ধরণীর বেহেশত মসজিদ- ২৬ (মরক্কোর হাস্সান মসজিদ)
আপনাদের সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি আমাদের সাপ্তাহিক আলোচনা অনুষ্ঠান- ধরণীর বেহেশত মসজিদে। আশা করছি সবাই ভালো আছেন। মসজিদের মূল কাজ ইবাদত হলেও এখানে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক তৎপরতাসহ আরো অনেক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। আজকের আসরে আমরা দূর আফ্রিকার দেশ মরক্কোর হাস্সান মসজিদ এবং হাসান সানি মসজিদ নিয়ে আলোচনা করার পাশাপাশি মসজিদের রাজনৈতিক কার্যক্রম সম্পর্কে সংক্ষেপে কথা বলব।
মসজিদে রাজনৈতিক, সামাজিক বা সাংস্কৃতিক কিংবা শিক্ষা কার্যক্রম যা কিছুই পরিচালিত হোক না কেন তা হয় মসজিদের ইমামের নেতৃত্বে। রাসূলুল্লাহ (সা.)’র জীবদ্দশায় মদীনার মসজিদে নববীর সব কার্যক্রম পরিচালিত হতো তাঁরই নেতৃত্বে। অর্থাৎ যাঁকে কেন্দ্র করে সমাজের সব ধর্মীয় ও রাজনৈতিক তৎপরতা পরিচালিত হতো তিনি একইসঙ্গে ছিলেন মসজিদেরও সর্বেসর্বা। কাজেই দেখা যাচ্ছে, ইসলামের প্রাথমিক যুগে ইবাদতের পর রাজনৈতিক তৎপরতাই ছিল মসজিদের দ্বিতীয় প্রধান কাজ। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ইসলাম আবির্ভাবের আগে ক্বাবা শরীফেরও দ্বিতীয় ভূমিকা ছিল রাজনৈতিক তৎপরতা। রাসূলুল্লাহ (সা.)’র নবুওয়াত প্রাপ্তির আগে মসজিদুল হারাম ছিল তৎকালীন হিজাযের প্রধান রাজনৈতিক কেন্দ্র। সে সময় কাবা ও মসজিদুল হারামের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মক্কার রাজনৈতিক দল ও গোত্রগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতো এবং কখনো কখনো এ নিয়ে তাদের মধ্যে সংঘর্ষও বেধে যেত।
ইসলামের প্রাথমিক যুগে ধর্ম ও রাজনীতির সর্বোৎকৃষ্ট মিলনমেলা ছিল মসজিদ এবং এই দু’টি বিষয় যে আলাদা নয় তা মসজিদে নববীতে প্রথম বাস্তবায়ন করে দেখান আল্লাহর রাসূল (সা.)। সমাজের ইমাম ও নেতা হিসেবে মসজিদে নববীতে রাসূলুল্লাহ (সা.)’র প্রায় সার্বক্ষণিক উপস্থিতি সবাইকে এই মসজিদের দিকে ধাবিত করত। সাধারণ মানুষের সমাবেশস্থল হিসেবে এই মসজিদে সার্বক্ষণিক উপস্থিতির মাধ্যমে বিশ্বনবী তাঁর উম্মতকে একথাই শিখিয়েছেন যে, যিনি জনগণের নেতা হবেন তাকে তাদের সেবক হতে হবে। রাসূল্লাহ (সা.) যে সেবা করেছেন তার একমাত্র লক্ষ্য ছিল আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন। সম্পদ বা ক্ষমতা লাভ কিংবা আত্মম্ভরিতা জাহির করার কোনো লক্ষ্য তাঁর ছিল না।
ইসলামের প্রাথমিক যুগে রাজনৈতিক তৎপরতার কেন্দ্র হিসেবে এই মসজিদেই নেতার সঙ্গে সাধারণ মানুষের বায়াত বা আনুগত্যের শপথ অনুষ্ঠিত হতো। রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিগুলিও ঘোষণা করা হতো মসজিদ থেকেই। মদীনায় মসজিদে নববী নির্মাণ হওয়ার পর সব নও মুসলিম এই মসজিদে বসে রাসূলুল্লাহ (সা.)’র সঙ্গে আনুগত্যের শপথ করেন এবং তাঁকে নিজেদের নেতা হিসেবে গ্রহণ করেন।
