কুরআনের আলো
সূরা আয-যুমার: আয়াত ১-৪ (পর্ব-১)
পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে থেকে সূরা আয-যুমারের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। পবিত্র কুরআনের ৩৯তম এই সূরা মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। অন্যান্য মাক্কী সূরার মতো সূরা যুমারেও আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদ, রিসালাত ও কিয়ামতের মতো বিশ্বাসগত বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার প্রথম ও দ্বিতীয় আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
تَنْزِيلُ الْكِتَابِ مِنَ اللَّهِ الْعَزِيزِ الْحَكِيمِ (1) إِنَّا أَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ فَاعْبُدِ اللَّهَ مُخْلِصًا لَهُ الدِّينَ (2)
“(এই) কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময় আল্লাহর পক্ষ থেকে। (৩৯:১)
“আমি আপনার প্রতি এ কিতাব যথার্থরূপে নাযিল করেছি। অতএব, আপনি (নিজের) দ্বীনকে তাঁর জন্য একনিষ্ঠ করে আল্লাহর এবাদত করুন।” (৩৯:২)
সূরা যুমারের এই দুই আয়াতে ইসলামি জীবনব্যবস্থায় পবিত্র কুরআনের উচ্চ মর্যাদার কথা তুলে ধরে বলা হচ্ছে: কুরআন রাসূলের বাণী নয় বরং স্বয়ং আল্লাহ তায়ালার বাণী। বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহকে সঠিকভাবে জানা এবং একমাত্র তাঁর ইবাদতের ক্ষেত্রে যেকোনো ধরনের বিভ্রান্তি ও বক্রতা দূর করার লক্ষ্যে এই কিতাব নাজিল করা হয়েছে। মানুষ তার সহজাত প্রবৃত্তি দিয়ে একথা উপলব্ধি করে যে, এই বিশ্বজগতের একজন স্রষ্টা রয়েছেন। কিন্তু সেই স্রষ্টাকে জানতে গিয়ে মানুষ বিভ্রান্তির স্বীকার হয়।
সে হয় বিশ্বজগত সৃষ্টিতে আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোনো মানুষ বা বস্তুকে অংশীদার বানায় অথবা মনে করে এই জগত পরিচালনায় আল্লাহ তায়ালা কারো কারো সাহায্য নেন। অথচ এই দু’টি ধারণাই ভ্রান্ত। বিশ্বজগত সৃষ্টিতে যেমন আল্লাহর কোনো শরীক ছিল না তেমনি এটি পরিচালনায়ও তিনি কারো সাহায্য নেন না এবং পরিচালনা করতে তিনি বিন্দুমাত্র ক্লান্ত হন না। আর আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময় বলে তিনি কুরআনে যা কিছু নাজিল করেছেন তা মহাসত্য এবং প্রজ্ঞাপূর্ণ।
এই দুই আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে:
১- চর্মচক্ষু দিয়ে আমরা আল্লাহকে দেখতে পাই না ঠিকই কিন্তু কুরআনের মাধ্যমে তাঁর বক্তব্য জানতে এবং মহাসত্যকে চিনতে পারি।
২- আল্লাহর ইবাদত করতে হবে একনিষ্ঠ চিত্তে এবং ইবাদতে শিরক, কুফর ও কুসংস্কারকে প্রশ্রয় দেয়া যাবে না।
এই সূরার ৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
أَلَا لِلَّهِ الدِّينُ الْخَالِصُ وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مِنْ دُونِهِ أَوْلِيَاءَ مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَى إِنَّ اللَّهَ يَحْكُمُ بَيْنَهُمْ فِي مَا هُمْ فِيهِ يَخْتَلِفُونَ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي مَنْ هُوَ كَاذِبٌ كَفَّارٌ (3)
“জেনে রাখুন, নিষ্ঠাপূর্ণ দ্বীন ও এবাদত আল্লাহরই জন্য। যারা আল্লাহর পরিবর্তে অপরকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছে এবং (বলে যে,) আমরা শুধুমাত্র একারণে তাদের এবাদত করি, যেন তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেয়। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাদের মধ্যকার পারস্পরিক বিরোধপূর্ণ বিষয়ের ফয়সালা করে দেবেন। আল্লাহ মিথ্যাবাদী কাফেরকে সৎপথে পরিচালিত করেন না।” (৩৯:৩)
