রমজান : রহমতের বসন্ত (পর্ব-২৪)
আশা করছি এ আলোচনা আমাদের হৃদয়ে যোগাবে শক্তি ও আত্মবিশ্বাস। হে সর্বোচ্চ দয়াময়! মহানবী (সা) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের প্রতি দরুদ পাঠানোর উসিলায় এই রমযান যেন আমাদের দেয় পাপের মোকাবেলায় দৃঢ়তা ও তীব্র খোদাভীতি এবং দুনির্বার খোদাপ্রেম।
দোয়া, দরুদ, তওবা ও কুরআন অধ্যয়নের এবং সার্বিকভাবে আত্মসংশোধন ও ইবাদতের বসন্ত হল রমজান। মহান আল্লাহর নৈকট্য ও খোদাভীতি অর্জন নামাজ-রোজাসহ সব ইবাদতের প্রধান উদ্দেশ্য। এক্ষেত্রে নফল ইবাদতের রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব। মহানবী (সা) জানিয়েছেন,মহান আল্লাহ বলেছেন: আমার কোন বান্দাই কেবল ফরজ ইবাদতগুলো পালন করে আমার বেশি নৈকট্য লাভ করত পারেনি, নিশ্চয়ই সে আমাকে ভালবাসার কারণে বাধ্যতামূলক নয় এমন তথা নফল ও মুস্তাহাব ইবাদতগুলো পালন করেই আমার বেশি নৈকট্য পেয়ে থাকে। এভাবে যখন সে আমার প্রিয় হয় তখন আমি তাঁর কান হয়ে যাই যাঁর মাধ্যমে সে শুনে থাকে, আমি তাঁর চোখ হয়ে যাই যাঁর মাধ্যমে সে দেখে থাকে,আমি তাঁর জিহবা হয়ে যাই যাঁর মাধ্যমে সে কথা বলে,আমি তাঁর হাত হয়ে যাই যাঁর মাধ্যমে সে আঘাত করে,যদি সে আমাকে ডাকে বা আমি তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে থাকি। -
ইবাদত আত্মসংশোধন ও প্রশিক্ষণের মাধ্যম। জ্ঞান-অর্জন ও চিন্তাভাবনা ছাড়া ইবাদতের মান উন্নত হয় না। কুরআনের ভাষা তথা আরবি ভাষা শেখা ইসলামী জ্ঞান অর্জনের জন্য খুবই সহায়ক ও জরুরি। এর ফলে কুরআন ও হাদিস বোঝা ছাড়াও আপনি নামাজে, দোয়ায় ও জিকরে কি বলছেন তা সহজেই বুঝতে সক্ষম হবেন। যারা আরবি ভাষা তেমন একটা বোঝেন না বা মোটেও বোঝেন না তাদের উচিত কুরআন, হাদিস ও দোয়া এবং জিকরের অর্থগুলো অনুবাদ থেকে জেনে নেয়া। এ ছাড়াও নামাজে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের সময় উচ্চারণ যথাসাধ্য শুদ্ধ হওয়া উচিত এবং একইভাবে নামাজের দোয়া ও জিকরের উচ্চারণও শুদ্ধ হওয়া উচিত।

ইবাদতসহ মানুষের সার্বিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে ও বিশেষভাবে আত্মশুদ্ধির ক্ষেত্রে দুটি বড় বাধা হল রিয়া এবং ওজব্ তথা লোক-দেখানোর প্রবণতা ও আত্মতৃপ্তি বা নিজেকে উচ্চস্তরের তথা উন্নত পর্যায়ের মানুষ বলে ভাবা। আল্লাহর দেয়া তৌফিকের সুবাদে আমরা যদি রাত জেগে নফল ইবাদতের সুযোগ পাই, কিংবা ধর্মীয় নানা সূক্ষ্ম দিক ও রহস্য সম্পর্কে অন্য অনেকের চেয়ে কিছু বেশি জ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম হই তাহলে শয়তান এক ধরনের অহংকার জাগিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। ফলে আমরা ভাবি যে কত মানুষ তাহাজ্জদের নামাজ পড়ে না, অথচ আমি নিয়মিত তাহাজ্জদের নামাজ পড়ি! কিংবা কত মানুষ আমার চেয়ে খুব কম হাদিস ও কুরআনের খুব কম আয়াতের তাফসির এবং কম আরবি জানে! যখনই মানুষের মনে এ ধরনের বড়ত্বের ভাব জাগে তখন তা মানুষকে খোদাপ্রেম ও বিনয় থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে তাকে শয়তানের বন্ধুতে পরিণত করে। শয়তান এক সময় খুবই বড় জ্ঞানী ও সাধক এবং ইবাদতকারী ছিল। কিন্তু অহংকার থেকে জন্ম নেয়া হিংসা তাকে পরিণত করেছে সবচেয় অভিশপ্ত সৃষ্টিতে!
অনেক মানুষের আরেকটি প্রধান ধ্বংসাত্মক আত্মিক রোগ হল লোক-দেখানোর প্রবণতা। নামাজ, রোজা ও অন্য সব ইবাদতসহ মানুষের সার্বিক তৎপরতার লক্ষ্য হওয়া উচিত আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা, মানুষের বাহবা পাওয়া নয়। তাই সুযোগ পেলেই ভালো কাজ ও ইবাদতগুলোর ছবি মোবাইলের সেলফিতে তুলে রাখা এবং নানা সামাজিক মাধ্যমে সেসবের ছবি প্রচার করা কিংবা লেখালেখিতে ও কথা বলার সময় সেসবের উল্লেখ মহান আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার লক্ষণ নয়। তবে শিশু-কিশোর ও তরুণ শ্রেণীর কাউকে উৎসাহ দিতে এবং অনেক ক্ষেত্রে দানশীল হতে মানুষকে উৎসাহী করার জন্য নানা শ্রেণীর মানুষের দান-খয়রাতের বিষয়টি প্রচার করা জরুরি। গোপনে কারো উপকার করা ও গোপনে দান-খয়রাত করার মূল্য বেশি হলেও প্রকাশ্যে দান-খয়রাতের মধ্যেও দোষ নেই যদি না তাতে লোক-দেখানোর উদ্দেশ্য না থাকে।
শেখ সাদি কৈশরে ইবাদতের এক বিশেষ রাতে মসজিদে রাত জেগে ইবাদত করতে গিয়ে ঘুমন্ত এক ব্যক্তিকে দেখিয়ে তার বাবাকে বলেন, বাবা দেখুন এ লোকটি এমন রাতে কিভাবে ঘুমাচ্ছে! তার বাবা বললেন, তুমিও বরং ঘুমালেই ভালো করতে ও গিবতের পাপ থেকে মুক্ত থাকতে!
মহান আল্লাহ আমাদের আত্মিক সব রোগ থেকে মুক্ত রাখুন মহানবী (সা) ও তাঁর আহলে বাইতের প্রতি বেশি বেশি দরুদ পাঠ ও তওবার উসিলায়।
অর্থসহ ২৪ তম রোজার দোয়া:-

পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আবু সাঈদ/২৪
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।