কুরআনের আলো
সূরা ইউনুস; আয়াত ১০১-১০৬ (পর্ব-২০)
পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা ইউনুসের ১০১ থেকে ১০৬ নম্বর পর্যন্ত আয়াতের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ১০১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
قُلِ انْظُرُوا مَاذَا فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا تُغْنِي الْآَيَاتُ وَالنُّذُرُ عَنْ قَوْمٍ لَا يُؤْمِنُونَ (101)
"বলুন, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে তার প্রতি লক্ষ্য করো, তবে নিদর্শনাবলী ও ভীতি প্রদর্শন, অবিশ্বাসী সম্প্রদায়ের কোনো উপকারে আসে না।" (১০:১০১)
এর আগের আয়াতে বলা হয়েছে, মহান সৃষ্টিকর্তাকে অস্বীকার করার একটি প্রধান কারণ হচ্ছে, মানুষ এই বিশ্ব প্রকৃতিকে নিয়ে চিন্তা করে না। এ ব্যাপারে তাদের চিন্তাশক্তিকে মোটেও কাজে লাগায় না। তাই এই পবিত্র আয়াতে মানুষকে বিশ্ব জগত এবং এর অভিনব সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা করার জন্য গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। কারণ কেউ যদি সৃষ্টি জগতের প্রতি, প্রকৃতিতে বিদ্যমান নিয়ম শৃঙ্খলার প্রতি গভীরভাবে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, তাহলে সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাস অর্জনের ক্ষেত্রে তার পক্ষে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।
আগের পর্বে বলা হয়েছে, জবরদস্তি বা চাপিয়ে দেয়া বিশ্বাস বা ঈমানের কোনো মূল্য নেই। স্বাধীন চিন্তা ও স্বতঃস্ফুর্তভাবে ঈমান অর্জন করতে হবে। তাই এই আয়াতে মানুষকে সৃষ্টি রহস্য এবং বিশ্ব প্রকৃতি সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনার জন্য উতসাহিত করা হয়েছে যাতে মানুষ বুঝে-শুনে এবং জ্ঞান ও উপলব্ধির মাধ্যমে ঈমান অর্জন করতে পারে।
এতে কোন সন্দেহ নেই যে, মানুষ যদি বিশ্ব- প্রকৃতিতে বিদ্যমান সুক্ষ্ণ ও অভিনব বিষয়গুলোর প্রতি নজর দিতে সক্ষম হয় তাহলে একজন সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব তার সামনে প্রতিভাত হয়ে উঠবে। তবে এটাও ঠিক যে সৃষ্টিজগতের বিশালত্ব ও খুঁটি নাটি বিষয় অবলোকনের পরও অনেকের পক্ষে ঈমান অর্জন করার সৌভাগ্য নাও হতে পারে। সন্দেহ ও অস্পষ্টতা তাদেরকে খোদাদ্রোহীতে পরিণত করে।
এই আয়াত থেকে আমরা এটা উপলব্ধি করতে পারি যে, অধ্যায়ন এবং সৃষ্টিজগত সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করা খোদাকে জানবার একটি সহজ পথ। তাই বলে সৃষ্টিজগতে বিদ্যমান নানা নিদর্শন অবলোকন করা এবং সত্যের বাণী শুধু শুনে গেলেই হবে না, তা গ্রহণ করার মত ইচ্ছা ও দৃঢ় মনোবল থাকতে হবে।
সূরা ইউনুসের ১০২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
فَهَلْ يَنْتَظِرُونَ إِلَّا مِثْلَ أَيَّامِ الَّذِينَ خَلَوْا مِنْ قَبْلِهِمْ قُلْ فَانْتَظِرُوا إِنِّي مَعَكُمْ مِنَ الْمُنْتَظِرِينَ (102)
"তারা কি তাদের পূর্বে যা ঘটেছে তার অনুরূপ ঘটনারই প্রতীক্ষা করে? বলুন, তোমরা প্রতীক্ষা কর, আমিও তোমাদের সাথে প্রতীক্ষা করছি।" (১০:১০২)
এর আগের আয়াতটিতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অবিশ্বাসী কাফেরদেরকে সৃষ্টি জগতে বিদ্যমান নানা নিদর্শনের প্রতি গভীর চিন্তা-ভাবনা করার আহবান জানিয়েছেন। এই আয়াতে বলা হয়েছে, তারা যেহেতু এসব নিয়ে ভাবতে চায় না তাই সেদিনের জন্য অপেক্ষা করা উচিত- যেদিন আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের ওপর কঠিন শাস্তি নেমে আসবে।
প্রকৃতিতে আল্লাহর সন্নিবেশিত নিয়ম হচ্ছে, কোন সমাজের ভাগ্য নির্ধারিত হয় সেই সমাজের অধিকাংশ মানুষের আচরণ ও কার্যাবলীর ওপর। এজন্য কোন সমাজের অধিকাংশ মানুষ সত ও ন্যায়বান হলে সেখানে কিছু অসত লোকের উপস্থিতি থাকলেও সেই সমাজের উন্নয়ন ও কল্যাণ সাধিত হয়। আবার কোন সমাজের অধিকাংশ মানুষ যদি অসত হয় তাহলে সেখানে কিছু ভালো মানুষ থাকলেও এ ধরনের সমাজের অবক্ষয় রোধ করা যায় না।
হযরত নুহ , লুত ও হুদ (আ.) এর জাতির ইতিহাস থেকে আমরা এই বাস্তবতাই উপলব্ধি করতে পারি। তাই ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মাদ (দ.) অবিশ্বাসী মক্কার অধিবাসীদেরকে এই বার্তাই দিতে চেয়েছিলেন যে, তোমরা যদি আল্লাহর বাণীর বিপক্ষে দাঁড়াতে চাও তাহলে তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলোর মত ভাগ্যবরণের জন্য প্রস্তুত হও।