আগের আয়াতে একনিষ্ঠ চিত্তে আল্লাহর ইবাদতের কথা বলার পর এই আয়াতে বলা হচ্ছে, সত্য ধর্ম ও জীবনবিধান কেবলমাত্র আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকেই পাওয়া সম্ভব। কিন্তু মানুষের মস্তিষ্কপ্রসূত চিন্তাধারা ও মতবাদ শিরক, কুসংস্কার ও বিভ্রান্তি মিশ্রিত। একমাত্র আল্লাহর পক্ষেই মানুষের সামনে নিজের পরিচয় তুলে ধরা সম্ভব এবং কীভাবে তাঁর ইবাদত করতে হবে তাও একমাত্র তিনিই আমাদেরকে শিক্ষা দিতে পারেন। সেইসঙ্গে আল্লাহ শুধুমাত্র একনিষ্ঠ ইবাদত গ্রহণ করেন। অন্তরে শিরক পোষণ করে লোকদেখানোর জন্য ইবাদত করলে তা আল্লাহ গ্রহণ করেন না।
আয়াতের পরবর্তী অংশে দ্বীনি কাজের একনিষ্ঠতা থেকে দূরে সরে যাওয়ার একটি আলামত উল্লেখ করে বলা হচ্ছে, মানুষের পক্ষে সরাসরি আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন বা তাঁর কাছে কিছু চাওয়া সম্ভব নয়- এমন ভ্রান্ত ধারণা থেকে মুশরিকরা আল্লাহর কিছু সৃষ্টিকে তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের লক্ষ্যে ‘পবিত্র মাধ্যম’ মনে করে তাদের উপাসনা করত। অথচ আল্লাহ তায়ালা কখনোই মানুষকে এ ধরনের শিরক করার অনুমতি দেননি। ইবাদতের ক্ষেত্রে কোনো মানুষ বা অন্য কোনো কিছুকে আল্লাহর সমকক্ষ করা যাবে না এবং আল্লাহ ছাড়া আর কারো ইবাদতও করা যাবে না।
এই আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে:
১- মানুষের সৃষ্ট মতবাদ তা যতই আধ্যাত্মিক গুণে গুণান্বিত হোক না কেন তাতে নানারকম কুসংস্কার ও বিভ্রান্তি মিশ্রিত থাকে। আদর্শগতভাবে তা যেমন খাঁটি নয় তেমনি তাতে অনেক কুসংস্কারপূর্ণ আমল সংযুক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে প্রকৃত ও খাঁটি ধর্মীয় আমল একমাত্র আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে বান্দার জন্য নাজিল হয়েছে।
২- ভ্রান্ত মতবাদে বিশ্বাসীরা মানুষকে আকৃষ্ট করার জন্য তাদের মতবাদের পক্ষে নানামুখী যুক্তি তুলে ধরে।
৩- নেক আমলের মাধ্যমে সবাই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে চায়। কিন্তু এই নেক আমল করতে গিয়ে বহু মানুষ ভুল পথে পা বাড়ায়।
সূরা যুমারের ৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
لَوْ أَرَادَ اللَّهُ أَنْ يَتَّخِذَ وَلَدًا لَاصْطَفَى مِمَّا يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ سُبْحَانَهُ هُوَ اللَّهُ الْوَاحِدُ الْقَهَّارُ (4)
"আল্লাহ যদি (নিজের জন্য) সন্তান গ্রহণ করার ইচ্ছা করতেন, তবে নিঃসন্দেহে তাঁর সৃষ্টির মধ্য থেকে যা কিছু ইচ্ছা মনোনীত করতেন, (কিন্তু সন্তানের অধিকারি হওয়া থেকে) তিনি পবিত্র। তিনি এক আল্লাহ, মহা পরাক্রমশালী।” (৩৯:৪)
আগের আয়াতে শিরক-মিশ্রিত বিশ্বাসের একটি উদাহরণ তুলে ধরার পর এই আয়াতে বলা হচ্ছে: মুশরিকদের কিছু দল ফেরেশতাদেরকে আল্লাহর কন্যা মনে করে তাদের উপাসনা করত। খ্রিস্টানরা বিবি মরিয়ম সালামুল্লাহি আলাইহার সন্তান ও আল্লাহর নবী হযরত ঈসা (আ.)কে আল্লাহর পুত্র মনে করে তাঁর উপাসনা করত এবং এখনো করে। অথচ আল্লাহ তায়ালার কোনো সন্তান নেই এবং এ থেকে তিনি সম্পূর্ণ পবিত্র। যদি তিনি সন্তান নিতে চাইতেন তাহলে নিজের সৃষ্টির মধ্য থেকে কাউকে সন্তান হিসেবে গ্রহণ করে তার উপাসনা করার জন্য ঘোষণা দিয়ে দিতেন। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। আল্লাহ একক ও অদ্বিতীয় সত্ত্বা। তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই। সব সৃষ্টির ওপর তাঁর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং তিনি মহাপরাক্রমশালী।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১- আল্লাহর কোনো সন্তান নেই এবং তিনি কখনো সন্তান চানও নি। কারণ সন্তান চাওয়ার অর্থ কারো মুখাপেক্ষী হওয়া অথচ আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী নন বরং সবাই তার মুখাপেক্ষী।
২- আল্লাহর সমকক্ষ আর কেউ নেই বা হতে পারে না। কাজেই কাউকে তার সমকক্ষ মনে করা মহা অন্যায় ও শিরক এবং আল্লাহ শিরকের গুনাহ তওবা ছাড়া মাফ করেন না।#
পার্সটুডে/এমএমআই/এআর/২৪
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।