কুরআনের আলো
সূরা ইউনুস; আয়াত ১০৭-১০৯ (পর্ব-২১)
পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা ইউনুসের ১০৭ থেকে ১০৯ নম্বর পর্যন্ত আয়াতের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ১০৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَإِنْ يَمْسَسْكَ اللَّهُ بِضُرٍّ فَلَا كَاشِفَ لَهُ إِلَّا هُوَ وَإِنْ يُرِدْكَ بِخَيْرٍ فَلَا رَادَّ لِفَضْلِهِ يُصِيبُ بِهِ مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَهُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ (107)
“আর আল্লাহ যদি (কোন ভুলের কারণে বা পরীক্ষার উদ্দেশ্যে) তোমাকে কষ্ট দেয় তাহলে তিনি ব্যতীত এর মোচনকারী আর কেউ নেই। আর তিনি যদি তোমার মঙ্গল চান তাহলে তার অনুগ্রহ রদ করার নেই। তার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তিনি মঙ্গল দান করেন, তিনি ক্ষমাশীল পরম দয়ালু।" (১০:১০৭)
আগের আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর রাসূলকে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি যেন অংশীবাদী মুশরিকদের ব্যাপারে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন এবং তৌহিদী আদর্শ বা একত্ববাদের বিশ্বাস যেন তিনি সুস্পষ্টভাবে তাদের সামনে তুলে ধরেন। আল্লাহতায়ালা তার রাসূলকে আরো বলেছেন যে, মুশরিকদেরকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য তাদের প্রতি নমনীয় হওয়ার বা তাদের সাথে আপোষ করার কোন প্রয়োজন নেই।
এই আয়াতে আল্লাহর রাসূলকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে, আপনার লাভ- ক্ষতি, দুঃখ-আনন্দ সবই তো আল্লাহর হাতে। তিনি ছাড়া কারো পক্ষে আপনার কল্যাণ বা অকল্যাণ করার ক্ষমতা নেই।
আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কারো ক্ষতি করা বা কারো উপকার করার সাধ্য কারো নেই।
এই আয়াত দ্বারা এই শিক্ষাই দেয়া হয়েছে যে, মুশরিক এবং কাফেররা আল্লাহর ওপর বিশ্বাস স্থাপন না করলেও তারা সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর আয়ত্ব না নাগালের বাইরে যেতে সক্ষম নয়। কাজেই এতে কোন সন্দেহ নেই যে, তাদের ভাগ্য এবং পরিণতি আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ীই নির্ধারিত হয়ে থাকে।
এই আয়াত থেকে আমরা আরো উপলব্ধি করতে পারি যে, সুখ সমৃদ্ধি এবং কল্যাণ মানুষের প্রাপ্য অধিকার নয়, আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের বিশেষ অনুগ্রহে মানুষ তা লাভ করে থাকে।
এই সূরার ১০৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
قُلْ يَا أَيُّهَا النَّاسُ قَدْ جَاءَكُمُ الْحَقُّ مِنْ رَبِّكُمْ فَمَنِ اهْتَدَى فَإِنَّمَا يَهْتَدِي لِنَفْسِهِ وَمَنْ ضَلَّ فَإِنَّمَا يَضِلُّ عَلَيْهَا وَمَا أَنَا عَلَيْكُمْ بِوَكِيلٍ (108)
"বলুন, হে মানব সকল, তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হতে তোমাদের কাছে সত্য এসেছে, সুতরাং যারা সতপথ অবলম্বন করবে, তারা তো নিজেদেরই মঙ্গলের জন্য সতপথ অবলম্বন করবে এবং যারা পথভ্রষ্ট হবে তারা তো পথভ্রষ্ট হবে নিজেদেরই ধ্বংসের জন্য এবং আমি তোমাদের কর্ম বিধায়ক নই।" (১০:১০৮)
