অক্টোবর ০৮, ২০২০ ১৪:২১ Asia/Dhaka

পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা আয-যুমারের ৯ ও ১০ নম্বর আয়াতের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  أَمْ مَنْ هُوَ قَانِتٌ آَنَاءَ اللَّيْلِ سَاجِدًا وَقَائِمًا يَحْذَرُ الْآَخِرَةَ وَيَرْجُو رَحْمَةَ رَبِّهِ قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُولُو الْأَلْبَابِ (9)

“(সেই ব্যক্তি ভালো, নাকি) যে রাত্রিকালে সেজদার মাধ্যমে এবং দাঁড়িয়ে ইবাদতে মশগুল থাকে (ও) পরকালের ভয় করে এবং তার পালনকর্তার রহমতের ব্যাপারে আশাবাদী? (হে রাসূল আপনি) বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না; তারা কি সমান হতে পারে? চিন্তা-ভাবনা কেবল তারাই করে, যারা বুদ্ধিমান।” (৩৯:৯)

সূরা যুমারের এর আগের আয়াতে সেইসব মানুষের কথা বলা হয়েছে যারা বিপদে পড়লে আল্লাহকে ডাকে এবং বিপদ কেটে গেলে আল্লাহর কথা ভুলে যায় অথবা তাঁকে অস্বীকার করে। এরপর ওই মানুষদের তুলনায় আরেকদল মানুষের কথা উল্লেখ করে আজকের এই আয়াতে বলা হচ্ছে: যে ব্যক্তি সুখে-দুঃখে সব সময় আল্লাহকে স্মরণে রাখে সে কি তার সমান যে শুধু বিপদে পড়ে আল্লাহকে ডাকে? সব সময় আল্লাহকে স্মরণকারী ব্যক্তি গভীর রাতে ঘুম থেকে জেগে উঠে নামাজসহ অন্যান্য ইবাদতে মশগুল হয়। তার অন্তরে সব সময় জাহান্নামের ভয় এবং আল্লাহর রহমত লাভ করে জান্নাত লাভের আশা কাজ করে।

আল্লাহ তায়ালার প্রিয়ভাজন ব্যক্তি বা ওলিদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তারা শেষ রাতে আরামের ঘুম হারাম করে নামাজ, দোয়া ও কুরআন তেলাওয়াতে মশগুল হন। অথচ কিছু মানুষ আছে যারা ফরজ নামাজই দায়সারাভাবে আদায় করে এবং রোজা রাখতে তাদের অনেক কষ্ট হয়। পক্ষান্তরে ঈমানদার ব্যক্তিরা চরম আকর্ষণ ও পরম তৃপ্তি সহকারে ফরজ ইবাদত তো পালন করেনই সেইসঙ্গে নফল ইবাদত করার জন্য মাঝরাতে ঘুম থেকে জেগে ওঠেন। এ ধরনের মানুষ আল্লাহর আজাবের ভয় করার পাশাপাশি তাঁর ক্ষমা লাভের ব্যাপারে এক বুক আশা পোষণ করেন।

ঈমানদার এই মানুষেরা সব সময় ভয় এবং আশার মাঝামাঝি একটি অবস্থানে জীবন অতিবাহিত করেন। ফলে তারা একদিকে যেমন আল্লাহর রহমতের ব্যাপারে নিরাশ হয়ে যান না তেমনি আল্লাহর রহমত লাভের ব্যাপারে অহংকারী হয়ে ওঠেন না। আয়াতের পরবর্তী অংশে মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় রাসূলকে উদ্দেশ করে বলেন, আপনি মানুষকে একথা জানিয়ে দিন যে, জ্ঞানী ও মূর্খ মানুষ কখনো পরস্পরের সমান নয়। শুধুমাত্র জ্ঞানী ব্যক্তিরাই দাওয়াতের বাণী গ্রহণ করে ঈমানের ছায়াতলে সমবেত হয় এবং আল্লাহর ইবাদতে আত্মনিয়োগ করে। যারা এ কাজ করে না পার্থিব দৃষ্টিতে তারা যত বড় জ্ঞানীই হোক না কেন আসলে তারা মূর্খ।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১- পবিত্র কুরআনের দৃষ্টিতে রাত কেবল বিশ্রাম গ্রহণ ও ঘুমের জন্য দেয়া হয়নি। বরং একাগ্রচিত্তে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল হওয়ার কাজে রাতের শেষ প্রহরকে কাজে লাগাতে হবে।

২- প্রকৃত জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান সেইসব মানুষ যারা ঈমান আনার পর ইবাদত-বন্দেগিতে আত্মনিয়োগ করে।

৩- আল্লাহর আজাবের ভয় ও রহমতের আশা মানুষের আচরণে ভারসাম্য আনে। ঈমানদার মানুষেরা একদিকে হতাশ হয় না এবং অন্যদিকে বেশি বেশি ইবাদত করার কারণে তাদের অন্তরে অহংকারও বাসা বাধতে পারে না।

সূরা যুমারের ১০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  قُلْ يَا عِبَادِ الَّذِينَ آَمَنُوا اتَّقُوا رَبَّكُمْ لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا فِي هَذِهِ الدُّنْيَا حَسَنَةٌ وَأَرْضُ اللَّهِ وَاسِعَةٌ إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُمْ بِغَيْرِ حِسَابٍ (10)   

