সূরা আন নিসা; আয়াত ৭৭-৭৯ (পর্ব ২১)
পবিত্র কুরআনের তাফসিরবিষয়ক অনুষ্ঠান 'কুরআনের আলো'র আজকের পর্বে সূরা আন নিসার ৭৭ থেকে ৭৯ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ৭৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ قِيلَ لَهُمْ كُفُّوا أَيْدِيَكُمْ وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآَتُوا الزَّكَاةَ فَلَمَّا كُتِبَ عَلَيْهِمُ الْقِتَالُ إِذَا فَرِيقٌ مِنْهُمْ يَخْشَوْنَ النَّاسَ كَخَشْيَةِ اللَّهِ أَوْ أَشَدَّ خَشْيَةً وَقَالُوا رَبَّنَا لِمَ كَتَبْتَ عَلَيْنَا الْقِتَالَ لَوْلَا أَخَّرْتَنَا إِلَى أَجَلٍ قَرِيبٍ قُلْ مَتَاعُ الدُّنْيَا قَلِيلٌ وَالْآَخِرَةُ خَيْرٌ لِمَنِ اتَّقَى وَلَا تُظْلَمُونَ فَتِيلًا (77)
"আপনি কি তাদের দেখেননি, যাদেরকে (মক্কায়) বলা হয়েছিল তোমরা জিহাদ থেকে তোমাদের হাতকে নিবৃত রাখ, শুধু নামাজ পড় এবং যাকাত দাও, (তখন তারা প্রতিবাদী হয়েছিল ও যুদ্ধের দাবি জানিয়েছিল।) কিন্তু যখন মদীনায় তাদেরকে জিহাদের আদেশ দেয়া হলো, তখন তাদের এক দল জনগণকে এমন ভয় করতে আরম্ভ করল যেমন করে ভয় করা হয় আল্লাহকে, এমন কি তার চেয়েও বেশি ভয়। তারা বলল, হে আমাদের প্রতিপালক, কেন আমাদেরকে যুদ্ধের আদেশ দিলে? কেন আমাদেরকে আরো কিছুকাল অবসর দিলে না? হে নবী আপনি তাদের বলুন,পার্থিব জীবন খুবই সামান্য এবং খোদাভীরুদের জন্য পরকালই কল্যাণকর৷তোমাদের ওপর সামান্য পরিমাণ জুলুমও করা হবে না।" (৪:৭৭)
ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী মুসলমানরা যখন মক্কায় ছিল, তখন মুশরিকদের উৎপীড়ন ও নির্যাতনের কারণে তাদের মধ্যে একদল মহানবী (সা.)এর কাছে এসে বলল, ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হবার আগে আমরা মুশরিকদের কাছে প্রিয় ছিলাম কিন্তু এখন তাদের কাছে আর আমাদের সম্মান নেই এবং আমরা সব সময়ই শত্রুদের অত্যাচার ও উৎপীড়নের শিকার হচ্ছি। আমাদেরকে যুদ্ধ করতে দিন যাতে আমরা পুনরায় সম্মান অর্জন করতে পারি। মহানবী (সা.) তাদেরকে বললেন, আমি এ মুহূর্তে জিহাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ পাই নি, আপনারা নামাজ আদায় ও যাকাত দেয়ার মত ব্যক্তিগত এবং সামাজিক দায়িত্ব পালন করুন। এরপর যখন মদিনায় হিজরতের পর আল্লাহর পক্ষ থেকে জিহাদের নির্দেশ আসলো তখন যুদ্ধের জন্য অতি আগ্রহী ওই ব্যক্তিরা বিভিন্ন অজুহাত দেখাতে লাগল এবং জিহাদে অংশ নেয়া থেকে বিরত হলো। ঠিক তখনই এ আয়াত নাজেল হয় এবং এতে ঐ লোকদের দ্বিমুখী আচরণের প্রতিবাদ করা হয়েছে। যদিও ইসলামের প্রাথমিক যুগের একদল মুসলমানের ঐ রকম কপট আচরণ ছিল এই আয়াত নাজিলের উপলক্ষ্য কিন্তু বাস্তবে এ ধরনের ঘটনার নজীর সব যুগেই দেখা যায়। সমাজে সব সময়ই এমন একদল লোক থাকে যারা