কুরআনের আলো
সূরা ইউনুস; আয়াত ৯৮-১০০ (পর্ব-১৯)
পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা ইউনুসের ৯৮ থেকে ১০০ নম্বর পর্যন্ত আয়াতের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ৯৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
فَلَوْلَا كَانَتْ قَرْيَةٌ آَمَنَتْ فَنَفَعَهَا إِيمَانُهَا إِلَّا قَوْمَ يُونُسَ لَمَّا آَمَنُوا كَشَفْنَا عَنْهُمْ عَذَابَ الْخِزْيِ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَمَتَّعْنَاهُمْ إِلَى حِينٍ (98)
"ইউনুসের সম্প্রদায় ব্যতীত এমন কোনো জনপদবাসী নেই যারা বিশ্বাস করেছিল এবং বিশ্বাস দ্বারা উপকৃত হয়েছিল।তারা যখন বিশ্বাস করলো তখন আমি তাদের পার্থিব জীবনে অপমানজনক শাস্তি হতে মুক্ত করলাম এবং কিছু কালের জন্য জীবন উপভোগ করতে দিলাম।"(১০:৯৮)
মানুষ যাতে তার পাপের জন্য অনুতপ্ত হতে পারে এবং নিজের ভুল শুধরিয়ে সুপথে ফিরে আসতে পারে সেজন্য আল্লাহ তায়ালা সময় দিয়ে থাকেন। তবে এই সময় বা সুযোগ এ নশ্বর জীবনেই সীমাবদ্ধ মৃত্যুর পর বা ঐশী শাস্তি নেমে আসার পর অনুতপ্ত হয়ে তাওবা করলে তা গ্রহণযোগ্য হয় না। কারণ শাস্তি প্রত্যক্ষ করার পর ভয়ে আতঙ্কে বিশ্বাস স্থাপন করলে তার মূল্য নেই, এটাই আল্লাহর বেঁধে দেয়া প্রকৃতির নিয়ম। সর্বকালের এবং সকল জাতির মানুষের জন্য এই নিয়ম অবধারিত হয়ে আছে, শুধুমাত্র হযরত ইউনুস (আ.) এর সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায়। হযরত ইউনুস (আ.) এর সম্প্রদায় ঐশী শাস্তি প্রত্যক্ষ করার পর ঈমান এনেছিলেন এবং আল্লাহতায়ালা তা কবুল করে নিয়ে তাদেরকে পুনরায় সুযোগ দিয়েছিলেন।
এ সম্পর্কে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় যেটা পাওয়া যায় তা হচ্ছে, বহু বছর ধরে ধর্ম প্রচারের পর মাত্র দুইজন মানুষ হযরত ইউনুস (আ.) এর ওপর ঈমান এনেছিল। পড়ন্ত বয়সে হযরত ইউনুস (আ.) হতাশ হয়ে ওই এলাকার বাসিন্দাদেরকে অভিশাপ দিয়ে সেখান থেকে চলে যান। সাধারণত পয়গম্বরদের এ ধরনের অভিশাপ সাথে সাথেই কার্যকরী হয় এবং ঐশী শাস্তি নেমে আসে। কিন্তু যে দুইজন ইউনুস (আ.) এর ওপর ঈমান এনেছিলেন তাদের মধ্যকার প্রবীণতম ব্যক্তি জনগণের কাছে দৌঁড়ে গিয়ে পয়গম্বরদের এ ধরনের অভিশাপের পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এ থেকে বাঁচতে হলে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ ও মার্জনা লাভ করতে হলে সবার উচিত হবে শহরের বাইরে গিয়ে অন্তর থেকে অনুতাপ-অনুশোচনার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। তাহলে হয়ত মহান প্রতিপালক ক্ষমা করবেন। জনগণ ওই প্রবীণ ধর্মপ্রাণ ব্যক্তির প্রস্তাব মেনে নেয়। ফলে তারা ঐশী শাস্তির হাত থেকে বেঁচে যান। হযরত ইউনুস (আ.)ও পুনরায় নিজ শহরে ফিরে আসেন।
এই আয়াতের দু'টো শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে,
