ডিসেম্বর ২২, ২০১২ ১৩:২৭ Asia/Dhaka
  • সূরা হুদ; আয়াত ১১৯-১২৩ (পর্ব-২৮)

পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা হুদের ১১৯ নম্বর থেকে ১২৩ নম্বর পর্যন্ত আয়াতের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ১১৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

إِلَّا مَنْ رَحِمَ رَبُّكَ وَلِذَلِكَ خَلَقَهُمْ وَتَمَّتْ كَلِمَةُ رَبِّكَ لَأَمْلَأَنَّ جَهَنَّمَ مِنَ الْجِنَّةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ (119)

"তোমার পালনকর্তা যাদের ওপর রহমত করেছেন তারা বাদে সবাই চিরদিন মতভেদ করতেই থাকবে এবং এজন্যই আল্লাহ তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। আর তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে এই নির্দেশ জারি হলো যে, আমি জাহান্নামকে জ্বিন ও মানুষ দ্বারা একযোগে ভর্তি করব।" (১১:১১৯)

আগের পর্বে বলা হয়েছে যে, আল্লাহতালা ঈমানদার হওয়ার জন্য কাউকে বাধ্য করেন না। তিনি সত্য ও মিথ্যা বুঝবার জন্য মানুষকে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দিয়েছেন। আবার নিজের চলার পথ বেছে নেয়ার জন্য চিন্তার স্বাধীনতা দিয়েছেন। তাই যে সত্য পথকে গ্রহণ করবে তার জন্য যেমন পুরস্কার রয়েছে, তেমনি অসৎ পথে চলার জন্য শাস্তিরও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এই আয়াতে বলা হয়েছে, জ্বীন এবং মানুষের মধ্যে যারা আল্লাহকে অস্বীকার করেছে তারা যদিও ইহজগতে সৃষ্টিকর্তার দয়া ও নেয়ামত থেকে বঞ্চিত হয়নি, তার অর্থ এই নয় যে, তারা পার পেয়ে গেছে। আসলে তাদের জন্য পরকালে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে আর জাহান্নাম হবে তাদের স্থায়ী ঠিকানা।

এই আয়াতে আরেকটি বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, মানুষের সৃষ্টি বা অস্তিত্ব লাভ করাটাও আল্লাহর অনুগ্রহের ফল। তিনি বিশেষ অনুগ্রহ করে মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাদেরকে সুপথে পরিচালিত করার জন্য নবী-রাসূল ও ঐশী গ্রন্থ প্রেরণ করেছেন। কাজেই পরকালেও যাতে মানুষ আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ লাভে সৌভাগ্যবান হতে পারে সে চেষ্টা থাকা উচিত। আল্লাহতালা মানুষকে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দিয়েছেন। মানুষকে দিক-নির্দেশনা দেয়ার জন্য নবী-রাসূলদেরকে পাঠিয়েছেন। এরপরও মানুষ পাপ-পঙ্কিলতায় নিমজ্জিত হলে, স্রষ্টার অবাধ্য হলে তাকে যে শাস্তি পেতে হবে সেজন্য  তো দায়ী মানুষ নিজেই।

এই সূরার ১২০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন,

  وَكُلًّا نَقُصُّ عَلَيْكَ مِنْ أَنْبَاءِ الرُّسُلِ مَا نُثَبِّتُ بِهِ فُؤَادَكَ وَجَاءَكَ فِي هَذِهِ الْحَقُّ وَمَوْعِظَةٌ وَذِكْرَى لِلْمُؤْمِنِينَ (120)

"(হে পয়গম্বর) আমি রাসূলগণের সকল বৃত্তান্তই তোমাকে বলছি, যা দ্বারা তোমার অন্তরকে মজবুত করছি। এর মাধ্যমে তোমার নিকট সত্য এসেছে এবং বিশ্বাসীদের জন্য এসেছে উপদেশ ও সাবধানবাণী।" (১১:১২০)

