মার্চ ০৮, ২০১২ ১১:৩৯ Asia/Dhaka

পবিত্র কুরআনের তাফসিরবিষয়ক অনুষ্ঠান 'কুরআনের আলো'র আজকের পর্বে সূরা আলে ইমরানের ৩৮ থেকে ৪৩ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ৩৮ ও ৩৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-

هُنَالِكَ دَعَا زَكَرِيَّا رَبَّهُ قَالَ رَبِّ هَبْ لِي مِنْ لَدُنْكَ ذُرِّيَّةً طَيِّبَةً إِنَّكَ سَمِيعُ الدُّعَاءِ (38) فَنَادَتْهُ الْمَلَائِكَةُ وَهُوَ قَائِمٌ يُصَلِّي فِي الْمِحْرَابِ أَنَّ اللَّهَ يُبَشِّرُكَ بِيَحْيَى مُصَدِّقًا بِكَلِمَةٍ مِنَ اللَّهِ وَسَيِّدًا وَحَصُورًا وَنَبِيًّا مِنَ الصَّالِحِينَ (39)
"মারিয়মের কাছে বেহেশতী খাবার দেখে সেখানেই জাকারিয়া আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলেন, হে আমার প্রতিপালক! আমাকেও আপনার পক্ষ থেকে মারিয়মের মতো পবিত্র সৎ বংশধর দান করুন। আপনি প্রার্থনা শ্রবণকারী।" (৩:৩৮)
 
"এরপর জাকারিয়া যখন তার ইবাদতের কক্ষে নামাজ পড়ছিলেন, তখন ফেরেশতারা তাঁকে সম্বোধন করে বলেছিল নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাকে ইয়াহিয়ার সুসংবাদ দিচ্ছেন। তোমার এই পুত্র হবে আল্লাহর নিদর্শনের তথা হযরত ইসা (আ.)-এর সমর্থনকারী। যে হবে জনগণের নেতা,ধার্মিক এবং পূণ্যবানদের মধ্যে একজন নবী।" (৩:৩৯)

আমরা গত পর্বে বলেছি, হযরত মারিয়মের মা তাঁর প্রতিজ্ঞা অনুযায়ী মারিয়ামকে বায়তুল মোকাদ্দাস মসজিদের সেবিকা করেন। হযরত মারিয়াম আল্লাহর ইবাদত ও ধ্যানে এত মশগুল থাকতেন যে, নিজের খাবারের কথাও ভুলে যেতেন। কিন্তু মারিয়মের অভিভাবকের দায়িত্বপালনকারী হযরত জাকারিয়া (আ.) যখনই তাঁর কক্ষে যেতেন, তখনই সেখানে বেহেশতি খাবার দেখতে পেতেন। এমনটি দেখে একবার হযরত জাকারিয়া (আঃ)'র মনের মধ্যে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হলো। তিনিও আল্লাহর কাছে মারিয়মের মায়ের মত প্রার্থনা করলেন যেন আল্লাহ তাঁর স্ত্রীকেও মারিয়মের মতো পবিত্র সন্তান দান করেন।

উল্লেখ্য, ইমরান (আ.)'র স্ত্রীর মতো তাঁর স্ত্রীও ছিলেন বন্ধ্যা। আল্লাহ হযরত জাকারিয়া (আ.)'র দোয়া কবুল করলেন। একবার যখন জাকারিয়া (আ.) তাঁর নামাজের কক্ষে নামাজ পড়ছিলেন, তখন তাঁকে ইয়াহিয়া নামক পূত্রের সুসংবাদ জানিয়ে দেয়া হয়। তাঁর এই পুত্রের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য হবে। বৈশিষ্ট্যগুলো হলো,

প্রথমত : তিনি হযরত ঈসা (আ.)'র প্রতি ঈমান আনবেন। ঈসা (আ.)'র চেয়ে বয়সে বড় হওয়ায় এবং পবিত্রতা ও সাধনার খ্যাতি থাকায়, ঈসা (আ.)'র প্রতি তাঁর ঈমানের কারণে জনগণও ঈসা (আ.)'র প্রতি ঈমান আনবে।