এক. অতীতকালে একমাত্র হযরত ইউনুস (আ.) এর সম্প্রদায়ই ঐশী শাস্তি আসার আগে অর্থাত সময় থাকতেই সত্য ধর্ম গ্রহণ করেছিল।
দুই. মানুষের ভাগ্য তার নিজের হাতেই কারণ মানুষ তাওবা এস্তেগফার এবং দোয়া দরুদের মাধ্যমে বিপদাপদ প্রতিহত করতে পারে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ লাভ করার ক্ষমতা রাখে।
এই সূরার ৯৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَلَوْ شَاءَ رَبُّكَ لَآَمَنَ مَنْ فِي الْأَرْضِ كُلُّهُمْ جَمِيعًا أَفَأَنْتَ تُكْرِهُ النَّاسَ حَتَّى يَكُونُوا مُؤْمِنِينَ (99)
"তোমার প্রতিপালক ইচ্ছা করলে পৃথিবীতে যারা আছে তারা সকলেই বিশ্বাস করতো। তবে কি তুমি বিশ্বাসী হওয়ার জন্য মানুষের ওপর জবরদস্তি করবে?” (১০:৯৯)
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন চান, মানুষ সত্যপথ গ্রহণ করুক, সৃষ্টিকর্তার ওপর বিশ্বাস স্থাপন করুক। তবে এক্ষেত্রে তিনি মানুষকে চিন্তার স্বাধীনতা দিয়েছেন, সত্যকে গ্রহণ করতে হবে স্বেচ্ছায় এবং সুচিন্তিতভাবে, জোর-জবরদস্তির মাধ্যমে নয়, এটাই আল্লাহর নিয়ম। মানুষের সামনে দুটো পথই উন্মুক্ত। তবে মানুষ যে পথই গ্রহণ করুক তার জন্য উপযুক্ত প্রতিদান রয়েছে। আল্লাহর রাসূল মানুষকে সত্য ধর্মের প্রতি অনবরত আহ্বান জানানোর পরও বহু মানুষ যখন মূর্তি পূজা পরিত্যাগ করতে রাজী হচ্ছিল না, তখন তিনি ব্যথিত হন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা তার রাসূলকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, এটা আশা করা উচিত নয় যে, সকল মানুষ বাধ্যতামূলকভাবে বিশ্বাস স্থাপন করবে।
এই আয়াত থেকে আমরা এটা উপলব্ধি করতে পারি যে, চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক অণু শিক্ষণের মাধ্যমে যে বিশ্বাস তা গ্রহণযোগ্য। জোর জবরদস্তির মাধ্যমে হলে তার কোন মূল্য নেই।
এই সূরার ১০০ তম আয়াতে বলা হয়েছে-
وَمَا كَانَ لِنَفْسٍ أَنْ تُؤْمِنَ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ وَيَجْعَلُ الرِّجْسَ عَلَى الَّذِينَ لَا يَعْقِلُونَ (100)
"আল্লাহর অনুমতি ছাড়া বিশ্বাস ও ঈমান অর্জন করা কারও সাধ্য নেই এবং যারা অনুধাবন করে না আল্লাহ তাদের কলুষলিপ্ত করেন।" (১০:১০০)
হেদায়েত বা সত্যপথ লাভ করা একটি সৌভাগ্যের ব্যাপার। আল্লাহতালাই মানুষকে সুপথ লাভের সকল বন্দোবস্ত করে দেন, কাজেই এ নিয়ে গর্ব করা উচিত নয়, কারণ আল্লাহর দয়াতে এবং তার বিশেষ করুণার কারণেই মানুষের সামনে সত্য প্রতিভাত হয়ে ওঠে। মানুষ অনেক সময় শিরক বা আল্লাহর সঙ্গে অংশীস্থাপন করে বা পাপের কারণে এই সৌভাগ্য লাভের পথকে নিজেরাই বন্ধ করে দেয়।
ঈমান ও আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ তারাই লাভ করতে পারে যারা নিজেদের বিবেক বুদ্ধিকে কাজে লাগায়, যুক্তিকে মেনে নেয়। আর যারা যুক্তির পরিবর্তে কু-প্রবৃত্তিকে প্রাধান্য দেয়া তারা কলুষতায় নিমজ্জিত হয়। #