“(হে রাসূল আপনি) বলুন, হে আমার ঈমানদার বান্দাগণ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর। যারা এ দুনিয়াতে সৎ কাজ করে, তাদের জন্য (পুরস্কার হিসেবে) রয়েছে পুণ্য। আল্লাহর পৃথিবী প্রশস্ত (কাজেই যদি কোথাও ঈমান রক্ষা করতে গিয়ে শাসকদের পক্ষ থেকে বা পরিস্থিতির কারণে চাপের মধ্যে থাকো তাহলে হিজরত করে অন্য কোথাও চলে যাও)। নিঃসন্দেহে যারা সবরকারী, তাদেরকে অগণিত পুরস্কার পুরোপুরি বুঝিয়ে দেয়া হবে।” (৩৯:১০)

আগের আয়াতে অহংকারী ও অকৃতজ্ঞ মানুষদের সঙ্গে তওবাকারী ও অনুগত বান্দাদের তুলনা করা হয়েছে। সেইসঙ্গে মূর্খ ও অজ্ঞদের মধ্যকার বিশাল পার্থক্যের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। সে আয়াতের ধারাবাহিকতায় এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালার প্রকৃত বান্দাদের কিছু বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব বৈশিষ্ট্যের শীর্ষে রয়েছে তাকওয়া বা খোদাভীতি। বলা হচ্ছে: ঈমানদার ব্যক্তির বড় গুণ হচ্ছে সে আল্লাহকে ভয় করে। অর্থাৎ ঈমানদার ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করার কারণে সব ধরনের গোনাহ ও নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকে।

তবে শুধুমাত্র তাকওয়া যথেষ্ট নয়, সঙ্গে নেক আমলও করতে হবে। তাকওয়া হচ্ছে গাড়ির ব্রেকের মতো যা মানুষকে নানা রকমের বিপদ-আপদ ও গোনাহের কাজ থেকে রক্ষা করে এবং নেক কাজ হচ্ছে ইঞ্জিনের মতো যা মানুষকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। কথা ও কাজের মাধ্যমে নেক কাজ করার জন্য ঈমান থাকা জরুরি।  অন্য কথায় যে ব্যক্তি নিজেকে ঈমানদার দাবি করে কিন্তু তার কথা ও কাজে নেক আমলের প্রমাণ পাওয়া যায় না তার ঈমানের দাবি অর্থহীন। এ ধরনের মানুষের দাবি আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয় এবং তারা পরকালে আল্লাহর কাছ থেকে কোনো পুরস্কার পাবে না।

আয়াতের পরবর্তী অংশে ঈমানদার ব্যক্তিকে প্রয়োজনে নিজের বসবাসের স্থান ত্যাগ করতে বা হিজরত করতে বলা হয়েছে।  আল্লাহ বলেন, যদি নিজের  গ্রাম, শহর বা দেশে ধর্ম রক্ষা করতে তোমার কষ্ট হয় তাহলে অন্য কোনো গ্রাম, শহর বা দেশে চলে যাও।  মাতৃভূমির মায়া যেন তোমাদের ধর্মের ক্ষতি করতে না পারে। মহানবী (সা.) ও তাঁর সাহাবীরা মক্কার মুশরিকদের অত্যাচারের কারণে ধর্ম রক্ষার তাগিদে মদীনায় হিজরত করতে বাধ্য হয়েছিলেন। নিঃসন্দেহে জন্মভূমি কিংবা যে এলাকায় মানুষ দীর্ঘদিন বসবাস করে সেখান থেকে স্থায়ীভাবে অন্য কোথাও চলে যাওয়া মানুষের জন্য অনেক কঠিন। এ কারণে আয়াতের পরবর্তী অংশে বলা হচ্ছে: যারা আল্লাহর ধর্ম রক্ষার লক্ষ্যে এই কষ্ট সহ্য করবে ও ধৈর্য ধরবে মহান আল্লাহ তাদেরকে পুরস্কার পরিপূর্ণভাবে দান করবেন।  এই পুরস্কার কর্মের সমপরিমাণ হবে না বরং তার চেয়ে বহুগুণ বেশি হবে।

এই আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে:

১- ঈমান, তাকওয়া ও নেক আমল পরস্পরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এর যেকোনো একটি ছেড়ে দিলে মানুষ সফলকাম হতে পারবে না।

২- যদি ঈমান রক্ষার কারণে প্রয়োজন হয় তাহলে জন্মভূমি ত্যাগ করে হিজরত করতে হবে। এই কাজে যত কষ্ট ও বিপদ আসুক সেজন্য আল্লাহ তায়ালা বহুগুণ পুরস্কার নির্ধারণ করে রেখেছেন।

৩- আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দার চেষ্টা-প্রচেষ্টার ওপর ভিত্তি করে তাকে পুরস্কার দেবেন। ঈমানি চেতনা শক্তিশালী করে যে যত বেশি নেক আমল করতে পারবে মহান আল্লাহর দরবারে তার মর্যাদা তত বেশি হবে। #

পার্সটুডে/এমএমআই/এআর/৮

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।