ঐশী দিশারী (পর্ব ২৬): হযরত আলী (আ.)'র ক্ষমতা গ্রহণ এবং উষ্ট্রের যুদ্ধ
গত আসরে আমরা দ্বিতীয় ও তৃতীয় খলিফার মৃত্যুর সময় যথাক্রমে তৃতীয় ও চতুর্থ খলিফা নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করেছি। আজকের আসরে আমরা হযরত আলী (আ.)-এর ক্ষমতা গ্রহণ এবং জঙ্গে জামাল বা উষ্ট্রের যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা করব।
তৃতীয় খলিফা উসমান বিন আফফানের শাসনামলের শেষ দিকে তীব্র গণ অসন্তোষের জের ধরে তিনি নিহত হওয়ার পর জনতা হযরত আলী (আ.)-এর কাছে ছুটে আসে। কিন্তু শাসনক্ষমতা গ্রহণের বিন্দুমাত্র ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও জনগণের প্রবল চাপের মুখে তিনি এ দায়িত্ব গ্রহণ করতে বাধ্য হন। এ সম্পর্কে আমিরুল মু’মিনিন বলেন: আপনারা আমার হাত খুলে দিয়েছেন কিন্তু আমি তা বন্ধ করেছি। আপনারা আমার হাত টেনে নিয়েছেন কিন্তু আমি তা গুটিয়ে নিয়েছি। এরপর তৃষ্ণার্ত উট পানি পান করার জন্য যেমন কুয়ার মধ্যে গলা ঢুকিয়ে দেয় তেমনিভাবে আপনারা আমার চারপাশে জড়ো হয়েছেন। আপনাদের চাপে আমার জুতা পা থেকে খুলে যায় এবং আমার জামা ছিঁড়ে যায়। আমার হাতে বায়াত গ্রহণের জন্য ছোট-বড় সবাই প্রবল আবেগে আমার কাছে ছুটে এসেছিলেন।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে ক্ষমতা গ্রহণ করে যখনই আলী (আ.) ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার কাজে হাত দেন তখনই ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অভাবের কারণে জনগণ আমিরুল মু’মিনিনের বিরুদ্ধাচরণ শুরু করে। এ সময় কেউ কেউ দৃশ্যত হিতাকাঙ্ক্ষী হিসেবে আলী (আ.)কে প্রস্তাব দেন, শাসনক্ষমতাকে সুসংহত করার জন্য আগে প্রশাসনের লোকদের সহযোগিতা গ্রহণ করুন, তারপর তাদের দুর্নীতির বিচার করবেন। কিন্তু এ প্রস্তাবের জবাবে তিনি বলেন, তোমরা কি আমাকে ক্ষমতার জন্য জালেম হওয়ার প্রস্তাব করছ? রাজনীতির জন্য আমাকে ইসলামের আহকাম বাস্তবায়ন থেকে বিরত থাকতে বলছ? আল্লাহর পবিত্র সত্ত্বার শপথ, আমার দ্বারা কখনোই এটা সম্ভব হবে না। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আমি কোনো ধরনের আপোষ করব না।
এভাবে হযরত আলী (আ.) রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই প্রশাসনকে ঢেলে সাজানোর সিদ্ধান্ত নেন। তিনি দুর্নীতিবাজ ও অযোগ্য কর্মকর্তাদের সরিয়ে যোগ্য ও ঈমানদার ব্যক্তিদেরকে তাদের স্থলাভিষিক্ত করেন। তিনি নবনিযুক্ত কর্মকর্তাদের উদ্দেশ করে বলেন, তারা যেন ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ারে পরিণত করার পরিবর্তে একে আমানত হিসেবে গ্রহণ করে এবং জনগণের সেবক হিসেবে নিজেদের যোগ্যতার পরিচয় দেয়। তারা যেন সাদাসিধে জীবন যাপন করে, সমালোচনা গ্রহণ করতে অভ্যস্ত হয় এবং মোসাহেবদের থেকে দূরে থাকে।
তিনি কর্মকর্তাদের আরো বলেন, সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখতে হবে এবং কথা বলার পরিবর্তে কাজ করতে হবে। নির্যাতিতদের পাশে দাঁড়াতে হবে এবং জালেমদের যথাযথ শাস্তি দিতে হবে। মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে এবং মুসলিম সমাজের ঐক্য ও সংহতি রক্ষা করতে হবে। আদালতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে, বিচার করার সময় সত্যের পক্ষে রায় দিতে হবে এবং কোনো ধরনের বৈষম্য করা যাবে না। হযরত আলী (আ.) নবনিযুক্ত কর্মকর্তাদের উদ্দেশ করে আরো বলেন, আপনারা কখনো কারো বিরুদ্ধে আগে যুদ্ধ শুরু করবেন না। আগ্রাসনের শিকার হলে আগ্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে এবং যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়ন করা যাবে না। যুদ্ধে জয়ী হলে বন্দিদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করতে হবে। পলায়নরত ও আহত ব্যক্তিদের ধাওয়া করা যাবে না।