প্রকৃতিতে বেঁধে দেয়া সৃষ্টিকর্তার নিয়ম সর্বকালের জন্য এবং সকল মানুষের জন্য প্রযোজ্য। এছাড়া, অতীতের ইতিহাস থেকে ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা নেয়া উচিত।
এই সূরার ১০৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
ثُمَّ نُنَجِّي رُسُلَنَا وَالَّذِينَ آَمَنُوا كَذَلِكَ حَقًّا عَلَيْنَا نُنْجِ الْمُؤْمِنِينَ (103)
"পরিশেষে (ঐশী শাস্তি নেমে এলে) আমি আমার রাসূলগণ ও বিশ্বাসী মুমেনদেরকে উদ্ধার করি, কেননা বিশ্বাসীদেরকে উদ্ধার করা আমার দায়িত্ব।" (১০:১০৩)
পার্থিব জগতেই অনেক সময় পাপের শাস্তি নেমে আসে এ কথা বলার পর এই আয়াতে বলা হচ্ছে, মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ ন্যায়পরায়নতার পরাকাষ্ঠা। ফলে খারাপ মানুষের পাপের শাস্তি ভালো ও সতমানুষকেও ভোগ করতে হবে-এমনটি হতে পারে না। একটি অনাচারী সম্প্রদায়ের ওপর যখন ঐশী শাস্তি নেমে আসে তখন প্রকৃত পাপী এবং যারা পাপ ও অনাচারের ব্যাপারে নির্লিপ্ত থেকেছে তারাই বিপর্যস্ত হবে। বিশ্বাসী ঈমানদার ব্যক্তিরা কোন না কোনভাবে ঐশী শাস্তির হাত থেকে রেহাই পাবে এটাই আল্লাহর প্রতিশ্রুতি, এটাই প্রকৃতিতে বেঁধে দেয়া আল্লাহর নিয়ম।
আল্লাহতায়ালা সব সময় ঐশী শাস্তি থেকে প্রকৃত ঈমানদারদেরকে হেফাজত করেন। কাজেই ঈমানদারদের ভবিষ্যত সব সময় উজ্জ্বল, তারা আল্লাহর বিশেষ রহমত প্রাপ্ত হন সকল ক্ষেত্রে।
সূরা ইউনুসের ১০৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
قُلْ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنْ كُنْتُمْ فِي شَكٍّ مِنْ دِينِي فَلَا أَعْبُدُ الَّذِينَ تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ وَلَكِنْ أَعْبُدُ اللَّهَ الَّذِي يَتَوَفَّاكُمْ وَأُمِرْتُ أَنْ أَكُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ (104)
"বলুন, হে মানুষ! তোমরা যদি আমার ধর্মের প্রতি (আমার দৃঢ়তার) ব্যাপারে সংশয়যুক্ত হও তবে জেনে রাখ, তোমরা আল্লাহ ব্যতীত যার উপাসনা করো আমি তার উপাসনা করি না। আমি উপাসনা করি আল্লাহর যিনি তোমাদের মৃত্যু ঘটান এবং আমি বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য আদিষ্ট হয়েছি।" (১০:১০৪)
অংশীবাদী মুশরিকদের পরিণতি ব্যাখ্যা দেয়ার পর এই আয়াতে বলা হচ্ছে, অবিশ্বাসীরা যদি মনে করে থাকে যে, আল্লাহর রাসূল তার ধর্মের ব্যাপারে শিথিল মনোভাব পোষণ করেন এবং ধর্মের ব্যাপারে তার সাথে আপোষ রফার সুযোগ রয়েছে। তাহলে স্পষ্ট করে বলে দিন, আমি আল্লাহ ছাড়া কখনোই কারো উপাসনা করবো না। কোনো অবস্থায়ই প্রতীমাকে প্রণাম করবে না, আমি এমন সৃষ্টিকর্তার উপাসনা করি যার হাতে রয়েছে আমার এবং তোমাদের জীবন, তার আয়ত্ত্বের বাইরে যাওয়ার সাধ্য কারো নেই। তোমাদের উপাস্য প্রতিমাগুলো এ ব্যাপারে সাহায্য করতে সম্পূর্ণ অপারগ।
সূরা ইউনুসের ১০৫ ও ১০৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেছেন-
وَأَنْ أَقِمْ وَجْهَكَ لِلدِّينِ حَنِيفًا وَلَا تَكُونَنَّ مِنَ الْمُشْرِكِينَ (105) وَلَا تَدْعُ مِنْ دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَنْفَعُكَ وَلَا يَضُرُّكَ فَإِنْ فَعَلْتَ فَإِنَّكَ إِذًا مِنَ الظَّالِمِينَ (106)
"তুমি একনিষ্ঠভাবে শিরকমুক্ত ধর্মে প্রতিষ্ঠিত হও, কখনও মুশরিক বা অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্তি হইও না।” (১০:১০৫)
“আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে ডাকবে না, যারা তোমার উপকারও করে না অপকারও করে না। এমন করলে তুমি সীমালংঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।" (১০:১০৬)
আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী বিশ্ব নবী (সা.) মুশরিকদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, কলুষমুক্ত ধর্মের ওপর দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস স্থাপন করা উচিত। শিরক বা অংশীবাদী ধর্ম কলুষমুক্ত নয়, তাতে রয়েছে নানা কুসংস্কার ও কলুষতা। এসব ধর্মে এমন সব উপাসনার উপাদান রয়েছে, যা মানুষের উপকারেও আসে না; অপকারেও আসে না। কাজেই উপাসনার উপযুক্ত নয় এমন বস্তুর সামনে মাথানত করা বা প্রণাম করার কোনো যুক্তি নেই।#