সূরা আয-যুমার: আয়াত ৭-৮ (পর্ব-৩)
পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা আয-যুমারের ৭ ও ৮ নম্বর আয়াতের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
إِنْ تَكْفُرُوا فَإِنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ عَنْكُمْ وَلَا يَرْضَى لِعِبَادِهِ الْكُفْرَ وَإِنْ تَشْكُرُوا يَرْضَهُ لَكُمْ وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى ثُمَّ إِلَى رَبِّكُمْ مَرْجِعُكُمْ فَيُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ إِنَّهُ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ (7)
“যদি তোমরা কুফরি করো, তবে (জেনে রেখো) আল্লাহ তোমাদের প্রতি অমুখাপেক্ষী। তিনি তাঁর বান্দাদের অকৃতজ্ঞ হয়ে পড়া পছন্দ করেন না। পক্ষান্তরে যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হও, তবে তিনি তোমাদের জন্য তা পছন্দ করেন। একজনের (গুনাহের) বোঝা অন্য জন বহন করবে না। অতঃপর তোমরা তোমাদের পালনকর্তার কাছে ফিরে যাবে। তিনি তোমাদেরকে তোমাদের কর্ম সম্বন্ধে অবহিত করবেন। কারণ, তিনি তোমাদের অন্তরের খবর সম্পর্কে সম্যক অবহিত।” (৩৯:৭)
আগের আয়াতে মানুষ ও চতুস্পদ জন্তু সৃষ্টিতে আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এরপর এই আয়াতে মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়ার উপদেশ দিয়ে বলা হচ্ছে: কিছু মানুষ আল্লাহর পক্ষ থেকে যেকোনো নেয়ামত পাওয়ার পর তার শোকর আদায় করে। এ ধরনের বান্দারা সর্বাবস্থায় আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকে। কিন্তু আরেকদল মানুষ আছে যারা আল্লাহর ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন। তারা কোনো নেয়ামত পেলে কে তা দিল তা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে শুধু তা ব্যবহার করে। অথবা তারা মনে করে, মেধা খাটিয়ে ও পরিশ্রম করে তারা নিজেরাই এই নেয়ামত অর্জন করেছে এবং এখানে আল্লাহ তায়ালার কোনো হাত নেই। এ কারণে তারা আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।
মানুষকে শুকরিয়া বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশের যে নির্দেশ আল্লাহ দিয়েছেন তার কোনো প্রয়োজন আল্লাহর নেই। পৃথিবীর সকল মানুষও যদি আল্লাহকে অস্বীকার করে কিংবা তাঁর প্রতি অকৃতজ্ঞ হয় তাতে আল্লাহ তায়ালার বিন্দুমাত্র ক্ষতি হবে না। কারণ, আমাদের কৃতজ্ঞতা তো দূরে থাক আমাদের অস্তিত্বেরই কোনো প্রয়োজন সর্বশক্তিমান আল্লাহর নেই। আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নির্দেশ এজন্য দেননি যে, এই শুকরিয়া তার প্রয়োজন বরং শুকরিয়া আদায় করলে আমাদেরই নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ সাধিত হয়। এ কারণে পবিত্র কুরআনের অন্যত্র (সূরা লুকমানের ১৪ নম্বর আয়াতে) মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ের পাশাপাশি পিতা-পাতার প্রতিও কৃতজ্ঞ থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
আয়াতের পরবর্তী অংশে মানুষের আচরণগত একটি সাধারণ নিয়মের প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হচ্ছে: এই পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষকে তার নিজের কর্মের দায়িত্ব নিতে হয় এবং কেউ নিজের কাজের দায়ভার অন্যের কাঁধে চাপাতে পারে না। মহান আল্লাহও কিয়ামতের দিন একজনের গোনাহের বোঝা আরেকজনের ওপর চাপিয়ে দেবেন না। মানুষের কৃতকর্মের পাশাপাশি তার অন্তরের সব খবর আল্লাহ তায়ালার জানা আছে বলে তিনি সেই মহাজ্ঞানের ভিত্তিতে কিয়ামতের দিন বিচার করবেন এবং প্রত্যেককে যার যার কৃতকর্মের জন্য শাস্তি বা পুরস্কার দেবেন।
এই আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে:
১- নামাজ ও রোজার মতো ধর্মীয় নির্দেশ পালনকে কোনো অবস্থায় আমাদের প্রতি আল্লাহর মুখাপেক্ষিতা বলে মনে করা যাবে না; বরং একজন শিক্ষক যেমন শিক্ষার্থীর উপকারের জন্যই তাকে বাড়ির কাজ করতে দেন আল্লাহ তায়ালাও তেমনি মানুষেরই উপকারার্থে তার জন্য কিছু ধর্মীয় দায়িত্ব নির্ধারণ করে দিয়েছেন।
