জানুয়ারি ২২, ২০১৮ ২০:০৯ Asia/Dhaka

বন্ধুরা, আপনাদের সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি আমাদের সাপ্তাহিক আলোচনা অনুষ্ঠান- ধরণীর বেহেশত মসজিদে। আশা করছি সবাই ভালো আছেন। আজকের আসরে আমরা মসজিদের অর্থনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরার পাশাপাশি ইয়েমেনের আরো কয়েকটি মসজিদ নিয়ে আলোচনা করব। আশা করছি শেষ পর্যন্ত আপনাদের সঙ্গ পাবো।

মসজিদ হচ্ছে সাধারণ মানুষের সর্বোত্তম মিলনমেলা, ঈমান শক্তিশালী করার শ্রেষ্ঠ স্থান এবং সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং এমনকি অর্থনৈতিক তৎপরতা চালানোরও উত্তম জায়গা। ইসলামের প্রাথমিক যুগে এই মসজিদে ধনাঢ্য ব্যক্তিরা তাদের অর্থ-সম্পদ দান করতেন এবং এখানে বসেই সেসব সম্পদ দরিদ্র ব্যক্তিদের মধ্যে বণ্টন করে দেয়া হতো।  জিহাদের গনিমতের মালও মসজিদে এনে জমা করা হতো এবং এখানে বসেই তা যোদ্ধাদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হতো। বিশ্বনবী (সা.) প্রথমবার বদর যুদ্ধের গনিমত জমা, সংরক্ষণ ও তালিকাভুক্ত করে রাখার জন্য আব্দুল্লাহ কা’বকে নিয়োগ দিয়েছিলেন। এরপর আল্লাহর রাসূল নিজে সেগুলো যোদ্ধাদের মধ্যে বণ্টন করে দেন। পরবর্তীতে মুসলিম সাম্রাজ্যে মসজিদের এক কোণে ‘খাজানা’ নামক আলাদা কক্ষ নির্মাণ করে সেখানে ‘বাইতুল মাল’ রাখার ব্যবস্থা হয়েছিল। আর এই শিক্ষাটি নেয়া হয়েছিল গনিমতের মাল বণ্টন থেকে। সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আদায়কৃত আয়করের অর্থ-সম্পদ সংরক্ষণের জন্য মসজিদের মতো উত্তম জায়গা আর পাওয়া যায়নি।

আমরা এর আগের কোনো এক আসরে বলেছি, ইসলামের প্রাথমিক যুগে প্রতিটি শহরে অনেক মসজিদ নির্মাণ করা হলেও শহরের কেন্দ্রস্থলে নির্মিত হতো জামে মসজিদ। জুমা, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার নামাজ আদায় হতো এই জামে মসজিদে।

এ ছাড়া, বড় বড় বাজারের ভেতর বা আশপাশে তৈরি হতো ‘বাজার মসজিদ’। এই মসজিদে কেনাকাটা করতে আসা মানুষ নামাজ আদায় করলেও এখানকার মূল মুসল্লি থাকতেন বাজারেরই ব্যবসায়ীরা। আজান হলেই ব্যবসায়ীরা তাদের দোকানপাট বন্ধ করে মসজিদে ছুটে যেতেন জামায়াতে নামাজ আদায় করার জন্য। মসজিদের ইমাম নামাজের আগে ও পরে ব্যবসা-বাণিজ্য সংক্রান্ত নানা মসলা-মাসায়েল মুসল্লিদের সামনে বর্ণনা করতেন। ব্যবসায়ীরাও ধর্মীয় বিধি-বিধান মেনে কেনা-বেচা করার চেষ্টা করতেন। বাজারের মসজিদ থেকে তাদেরকে ওজনে কম দেয়া, ভেজাল পণ্য বিক্রি ও দোষ-ত্রুটি গোপন রেখে পণ্য বিক্রি করতে নিষেধ করা হতো।  এভাবেই মসজিদের প্রচেষ্টায় বাজারে তৈরি হতো ধর্মীয় পরিবেশ।

