কুরআনের আলো
সূরা আয-যুমার: আয়াত ৫-৬ (পর্ব-২)
পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা আয-যুমারের ৫ ও ৬ নম্বর আয়াতের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ بِالْحَقِّ يُكَوِّرُ اللَّيْلَ عَلَى النَّهَارِ وَيُكَوِّرُ النَّهَارَ عَلَى اللَّيْلِ وَسَخَّرَ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ كُلٌّ يَجْرِي لِأَجَلٍ مُسَمًّى أَلَا هُوَ الْعَزِيزُ الْغَفَّارُ (5)
“তিনি আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন যথাযথভাবে। তিনি রাত্রিকে দিবস দ্বারা আচ্ছাদিত করেন এবং দিবসকে রাত্রি দ্বারা আচ্ছাদিত করেন এবং তিনি সুর্য ও চন্দ্রকে কাজে নিযুক্ত করেছেন। (এদের) প্রত্যেকেরই বিচরণ নির্দিষ্ট সময়কাল পর্যন্ত। জেনে রাখুন, তিনি পরাক্রমশালী ও অত্যন্ত ক্ষমাশীল।” (৩৯:৫)
গত আসরে আমরা বলেছি, বিশ্বজগত সৃষ্টি করার পাশাপাশি তা পরিচালনা করছেন এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহ। কাজেই এই কাজে তাঁর সঙ্গে অন্য কোনো ব্যক্তি বা বস্তুকে শরীক করে যেমন অন্তরে বিশ্বাস পোষণ করা যাবে না তেমনি ইবাদতের ক্ষেত্রেও আল্লাহর সমকক্ষ হিসেবে কাউকে দাঁড় করানো যাবে না। যেকোনো ইবাদত আল্লাহর দরবারে কবুল হওয়ার পূর্বশর্ত এটি। এরপর আজকের এই আয়াতে আল্লাহর একত্ববাদিতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলা হচ্ছে: চন্দ্র ও সূর্যসহ সকল গ্রহ-নক্ষত্র তিনি সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁর নির্ধারিত ব্যবস্থাপনায় এসব গ্রহ-নক্ষত্র আবর্তিত হচ্ছে।
যেসব কক্ষপথে নক্ষত্রসমূহ, সূর্য ও চন্দ্র ঘুর্ণয়মান রয়েছে সেগুলো আল্লাহ তায়ালাই নির্ধারণ করে দিয়েছেন। পৃথিবী নিজের অক্ষের ওপর ঘুর্ণয়নের পাশাপাশি সূর্যের কক্ষপথে আবর্তিত হওয়ার কারণে দিন-রাত সৃষ্টি হচ্ছে এবং ঋতু পরিবর্তিত হচ্ছে। নিঃসন্দেহে বিশ্বজগতের এই সুনির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন সৃষ্টির বৃহৎ কোনো লক্ষ্য আছে এবং সে লক্ষ্যেই এগুলো পরিচালিত হচ্ছে। এই মহা জটিল কর্মযজ্ঞ ও বিস্ময়কর মহাজাগতিক ক্রিয়াকলাপ দৈবক্রমে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা হতে পারে না। এ কারণে আয়াতের শুরুতেই বলা হচ্ছে: এই বিশ্বজগত আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন। এরপর বলা হয়েছে, গ্রহ-নক্ষত্রের আবর্তন সুনির্দিষ্ট নিয়মে হচ্ছে এবং এগুলোর আয়ুষ্কালও নির্ধারণ করে দেয়া আছে। সময় শেষ হয়ে গেলে এগুলোর ঘুর্ণয়ন থেমে যাবে।
এই আয়াতের দু’টি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:
১- বিশ্বজগত আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টি একথা যেমন সত্য তেমনি তার পরিচালনার দায়িত্বও তিনিই গ্রহণ করেছেন।
২- মহাকাশের সব গ্রহ-নক্ষত্র আল্লাহর নির্দেশে সুনির্দিষ্ট নিয়মে ঘুরছে এবং তাঁর নির্ধারণ করে দেয়া সময় পর্যন্ত এগুলোর ঘুর্ণয়ন অব্যাহত থাকবে।
সূরা যুমারের ৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:
خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ ثُمَّ جَعَلَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَأَنْزَلَ لَكُمْ مِنَ الْأَنْعَامِ ثَمَانِيَةَ أَزْوَاجٍ يَخْلُقُكُمْ فِي بُطُونِ أُمَّهَاتِكُمْ خَلْقًا مِنْ بَعْدِ خَلْقٍ فِي ظُلُمَاتٍ ثَلَاثٍ ذَلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمْ لَهُ الْمُلْكُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ فَأَنَّى تُصْرَفُونَ (6)
“তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন একই ব্যক্তি থেকে। অতঃপর তার থেকে তার যুগল সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি তোমাদের জন্য আট প্রকার চতুষ্পদ জন্তু অবতীর্ণ করেছেন। তিনি তোমাদেরকে (একবার সৃষ্টি করার পর) আরেকবার সৃষ্টি করেছেন তোমাদের মাতৃগর্ভে পর্যায়ক্রমে একের পর এক ত্রিবিধ অন্ধকারে। তিনিই আল্লাহ তোমাদের পালনকর্তা, (গোটা বিশ্বজগত) তাঁরই সাম্রাজ্যের অধীন। তিনি ছাড়া কোন উপাস্য নেই। অতএব, তোমরা কিভাবে সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছো? (এবং বিপথে চলে যাচ্ছো?)” (৩৯:৬)
আগের আয়াতে বিশ্বজগত সৃষ্টির বর্ণনা দেয়ার পর এই আয়াতে পৃথিবী নামক গ্রহে বসবাসরত মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর কথা বলা হচ্ছে। আল্লাহ তায়ালা বলছেন: তোমাদের সবাই সৃষ্টি হয়েছ একজন মানুষ থেকে যার স্ত্রী ছিল তার দৈহিক উপাদান থেকে সৃষ্টি। আদম ও হাওয়া নামের সেই প্রথম মানব-মানবী থেকেই গোটা মানবজাতি সৃষ্টি হয়েছে যারা পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। এরপর গৃহপালিত চতুস্পদ জন্তুর প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে যেগুলো আমাদেরকে দুগ্ধজাত সামগ্রী, গোশত ও পোশাকের উপকরণ সরবরাহ করে; এমনকি বাহন হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। বলা হচ্ছে: আল্লাহই মানুষের বেঁচে থাকার জন্য চার ধরনের পশুকে তার অনুগত করে দিয়েছেন: গরু, ছাগল, ভেড়া ও উট। এই চার ধরনের পশুর উভয়লিঙ্গের সমন্বয়ে আট ধরনের পশুকে মানুষের সেবায় নিয়োজিত করে দিয়েছেন আল্লাহ তায়ালা।
আয়াতের পরবর্তী অংশে মায়ের গর্ভে মানুষ সৃষ্টির পর্যায়গুলো বর্ণনা করা হয়েছে। এমন এক স্থানে মানবদেহ সৃষ্টি হয় যা থাকে পিতা-মাতার দৃষ্টির অন্তরালে। নবজাতক মাতৃগর্ভে তিনটি সুদৃঢ় আবরণে সংরক্ষিত থাকে। আল্লাহ তায়ালা শুক্রাণুকে মাতৃগর্ভে একটির পর একটি পর্যায় অতিক্রম করান এবং এক রূপ থেকে আরেক রূপে পরিবর্তন করানোর মাধ্যমে নয় মাসে একটি পূর্ণাঙ্গ নবজাতক তৈরি করে দেন।
আয়াতের শেষাংশে যারা আল্লাহর অস্তিত্বকে অস্বীকার করে এবং যারা তাঁর সঙ্গে অন্য কোনো ব্যক্তি বা বস্তুকে শরীক করে তাদের উদ্দেশ করা বলা হচ্ছে: ইনি হচ্ছেন সেই আল্লাহ যিনি একইসঙ্গে তোমাদের সৃষ্টি ও পালনকর্তা। তিনি ছাড়া আর কারো পক্ষে কোনো কিছু সৃষ্টি করা এবং তাঁর মতো করে প্রতিপালন করা সম্ভব নয়। কাজেই প্রশ্ন উত্থাপন করে বলা হচ্ছে: তাহলে তোমরা কেন বিপথে পরিচালিত হয়ে অন্য কারো দিকে ধাবিত হচ্ছো?
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১- বর্ণ, গোত্র, ভাষা ও জাতি নির্বিশেষে পৃথিবীর সকল মানুষ এক পিতা ও এক মাতা এবং একই উপাদান থেকে সৃষ্টি হয়েছে। কাজেই এই দিক দিয়ে তারা সকলে ভাই-ভাই।
২- দৈহিক গঠনের দিক দিয়ে নারী ও পুরুষের মধ্যে কিছু পার্থক্য থাকলেও তাদের সৃষ্টিগত উপাদান একই। কাজেই মানবীয় গুণাবলী অর্জন ও পূর্ণতায় পৌঁছানোর ক্ষেত্রে তাদের উভয়ের সমান সুযোগ রয়েছে।
৩- কয়েকটি পর্যায় অতিক্রম করে মানুষ মায়ের পেট থেকে ভূমিষ্ট হয় এবং মাতৃগর্ভ হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার অন্যতম লুক্কায়িত মোজেযা বা অলৌকিক নিদর্শন। নবজাতক ভূমিষ্ট হওয়ার মাধ্যমে এই মোজেযার বিষয়টি মানুষের সামনে প্রকাশ পায়; যদিও মাতৃগর্ভের রহস্য মানুষের অজানাই থেকে যায়।
সূরা যুমারের ৬ নম্বর আয়াতের আরেকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে:
৪- মহান আল্লাহ আমাদের শ্রষ্টা, আমাদের প্রতিপালক এবং আমাদের অস্তিত্বের মালিকানাও তাঁরই। আমাদের যা কিছু আছে তার সব তাঁরই দান। কাজেই তার প্রতি সার্বক্ষণিক ঈমান থাকতে হবে এবং শুধুমাত্র তাঁরই ওপর নির্ভর করতে হবে। কারণ, তিনি ছাড়া আর যা কিছু আছে তার সবই তাঁর সৃষ্টি এবং তাঁরই আজ্ঞাবহ।#
পার্সটুডে/এমএমআই/এআর/৩০
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।