সূরা ইউনুসের শেষভাগে এসে রাসূলে খোদা (সা.) মানুষকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ প্রত্যাদেশবাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া এবং সত্যের দিকে মানুষকে আহ্বান করাই আমার দায়িত্ব। জোর- জবরদস্তির মাধ্যমে কিংবা অন্য কোন উপায়ে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করার কোন অধিকার আমার নেই। প্রত্যেক মানুষই এক্ষেত্রে স্বাধীন, যে কেউ তা গ্রহণ কোরে সতপথের যাত্রী হতে পারে, আবার কেউ তা অস্বীকার করে বিভ্রান্ত হতে পারে। তবে সবারই এটা জেনে রাখা উচিত যে, মানুষ বিশ্বাস আর অবিশ্বাস যাই করুক না কেন তাতে আল্লাহ বা তার রাসূলের কোন লাভ–ক্ষতি নেই। এতে লাভ বা ক্ষতি যাই হবে তা মানুষেরই হবে। কারণ আল্লাহ কারো বা কোন কাজের মুখাপেক্ষী নয়। আর তার পয়গম্বরের দায়িত্ব হচ্ছে- মানুষকে সুপথে আহ্বান করা, বিশ্বাস করানো তার দায়িত্ব নয়।
সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ মানবজাতির জন্য তার করণীয় সবই সম্পাদন করেছেন এবং সত্যপথ সকলের জন্য সুস্পষ্ট করেছেন, এরপর পথ নির্বাচনের দায়িত্ব হচ্ছে মানুষের। এই আয়াতের আরেকটি শিক্ষা হচ্ছে, ধর্ম প্রচারের দায়িত্বে নিয়োজিত আলেম সম্প্রদায়ের দায়িত্ব হচ্ছে মানুষকে সতপথের সন্ধান দেয়া, প্রলোভন এবং জোর-জবরদস্তির মাধ্যমে ইসলাম গ্রহণ করতে বাধ্য করা তাদের কর্তব্য নয়।
সূরা ইউনুসের সর্বশেষ আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন-
وَاتَّبِعْ مَا يُوحَى إِلَيْكَ وَاصْبِرْ حَتَّى يَحْكُمَ اللَّهُ وَهُوَ خَيْرُ الْحَاكِمِينَ (109
"তোমার প্রতি যা প্রত্যাদেশ হয়েছে, তুমি তার অনুসরণ কর এবং আল্লাহর ফয়সালা না আসা পর্যন্ত ধৈর্য্য ধারণ কর এবং আল্লাহই সর্বোত্তম বিধানকর্তা ফয়সালাকারী।" (১০:১০৯)
সূরা ইউনুসের সর্বশেষ আয়াতে পুনরায় আল্লাহর রাস্তায় অটল ও অবিচল থাকা এবং ঐশী বিধানের পূর্ণ আনুগত্য করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। মিথ্যা ও অসত্যের বিরুদ্ধে বিজয় না আসা পর্যন্ত আল্লাহর রাসূল ও ঈমানদার মুসলমানদেরকে ধৈর্য্য ও স্থির থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এটা খুবই স্বাভাবিক যে, সত্য বিমুখ অত্যাচারী গোষ্ঠী সত্যপন্থী মুসলমানদের চলার পথে নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে। কাজেই মুসলমানদেরকে এসব প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে, ত্যাগের জন্য উজ্জীবিত হতে হবে। এটা মনে রাখতে হবে সৃষ্টিকর্তার কাছে সব কিছু প্রত্যক্ষ, কোন কিছুই তার জ্ঞান ও দৃষ্টির আগোচরে নয়। তিনি বিচার দিবসে ন্যায় এবং দক্ষতার সাথে ফয়সালা করবেন, এছাড়া অত্যাচারী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে এই পার্থিব জগতেও ন্যায়কামীদের বিজয় অনিবার্য। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহর প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
এই আয়াতে ঈমানদার মুসলমানের জন্য দু'টো শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে-
এক. আল্লাহর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা বা না করার ব্যাপারে মানুষ সম্পূর্ণ স্বাধীন। মুসলমানদেরকে সব সময় সতর্ক থাকতে হবে যাতে অবিশ্বাসীরা তাদের ঈমানের ওপর কোন প্রভাব বিস্তার করতে না পারে। তাই আল্লাহর রাস্তায় অবিচল থেকে ঐশী বিধানের পূর্ণ আনুগত্য করার ক্ষেত্রে মনোযোগী হতে হবে।
দুই. প্রত্যেক ঈমানদার মুসলমানের উচিত ভবিষ্যতের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন না হয়ে নিজ দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করা। কারণ ভবিষ্যত সম্পূর্ণ আল্লাহর হাতে এবং তিনি সর্বোত্তম ফয়সালাকারী।#
(সূরা ইউনুস সমাপ্ত)