রাসূলের ওফাতের পর প্রথম খলিফা আবুবকরের সঙ্গে সাধারণ জনগণের প্রথম আনুগত্যের শপথ সাকিফায়ে বনি সাআদা’য় হলেও পরের দিন মসজিদে নববীতে আনুষ্ঠিকভাবে আরেকবার জনগণের বায়াত গ্রহণ করা হয়। এরপর আবুবকর মসজিদের মিম্বারে ওঠেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)’র চেয়ে এক ধাপ নীচে বসে আল্লাহ তায়ালার হামদ ও প্রশংসা শেষে বলেন: আমি আপনাদের চেয়ে উত্তম না হলেও এই মুহূর্তে আপনাদের ওপর শাসনক্ষমতা অর্জন করেছি। যদি আমি সোজা পথে চলি তবে আপনারা আমাকে অনুসরণ করুন আর যদি বেঁকে যাই তাহলে আমাকে সোজা করে দিন।
তৃতীয় খলিফার মৃত্যুর পর হযরত আলী (আ.) জনগণের প্রবল পীড়াপীড়িতে খেলাফতের দায়িত্ব নেন এবং মসজিদে গিয়ে জনগণের আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করেন। এরপর এই মসজিদে সাধারণ মানুষের উদ্দেশে খুতবা পেশ করেন এবং দৃঢ়তার সঙ্গে নিজের খেলাফতের ধরন ও রাষ্ট্র পরিচালনার কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
আসরের এ পর্যায়ে আমরা আপনাদেরকে দূর আফ্রিকার দেশ মরক্কোতে নিয়ে যাব।
দেশটির রাজধানী রাবাতের একটি বিখ্যাত ঐতিহাসিক স্থাপনা হচ্ছে হাসসান মসজিদ। মরক্কোর মোয়াহ্হেদি রাজবংশের তৃতীয় সুলতান ‘ইয়াকুব মানসুর মোয়াহ্হেদি’ ৫৯২ হিজরি মোতাবেক ১১৮৪ খ্রিস্টাব্দে এই মসজিদ নির্মাণ করেন। তৎকালীন আন্দালুসিয়ার অন্তর্গত ক্যাস্টিলের রাজা অস্টম আলফোনসোর বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হওয়ার পর সুলতান ইয়াকুব মানসুর স্পেনের কর্ডোভা মসজিদের মতো একটি মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা করেন। তার উদ্দেশ্য ছিল নামাজ আদায়ের পাশাপাশি এটি হবে মুসলিম সেনা সমাবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। অনেক বিশালাকায় ও জাঁকজমকপূর্ণ একটি মসজিদ নির্মাণ কাজে হাত দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তার মৃত্যুর পর মসজিদের নির্মাণ কাজ স্থগিত হয়ে যায় এবং তার পরবর্তী কোনো সুলতান এটির নির্মাণকাজ সমাপ্ত করেননি। আজও মসজিদটি সেই অবস্থাতেই রয়ে গেছে।
সে যুগে ইরাকের সামেরা জামে মসজিদের পর হাসসান জামে মসজিদ ছিল মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মসজিদ। এই মসজিদের মিনার ছিল আফ্রিকা মহাদেশের মসজিদগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উঁচু। মসজিদটি অর্ধসমাপ্ত হলেও এতে প্রাচ্য ও আন্দালুসিয়ার মসজিদগুলো নির্মাণের যৌথ কলাকৌশল প্রয়োগ করা হয় এবং এর ভেতরের দেয়ালের কারুকাজ এখনো চোখে পড়ার মতো। হাসসান জামে মসজিদের শুধু নামাজ ঘরের আয়তন ১৯২৩ বর্গমিটার। এই স্থানটি T-আকৃতিতে তৈরি করা হয়েছে। সাধারণত অন্যান্য মসজিদে একটি আঙিনা থাকলেও এই মসজিদে রয়েছে বেশ কয়েকটি আঙিনা। মসজিদের একমাত্র মিনারের পাশেই রয়েছে এটির সবচেয়ে বড় আঙিনা। এর দুই পাশে রয়েছে ছোট দু’টি আঙিনা যাতে স্থাপিত রয়েছে অসংখ্য ছোট-বড় স্তম্ভ। গোলাকৃতি এই স্তম্ভগুলোর উচ্চতা সাড়ে ৬ মিটার থেকে শুরু করে ২৫ মিটার পর্যন্ত। মরক্কোর বেশিরভাগ মসজিদে রয়েছে গোলাকৃতি স্তম্ভ যা এই দেশের মসজিদগুলোর অনন্য বৈশিষ্ট্য।
আসরের এ পর্যায়ে আমরা মরক্কোর হাসান সানি বা দ্বিতীয় হাসান মসজিদ নিয়ে আলোচনা করব। উত্তর আটলান্টির মহাসাগরের তীরে অবস্থিত দেশটির কাসাব্লাঙ্কা শহরে ১৯৮০ সালে এই মসজিদের নির্মাণ কাজ শুরু এবং ১৯৯৩ সালে শেষ হয়। মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববীর পর আয়তনের দিক দিয়ে এটি মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বড় মসজিদ। এটির আয়তন ২০ হাজার বর্গমিটার। সাগর তীরের এই মসজিদের এক-তৃতীয়াংশ সাগরের উপর পিলার তৈরি করে নির্মাণ করা হয়েছে। মসজিদের দেয়াল নির্মাণ করা হয়েছে মর্মর পাথর দিয়ে এবং এর ভেতরের পুরোটা অংশ জুড়ে বসানো হয়েছে দৃষ্টিনন্দন টাইলস। হাসান সানি মসজিদে একসঙ্গে ২৫ হাজার মানুষের নামাজ আদায় করার ব্যবস্থা রয়েছে।
অত্যাধুনিক সব প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে এই মসজিদে। যেমন- এর দরজাগুলো স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় খোলা এবং বন্ধ করা যায়। মসজিদটির একমাত্র মিনারের উচ্চতা ২১০ মিটার এবং এটি এখন পর্যন্ত মুসলিম নির্মিত মসজিদগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উঁচু মিনার। ৬০ তলা ভবনের সমান এ মিনারের ওপরে রয়েছে লেজার রশ্মি,যা রাত্রিবেলা নাবিকদের দেখিয়ে দেয় পবিত্র কাবাশরিফের পথ। ৩০ কিলোমিটার দূর থেকেও স্পষ্ট দেখা যায় এই লেজার রশ্মি। এই মসজিদে রয়েছে কুরআন শিক্ষার একটি মাদ্রাসা। পুরনো এবং আধুনিক দুই পদ্ধতিতে এখানকার ছাত্রদের কুরআন শিক্ষা দেয়া হয়।
মরক্কোর তৎকালীন শাসক দ্বিতীয় হাসানের ৬০তম জন্মদিন উপলক্ষে হাসান সানি মসজিদ নির্মাণ করা হয়। কাজেই এটি যতটা না নামাজ আদায়ের স্থান, পর্যটন স্পট হিসেবে এর খ্যাতি ছড়িয়েছে তার চেয়ে বেশি। বিশ্বের বহু দেশ থেকে প্রতিদিন এই মসজিদ দেখতে শত শত মানুষ ভিড় জমায়। কাসাব্লাঙ্কা শহরের নাম শুনলেই সবার মনে ভেসে ওঠে এই মসজিদের নাম। সেই আশির দশকে এই মসজিদ নির্মাণ করতে ৭০ কোটি ডলার অর্থ ব্যয় হয়েছে। ২,৫০০ স্থপতি এবং ১০,০০০ শ্রমিক টানা ছয় বছর ধরে দিন-রাত কাজ করে এটি নির্মাণ করেছেন। খুব স্বাভাবিকভাবেই আল্লাহর রাসূলের তৈরি করা সাধাসিধে মসজিদের সঙ্গে এই মসজিদের ব্যবধান আকাশ-পাতাল এবং এটি তৈরিই করা হয়েছে মরক্কোর শাসকের সুনাম ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যে।
তো বন্ধুরা, আজ আর নয়। আগামী আসরে আমরা আফ্রিকার আরেকটি দেশ তিউনিশিয়ার কাইরুয়ান জামে মসজিদ নিয়ে আলোচনা করব। সে আসরেও আপনাদের সঙ্গ পাওয়ার আশা রইল।#
পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ/২৬