রমজান: খোদাপ্রেমের বসন্ত (পর্ব- ১৫)
রমজান মুসলমানদের জন্য একটি বিশেষ মহা-উৎসবের মাস। আর এ মহা-উৎসবের আয়োজক হলেন স্বয়ং মহান আল্লাহ।
এ মহা-উৎসব থেকে মু'মিন বা খোদাভীরু মুসলমানরাই সবচেয়ে বেশি লাভবান হন। অবশ্য মহান আল্লাহর অন্য সাধারণ উৎসব থেকে লাভবান হয় সৃষ্টিকুলের সব সদস্যই।
নামাজ, রোজা ও জাকাত- এসব ধর্মীয় প্রথা বা ইবাদতের প্রচলন অতীতের নবী-রাসুলদের যুগেও ছিল। অর্থাৎ মানুষের জন্য এ ধরনের ইবাদতগুলো সব যুগেই জরুরি বা ফরজ করা হয়েছে যাতে তারা মহান আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে পারে এবং এসবের মাধ্যমে আত্মিক সমৃদ্ধির অধিকারী হয়। অন্য কথায় মানুষের আত্মিক উন্নতি, দিক-নির্দেশনা ও প্রশিক্ষণের অন্যতম মৌলিক স্তম্ভ হল রোজা এবং তা আসমানি বা ঐশী ধর্মগুলোর অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
রোজার উদ্দেশ্য হল খোদাভীতি বা তাকওয়া অর্জন। খোদাভীরুতা হচ্ছে চোখ-কান ও অন্তরকে সদা-সতর্ক রাখা যাতে সব ধরনের পাপ থেকে মুক্ত থাকা যায় এবং যেসব কাজে আল্লাহ খুশি হন সেসব কাজে মশগুল হওয়া যায়। চলা-ফেরা এবং ওঠা-বসা ও যাবতীয় লেন-দেন ও তৎপরতায় খোদাভীতি অর্জনের অন্যতম মাধ্যম হল রোজা।
রোজা কেবল পরকালে বেহেশত পাওয়ার জন্য জরুরি তা নয়। সমাজের প্রতিটি মানুষ যদি খোদাভীরু হয়ে যায় তাহলে সে সমাজ দুনিয়ার বুকেই এক ধরনের বেহেশতি পরিবেশ তৈরি করে। এ ধরনের সমাজের প্রতিটি মানুষ হন সম্মানিত এবং সেখানে থাকে কেবলই পারস্পরিক ভালবাসা, সহযোগিতা, সুস্থতা, নিরাপত্তা ও সার্বিক সমৃদ্ধি। বর্তমান বিশ্বের সব সংকট আর সমস্যার মূল কারণ হচ্ছে খোদাভীরুতা বা তাকওয়ার অভাব। পাশ্চাত্য আজ বস্তুগত জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং ধন-সম্পদে সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও সেখানে নানা ধরনের শূন্যতা ও সংকট বিরাজ করছে খোদাভীরুতার অভাবেই।
খোদাভীরুতা বা তাকওয়া ব্যক্তি ও সমাজের জন্য খোদায়ি দিক-নির্দেশনা লাভের পূর্বশর্ত। পবিত্র কুরআনের শুরুতেই বলা হয়েছে, এ মহাগ্রন্থ কেবল মুত্তাকি বা খোদাভীরুদেরই সুপথ দেখায়। সব নবী-রাসুলের প্রথম ও শেষ উপদেশ ছিল: খোদাভীরু হও। ব্যক্তি ও সমাজ যদি প্রতিটি কাজে, চিন্তায় ও পদক্ষেপে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন তথা খোদাভীতিকে প্রাধান্য দেয় তাহলে কোনো শক্তিই- তা যত বড়ই হোক না কেন সেই ব্যক্তি ও সমাজকে সঠিক পথ থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত করতে পারবে না।

