অক্টোবর ১৬, ২০২০ ১৬:২৯ Asia/Dhaka

পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা আয-যুমারের ১৭ ও ২১ নম্বর আয়াতের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ১৭ ও ১৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَالَّذِينَ اجْتَنَبُوا الطَّاغُوتَ أَنْ يَعْبُدُوهَا وَأَنَابُوا إِلَى اللَّهِ لَهُمُ الْبُشْرَى فَبَشِّرْ عِبَادِ (17) الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ أُولَئِكَ الَّذِينَ هَدَاهُمُ اللَّهُ وَأُولَئِكَ هُمْ أُولُو الْأَلْبَابِ (18)

“যারা শয়তানি শক্তির পূজা-অর্চনা থেকে বিরত হয়ে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করে, তাদের জন্যে রয়েছে সুসংবাদ।  অতএব, সুসংবাদ দিন আমার বান্দাদেরকে।” (৩৯:১৭)

“যারা মনোযোগ সহকারে কথা শোনে, অতঃপর তার মধ্য থেকে যা উত্তম তার অনুসরণ করে তাদেরকেই আল্লাহ সৎ পথ প্রদর্শন করেন এবং তারাই বুদ্ধিমান।” (৩৯:১৮)

এই দুই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা তাঁর সেইসব বান্দার প্রসঙ্গ টেনেছেন যারা সত্য অনুসন্ধানী এবং সত্যের খোঁজ পাওয়া মাত্র তা গ্রহণ করে। তারা আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করে তাঁর রহমতের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করে।

অবশ্য প্রকৃত ঈমানদার হতে হলে গায়রুল্লাহ বা আল্লাহ ছাড়া অন্য সব কিছুর পূজা-অর্চনা ও আনুগত্য ত্যাগ করতে হবে। মাটির তৈরি মূর্তি বা মনের খেয়াল-খুশি কিংবা অত্যাচারী শাসক- এগুলোর কোনোকিছুর নির্দেশ পালন বা কোনো কিছুর পূজা বা আনুগত্য করা যাবে না।

এরপর মহান আল্লাহ তাঁর বিশেষ একদল বান্দার কথা উল্লেখ করেছেন যারা অনর্থক নিজেদের ভুল অবস্থানে অটল না থেকে সব ধরনের কথা শোনে এবং নিজেদের বিচার-বিবেচনাকে কাজে লাগিয়ে এসব কথার মধ্য থেকে সর্বোত্তম কথাটি গ্রহণ করে।  এ ধরনের মানুষ প্রকৃত সত্যপিপাসু। তারা সত্যের সন্ধান পাওয়ামাত্র অন্তরের অন্তস্তল থেকে তা গ্রহণ করে এবং সমস্ত দেহমন দিয়ে তাকে স্বাগত জানায় ও তা মেনে চলে। মহান আল্লাহ এদেরকে প্রকৃত বুদ্ধিমান হিসেবে উল্লেখ করে জানিয়েছেন, তিনি এ ধরনের মানুষকে হেদায়েত দান বা সৎপথ প্রদর্শন করেন।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১- সমস্ত শয়তানি শক্তির আনুগত্য প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার প্রতি ঈমান আনার পূর্বশর্ত।

২- যেকোনো বক্তব্য শোনার সময় এর সারমর্মের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে। যে ব্যক্তি কথা বলছে সমাজে তার অবস্থান ও পদমর্যাদা বড় কথা নয়। সে কি বলছে সেটা মনযোগ দিয়ে শুনতে হবে এবং সেগুলোর মধ্য থেকে উত্তমটাকে গ্রহণ করতে হবে।

৩- ঐশী শিক্ষার সঙ্গে মানুষের বিচার-বুদ্ধির চমৎকার সামঞ্জস্য রয়েছে। এই দু’টিকে আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সৎপথ প্রদর্শনের জন্য দান করেছেন। 

৪- ইসলাম মানুষকে চিন্তার স্বাধীনতা দিয়ে তার ইচ্ছা অনুযায়ী চলার পথ নির্ধারণ করার সুযোগ দিয়েছে।  

এই সূরার ১৯ ও ২০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,

 أَفَمَنْ حَقَّ عَلَيْهِ كَلِمَةُ الْعَذَابِ أَفَأَنْتَ تُنْقِذُ مَنْ فِي النَّارِ (19) لَكِنِ الَّذِينَ اتَّقَوْا رَبَّهُمْ لَهُمْ غُرَفٌ مِنْ فَوْقِهَا غُرَفٌ مَبْنِيَّةٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ وَعْدَ اللَّهِ لَا يُخْلِفُ اللَّهُ الْمِيعَادَ (20)

“যার জন্য শাস্তির হুকুম অবধারিত হয়ে গেছে (তা থেকে তার মুক্তির পথ আছে কি?) যে ব্যক্তি আগুনের মধ্যে আছে আপনি কি তাকে মুক্ত করতে পারবেন?”(৩৯:১৯)

“কিন্তু যারা তাদের পালনকর্তাকে ভয় করে, তাদের জন্য (জান্নাতে) নির্মিত রয়েছে প্রাসাদের উপর প্রাসাদ; এগুলোর তলদেশে নদী প্রবাহিত; (এটি) আল্লাহর প্রতিশ্রুতি; আল্লাহ প্রতিশ্রুতির খেলাফ করেন না।” (৩৯:২০)