দ্বিতীয়ত : ইয়াহিয়া (আ.) কে তাঁর ভালো চরিত্র ও সৎকাজের জন্য মানুষ তাঁকে নেতা হিসেবে গ্রহণ করবে।

তৃতীয়ত : হযরত ইয়াহিয়া (আ.) দুনিয়ার লোভ লালসা থেকে দূরে থাকবেন এবং এসব গুণাবলীর কারণে নবী হিসেবে মনোনীত হয়ে পবিত্র ও পূণ্যবানদের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত হবেন।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিক হলো, সন্তানের গুরুত্ব ও মূল্য হলো তাঁর সততা ও পবিত্রতায়, সে পুরুষ নাকি নারী সেটা বিবেচ্য বিষয় নয়। আল্লাহ ইমরান (আ.)কে কন্যা ও জাকারিয়া (আ.)কে পুত্র সন্তান দান করেছিলেন। ঐ দু'জনই ইতিহাসে পবিত্র মানুষের মর্যাদা পেয়েছেন ।

সূরা আলে ইমরানের ৪০ ও ৪১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-

قَالَ رَبِّ أَنَّى يَكُونُ لِي غُلَامٌ وَقَدْ بَلَغَنِيَ الْكِبَرُ وَامْرَأَتِي عَاقِرٌ قَالَ كَذَلِكَ اللَّهُ يَفْعَلُ مَا يَشَاءُ (40) قَالَ رَبِّ اجْعَلْ لِي آَيَةً قَالَ آَيَتُكَ أَلَّا تُكَلِّمَ النَّاسَ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ إِلَّا رَمْزًا وَاذْكُرْ رَبَّكَ كَثِيرًا وَسَبِّحْ بِالْعَشِيِّ وَالْإِبْكَارِ (41)

"জাকারিয়া বললেন, হে আমার প্রতিপালক কীভাবে আমার পুত্র সন্তান হবে? আমার তো বার্ধক্য এসেছে এবং আমার স্ত্রী বন্ধ্যা। আল্লাহ বললেন, এভাবেই আল্লাহ যা ইচ্ছা তাই করেন।" (৩:৪০)

"জাকারিয়া বললেন, আমাকে একটা নিদর্শন দেখান। তখন আল্লাহ বললেন, তোমার নিদর্শন এই যে, তুমি তিন দিন ধরে ইশারা ইঙ্গিত ছাড়া কথা বলতে পারবে না। অবশ্য আল্লাহকে স্মরণের সময় তোমার মুখ খুলে যাবে। তোমার প্রতিপালককে বেশী মাত্রায় স্মরণ কর এবং প্রভাতে ও সন্ধ্যায় তাঁর মহিমা প্রচার কর।" (৩:৪১)

যদিও জাকারিয়া (আ.) আল্লাহর কাছে সন্তান প্রার্থনা করেছিলেন কিন্তু তা সত্ত্বেও সন্তান লাভের সুসংবাদ শুনে তিনি বিস্মিত হন। কারণ, তাঁর স্ত্রী যৌবনেই বন্ধ্যা ছিলেন। এ অবস্থায় উভয়েরই বৃদ্ধ বয়সে সন্তান লাভের কোন সম্ভাবনা থাকার কথা নয়। যেকোন মানুষই প্রকৃতির নিয়মের কোন ব্যতিক্রম দেখলে বা শুনলে বিস্মিত হয়ে পড়ে এবং ঐ বিষয়কে অন্তর ও বিবেক দিয়ে বিশ্বাস করলেও নিজের চোখ দিয়ে তা দেখতে চায়। তাই হযরত জাকারিয়া (আ.)ও আল্লাহর অসীম শক্তির সামান্য এক নিদর্শন দেখতে চাইলে আল্লাহও তা দেখানোর ব্যবস্থা করেন। যে জাকারিয়া (আ.) ছিলেন সুস্থ এবং কথা বলতে যার কোন অসুবিধা হতো না, দেখা গেল যে, আল্লাহর মোজেজায় তিনি তিন দিনের জন্য বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন এবং ইশারা-ইঙ্গিত ও ঠোঁট নাড়ানো ছাড়া তিনি অন্যদের কাছে নিজের উদ্দেশ্যে বোঝাতে পারছিলেন না। কিন্তু যখনই তিনি আল্লাহর নাম নিতে চাইতেন, তখনই তিনি বাকশক্তি ফিরে পেতেন এবং আল্লাহর প্রশংসা করতেন।