সূরা হুদে বেশ ক'জন নবীর জীবন বৃত্তান্ত বর্ণনা করা হয়েছে। এই বিষয়ের দিকেই ইঙ্গিত করে এই সূরার শেষ ভাগে বলা হয়েছে, বিশ্বনবীর মনোবল সুদৃঢ় করার জন্যই অতীতের অনেক নবীর ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। এসব ঘটনা থেকে যেন সর্বশেষ নবী এটা বুঝতে পারেন যে, সকল নবী-রাসূলগণই সমাজে প্রবল বিরোধিতা ও প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছিলেন। এ ছাড়া এ সব ঘটনা থেকে ঈমানদার মুসলমানরাও এই শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে যে, আল্লাহর অবাধ্য হলে এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করলে অতিতের অভিশপ্ত জাতিগুলোর মত তাদেরকেও একই পরিণতি ভোগ করতে হবে।

পবিত্র কুরআনে বর্ণিত প্রতিটি কাহিনীই সত্য ও শিক্ষণীয়। মানবজাতিকে শিক্ষা দেয়ার উদ্দেশ্যেই তা বর্ণনা করা হয়েছে। বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা সব সময় অতীত থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে। অতীতকে অবজ্ঞা করে তারাই যারা আসলে নির্বোধ।

সূরা হুদের ১২১ ও ১২২ নম্বর আয়াতে আল্লাহতালা বলেছেন-

  وَقُلْ لِلَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ اعْمَلُوا عَلَى مَكَانَتِكُمْ إِنَّا عَامِلُونَ (121) وَانْتَظِرُوا إِنَّا مُنْتَظِرُونَ (122)

"যারা ঈমান আনে না তাদেরকে বলে দাও তোমরা যেমন করছো করতে থাক এবং আমরাও আমাদের কাজ করছি।” (১১:১২১)

“এবং তোমরাও অপেক্ষা করতে থাক, আমরাও অপেক্ষায় রইলাম।" (১১:১২২)

আগের আয়াতে বলা হয়েছে, মুমিনদের শিক্ষার জন্য পবিত্র কুরআনে মানবজাতির অতীত ইতিহাস বর্ণনা করা হয়েছে। কারণ ঈমানদার মুসলমানরা সবসময়ই অতীত থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন। এই দুই আয়াতে বলা হচ্ছে, হে রাসূল! যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে না তাদেরকে বলে দিন, তোমরা তোমাদের খেয়াল-খুশি মত কাজ করতে থাক এবং এর পরিণতির জন্য অপেক্ষা কর, আর আমরাও আমাদের কাজ করে যাচ্ছি এবং আমাদের কাজের প্রতিদানের জন্য অপেক্ষা করছি।

এই সূরা ১২৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন-

   وَلِلَّهِ غَيْبُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَإِلَيْهِ يُرْجَعُ الْأَمْرُ كُلُّهُ فَاعْبُدْهُ وَتَوَكَّلْ عَلَيْهِ وَمَا رَبُّكَ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ (123) 

 "আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর অদৃশ্য বিষয়ের (জ্ঞান) আল্লাহরই এবং তারই নিকট সমস্ত কিছু প্রত্যাবর্তিত হবে। সুতরাং তার উপাসনা কর এবং তার ওপর নির্ভর কর, তোমরা যা কর সে সম্বন্ধে তোমার প্রতিপালক অনবহিত নন।" (১১:১২৩)

সূরা হুদের সর্বশেষ আয়াতে মানব জাতিকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে, সবারই ভালো জানা থাকা উচিত যে বিশ্ব জগতের সকল কিছুই আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে এবং সব কিছু সম্পর্কে তিনি অবহিত। প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সবই তার জানা। কাজেই মানুষের উচিত একমাত্র তারই উপাসনা করা এবং দুঃসময়ে তার ওপরই নির্ভর করা।

তবে, এটা মনে রাখতে হবে যে, এবাদত বন্দেগী এবং আল্লাহর ওপর নির্ভরতার পাশাপাশি মানুষকে কর্ম-প্রচেষ্টা চালাতে হবে। তাহলেই আল্লাহর বিশেষ রহমত ও অনুগ্রহে পূর্ণ সফলতা লাভ করা সম্ভব হবে।  #   

(সূরা হুদ সমাপ্ত)