তৃতীয় খলিফার শাসনামলে স্বজনপ্রীতির কারণে যেসব গভর্নর ও শাসক ইসলামের এই নীতিমালা থেকে দূরে সরে গিয়েছিল তাদের কাছে হযরত আলী (আ.)-এর এই নির্দেশাবলী ভালো লাগেনি। তারা আমিরুল মুমিনিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এসব ব্যাপারে নমনীয় হওয়ার অনুরোধ করে। কিন্তু তারা যখন দেখতে পায়, হযরত আলী (আ.) ইসলামের দিকনির্দেশনা থেকে বিন্দুমাত্র পিছু হটবেন না তখন তারা তাঁর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র আঁটতে থাকে। অদূরদর্শী ঈমানদার ব্যক্তিরাও তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। আলী (আ.)-এর বিরোধিতাকারীদের এই দলে অনেক সাহাবী ছিলেন বলে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা আমিরুল মুমিনিনের পক্ষে সহজ ছিল না। কিন্তু তারপরও তিনি যুদ্ধ এড়াতে পারেননি। প্রথমেই সংঘটিত হয় জঙ্গে জামাল বা উষ্ট্রের যুদ্ধ। তৃতীয় খলিফা নিহত হওয়ার পর হযরত আলী (আ.)-এর বিরোধিতাকারীরা উসমান হত্যাকারীদের বিচারের অজুহাতে আমিরুল মুমিনিদের বিরুদ্ধে সেনা সমাবেশ ঘটায়।
হযরত আলী (আ.)-এর বিরুদ্ধাচরণকারীদের মধ্যে ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর স্ত্রী আয়েশার পাশাপাশি তালহা ও জুবায়েরের মতো সাহাবীরা। এমনকি তৃতীয় খলিফা নিহত হওয়ার পর যারা আমিরুল মুমিনিনের হাতে বায়াত গ্রহণ করেছিল তাদেরও অনেকে আলী (আ.)-এর প্রতিপক্ষে চলে যায়। হযরত আলী (আ.) যখন শুনতে পান তার বিরুদ্ধাচরণকারীরা সদলবলে বসরার দিকে যাচ্ছে তখন তিনি বসরার গভর্নরের কাছে পত্র লিখে তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে এবং যুদ্ধ পরিহার করার আহ্বান জানাতে বলেন। কিন্তু উষ্ট্রের বাহিনী নামে পরিচিত এই বাহিনীর ক্ষমতালিপ্সু কমান্ডাররা বসরার গভর্নরের কথায় কর্ণপাত না করে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি চালিয়ে যেতে থাকে। বসরার গভর্নর উসমান বিন হানিফ তখন অনন্যোপায় হয়ে উষ্ট্রের বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য নিজের বাহিনী প্রস্তুত করেন।
এদিকে উষ্ট্রের বাহিনী বসরার যোদ্ধাদের সঙ্গে ছোটখাট সংঘর্ষের পর যখন দেখল তাদের সঙ্গে পেরে উঠবে না তখন বসরার গভর্নরের কাছে সন্ধির প্রস্তাব দিয়ে বলে, আলী (আ.) বসরায় আসার আগ পর্যন্ত যুদ্ধ বন্ধ রাখা হোক। আমিরুল মুমিনিন মদীনা থেকে বসরায় এসে যে সিদ্ধান্ত দেবেন তা মেনে নেয়া হবে। উষ্ট্রের বাহিনী সন্ধির শর্ত অনুসারে বসরায় প্রবেশের অনুমতি চায় এবং বলে, তারা শুধু শহরে প্রবেশ করবে কিন্তু মসজিদে প্রবেশ করবে না এবং শাসনকাজে হস্তক্ষেপ করবে না। কিন্তু শহরে প্রবেশ করার পর তারা নিজেদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে মসজিদে প্রবেশ করে বসরার গভর্নরকে অপমান করে, শহর দখল করে নেয় এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগার লুট করে।
হযরত আলী (আ.) এ খবর পেয়ে দ্রুত বসরার কাছাকাছি পৌঁছে ঘাঁটি স্থাপন করেন। উষ্ট্রের বাহিনী আমীরুল মুমিনিনের ওপর হামলা করলে জঙ্গে জামাল বা উষ্ট্রের যুদ্ধ শুরু হয়। তুমুল যুদ্ধে উষ্ট্রের বাহিনী পরাজিত হয় এবং দুঃখজনকভাবে ভ্রাতৃঘাতী এই যুদ্ধে হযরত আলী (আ.)-এর বাহিনীর পাঁচ হাজার এবং উষ্ট্রের বাহিনীর পক্ষে তার চেয়ে বেশি সংখ্যক যোদ্ধা নিহত হন। যুদ্ধ শেষে হযরত আলী (আ.) নবীজীর স্ত্রীকে সসম্মানে মদীনায় পাঠিয়ে দেন এবং তিনি নিজে বেশ কিছুটা পথ আয়েশার কাফেলাকে সঙ্গ দেন। এর মাধ্যমে হযরত আলী (আ.)-এর খেলাফতের বিরুদ্ধে প্রথম ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়। আমিরুল মুমিনিন এ সময় শাম বা তৎকালীন সিরিয়াকে পরাভূত করার লক্ষ্যে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করা থেকে বিরত থাকেন এবং বসরা থেকে কুফায় গমন করেন। শামের গভর্নর মুয়াবিয়া হযরত আলী (আ.)-এর আনুগত্য মেনে নিতে অস্বীকার করেছিলেন বলে আমিরুল মুমিনিন শামের বাহিনীর উপর নজর রাখার জন্য কুফায় ঘাঁটি স্থাপন করেন।#
পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ/ ১১
খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন