ডিসিসি নির্বাচন নিয়ে অধ্যাপক তোফায়েল যা বললেন…
আসন্ন ঢাকা সিটি নির্বাচন সুষ্ঠু হতে সবার ভূমিকা থাকতে হবে। নির্বাচন কমিশন তাদের নিজ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করলেই নির্বাচন অনেকাংশে সুষ্ঠু হতে পারে। তবে আমাদের দেশে নির্বাচন কমিশনের সবকিছু করার সক্ষমতা নেই। রেডিও তেহরানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ।
পুরো সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।
রেডিও তেহরান: ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা ও মনোনয়নের কাজ শেষ করেছে নির্বাচন কমিশন। বিএনপি এ নির্বাচনে অংশ নেবে এবং শেষ পর্যন্ত থাকবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। এটি নির্বাচন কমিশনের জন্য এক রকমের স্বস্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিএনপির এই অংশগ্রহণকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ: দেখুন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি কিন্তু এ পর্যন্ত কোনো স্থানীয় সরকার নির্বাচন বয়কট করে নি। সবগুলো লোকাল ইলেকশনে অংশ নিয়েছে। ফলে এটি নতুন কিছু নয়। আমার কাছে এটি স্বাভাবিক বলেই মনে হয়।
রেডিও তেহরান: নির্বাচন কমিশন বলছে, দুই সিটিতেই পরিপূর্ণভাবে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম ব্যবহার করা হবে। কিন্তু দৈনিক প্রথমআলো পত্রিকা জানাচ্ছে- ইভিএমকে চ্যালেঞ্জ মনে করছে ইসি। তারপরও কেন তারা এটি করতে চাইছে? তাতে লাভটা কী?
অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ: দেখুন, ইভিএমে লাভ ক্ষতির প্রসঙ্গ বলার আগে বলতে চাই যে, আমি কোনোরকমের প্রযুক্তির বিরোধী নই। কারণ বিশ্বে প্রযুক্তিগত যেসব উন্নয়ন হচ্ছে তারসঙ্গে তাল রেখে আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিকসহ অন্যান্য কর্মকাণ্ড সম্পাদন করতে হবে। বাংলাদেশের বিভিন্ন নির্বাচনে পরীক্ষামূলকভাবে অনেকবার ইভিএমের ব্যবহার হয়েছে এবং খুব বেশি অসফল প্রমাণ হয় নি।
তবে যে বিষয়টি সামনে আসছে বা বিভিন্নমহল থেকে প্রশ্ন উঠছে যে, ইভিএমকে সামনে রেখে যদি কেউ কারচুপি করতে চায় তাহলে কারচুপি করতে পারে। ইভিএমে কারচুপি হয় না একথা জোর দিয়ে বলার সুযোগ নেই। কারণ গত নির্বাচনে দেখা গেছে বিরোধীদলের কোনো এজেন্ট ভোটকেন্দ্রগুলোতে ছিল না। একটি দল পুরো নির্বাচনকে দখলে নিয়ে নেয়। এরকম একটা পরিস্থিতিতে ব্যালট পেপার থাকলেও যা হবে ইভিএমেও তাই হবে। যদি একতরফা নির্বাচন হয়। তবে এই মুহূর্তে আসলে বাংলাদেশে ইভিএম নিয়ে সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করা খুব কঠিন। কারণ আমাদের কারও কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। অনেকটা আন্দাজ করে কথা বলছি। আসলে আমাদের কাছে এই মুহূর্তে এ সম্পর্কে কোনো সাপোর্ট নেই। ফলে ইভিএম কাজ করে না আবার কাজ করে দুটোর কোনোটাই সঠিকভাবে এই মুহূর্তে বলা সম্ভব নয়।
রেডিও তেহরান: ইভিএম ব্যবহার নিয়ে বিএনপি বলছে- এতে জনগণের রায় প্রতিপ হবে না। কিন্তু আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ইভিএম-এ নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। কীভাবে দেখছেন এসব বক্তব্যকে?
অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ: দেখুন, বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তব্য দুটোই আসলে রাজনৈতিক বক্তব্য। তারা আসলে গ্যলারি প্লে করে থাকেন। এগুলো তাদের দৃষ্টিভঙ্গি হতে পারে তবে তা রাজনৈতিক বক্তব্য। তবে নির্বাচন কমিশনের উচিত রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নেয়া; তাদেরকে দিয়ে পরীক্ষা করিয়ে মতামত নেয়া। তাদের আপত্তির জায়গাগুলো চিহ্নিত করে সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়া। এক্ষেত্রে ইভিএম'র কিছু মোডিফিকেশন নিয়ে কথা বলা যায়। কিন্তু নির্বাচন কমিশন বলছে সরকারি দল না চাইলে সেটি করবে না। আবার সরকারি দল বলছে অতীতে যে নির্বাচন হয়েছে তাতে তারা পুরোপুরি সন্তুষ্ট না। তারা ভালো নির্বাচন করতে চায়। ফলে আমাদের আগামীতে দেখতে হবে আমরা একটা সফলতার দিকে যাচ্ছি নাকি আরেকটা ব্যর্থতার দিকে যাচ্ছি ?
রেডিও তেহরান: অধ্যাপক তোফায়েল আপনি দীর্ঘদিন নির্বাচন নিয়ে কাজ করছেন। তো বিগত সংসদ নির্বাচনের পর দেশে এটিই প্রথম বড় কোনো নির্বাচন হতে যাচ্ছে। সংসদ নির্বাচনের আলোকে আপনি কী মনে করেন আসন্ন সিটি নির্বাচন সুষ্ঠু হবে?
অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ: দেখুন, শুধু সংসদ নির্বাচন না বিভিন্ন নির্বাচনের মধ্যে মিশ্র অবস্থা দেখা যায়। কুমিল্লা এবং রংপুরের নির্বাচন একরকম হয়েছে। অন্যদিকে খুলনা, বরিশাল ও গাজীপুরের নির্বাচন নিয়ে আরেকরকম। ফলে আসলে নির্বাচন জ্যোতিষি কোনো বিষয় নয় যে আগাম বলে দেয়া যাবে সেটি কেমন হবে। এটি মাঠের বাস্তবতার বিষয়। এটি অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করবে। তাছাড়া সিটি করপোরেশন নির্বাচন শুধুমাত্র মেয়র নির্বাচন নয়; এক ব্যাক্তির নির্বাচন নয়। এখানে অনেকগুলো পুরুষ ও মহিলা কাউন্সিলরেরও নির্বাচন। ফলে অনেকটা ত্রিমুখী নির্বাচন। ফলে সিটি নির্বাচন অনেকটা জটিল বিষয়।
রেডিও তেহরান: নির্বাচনকে অনেক বেশি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে নির্বাচন কমিশন কী করতে পারে? এ ক্ষেত্রে আপনার কী পরামর্শ?
অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ: নির্বাচন কমিশনের ওপর যে দায়িত্ব দেয়া আছে, তাদের যে কাজ সেটিই তারা যথাযথভাবে পালন করলেই হয়। তাদের এর বাইরে অতিরিক্ত কোনো ভূমিকা পালন করার দরকার নেই। নির্বাচন সুষ্ঠু নিরপেক্ষ ও অবাধ করার জন্য যা যা করণীয় নির্বাচন কমিশন তাই করবে। সেটাই তাদের দায়িত্ব। এখন তারা যদি সেটা না করে তাহলে তো কিছুই বলার থাকে না। দেখা গেল যে নির্বাচন কমিশন শিডিউল ঘোষণা করল। প্রার্থীরা তাদের মনোনয়নপত্র দাখিল করল এই প্রক্রিয়া শেষ হলো অথচ কমিশনের কোনো দায় থাকবে না। এমনটি করলে নির্বাচন যথাযথ হয় না। নির্বাচন কমিশন নিজের দায়িত্ব নিয়ে কাজ করলেই ভালো নির্বাচন হতে পারে।
আরেকটি বিষয় একটু বলতে চাই, সেটি হচ্ছে এ দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নির্বাচন কমিশন সর্বেসর্বা; তারাই সবকিছু করতে পারবে সেই সক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের নেই। এখানে সাধারণ ভোটার থেকে শুরু করে সরকার এবং যারা নির্বাচন পরিচালনা করবেন তাদের সবার ভূমিকা রয়েছে।#
পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ/৪