''রাফি হত্যার ঘটনায় বোঝা যায় নৈতিকতার কতটা অবক্ষয় ঘটেছে''
বাংলাদেশের ফেনির সোনাগাজী মাদ্রাসার শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন নিগ্রহ এবং হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নতুন কিছু নয়। এ ধরনের ঘটনা সেক্যুলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ এমনকি প্রাথমিক স্কুলেও ঘটছে। ফলে এটিকে সাম্প্রদায়িক ঘটনা হিসেবেও দেখার সুযোগ নেই। যৌন নিগ্রহের ঘটনা নিত্যকার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। রেডিও তেহরানকে দেয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট কলামিস্ট ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার সৈয়দ আবুল মকসুদ।
তিনি বলেন, এসব ঘটনার জন্য আমাদের রাজনীতি, শিক্ষাব্যবস্থা, সুশীল সমাজ, সিভিল প্রশাসন, পুলিশ ও বিচারহীনতাসহ অনেক কিছুই দায়ী।
সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।
রেডিও তেহরান: জনাব সৈয়দ আবুল মকসুদ, সম্প্রতি বাংলাদেশের ফেনি জেলার সোনাগাজি উপজেলায় নুসরাত জাহান রাফির হত্যাকাণ্ড নিয়ে সারা দেশে তোলপাড় হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে- মাদ্রাসা হচ্ছে ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র যেখানে স্বাভাবিকভাবে নীতি-নৈতিকতা শিক্ষা দেয়া হয়। সেখানে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
সৈয়দ আবুল মকসুদ: দেখুন, ফেনির সোনাগাজি উপজেলায় নুসরাত জাহান রাফি হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। প্রতিদিন যৌন নিপীড়নের ঘটনা পত্রপত্রিকায় আসছে কিন্তু রাফিকে যেভাবে পরিকল্পিতভাবে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে পুড়িয়ে মারা হয়েছে সেটি সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
ঘটনাটি ঘটেছে মাদ্রাসায়। তবে যৌন নিপীড়ন এবং যৌন অপরাধ কেবল মাদ্রাসায় নয়; বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হচ্ছে। যৌন নিপীড়ন ও যৌন অপরাধের ঘটনা সেক্যুলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে হচ্ছে, কলেজ- স্কুল এমনকি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পর্যন্ত হচ্ছে। সুতরাং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের ঘটনা আসলে নতুন কিছু নয়।
তবে যেকথাটি আপনি বললেন মাদ্রাসায় এমন একটি ঘটনা ঘটল; বিশেষ করে এটি একটি এবতেদায়ি মাদ্রাসা নয়; উঁচু মাদ্রাসা। সেই মাদ্রাসায় যখন এধরনের ঘটনা ঘটে তখন বোঝা যায় যে নৈতিকতার কতটা অবক্ষয় ঘটেছে। সেখানে ইসলাম ধর্মীয় শাস্ত্র ও নৈতিকতা শিক্ষা দেয়া হয় অথচ সেখানে এমন একটি ঘটনা ঘটায় বিশেষ করে মাদ্রাসার অধ্যক্ষের যে পরিচয় এখানে পাওয়া গেল তাতে মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। তবে অনেকে আবার এটিকে একটি সাম্প্রদায়িক রুপ দেয়ার চেষ্টা করছে। তারা বলছে মাদ্রাসায় এমন একটি অপ্রীতিকর ও মর্মান্তিক ঘটনা ঘটল! তাদের বক্তব্য মাদ্রাসার লোকেরা এ ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছে। এ ধরনের ভাবনা ও মতও ঠিক নয়। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অহরহ যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটছে।
তাছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাইরেও যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটছে। এটির কারণ হচ্ছে এ ধরনের ঘটনায় বড় রকমের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া আজ পর্যন্ত সম্ভব হয় নি। আর সম্ভব না হওয়ারও কারণ আছে। এজন্য সম্ভব হচ্ছে না যে, এ ধরনের ঘটনার পেছনে যেসব প্রভাবশালীরা থাকেন তারা কোনো না কোনোভাবে বড় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত। অথবা তারা নিজেরাই প্রভাবশালী কোনো গোষ্ঠী এমনকি স্থানীয়ভাবে খুব প্রভাবশালী। তাছাড়া সিভিল প্রশাসন এবং পুলিশ প্রশাসন তাদের সঙ্গে এদের যোগসাজস রয়েছে। ফলে অনেক অপরাধী বেরিয়ে যায়। তাদের কোনো সাজা হয় না। আর সেসব কারণে রাফি হত্যাকাণ্ড নিয়ে মানুষের মধ্যে নানা দিক থেকে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তবে প্রগতিশীলরা ভাবছেন এমন ঘটনা মাদ্রাসায় ঘটল! তবে সাধারণ মানুষ বিষয়টিকে অন্যভাবে দেখছেন। তারা দেখছেন- এ ঘটনার পেছনে সরকারি দলের নেতারা আছেন। স্থানীয় পর্যায়ের সরকারি দলের নেতারা থাকায় নাগরিক সমাজের মধ্যে একটা ধারনা হয়েছে হয়তো শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনোভাবে অপরাধীরা ছাড় পেয়ে যাবে।
রেডিও তেহরান: নুসরাত জাহান রাফি হত্যাকাণ্ডের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এ ঘটনায় জড়িত কাউকেই রেহাই দেয়া হবে না। কিন্তু বিএনপির নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, হত্যাকাণ্ডের বিচারের সম্ভাবনা দেখছি না। তো প্রধানমন্ত্রী, নজরুল ইসলাম খানের বক্তব্য এবং সাধারণ মানুষের ভাবনা- এ বিষয়গুলোকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
সৈয়দ আবুল মকসুদ: দেখুন, বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম খান সাহেব যেকথা বলেছেন সেটি একেবারেই একটা দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বলেছেন। আর সরকারের দিক থেকে প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যে কথা বলেছেন যে, কোনো ছাড়া দেয়া হবে না। বিভিন্ন সময় ওনারা এমনটি বলে থাকেন। কিন্তু আইনের যে মারপ্যাচ আছে তাতে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। যদি কোনো ঘটনার চার্জশিট ঠিক মতো দেয়া না হয় তাহলে তো আদালত কাউকে জোর করে শাস্তি দিতে পারবে না। সেদিক থেকে মানুষের মধ্যে এমন ধারনা হওয়ার কারণ হচ্ছে অতীতের দৃষ্টান্ত।
অতীতে দেখা গেছে এ ধরনের ঘটনায় অনেকেই ছাড় পেয়ে গেছেন। তাছাড়া মামলা যখন দীর্ঘসূত্রিতা লাভ করে তখন মানুষ একদিকে ভুলে যায় অন্যদিকে বিষয়টি নিয়ে পরে আর তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না। ফলে রাফির ঘটনায় বিচার হবে না বলে মানুষের মনে ভাবনা এসেছে তাকে ভুল প্রমাণ করতে হলে যারাই এ ঘটনার সাথে জড়িত আছে বিশেষ করে অধ্যক্ষসহ রাজনৈতিক নেতা- তাদেরকে অতি দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে সরকারকে। শুধু অধ্যক্ষ এবং তার সহযোগীরা নয়; ওই মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটিকেও আইনের আওতায় আনতে হবে। তাদেরকে জবাবদিহিতার জায়গায় আনতে হবে। মাদ্রাসায় এমন একটি ঘটনা কিভাবে ঘটল তার জবাব দিতে হবে কমিটিকে। তাছাড়া একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে- প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটিতে কেবলমাত্র সরকারি দলের লোকেরাই থাকেন। আর সে কারণে মানুষের ধারনা সরকারি দলের লোকেরা যখন ম্যানেজিং কমিটিতে থাকেন তখন দেখা গেল কোনো একটি প্রক্রিয়ায় অপরাধীরা আইনের বাইরে রয়ে গেল। সেজন্যেই মানুষের মধ্যে এই ধারনা সৃষ্টি হয়েছে।
রেডিও তেহরান: ইদানিং বাংলাদেশে একটা প্রবণতা দেখা যাচ্ছে সেটা হলো- কোনো একটা অপরাধমূলক ঘটনা ঘটলে একের পর এক সে ধরনের ঘটনা ঘটেই চলে। এর কারণ কী?