২- মহান আল্লাহ মানুষের সঙ্গে ন্যায়পূর্ণ আচরণ করেন এবং তিনি প্রত্যেককে তার কাজের জন্য শাস্তি বা পুরস্কার দেবেন। এ কারণেই কিয়ামতের দিন পারিবারিক, বংশগত বা গোত্রীয় পরিচয় কোনো কাজে আসবে না। সন্তান বাবার কিংবা বাবা সন্তানের কোনো উপকারে আসবে না।
৩- মহান আল্লাহ আমাদের মনের সুপ্ত বাসনা ও নিয়ত বা যেকোনো কাজের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সম্যক অবহিত। তিনি মনের সে নিয়ত অনুযায়ী আমাদের কৃতকর্ম পরিমাপ করবেন।
সূরা যুমারের ৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَإِذَا مَسَّ الْإِنْسَانَ ضُرٌّ دَعَا رَبَّهُ مُنِيبًا إِلَيْهِ ثُمَّ إِذَا خَوَّلَهُ نِعْمَةً مِنْهُ نَسِيَ مَا كَانَ يَدْعُو إِلَيْهِ مِنْ قَبْلُ وَجَعَلَ لِلَّهِ أَنْدَادًا لِيُضِلَّ عَنْ سَبِيلِهِ قُلْ تَمَتَّعْ بِكُفْرِكَ قَلِيلًا إِنَّكَ مِنْ أَصْحَابِ النَّارِ (8)
“যখন মানুষকে দুঃখ-কষ্ট স্পর্শ করে, তখন সে অনুতপ্ত হয়ে একাগ্রচিত্তে তার পালনকর্তাকে ডাকে, অতঃপর তিনি যখন তাকে নিজের পক্ষ থেকে কোনো নেয়ামত দান করেন, তখন সে কষ্টের কথা ভুলে যায় যার জন্যে পূর্বে আল্লাহকে ডেকেছিল এবং সে আল্লাহর সমকক্ষ স্থির করে; যাতে করে (নিজেকে এবং) অপরকে আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করতে পারে। বলুন, তুমি তোমার কুফর সহকারে কিছুকাল জীবনোপভোগ করে নাও। নিশ্চয় তুমি জাহান্নামীদের অন্তর্ভূক্ত।” (৩৯:৮)
এই আয়াতে মানুষের আরেকটি আচরণগত বৈশিষ্ট্যের প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হচ্ছে: কোনো কোনো মানুষ অসুখ-বিসুখ এবং আর্থিক সংকটের মতো দুঃখ-কষ্টে পড়লে বেশি বেশি আল্লাহকে স্মরণ করে। তারা তাদের এই কষ্ট থেকে উদ্ধার করে দেয়ার জন্য আল্লাহ তায়ালার সাহায্য চায়। তারা যদি বুঝতে পারে তাদের কোনো ভুল বা গোনাহের কারণে তারা এই বিপদে পড়েছে তাহলে সেজন্য আল্লাহর কাছে তওবা ও অনুশোচনা করে এবং আর কখনো একই ধরনের গোনাহ করবে না বলে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়।
কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছায় সে কষ্ট দূর হয়ে গেলে কিংবা আল্লাহর পক্ষ থেকে নতুন কোনো নেয়ামত পেলে তারা সৃষ্টিকর্তার কথা বেমালুম ভুলে যায়। তখন তাদের মনেই থাকে না তারা কখনো অনুতপ্ত হয়েছিল এবং আল্লাহর সাহায্য চেয়েছিল।
তারা দুনিয়ার সুখসাগরে এতটা নিমজ্জিত হয়ে যায় যে, আল্লাহ তায়ালার অস্তিত্বের কথাও তাদের অন্তর থেকে উধাও হয়ে যায়। তখন তারা ভাবতে থাকে তাদের চারপাশের মানুষগুলোই তাদের জীবনের সবকিছু এবং এরাই তার জীবনের সমস্ত সুখ-সমৃদ্ধির কারণ। এ অবস্থায় দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনের এই ভোগসামগ্রী উপভোগের জন্য তারা অন্য মানুষকেও তাদের কাছে ডাকতে থাকে এবং এভাবে নিজেদের পাশাপাশি তারা আরো বহু মানুষকে পথভ্রষ্ট করে এবং বিভ্রান্তির অতল গহ্বরে টেনে নিয়ে যায়।
এই আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:
১- বিপদে পড়ে যারা আল্লাহকে ডাকে তাদের ঈমান বেশিদিন স্থায়ী হয় না। এ ধরনের মানুষ জীবনের বেশিরভাগ সময় আল্লাহকে ভুলে থাকে। ফলে এই ‘মৌসুমি’ ঈমান আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না এবং এ ধরনের ঈমানের অধিকারীরা জাহান্নামের আজাব থেকে নিজেদের বাঁচাতে পারবে না।
২- পার্থিব জীবনের দুঃখ-কষ্ট সহ্য করা মানুষের জন্য কঠিন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের দুঃখ-কষ্টে মানুষের অনেক উপকার হয়। সবচেয়ে বড় উপকার হচ্ছে, গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দেয়া মানুষের জন্য নিজের সৃষ্টিকর্তাকে নিয়ে চিন্তাভাবনা করার ও তাকে ডাকার সুযোগ তৈরি হয়। যারা এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নিজেদেরকে স্থায়ীভাবে আল্লাহর বিধিনিষেধের গণ্ডির মধ্যে নিয়ে আসে তারাই সফলকাম।
এই আয়াতের আরেকটি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:
৩- নির্বোধ মানুষেরাই সুখে থাকার সময় অতীতের কষ্টের কথা এবং সে কষ্ট দূর করতে আল্লাহ তায়ালার অবদানের কথা ভুলে যায়। বাহ্যত এ ধরনের মানুষকে অনেক বুদ্ধিমান ও প্রখর জ্ঞানী বলে মনে হলেও আল্লাহ-বিস্মৃত মানুষরা নির্বোধ ছাড়া আর কিছু নয়।#
পার্সটুডে/এমএমআই/এআর/৪
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।