কুরআনের আলো
সূরা আয-যুমার: আয়াত ১১-১৬ (পর্ব-৫)
পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা আয-যুমারের ১১ ও ১৬ নম্বর আয়াতের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ১১ থেকে ১৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
قُلْ إِنِّي أُمِرْتُ أَنْ أَعْبُدَ اللَّهَ مُخْلِصًا لَهُ الدِّينَ (11) وَأُمِرْتُ لِأَنْ أَكُونَ أَوَّلَ الْمُسْلِمِينَ (12) قُلْ إِنِّي أَخَافُ إِنْ عَصَيْتُ رَبِّي عَذَابَ يَوْمٍ عَظِيمٍ (13(
“(হে রাসূল আপনি) বলুন: আমি নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর ইবাদত করতে আদিষ্ট হয়েছি।” (৩৯:১১)
“আরও আদিষ্ট হয়েছি, সর্ব প্রথম মুসলমান হওয়ার জন্য।” (৩৯:১২)
“বলুন, আমি আমার পালনকর্তার অবাধ্য হলে এক মহাদিবসের শাস্তির ভয় করি।” (৩৯:১৩)
আগের আয়াতে ঈমানদার ব্যক্তিদের অন্যতম প্রধান গুণ- তাকওয়া, নেক আমল ও সবর বা ধৈর্যের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। এরপর এই তিন আয়াতে রাসূলুল্লাহ (সা.)কে উদ্দেশ করে বলা হচ্ছে: হে রাসূল! আপনি সুস্পষ্টভাবে মুশরিকদের বলে দিন, আমি আল্লাহর ধর্মকে সব ধরনের শিরক থেকে মুক্ত করে একমাত্র তাঁর ইবাদত করার আদেশ পেয়েছি। সেইসঙ্গে ইবাদত করার পাশাপাশি শিরকযুক্ত যেকোনো কাজ ও আচরণ থেকে বিরত থাকার দিক দিয়ে ঈমানদার ব্যক্তিদের মধ্যে আমাকে সবচেয়ে অগ্রগামী থাকতেও আদেশ করা হয়েছে।
পরের আয়াতে বলা হচ্ছে: যে কেউ আল্লাহর আদেশ অমান্য করবে তাকে মহা শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। এক্ষেত্রে আল্লাহর রাসূল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। দুনিয়া ও আখিরাতে মহান আল্লাহর ক্রোধ থেকে বেঁচে থাকার একমাত্র উপায় তাঁর আদেশ ও নিষেধের সামনে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ করা। এই কাজে আল্লাহর নবীর দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি এবং তাঁকে সবচেয়ে অগ্রগামী থাকার আদেশ দিয়েছেন আল্লাহ তায়ালা। যুগে যুগে নবী-রাসূলগণ নিজেদেরকে অন্য মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করতেন না বরং তাঁরা নিজেদেরকে আল্লাহর বান্দা ও তাঁর নির্দেশের সামনে আত্মসমর্পণকারী ভাবতেন। তাঁদের এই আচরণই প্রমাণ করে তাঁরা সত্যিকারের নবী ছিলেন। অন্যদিকে নবুওয়াতের মিথ্যা দাবিদাররা আল্লাহর ইবাদতের প্রতি মানুষকে দাওয়াত না দিয়ে তারা তাদের ইবাদত করার জন্য মানুষকে আহ্বান জানাত। এ ছাড়া, তারা সাধারণ মানুষের চেয়ে নিজেদেরকে শ্রেষ্ঠ মনে করত।
এই তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১- মানুষের কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছে দেয়া নবী-রাসূলগণের প্রধান দায়িত্ব। তাঁরা নিজেদের পক্ষ থেকে মানুষকে কোনো কাজ করার আদেশ করেননি বরং তারা মানুষের কাছে আল্লাহর আদেশ-নিষেধ পৌঁছে দিয়েছেন মাত্র।
২- নবী-রাসূলগণ মানুষকে আল্লাহর পক্ষ থেকে সব ধরনের শিরকমুক্ত ইবাদত করার আদেশ দিয়েছেন।
সূরা যুমারের ১৪ ও ১৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
قُلِ اللَّهَ أَعْبُدُ مُخْلِصًا لَهُ دِينِي (14) فَاعْبُدُوا مَا شِئْتُمْ مِنْ دُونِهِ قُلْ إِنَّ الْخَاسِرِينَ الَّذِينَ خَسِرُوا أَنْفُسَهُمْ وَأَهْلِيهِمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَلَا ذَلِكَ هُوَ الْخُسْرَانُ الْمُبِينُ (15)
“বলুন, আমি নিষ্ঠার সাথে আল্লাহ তা'আলারই ইবাদত করি।” (৩৯:১৪)
“অতএব, তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যার ইচ্ছা তার ইবাদত কর। (হে রাসূল আপনি তাদের) বলুন, তারাই (প্রকৃত) ক্ষতিগ্রস্ত যারা কেয়ামতের দিন নিজেদের ও পরিবারবর্গের ক্ষতি করবে। জেনে রাখো, এটাই হলো সেই সুস্পষ্ট ক্ষতি।” (৩৯:১৫)
