রমজান : রহমতের বসন্ত (পর্ব -২৮)
আশা করছি এ আলোচনা আমাদের হৃদয়ে বইয়ে দেবে খোদাপ্রেম ও আল্লাহর প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতার ফল্গুধারা।
রমজানে উত্তম বা মহতী গুণগুলোর চর্চা ধার্মিকদের আরাধ্য বিষয়। আত্মীয়-স্বজনের, দরিদ্রদের ও প্রতিবেশীদের খোঁজ-খবর নেয়া সব সময়ই একটি ভালো গুণ। রমজানে এসব কাজের সাওয়াব অনেক বেড়ে যায়। রমজানে মহান আল্লাহর পছন্দনীয় আরেকটি খুবই ভালো কাজ হল দুই ব্যক্তি, স্বামী-স্ত্রী বা দুই পরিবারের বিরোধ মিটিয়ে মিলন ঘটিয়ে দেয়া। পরস্পর শত্রু হয়ে পড়া দুই মুসলমান বন্ধু বা ব্যক্তির মধ্যে ভ্রাতৃত্ব পুন-প্রতিষ্ঠার জন্য মিথ্যা কথা বলাকে বৈধ বলা হয় ইসলামী আইনে। তাদের একজন অপরজনকে গালি দিয়ে বেড়ালেও আপনি বলতে পারেন যে, আপনার খুবই প্রশংসা করতে দেখেছি অমুককে! প্রতিপক্ষকেও বলতে পারেন একই ধরনের কথা! ফলে তারা আবারও পরস্পরের বন্ধু হয়ে উঠবে।

অতি উচ্চ পর্যায়ের নৈতিক-গুণগুলোর একটি হল যে আপনাকে বঞ্চিত করে আপনি তাকেও সাহায্য করা ও উপকার করা অব্যাহত রাখুন। মুসলমান বা মুমিন ব্যক্তির দোষ-ত্রুটি গোপন রাখা ও তাদের সম্মান বজায়ের জন্য তাদের অনেক ত্রুটি বা লজ্জাজনক কোনো দোষ ঢেকে রাখাও অতি উচ্চ পর্যায়ের নৈতিক গুণ।
যে একজন মুসলমানের কোনো ত্রুটি বা দোষ বা পাপের বিষয় সমাজে ফাঁস করবে না মহান আল্লাহও কিয়ামতের দিন তার কোনো ত্রুটি বা পাপ গোপন রাখবেন।
হযরত আলী (আ) বলেছেন, তোমার ভাই বা মুসলমানদের কেউ তোমাকে ধোঁকা দিলেও তুমি তার সঙ্গে একই কাজ করো না। -এই উপদেশ মেনে চলা কঠিন হলেও তা অতি উচ্চস্তরের একটি গুণ। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও প্রতিশোধ না নিয়ে ক্ষমা করে দেয়াটা আল্লাহর কাছ খুবই পছন্দনীয়। এক ইহুদি যুবক প্রতিদিনই মহানবীর ওপর ময়লা-আবর্জনা ঢেলে তাঁকে কষ্ট দিত! একবার বেশ কয়েকদিন সে অনুপস্থিত! সেই যুবক অসুস্থ হয়েছে শুনে মহানবী তাকে দেখতে গেলেন। যুবকটি এই মহানুভবতায় মুসলমান হয়ে যায়। মক্কার কাফের-মুশরিকরা মহানবীকে (আ) ও মুসলমানদেরকে এত কষ্ট দেয়া সত্ত্বেও মহানবী মক্কা-বিজয়ের সময় তাদের ক্ষমা করে দেন। ফলে তারা মুসলমান হয়ে যায়।
রমজান মাসসহ সব সময়ই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সুন্দর ব্যবহার খুবই উচ্চ পর্যায়ের গুণ। অনেকেই স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের কেবল নিজের সেবক এবং আজ্ঞাবহ দেখতে চান। স্ত্রী, সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের সেবা করার মত সাওয়াবের কাজকে তারা লজ্জাজনক মনে করেন! ইসলামের মহামানবদের জীবনীতে দেখা যায় তারা কখনও স্ত্রীকে