চরম পন্থা অনুসরণ বা বাড়াবাড়ি করতে অভ্যস্ত৷ এইসব লোক কখনও কখনও সমাজের নেতার চেয়েও বেশী সক্রিয় হয়ে ওঠেন, আবার কখনও সমাজের সাধারণ লোকের চেয়েও ধীরগতির হন৷ আসলে এ ধরনের লোক নিজেদের দায়িত্ব বোঝার ও তা পালনের চেষ্টা করে না। বরং তারা সাগরের ঢেউয়ের মত উত্তাল হয় এবং যখন ঢেউ তীরে পৌঁছে, তখনই বুদবুদের মত মিলিয়ে যায়। এ ধরনের মানুষ মুখে মুখে খুব সাহসিকতা দেখালেও অন্তরের দিক থেকে খুবই ভীরু।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হচ্ছে,
প্রথমত : ধর্মীয় বিধান পর্যায়ক্রমিক। ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গী অনুযায়ী একমাত্র তারাই জিহাদ ও সংগ্রামের যোগ্যতা অর্জন করতে সক্ষম,যারা নামাজ পড়েছে, যাকাত দিয়েছে এবং নিজের ভেতরের শয়তান ও প্রবৃত্তির সঙ্গে সংগ্রাম করেছে।
দ্বিতীয়ত : সামাজিক সমস্যাদির ব্যাপারে কখনোই উত্তেজিত হয়ে কিছু করা ঠিক নয়। এ সব ক্ষেত্রে ন্যায় পরায়ন ও দূরদর্শী নেতৃবৃন্দ যা বলেন তাই মেনে চলা উচিত ৷
এরপর ৭৮ ও ৭৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে,
أَيْنَمَا تَكُونُوا يُدْرِكُكُمُ الْمَوْتُ وَلَوْ كُنْتُمْ فِي بُرُوجٍ مُشَيَّدَةٍ وَإِنْ تُصِبْهُمْ حَسَنَةٌ يَقُولُوا هَذِهِ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ وَإِنْ تُصِبْهُمْ سَيِّئَةٌ يَقُولُوا هَذِهِ مِنْ عِنْدِكَ قُلْ كُلٌّ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ فَمَالِ هَؤُلَاءِ الْقَوْمِ لَا يَكَادُونَ يَفْقَهُونَ حَدِيثًا (78) مَا أَصَابَكَ مِنْ حَسَنَةٍ فَمِنَ اللَّهِ وَمَا أَصَابَكَ مِنْ سَيِّئَةٍ فَمِنْ نَفْسِكَ وَأَرْسَلْنَاكَ لِلنَّاسِ رَسُولًا وَكَفَى بِاللَّهِ شَهِيدًا (79
"তোমরা যেখানেই থাক না কেন, মৃত্যু তোমাদের নাগাল পাবেই, এমনকি সুউচ্চ ও সুদৃঢ় দুর্গে থাকলেও তোমরা মৃত্যু এড়াতে পারবে না। যদি মোনাফিকরা বিজয়ী হয় বা তাদের ওপর কোন কল্যাণ অবতীর্ণ হয় তখন তারা বলে এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়েছে৷ আর যদি তাদের জন্য খারাপ কিছু ঘটে, তখন তারা বলে এটা নবীর কাছ থেকে হয়েছে। আপনি বলুন সব কিছুই আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়। ওই সম্প্রদায়ের কি হয়েছে যে তারা সত্য বুঝতে ও মানতে প্রস্তুত নয়?"(৪:৭৮)
"হে নবী! আপনার ওপর যে কল্যাণ নাজিল হয় তা আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়, আর আপনার ওপর মন্দ যা কিছু হয় তা আপনার নিজের কারণেই হয়। আমরা আপনাকে মানুষের জন্য রাসূল হিসাবে পাঠিয়েছি। আল্লাহই সাক্ষী হিসাবে যথেষ্ট৷" (৪:৭৯)