এই দুই আয়াত থেকে আমরা যা শিখতে পারি তাহলো,

প্রথমত : আল্লাহর ইচ্ছা সব কিছুর চেয়ে বড়। আল্লাহর ইচ্ছা সবকিছুর চেয়ে বড়। আল্লাহ যদি কাউকে সন্তান দিতে চান, তাহলে বার্ধক্য ও বন্ধ্যাত্ব সেক্ষেত্রে কোন বাধা সৃষ্টি করতে পারে না।

দ্বিতীয়ত : আল্লাহ সব কিছু করতে সক্ষম। আল্লাহ চাইলে মানুষ জিহ্বার মাধ্যমে কথা বলতে পারে কিন্তু আল্লাহ যদি চান, তাহলে তিনি জিহ্বার এই ক্ষমতা কেড়ে নিতে পারেন ।

সূরা আলে ইমরানের ৪২ ও ৪৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-

وَإِذْ قَالَتِ الْمَلَائِكَةُ يَا مَرْيَمُ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَاكِ وَطَهَّرَكِ وَاصْطَفَاكِ عَلَى نِسَاءِ الْعَالَمِينَ (42) يَا مَرْيَمُ اقْنُتِي لِرَبِّكِ وَاسْجُدِي وَارْكَعِي مَعَ الرَّاكِعِينَ (43)

"স্মরণ কর, যখন ফেরেশতারা বলেছিল, হে মারিয়াম! নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাকে মনোনীত করেছেন ও তোমাকে পবিত্র করেছেন এবং বিশ্ব-জগতের নারীদের ওপর তোমাকে মনোনীত করেছেন।" (৩:৪২)

"হে মারিয়াম, তোমার প্রতিপালকের কাছে নত হও, সেজদা কর এবং রুকুকারীদের সাথে রুকু কর।" (৩:৪৩)

মারিয়াম (সা.)'র পবিত্রতা, তাঁর নামাজ ও আন্তরিক ইবাদত প্রভৃতির কারণে আল্লাহ তাঁকে অন্যান্য নারীর চেয়ে উচ্চতর মর্যাদা দান করেন। তিনি এত সম্মানের অধিকারী হলেন যে,ফেরেশতারা তাঁর সাথে কথা বলতো, আল্লাহর নির্দেশ ও সুসংবাদ সরাসরি তাঁর কাছে পৌঁছে দিত। তিনি হযরত ঈসা (আ.) এর মতো নবীর মা হবার সৌভাগ্য অর্জন করেন এবং হযরত ঈসা (আ.) তাঁরই কোলে লালিত পালিত হন। তাই ফেরেশতারা বিবি মারিয়ামকে বলল, আল্লাহর এই অনুগ্রহের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য আল্লাহর সামনে বিনম্রভাব অব্যাহত রাখুন এবং অন্যান্য নামাজীদের পাশাপাশি নামাজের জামাতে রুকু ও সেজদা করুন।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিক হলো,

প্রথমতঃ আল্লাহ উদ্দেশ্যহীনভাবে কাউকে মর্যাদা দান করেন না বরং আল্লাহ যোগ্যতা অনুযায়ী মর্যাদা দান করেন। মারিয়াম (সা.) ছিলেন আল্লাহর অনুগত পবিত্র ও আন্তরিক বান্দা। তাই আল্লাহ তাঁকে উচ্চ মর্যাদা দিয়েছেন।

দ্বিতীয়ত : ফেরেশতারা নবী নন এমন মানুষের সঙ্গেও কথা বলেন, অবশ্য তারা যদি হন বিবি মারিয়াম (সা.)'র সমতুল্য ব্যক্তিত্ব।

তৃতীয়ত : নামাযের জামাতে মহিলাদের উপস্থিতিও পছন্দনীয় বিষয়। যদি সেই মহিলারা হন মারিয়াম (সা.)'র মত ব্যক্তিত্ব । #