তা নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। অনেক মনে করেন, আল্লাহর নবী হযরত সুলাইমান (আ.) সাবা’র রাণি বিলকিসের জন্য প্রাসাদটি নির্মাণ করেছিলেন।
উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ ইবনে আব্দুল-মালেক ৭৯ হিজরিতে সানা জামে মসজিদের প্রসার ঘটান। পরবর্তী বিভিন্ন যুগে এই মসজিদে নতুন নতুন অংশ যুক্ত হয়। সানা শহরের অন্যান্য ভবনের সঙ্গে মিল রেখে এই মসজিদের প্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছে সাদা রঙের ইট দিয়ে। মসজিদটির ছাদ সাম্প্রতিক সময়ে নির্মাণ করা হলেও এতে খ্রিস্টীয় একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দির নকশা ব্যবহৃত হয়েছে। মসজিদের রয়েছে দু’টি সুউচ্চ মিনার যেগুলো ষষ্ঠ হিজরি শতক মোতাবেক খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতাব্দিতে পুনর্নির্মাণ করা হয়। এই মসজিদে রয়েছে তিনটি বড় পাঠাগার। প্রথম পাঠাগারটি নাম ‘আল-মাকতাবাতুল মাশরিকিয়্যা।’ ইয়েমেনের জেইদিয়া রাজবংশের শাসক ইয়াহিয়া হামিদুদ্দিনের শাসনামলে এটির নির্মাণকাজ শেষ হয়। দ্বিতীয় পাঠাগারটির নাম আল-মাকতাবাতুল গারবিয়্যা। এই পাঠাগারে রয়েছে হাতে লেখা সব বই। এই দু’টি পাঠাগারই মসজিদের দক্ষিণ পার্শ্বে অবস্থিত। তৃতীয় এবং সর্বশেষ পাঠাগারটির নাম আল-মাকতাবাতুল ওকাফ। এই পাঠাগারে বিশ্বের মুসলিম লেখকদের হাতে লেখা বই এবং পবিত্র কুরআনের প্রাচীন ও দুস্পাপ্র্য কিছু হাতে লেখা কপি রয়েছে।
ইসলামের ইতিহাসে কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় মুসলিম বিশ্বের বড় পাঠাগারগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কারণে ইসলামের প্রাথমিক যুগে হাতে লেখা কুরআন শরীফগুলোর বেশিরভাগ কপি নষ্ট হয়ে গেছে এবং সে যুগের হাতে লেখা কুরআন শরীফ বর্তমানে অনেকটা দুস্প্রাপ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কিন্তু সানার আল-কাবির জামে’ মসজিদে চামড়ার ওপর লেখা কুরআনের প্রায় ১৫,০০০ কপি সংরক্ষিত আছে। এসব কপিতে ৯৫০টি পূর্ণাঙ্গ কুরআন শরীফ লিখিত রয়েছে। ১৯৭২ সালে প্রবল বর্ষণে সানা জামে মসজিদের পশ্চিম অংশ ধসে পড়ে। এরপর এই অংশ পুনর্নির্মাণ করতে গিয়ে নির্মাণকর্মীরা এই মহামূল্যবান কুরআনের কপিগুলো খুঁজে পান। তারা ধসে পড়া মসজিদের ছাদের একাংশে একটি কুঠুরি খুঁজে পান যার মধ্যে চামড়ায় লেখা কুরআনের কপিগুলো সংরক্ষিত ছিল।
আরবি ভাষার সবচেয়ে প্রাচীন লিপি হচ্ছে হিজাজি লিপি। ইসলামের প্রাথমিক যুগে মক্কা ও মদীনা ছিল পবিত্র কুরআন লেখার কেন্দ্র এবং এই দু’টি শহরই ছিল হিজাজ অঞ্চলে। এ কারণে এই লিপি হিজাজি লিপি হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। অন্যান্য আরবি লিপির তুলনায় হেজাজি লিপি তুলনামূলকভাবে কৌণিক এবং ডান দিকে ঝুকে থাকে। এতে কোনো নুকতা বা স্বরচিহ্ন নেই এবং শুধু ব্যঞ্জনবর্ণ নিয়ে গঠিত। বর্তমানে এই লিপি অত্যন্ত দুস্প্রাপ্য হয়ে পড়েছে এবং বিশ্বের হাতে গোণা কয়েকটি মাত্র যাদুঘরে এই লিপিতে কয়েক পৃষ্ঠার বেশি স্ক্রিপ্ট সংরক্ষিত নেই। সানা জামে মসজিদে হিজাজি লিপির বেশ কিছু স্ক্রিপ্ট রয়েছে। এছাড়া, এখানকার বেশিরভাগ হাতে লেখা কুরআন কুফি লিপিতে লেখা হয়েছে। এখানকার হাতে লেখা স্ক্রিপ্টগুলোর মধ্যে হযরত আলী (আ.), জায়েদ বিন সাবেত ও সালমান ফারসির লেখা কুরআনের স্ক্রিপ্ট রয়েছে। ইউনেস্কো এই মসজিদে সংরক্ষিত হাতে লেখা কুরআনের বেশ কিছু স্ক্রিপ্টকে ‘মেমরি অব দ্যা ওয়ার্ল্ড’ শিরোনামের সিডি’তে স্থান দিয়েছে। এই সিডিতে হিজরি প্রথম শতাব্দিতে হিজাজি ও কুফি হরফে লেখা কুরআনের ৪০টির বেশি কপি রয়েছে।
তো শ্রোতাবন্ধুরা, আজকের আসরের সময়ও ফুরিয়ে এসেছে। এবার বিদায় নেয়ার পালা। আগামী আসরে আমরা ইয়েমেনের আরো কয়েকটি বিখ্যাত মসজিদ নিয়ে আলোচনা করব। সে আসরেও আপনাদের সঙ্গ পাওয়ার আশা রইল।#
পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ/১৭