অন্যদিকে দূরদূরান্ত থেকে আগত সওদাগর ও পাইকারি বিক্রেতারা বাজারে এসে সবার আগে মসজিদে প্রবেশ করতেন। তাদেরকে মসজিদে দেখা গেলেই স্থানীয় দোকানদাররা ধরে নিতেন নতুন পণ্য এসেছে। নামাজের পর দু’পক্ষ পণ্য বিক্রির আলোচনায় বসে যেতেন। মসজিদে বসে প্রাথমিক আলোচনা শেষ করার পর পণ্য দেখানোর জন্য সওদাগররা মসজিদের বাইরে নির্ধারিত স্থানে চলে যেতেন। এভাবে অনুষ্ঠিত ব্যবসায় পরস্পরকে মাপে কম দেয়া বা চোগলখুরি করার সুযোগ কম থাকত।  এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, মসজিদের প্রচেষ্টায় যেমন ব্যবসা-বাণিজ্য সঠিকভাবে ও ইসলামি রীতি অনুযায়ী হতো তেমনি ব্যবসায়ীরাও আর্থিকভাবে মসজিদের প্রচার-প্রসারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতেন। দূর থেকে আগত মুসলিম পণ্য বিক্রেতাদের কোনো কাফেলা এক জায়গায় বারবার থেমে পণ্য বিক্রি করলে তাদেরই উদ্যোগে সেখানে মসজিদ নির্মাণ করা হতো যাতে পরবর্তী ব্যবসায়িক লেনদেন মসজিদে বসে আঞ্জাম দেয়া যায়। এভাবে  নির্মিত মসজিদে আশপাশের অমুসলিমরা ধীরে ধীরে মুসলমান হয়ে যেত। এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এবং আফ্রিকায় এভাবেই ইসলামের প্রচার ও প্রসার ঘটেছে।

বন্ধুরা, এবারে আমরা ইয়েমেনের কয়েকটি মসজিদ সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করব।  আরবি ভাষায় ডান দিককে বলা হয় ইয়ামিন( یمین) । অনেকে মনে করেন, এই দেশটি কাবা শরীফের ডানদিকে অবস্থিত বলে এর নাম হয়েছে ইয়েমেন।  ইয়েমেনবাসী গর্ব করে বলেন, তারা যুদ্ধ ও রক্তপাত ছাড়াই মুসলমান হয়েছেন।  রাসূলুল্লাহ (সা.) হযরত আলী (আ.)কে বিশেষ দূত হিসেবে ইসলামের বার্তা নিয়ে ইয়েমেনে পাঠিয়েছিলেন এবং তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে দেশটির জনগণ ইসলাম গ্রহণ করেন।  ঐতিহাসিক বর্ণনায় এসেছে, অষ্টম হিজরিতে মক্কা বিজয়ের পর আল্লাহর রাসূল হামদান গোত্রের কাছে ইসলামের দাওয়াত দিতে হযরত আলী (আ.)কে ইয়েমেনে পাঠান।  ইমাম আলী (আ.) ইয়েমেনে পৌঁছে সেখানকার জনগণকে সমবেত করে হামদ ও সানা পাঠ  করার পর রাসূলুল্লাহ (সা.)’র পত্র পড়ে শোনান।  তৎকালীন ইয়েমেনের সবচেয়ে বড় গোত্র ছিল হামদান। রাসূলের বাণী শুনে এই গোত্রের লোকজন এতটাই অভিভুত হয়ে পড়েন যে, একদিনের মধ্যেই তারা সবাই মুসলমান হয়ে যান। এরপর ধীরে ধীরে গোটা ইয়েমেনবাসী ইসলাম গ্রহণ করেন।

কোনো কোনো সূত্রমতে, ইয়েমেনে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন উম্মে সাঈদ বারযাখিয়া নামের এক নারী। এই নারী ইসলাম গ্রহণের পর নিজের বাড়িকে মসজিদে রূপান্তরিত করেন এবং মসজিদটির নাম দেন মসজিদে আলী। নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে এই মসজিদটি আজো সগৌরবে টিকে আছে কালে সাক্ষী হয়ে।

ইয়েমেনের বেশিরভাগ মসজিদের গঠনকাঠামো আয়তাকার এবং এগুলোতে রয়েছে বিশাল আঙ্গিনা ও ছাদযুক্ত বারান্দা। দেশটির একটি প্রসিদ্ধ মসজিদের নাম ‘আল-বাকিরিয়া’ জামে মসজিদ। ইয়েমেনে ওসমানিয় সাম্রাজ্যের অন্যতম সুন্দর নিদর্শন এই মসজিদ। ১৫৯৪ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন ওসমানীয় শাসক হাসান পাশা সানায় এটি নির্মাণ করেন। একটি বড় গম্বুজবিশিষ্ট আয়তাকার মসজিদটির পূর্ব পার্শ্বে রয়েছে ছোট ছোট আরো তিনটি গম্বুজ।  মসজিদটির সামনে রয়েছে বড় একটি আঙ্গিনা এবং তার পরে রয়েছে গম্বুজে ঢাকা একটি ওজুখানা।  মসজিদের পূর্ব পার্শ্বে ঠিক মাঝখানে সুউচ্চ টাওয়ার সদৃশ একটি মিনার রয়েছে।