নির্দেশের সুরে কিছু বলতেন না। অন্যদিকে যারা স্ত্রীর বা স্বামীর নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি ও কঠোর আচরণ সত্ত্বেও ধৈর্য ধরবে এবং পাল্টা প্রতিশোধমূলক আচরণ করবে না তাদের জন্য রয়েছে পরকালে অত্যন্ত বড় ধরনের প্রতিদান। একজন বড় আলেমের স্ত্রী ছিলেন বদমেজাজি। ওই আলেমের বাসায়ও মাঝে মধ্যে ছাত্ররা পড়তে আসত। এ সময় একবার ছাত্রদের সামনেই ওই স্ত্রী একটা বিশাল বই নিয়ে স্বামীর পাগড়িযুক্ত মাথায় আঘাত করলেন। আলেম কিন্তু নীরবই রইলেন! ছাত্রদের কেউ কেউ বলল, এমন বদমেজাজি স্ত্রীকে তালাক দেয়াই ভাল না? আলেম বললেন, না, এটা আমার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে ধৈর্যের পরীক্ষা মাত্র।
যারা খোদাপ্রেমিক তাঁরা সব কিছুতেই দেখেন মহান আল্লাহর অশেষ দয়া ও রহমতের নিদর্শন। গভীর রাতে জেগে আকাশের দিকে তাকিয়ে তাঁরা আল্লাহর প্রশংসা করেন। কত বড় আল্লাহর গড়া এই মহাকাশ! এতে রয়েছে কত কোটি ছায়াপথ কেউ জানেনা! বিজ্ঞানীরা বলছেন ছায়াপথের সংখ্যা বিশ হাজার কোটিও হতে পারে! প্রতিটি ছায়াপথে রয়েছে কোটি কোটি গ্রহ-নক্ষত্র! ২০ হাজার কোটি নক্ষত্রের মাত্র একটি নক্ষত্র হল আমাদের দেখা সূর্য। এই সূর্য পৃথিবীর চেয়ে ১৩ লক্ষ গুণ বড়। বিজ্ঞানীরা আমাদের সৌরজগতের কাছাকাছি অঞ্চলের একটি গ্রহের সন্ধান পেয়েছেন যা পুরোটাই হীরার তৈরি!
নিজের চোখের দিকে তাকান! তাতে রয়েছে কত সুন্দর লেন্স ও পলক। পলকটা যদি স্থিতিস্থাপক না নমনীয় না হত তাহলে জানালার মত হাত দিয়ে তা খোলার পরই কিছু দেখা যেত! আল্লাহ যদি প্রতিটি নিঃশ্বাস ও প্রশ্বাসের জন্য ৫ পয়সা করে কর ধরতেন! নবজাতক শিশু যদি মায়ের স্তন না চুষে মুখ দিয়ে খালি ফু দিত! এভাবে আপনি যা নিয়েই ভাবুন না কেন তাতেই আল্লাহর অশেষ রহমত ও দয়া দেখতে পাবেন। তাই মহান আল্লাহ সুরা আর রাহমানে বার বার বলেছেন: অতএব,তোমরা জিন ও ইনসান তোমাদের পালনকর্তার কোন কোন অনুগ্রহকে অস্বীকার করবে? কুরআনে বলা হয়েছে: আল্লাহ যখনই কিছু সৃষ্টি করতে চান তখন তিনি বলেন হও! আর অমনি তা হয়ে যায়! তাই বিশ্বজগতের স্রস্টা আল্লাহর জন্য মানুষসহ যে কোনো সৃষ্টিকে মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত করা মোটেই কঠিন নয়।
হে আল্লাহ! মহানবী (সা) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের প্রতি দরুদ পাঠানোর উসিলায় আমাদের অন্তর যেন সব সময় প্রেমার্ত থাকে তোমার মুগ্ধতায় এবং আমাদের জিহ্বা মশগুল থাকে তোমার প্রশংসায়।
অর্থসহ ২৮তম রোজার দোয়া:-

পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আবু সাঈদ/২৮
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।