খোদাভীতির সঙ্গে রয়েছে পবিত্র কুরআন ও দোয়ার অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। মু'মিন ও খোদাভীরু কখনও হতাশ হন না। তাই তিনি মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। আর যে ব্যক্তি হতাশ সে কিছুই চায় না আল্লাহর কাছে। অথচ মহান আল্লাহ তাঁর কাছে চাইতে বলেছেন সবাইকে। দোয়া বিশ্বাসকে যোগায় শক্তি ও কাজে-কর্মে যোগায় অনুপ্রেরণা। রমজান দোয়া কবুলের সুবর্ণ-সুযোগের মাস। পবিত্র কুরআন অধ্যয়নও মানুষের ঈমান ও খোদাভীতিকে করে শক্তিশালী। রমজান হচ্ছে কুরআন অধ্যয়নের বসন্ত। কুরআনের আয়াতের অর্থ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা ও গবেষণার অভাবই মুসলমানদের অধঃপতনের প্রধান কারণ। বহু আরব দেশ আজ কাফির ও শয়তানি শক্তিগুলোর কাছে নতজানু হয়ে আছে। এর কারণ কুরআনের ভাষা বোঝা সত্ত্বেও তারা কুরআনের অর্থ নিয়ে ভাবেন না ও কুরআনের বিধানের আলোকে কাজ করেন না। অন্যদিকে ইসলামী ইরানের জনগণ এবং নেতৃবৃন্দ ফার্সি-ভাষী হওয়া সত্ত্বেও কুরআনের অর্থ নিয়ে গভীরভাবে ভাবেন ও কুরআনের নির্দেশের আলোকে আধুনিক জাহিলিয়্যাতের মোকাবেলায় সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। সাম্রাজ্যবাদ, বৈষম্য,শোষণ,জুলুম ও কপটতা হচ্ছে আধুনিক জাহিলিয়্যাতের কিছু বৈশিষ্ট্য।
পবিত্র রমজানের ফজিলত সম্পর্কে বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ জনাব মুহাম্মাদ মুনির হুসাইন খান বলেছেন: মাহে রমযান ও শাফায়াতঃ . যে ব্যক্তি মাহে রমযানে রোযা রাখে অতঃপর নিজ লজ্জাস্থান ও জিহ্বাকে হেফাজত করে ও সংযত রাখে মহান আল্লাহ তার সকল পূর্ববর্তী ও পরবর্তী গুনাহ মাফ করে দেবেন , তাকে দোযখ থেকে মুক্ত করে চিরস্থায়ী আবাসস্থল অর্থাৎ বেহেশতে স্থান দেবেন এবং তৌহীদে বিশ্বাসীদের পাহাড় – পর্বতের সমান ( অগণিত ) গুনাহ ও পাপ ক্ষমা করে দেয়ার জন্য তার শাফায়াতও কবুল করবেন।
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) বলেছেন, বিচার দিবস বা কিয়ামতের দিন আল্লাহ চার শ্রেণীর মানুষের দিকে রহমতের দৃষ্টি দেবেন না। এই চার শ্রেণী হল: বাবা-মা (অসন্তুষ্ট হয়ে) যে সন্তানকে পরিত্যাগ করে, যারা অন্যের উপকার করার পর উপকারের খোটা দেয় (বা এ জন্য কোনো দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়), যারা আল্লাহর নির্ধারিত ভাগ্য বা তকদিরের বিধানকে অস্বীকার করে এবং যারা মাদক-দ্রব্য সেবন করে।
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) বলেছেন, তিন ধরনের গোনাহর জন্য খুব দ্রুত শাস্তি নেমে আসে এবং পরকাল পর্যন্ত বিলম্বিত হয় না। এসব গোনাহ হল: বাবা মা যে সন্তানের ওপর অসন্তুষ্ট, মানুষের ওপর অত্যাচার করা এবং দয়ার প্রতি অকৃতজ্ঞতা দেখানো। মহান আল্লাহ আমাদেরকে এসব হাদিস মেনে চলার তৌফিক দিন।

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/মো.আবুসাঈদ/ ১৫