আগের আয়াতে দুর্বলমনা মুসলমানদের কথা বলা হয়েছে। জিহাদে অংশ না নেয়ার জন্য তারা অজুহাত দেখাতো এবং জিহাদ বিলম্বিত করার দাবি জানাতো৷ এই দুই আয়াতে তাদের উদ্দেশ্যে বলা হচ্ছে,মনে কর না জিহাদ থেকে পালিয়ে গেলেই মৃত্যু থেকে রক্ষা পাবে৷ খুব সুদৃঢ় দরজা বিশিষ্ট সুরক্ষিত দূর্গে বাস করলেও মৃত্যু ঠিকই তোমাদেরকে সময়মত গ্রাস করবে। তারাই সৌভাগ্যবান যারা নিজেদের জীবনকে আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দিয়ে অর্থাৎ শহীদ হয়ে অমরত্ব লাভ করবে। এরপর মহানবী (সা.)এর প্রতি মোনাফিকদের অশোভন আচরণের দিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ তা'লা বলছেন, "যখনই তোমরা যুদ্ধে জয়ী হও তখন একে আল্লাহর দয়া বলে উল্লেখ কর, কিন্তু পরাজিত হলে একে অদক্ষ পরিচালনার ফল বলে মন্তব্য কর। অথচ সব কিছু আল্লাহর ইচ্ছাতেই ঘটে৷ আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া জয় বা পরাজয় কোনটাই সম্ভব নয়।তবে আল্লাহর ইচ্ছাও অযৌক্তিক নয়। যদি তোমরা তোমাদের দায়িত্ব ঠিক মত পালন কর তাহলেই আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করেন এবং বিজয়ী করার সিদ্ধান্ত নেন। আর তোমরা যদি নিস্ক্রিয় থাকো তাহলে পরাজয়কে আল্লাহ তোমাদের ভাগ্যলিপি করেন।"
আল্লাহর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক হলো ভূপৃষ্ঠের সঙ্গে সূর্যের সম্পর্কের মত। সূর্যের চারদিকে ঘুরার সময় পৃথিবীর যে দিকে রোদ পড়ে সে দিকটা আলোকিত হয় এবং তাপ সঞ্চয় করে। যে দিকে রোদ পড়ে না সে দিকটা অন্ধকার ও শীতল হয়। পৃথিবীর আলো আসে যেহেতু আসে সূর্য থেকে তাই বলা যায় অন্ধকারে পড়ার জন্য পৃথিবীই দায়ী। মানুষের অবস্থাও একই রকম। মানুষ আল্লাহ মুখী হলেই সাহায্য পায়, বিজয়ী হয় কিন্তু আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করলে সকল অস্তিত্বের স্রষ্টার দয়া থেকে সে বঞ্চিত হয়। অবশ্য এটা শুধু ঈমানদার ও পবিত্র অন্তরের অধিকারীরাই বুঝতে পারেন এবং মেনেও নেন৷ কিন্তু অসুস্থ হৃদয়ের লোকেরা তা বুঝেও না এবং মেনেও নেয় না।কারণ এসব লোক আল্লাহর পরিবর্তে নিজেদেরকেই সব কিছুর কেন্দ্র বলে মনে করে। শুধু নিজেদেরকেই ন্যায়পন্থী মনে করে এবং তাদের পক্ষে নয় এমন সবাইকে বিভ্রান্ত বলে মনে করে। অথচ সত্য ও মিথ্যার মানদণ্ড হলেন আল্লাহ, তারা নয়।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো,
প্রথমত : মৃত্যু যখন অবধারিত অর্থাৎ একদিন সবাইকেই যখন মরতে হবে তখন জিহাদ থেকে পালিয়ে যাওয়া অর্থহীন।
দ্বিতীয়ত : নিজের পাপকে অন্যের ওপর চাপিয়ে দেয়া ঠিক নয়। নিজের অপরাধ বা ভুল ঢাকার জন্য দায়িত্ব এড়ানো উচিত নয়।
তৃতীয়ত : জীবন ও মৃত্যু তিক্ততা ও মিষ্টতা এবং অন্য সব কিছুই আল্লাহর বিজ্ঞ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঘটে। আর মহানবীর মিশন বিশ্বজনীন, এই মিশন কোন নির্দিষ্ট এলাকা বা জাতির জন্য সীমিত নয়।