ইয়েমেনের তায়িজ শহরে অবস্থিত আল-আশরাফিয়া মসজিদ দেশটির আরেকটি বিখ্যাত মসজিদ। এই মসজিদে রয়েছে আটটি ছোট ও একটি বড় গম্বুজ। মসজিদের পেছনে রয়েছে একটি সুলতানি সমাধিসৌধ এবং এর সঙ্গে লাগোয়া কিছু কক্ষ নির্মিত হয়েছে কুরআন শিক্ষার ক্লাস নেয়ার জন্য।  মসজিদের অনন্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর দু’টি বিশাল মিনার। চমৎকার ইসলামি নির্মাণশৈলি ব্যবহার করে বিশাল মিনার দু’টি তৈরি করা হয়েছে যা দূর থেকে দেখলে কোনো দূর্গের সুউচ্চ টাওয়ার বলে ভুল হতে পারে।

অবশ্য ২০১৫ সালের মার্চ মাস থেকে সৌদি আরব ইয়েমেনের ওপর যে অসম যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে তাতে দেশটির বহু মসজিদ ধ্বংস হয়েছে। বিশেষ করে ইয়েমেনের বহু ঐতিহাসিক মসজিদের মিনার ও গম্বুজ ধসে পড়েছে। সৌদি আগ্রাসনে ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি মসজিদ হচ্ছে সানা প্রদেশের বানি মাতার এলাকার জাবালুন নবী শোয়াইব (আ.) মসজিদ। প্রায় এক হাজার বছর আগে এটি নির্মাণ করা হয়েছিল।

ইয়েমেনের সা’দা শহরে রয়েছে  ‘আল-হাদি ইয়াহিয়া’ নামক একটি বিখ্যাত মসজিদ যা প্রায় ১২০০ বছর আগে নির্মাণ করা হয়েছিল। চতুর্থ হিজরি শতাব্দিতে ইয়েমেনের জাইদি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ইয়াহিয়া বিন হোসেইন ২৯০ হিজরিতে এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। ইয়েমেনের জাইদি শিয়া মুসলমানদের সবচেয়ে প্রাচীন ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে আল-হাদি মসজিদ সুপরিচিত। গত দুই বছরে একাধিকবার সৌদি বিমান হামলায় এই ঐতিহাসিক মসজিদটির মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে।

ইয়েমেনের রাজধানী সানায় অবস্থিত অন্যতম বিশাল মসজিদের নাম আস-সালেহ জামে মসজিদ। সাবেক প্রেসিডেন্ট আলী আব্দুল্লাহ সালেহ’র নির্দেশে তৈরি মসজিদটিতে একত্রে ৪৫ হাজার মানুষ নামাজ আদায় করতে পারেন।  মসজিদটিতে রয়েছে ছয়টি মিনার যেগুলোর চারটির উচ্চতা ১০০ মিটার করে এবং বাকি দু’টি ৮০ মিটার করে উঁচু। পশ্চিম এশিয়ার আর কোনো মসজিদে এত উঁচু মিনার নেই।  এ ছাড়া, এই মসজিদে বিভিন্ন আকৃতির ২৩টি গম্বুজ রয়েছে।  ১০ কোটি ডলারেরও বেশি অর্থ খরচ করে দীর্ঘ আট বছরে মসজিদটির নির্মাণকাজ শেষ হয়। ২০০৮ সালে যখন এটি উদ্বোধন করা হয় তখন ইয়েমেনে বিষয়টি নিয়ে এই মর্মে ব্যাপক সমালোচনা হয় যে, তখনও দেশটির বেশিরভাগ মানুষ যখন দৈনিক মাত্র ২ ডলারেরও কম আয় করেন তখন এত বিপুল অংকের অর্থ খরচ করে এই মসজিদ নির্মাণের কোনো প্রয়োজন ছিল না।

তো বন্ধুরা, আজকের আসরের সময়ও ফুরিয়ে এসেছে।  আগামী আসরে আমরা মরক্কোর দু’টি বিখ্যাত মসজিদ নিয়ে আলোচনা করব। আশা করছি তখনো আপনাদের সঙ্গ পাব। #

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ/২২