সৈয়দ আবুল মকসুদ: দেখুন, আপনি যে প্রশ্নটি করলেন একই ধরনের কথা বহুলোকে বলে থাকেন। যেমন ধরুন চোখ উপড়ানোর ঘটনা যদি একটা ঘটে তাহলে কিছুদিন ওইটাই ঘটতে থাকে। তারপর ধরুন শিশুহত্যা, অগ্নিকাণ্ড এবং ধর্ষণের ঘটনা। এসব ঘটনা একটি ঘটলে দেখা যায় ঘটতেই থাকে। এটা আমিও ঠিক বুঝতে পারি না। এ বিষয়টি আমাদের সমাজ বিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণের বিষয়। একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে একইধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকে। এই যে একটা প্রবণতা-এটি অত্যন্ত গভীরভাবে বিবেচনার বিষয়। এরজন্য আসলে দায়ী কারা? এরজন্য আমাদের রাজনীতি দায়ী, এজন্য আমাদের সুশীল সমাজ দায়ী, এজন্য আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাসহ অনেক কিছুই দায়ী। এসব কিছু যদি সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করা না যায় তাহলে এর ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব না।
রেডিও তেহরান: বাংলাদেশের অপরাধ প্রবণতা প্রতিরোধে সরকার ও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে কী আরো কিছু করার আছে বলে মনে করেন?
সৈয়দ আবুল মকসুদ: দেখুন, সিভিল প্রশাসন বা সরকার এবং পুলিশ প্রশাসনেরই দায়িত্ব এ বিষয়টি দেখার।
আমি মনে করি এবং আপনাকে বলতে চাই, যদি বৃটিশ আমলে এধরনের একটি ঘটনা ঘটত তাহলে এটা প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত আসার প্রয়োজন হতো না। এটা স্থানীয় শাসনের সঙ্গে যারা জড়িত তারাই সমাধান করতেন। যেমন ধরুন বৃটিশ সময়ে ইউনিয়ন বোর্ড বর্তমানে যেটি ইউনিয়ন কাউন্সিল, উপজেলা কাউন্সিল, জেলা কাউন্সিল-তারাই এ ধরনের সংকটের সমাধান করতে পারত। কিন্তু বর্তমানে নিচের দিকে যারা আছেন তারা তাকিয়ে থাকেন উপরের দিকে। তাছাড়া তারাও নানা ধরনের অপকর্ম ও সুবিধা নেয়ার ঘটনার সাথে যুক্ত। যে কারণে তারা কঠোর এবং ন্যায়সঙ্গত কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছেন না। পুলিশ প্রশাসন ও সিভিল প্রশাসনও নিক্রিয় থাকেন। অথচ এ ধরনের ঘটনায় তাদেরই ব্যবস্থা নেয়ার কথা। কোনো লোক যদি এটার বিচার নাও চাইতো তাহলেও বৃটিশ আমলে হলে প্রশাসন নিজেই এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিত। অথচ আমাদের এখানে দেখতে পাচ্ছি যে নাগরিক সমাজ থেকে হৈ চৈ হচ্ছে, বিভিন্ন জায়গায় মানববন্ধন হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীকে পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে বক্তব্য দিতে হচ্ছে। বর্তমান প্রশাসনের নিচের দিকের দুর্বলতা থেকেই এ ধরনের একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তারা যদি সঠিকভাবে দায়িত্বপালন করত তাহলে এ ধরনের অপরাধ অনেক কম হতো।#
পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/২০