এপ্রিল ১৫, ২০১৮ ১৫:৫৪ Asia/Dhaka

বন্ধুরা! আমাদের নতুন ধারাবাহিক- ঐশী দিশারী -এ আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। আশা করছি আপনারা প্রত্যেকে ভালো আছেন। এই ধারাবাহিক আলোচনায় আমরা মানবতার মুক্তির দূত বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.) থেকে শুরু করে ইমাম মাহদি (আ.) পর্যন্ত পবিত্র ইমামদের জীবনী ও মহান কর্ম নিয়ে আলোচনা করব।

আরব উপত্যকা যখন অজ্ঞতা, অন্যায়, অত্যাচার, ব্যাভিচার ও কুসংস্কারে পরিপূর্ণ ছিল এবং মূর্তিপুজা মক্কার মুশরিক সমাজকে স্তুপীকৃত পাথরের সামনে মস্তকাবনত করে রেখেছিল তখন অজ্ঞতার কালো মেঘের ভেতর থেকে উঁকি দেয় ইসলামের দীপ্তমান সূর্য। মক্কার প্রতিটি কোণে সেই সূর্যের দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ে। শুরুতে এই নূরের ঔজ্জ্বল্য ছিল কম ও সীমিত এবং দাম্ভিক আরব ধনিক শ্রেণি সে নূরের আলো অনুভবই করতে পারেনি। কিন্তু অল্প কিছুদিনের মধ্যে ইসলামের নূরের বিকিরণে তাদের চোখ ঝাপসা হয়ে যায়। অন্যদিকে এই নূরের আলোয় সমাজের নির্যাতিত, দুর্বল ও ক্রীতদাস শ্রেণি আলোকিত হয় এবং তাদের অন্তরে স্থান করে নেয় ইসলামির চির অম্লান শিক্ষা।          

ইসলামের দীপ্তমান সূর্যের উত্তাপ নও মুসলিমদের উনুনকে যত বেশি তপ্ত করছিল ধনিক শ্রেণির দম্ভ ও অহংকার ততবেশি জ্বলেপুড়ে ছারখার হচ্ছিল।  শুরুতে আল্লাহর নবী (সা.) একটি কথা বলেই ফরিয়াদ করছিলেন যে, ‘কুলু লা ইলাহা ইল্লাহ তুফলিহু’- অর্থাৎ ‘বলো এক আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই তবেই তোমরা সফলকাম হবে।’ ধীরে ধীরে এই ফরিয়াদ আসমান ও জমিনে এতটা শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে যে, তাকে স্তব্ধ করে দেয়ার লক্ষ্যে মুশরিকদের দিনরাতের অক্লান্ত পরিশ্রম ব্যর্থ হয়ে যায়। ইসলামের গনগনে সূর্য মাথার উপরে উঠে যায় এবং এক সময় তা গোটা বিশ্বকে আলোকিত করে তোলে। এই বিশাল পরিবর্তনের প্রক্রিয়াগুলো উপলব্ধি করার আগে আমাদেরকে আরব উপত্যকার সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারনা পেতে হবে। প্রথমেই চলুন সেই আলোচনায় যাওয়া যাক।

 

৩০ লাখ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে বিস্তৃত আরব উপদ্বীপ তিনদিক দিয়ে সাগরবেষ্টিত। এর পশ্চিম দিকে রয়েছে লোহিত সাগর, দক্ষিণে এডেন সাগর ও ভারত মহাসাগর এবং পূর্বদিকে পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগর। সে যুগে আরব উপত্যকায় জীবনযাপন করা ছিল অত্যন্ত কঠিন। সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে আরবদের অবস্থা ছিল শোচনীয়। তাদের জীবন ছিল গোত্রভিত্তিক এবং যারা শহরে জীবনযাপন করত তারাও তাদের গোত্রপরিচয় রক্ষা করে চলছিল। প্রতিটি গোত্রের লোকেরা তাদের গোত্রের প্রতিষ্ঠাতার নামে পরিচিতি পেত। নানা ধরনের বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা পেতে গোত্রের লোকদের মধ্যে বন্ধন ছিল অত্যন্ত মজবুত। বেদুঈন প্রথার এই জীবনে যে গোত্রের জনসংখ্যা যত বেশি হতো তার শক্তি-সামর্থ্য ও অহংকার ছিল তত বেশি।

গোত্রপ্রথার এই জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি ছিল কেন্দ্রীয় কোনো হুকুমত বা সরকার আরব দেশে ছিল না। এমনকি মক্কা ও ইয়াসরিবের মতো বড় শহরগুলিতেও কোনো সরকার ব্যবস্থা চালু ছিল না। প্রতিটি গোত্রের ছিল একটি করে স্বতন্ত্র রাজনৈতিক কাঠামো যেখানে শাসক ছিলেন গোত্রের অধিপতি। 

বিশ্বাসগত দিক থেকে বেশিরভাগ আরব ছিল মুশরিক। পবিত্র কুরআনে মূর্তিপূজকদেরকে মুশরিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে যদিও ‘শিরক’ শব্দটির ব্যাপ্তি মূর্তিপূজার চেয়ে আরো বেশি বিস্তৃত। মক্কার মুশরিকরা সুদূর অতীতে হযরত ইব্রাহিম (আ.)’র একত্ববাদী ধর্মে বিশ্বাসী ছিল। কিন্তু আস্তে আস্তে তাদের সে বিশ্বাসের ভিতে ফাঁটল ধরে এবং এক সময় তারা শিরক ও মূর্তিপূজায় লিপ্ত হয়ে যায়। কোনো কোনো আরব ঐতিহাসিকের মতে, আমরু বিন লুহাই নামক এক ব্যক্তির আবির্ভাবের আগে বেশিরভাগ আরব হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর ধর্মে প্রতিষ্ঠিত ছিল। আমরু বিন লুহাই শামদেশ থেকে হুব্‌ল নামের একটি মূর্তি নিয়ে মক্কায় আসে এবং লোকজনকে ওই মূর্তির পূজা করার আহ্বান জানায়। তার আহ্বানে প্রথম মক্কায় মূর্তিপূজা চালু হয় যা ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করে। দ্বিতীয় যে কারণে মানুষ একত্ববাদ থেকে দূরে সরে গিয়েছিল তা ছিল অজ্ঞতার অন্ধকার। এই অন্ধকার এতটা গাঢ় ছিল যে, মক্কা থেকে কেউ দূরে চলে গেলে সঙ্গে করে কাবাঘরের মূর্তি থেকে একখণ্ড পাথর খুলে সঙ্গে করে নিয়ে যেত এবং যাত্রাপথে সময় পেলে সেটির পূজা করত।

এভাবে একসময় তারা হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর ধর্ম থেকে পুরোপুরি বিচ্যুত হয়ে পরিপূর্ণভাবে মূর্তিপূজায় লিপ্ত হয়ে যায়। অবশ্য বেশিরভাগ আরব তখনও বিশ্বজগতের একক স্রষ্টা হিসেবে ‘আল্লাহ’কে চিনত এবং তাঁর প্রতি ভাসা ভাসা একটা বিশ্বাসও মনে পোষণ করত। কিন্তু ইবাদতের ক্ষেত্রে তারা আল্লাহর সঙ্গে বহু শরীক বানিয়ে নিয়েছিল। এই শরীকের সংখ্যা শুরুর দিকে কম থাকলেও ধীরে ধীরে তাদের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে অগণিত উপাস্য তৈরি হয়ে যায়। বিশ্বনবী (সা.) যখন নবুওয়্যাতপ্রাপ্ত হন তখন কাবাঘরে ৩৬০টি মূর্তি সংরক্ষিত ছিল। এসব মূর্তির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল লাত, মানাত ও উজ্জা এবং আরবরা এই তিন নারীমূর্তিকে আল্লাহর কন্যা বলে বিশ্বাস করত।  তারা মনে করতে, এই তিন মূর্তির উপাসনা করলে আল্লাহর কৃপা লাভ করা সম্ভব হবে।

 

আরবদেশে শিক্ষাব্যবস্থার তেমন কোনো গুরুত্ব ছিল না এবং মানুষ লেখাপড়া জানত না। হাতে গোনা কিছু মানুষ লিখতে ও পড়তে পারত।

গোত্রপ্রথার সেই জীবনে সামাজিক সম্মান ও মর্যাদার একমাত্র উৎস ছিল ক্ষমতা ও বংশগৌরব। ঢাল-তলোয়ার ও বাহুবলে যে গোত্র যত এগিয়ে ছিল তাকে ততটা সম্মানিত মনে করা হতো। বাহুবলের দিক দিয়ে ভালো অবস্থানে থাকার জন্য গোত্রের মধ্যে নারীর চেয়ে পুরুষের সংখ্যাধিক্য গুরুত্ব পেত। পরিবারের পুরুষ ছিল স্ত্রী ও সন্তানদের মালিক, কাজেই সে এদের ব্যাপারে যেকোনো ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পারত।

আরবদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অজ্ঞতার ছাপ ছিল লক্ষনীয়। ভুল ও অন্যায় রীতিনীতি ছিল তাদের বিশ্বাসের মূল ভিত্তি। কন্যা সন্তানের সঙ্গে আরবদের আচরণ এতটা নৃশংস ও পাশবিক ছিল যে তার বর্ণনা পবিত্র কুরআনে পর্যন্ত এসেছে।  আল্লাহ তায়ালা কুরআনে কারিমে বলেছেন, সে যুগে যদি কোনো পুরুষকে খবর দেয়া হতো যে তার স্ত্রী কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়েছে তাহলে তার চেহারা কালো হয়ে যেত এবং ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ হয়ে পড়ত।  (সূরা নাহল আয়াত ৫৮; সূরা  যোখরোফ আয়াত ১৭)। তারা এই ভেবে দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ত যে, এই কলঙ্ককে বাঁচিয়ে রাখবে নাকি জীবন্ত কবর দেবে। (সূরা নাহল আয়াত ৫৯)। শেষ পর্যন্ত তারা তাদের দৃষ্টিতে কন্যা সন্তানকে কলঙ্ক মনে করে জীবন্ত মাটিতে পুতে ফেলত।

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী ইসলামপূর্ব যুগে মক্কার অজ্ঞতার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন: একদিকে তারা লাগামহীনভাবে রিপুর কামনা চরিতার্থ করত এবং অন্যদিকে পাশবিকতার দিক থেকেও ছিল চরম নৃশংস এবং নিজেদের কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দিত।

আবর উপদ্বীপের দুই দিকে তখন ছিল পারস্য ও রোম সাম্রাজ্য। বিশ্বের সভ্য সমাজের একটা বড় অংশ ছিল এই দুই সাম্রাজ্যের অধীন। কিন্তু পরস্পরকে পরাভূত করে গোটা বিশ্বের ওপর আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে এই দুই সাম্রাজ্যের মধ্যে তখন যুদ্ধবিগ্রহ লেগেই থাকত। ইরানে আনুশিরাভানের শাসনামলে (৫৩১-৫৮৯ খ্রিস্টাব্দ) রোম ও পারস্য সাম্রাজ্যের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয় এবং তা ২৪ বছর ধরে খোসরু পারভিজের শাসনামল পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। ইরান ও রোমের জন্য এসব যুদ্ধ জানমালের ব্যাপক ক্ষতি বয়ে আনে। সেইসঙ্গে সমাজের সাধারণ মানুষদের সঙ্গে সাম্রাজ্যের শীর্ষ পর্যায়ের লোকদের দুর্ব্যবহার ওই দুই সামাজ্যকে ধ্বংসের দারপ্রান্তে নিয়ে যায়।

 

ইসলামের আবির্ভাবের সময় ইরানের সামাজিক পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সাঈদ নাফিসি লিখেছেন, “...ইরানে যে বিষয়টি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী ছিল তা হলো সাসানি শাসনামলে প্রচলিত বিশাল ব্যবধানের শ্রেণিবৈষম্য। অতীতে শ্রেণিবৈষম্যের অস্তিত্ব থাকলেও সাসানি সম্রাটরা তার বিস্তার ঘটায়। সে সময় সাতটি পরিবারের হাতে ছিল সমস্ত ক্ষমতা ও ধন-সম্পদ এবং সাম্রাজ্যের বাকি মানুষ ছিল সবকিছু থেকে বঞ্চিত। ...”

অন্যদিকে রোম সাম্রাজ্যের অবস্থাও ছিল অনেকটা একই রকম। শাসকের অত্যাচারে জনগণ অতিষ্ট হয়ে পড়েছিল। সাম্রাজ্যের বেশিরভাগ মানুষ ছিল খ্রিস্টান এবং রোম সম্রাট নিজেকে ঈশ্বরের প্রতিনিধি বলে দাবি করত।

ঠিক এমন একটি সময়ে এইসব নোংরা ও পাশবিক ঘটনাপ্রবাহকে চ্যালেঞ্জ করে মানবতার মুক্তির বাণী নিয়ে সামনে আসে ইসলাম। মহান আল্লাহর বার্তা নিয়ে আবির্ভূত হন একজন ঐশী মহাপুরুষ যিনি বর্ণ, গোত্র ও সাম্রাজ্য নির্বিশেষ সব মানুষকে এক আল্লাহর দিকে আহ্বান জানাতে থাকেন। তাঁর তৌহিদ বা একত্ববাদের বাণী সমাজের শোষিত ও নিষ্পেষিত মানুষের সামনে আশার আলোবর্তিকা হিসেবে আবির্ভূত হয়। এই মহামানবের নাম ছিল ‘মুহাম্মাদ’ পবিত্র কুরআন যাকে ‘সিরাজাম মুনিরা’ বা ‘উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা’ নামে অভিহিত করেছে। #

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ/ ১৫