এই দুই আয়াতে বলা হচ্ছে: আল্লাহর নবী কাফিরদের উদ্দেশ করে বলেন, আমি আল্লাহর দ্বীনকে সব ধরনের শির্কি দূষণ থেকে মুক্ত করে অবিকৃত অবস্থায় তোমাদের সামনে তুলে ধরেছি এবং আমি একনিষ্ঠ চিত্তে এক আল্লাহর ইবাদত করি। তিনি আরো বলেন, আমি তোমাদেরকে পবিত্র ও বিশুদ্ধ দ্বীন পালনের দিকে আহ্বান জানাচ্ছি। যখন তোমরা আমার কথা শুনছো না, তখন যার খুশি তার ইবাদত করতে পারো। কিন্তু মনে রেখো, এর পরিণতিতে তোমরা মহা ক্ষতির শিকার হবে। কারণ, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করলে তোমরা নিজেদের পাশাপাশি তোমাদের পরিবারের সদস্যদেরও কিয়ামতের দিন সুস্পষ্ট ক্ষতির মুখোমুখি দাঁড় করাবে।
আল্লাহর রাসূল (সা.) আরো বলেন, তোমরা কখনো ভেবো না, অর্থ বা ধন-সম্পদের ক্ষতি হচ্ছে সবচেয়ে বড় ক্ষতি। বরং প্রকৃত ক্ষতি হচ্ছে কিয়ামতের দিনের ক্ষতি। সেদিন পাপী ব্যক্তিরা একথা উপলব্ধি করবে যে, তারা পার্থিব জীবনে আল্লাহর দেয়া স্বাস্থ্য ও সম্পদ তাঁর নির্দেশিত পথে খরচ না করে অনর্থক কাজে ব্যয় করেছে। ফলে চিরকালীন জীবনের সৌভাগ্য অর্জনের পরিবর্তে তারা চরম ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। সেদিন তারা আরো উপলব্ধি করবে যে, পার্থিব জীবনের সেই ভুল শোধরানোর সুযোগ আর হবে না। এজন্যই আল্লাহ তায়ালা এই ক্ষতিকে সবচেয়ে বড় ক্ষতি বলে অভিহিত করেছেন।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. আল্লাহর নির্দেশ পালনের দিক দিয়ে নবী-রাসূলগণ ছিলেন সবচেয়ে অগ্রগামী। কখনো এমন হয়নি যে, তাঁরা মানুষকে সত্যের পথে দাওয়াত দিয়ে নিজেরা ইবাদত করা থেকে বিরত থেকেছেন।
২. সব ধরনের শিরক, বিদআত, কুসংষ্কার ও বিভ্রান্তি থেকে আল্লাহর দ্বীনকে মুক্ত রাখা ছিল নবী-রাসূলদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
৩. একদল মানুষ দাওয়াতের বাণী গ্রহণ না করলেও নবী-রাসূলগণ কখনো হতাশ হয়ে যান নি; বরং তারা ধৈর্যের সঙ্গে তাদের দায়িত্ব পালন করে গেছেন।
৪. ঈমানদার ব্যক্তিরা শুধু নিজের ব্যাপারে জবাবিদিহীতা করবে না বরং পরিবারের সদস্যদের ব্যাপারেও জিজ্ঞাসিত হবে। তাই সন্তানদেরকে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও ইবাদত-বন্দেগি শিক্ষা দেয়া অভিভাবকদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
সূরা যুমারের ১৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:
لَهُمْ مِنْ فَوْقِهِمْ ظُلَلٌ مِنَ النَّارِ وَمِنْ تَحْتِهِمْ ظُلَلٌ ذَلِكَ يُخَوِّفُ اللَّهُ بِهِ عِبَادَهُ يَا عِبَادِ فَاتَّقُونِ (16)
“তাদের জন্য উপর দিক থেকে এবং পায়ের নীচের দিক থেকে আগুনের মেঘমালা থাকবে। এ হচ্ছে সেই শাস্তি যা দ্বারা আল্লাহ তার বান্দাদেরকে (এই বলে) সতর্ক করেন যে, হে আমার বান্দাগণ, আমাকে ভয় কর।” (৩৯:১৬)
এই আয়াতে কিয়ামতের দিন প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের অবস্থা তুলে ধরে বলা হচ্ছে: জাহান্নামের ভয়াবহ আগুন তাদেরকে চারপাশ দিয়ে গ্রাস করবে এবং তাদের পালিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না। এটি প্রকৃতপক্ষে বিশ্বের সকল মানুষের জন্য একটি সতর্কবার্তা যেখানে আল্লাহ বলছেন: যদি পৃথিবীতে তাকওয়া অবলম্বন এবং আল্লাহকে ভয় না করো তাহলে কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে একরম পরিণতির সম্মুখীন হতে হবে।
এই আয়াতের দু’টি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:
১- কুফর, শিকর ও আল্লাহকে ভুলে যাওয়ার পরিণতি অত্যন্ত নির্মম ও বেদনাদায়ক হবে। দুনিয়াতে যে ব্যক্তি শিরক ও কুফরের পথ বেছে নেবে কিয়ামতের দিন তাকে মহান আল্লাহর ক্রোধের শিকার হতে হবে। ভয়াবহ আগুন তাকে গ্রাস করে নেবে।
২- জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র উপায় হচ্ছে তাকওয়া অবলম্বন ও গোনাহমুক্ত জীবনযাপন করা। গোনাহ হচ্ছে আগুনের উত্তম জ্বালানি। কাজেই দোজখের আগুনে পুড়তে না চাইলে অবশ্যই সব ধরনের গোনাহের কাজ পরিত্যাগ করতে হবে।#
পার্সটুডে/এমএমআই/এআর/১২
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।