মহানবী (সা.) চাইতেন কাফির-মুশরিকসহ সব পথভ্রষ্ট মানুষ সত্য গ্রহণ করে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি লাভ করুক। তিনি বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট মানুষদের আচরণে অত্যন্ত ব্যথিত হতেন। তাঁর এ কষ্ট দেখে এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলছেন, যারা ভ্রান্ত পথ অবলম্বন করে নিজেদের জন্য জাহান্নামের আগুন বাছাই করে নিয়েছে তাদেরকে কি আপনি সে আগুন থেকে মুক্তি দিতে পারবেন? এ প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে, কখনোই পারবেন না। যারা আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের সব পথ নিজেরাই বন্ধ করে দিয়েছে তাদের মুক্তির আর কোনো পথ অবশিষ্ট নেই। এমনকি আল্লাহর নবীও তাদের কোনো সাহায্য করতে পারবেন না।

কিন্তু এই দলের বিপরীতে যারা ঈমান গ্রহণ করে তাকওয়া অবলম্বন করেন, কিয়ামতের দিন তাদের জন্য উচ্চ মর্যাদা অপেক্ষা করছে এবং তাদের জন্য জান্নাতে রয়েছে প্রাসাদের উপর প্রাসাদ। সেখানে তাদের কোনো দুঃখ-কষ্ট বা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নেই বরং রয়েছে শান্তি, নিরাপত্তা আর অনাবিল আনন্দ।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো-

১- মানুষকে সঠিক পথের দিশা দেয়া এবং সঠিক উপায়ে জীবনযাপন করার শিক্ষা দেয়া ছিল নবী-রাসূলদের প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু মানুষ সঠিক পথ পাবে কিনা তাতে নবী-রাসূলদের কোনো হাত ছিল না। প্রত্যেক ব্যক্তির সঠিক পথের দিশা তার নিজের চেষ্টা-প্রচেষ্টার ওপর নির্ভর করে।

২- যে ব্যক্তি গোয়ার্তুমির কারণে সঠিক পথের দাওয়াত শুনতে নারাজ সে প্রকারান্তরে নিজের মুক্তির পথকে নিজের হাতে বন্ধ করে দিয়েছে।

সূরা যুমারের ২১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ أَنْزَلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَسَلَكَهُ يَنَابِيعَ فِي الْأَرْضِ ثُمَّ يُخْرِجُ بِهِ زَرْعًا مُخْتَلِفًا أَلْوَانُهُ ثُمَّ يَهِيجُ فَتَرَاهُ مُصْفَرًّا ثُمَّ يَجْعَلُهُ حُطَامًا إِنَّ فِي ذَلِكَ لَذِكْرَى لِأُولِي الْأَلْبَابِ (21)

“তুমি কি দেখনি যে, আল্লাহ আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেছেন, অতঃপর সে পানি যমীনের ঝর্ণাসমূহে (ও নদীনালায়) প্রবাহিত করেছেন, এরপর তদ্দ্বারা বিভিন্ন রঙের ফসল উৎপন্ন করেন, অতঃপর (সে ফসল পেকে যাওয়ার পর) তা শুকিয়ে যায়, ফলে তোমরা তা পীতবর্ণ দেখতে পাও। এরপর আল্লাহ তাকে খড়-কুটায় পরিণত করে দেন। নিশ্চয় এতে জ্ঞানীদের জন্যে উপদেশ রয়েছে।” (৩৯:২১)

এই আয়াতে আবার আল্লাহর একত্ববাদের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে। একত্মবাদের নিদর্শন হিসেবে আকাশ থেকে বৃষ্টির পানি বর্ষণের কথা বলা হয়েছে। কারণে, পৃথিবীর সব প্রাণীর জীবন এই বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভরশীল। বৃষ্টি না থাকলে মানুষসহ ভূপৃষ্ঠের বেশিরভাগ প্রাণীর জীবনযাপন অসম্ভব হয়ে পড়ত। এমনকি সাগর তীরবর্তী মানুষও বেঁচে থাকতে পারত না কারণ, সাগরের লবনাক্ত পানি পান করা বা কৃষিকাজের উপযোগী নয়। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা অত্যাশ্চর্যজনক ব্যবস্থার মাধ্যমে সেই লবনাক্ত পানি বাস্প আকারে আকাশে উঠিয়ে তাকে শীতল করে শুষ্ক ভূমিতে বৃষ্টি বর্ষণ করান।  এই বৃষ্টির পানি যেমন বিশুদ্ধ তেমনি তা পান করার মতো সুস্বাদু।  সাগরের যে লবনাক্ত পানি খাওয়া তো দূরের কথা মানুষ মুখেই দিতে পারে না সেই পানিকে আল্লাহ কি সুন্দর ব্যবস্থাপনায় পান করার উপযোগী মিষ্টি পানিতে পরিণত করে দিচ্ছেন।

এমনকি মানুষসহ অন্যান্য পশু-পাখী ও উদ্ভিদ যাতে এই বৃষ্টির পানি সারাবছর ব্যবহার করতে পারে সেজন্য আল্লাহ এই পানিকে বরফ আকারে পর্বতের চূড়ায় জমা করে রাখেন এবং নদ-নদী দিয়ে প্রবাহিত করিয়ে তা ভূপৃষ্ঠের সব মানুষের কাছে পৌঁছে দেন। এই বৃষ্টি বর্ষণের ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে কেউ চিন্তা করলে তার সামনে আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদ ও তাঁর বিশাল ক্ষমতা ও দয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

এই আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে:

১- প্রাকৃতিক ঘটনাবলী সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করলে আল্লাহকে চেনা যায়।

২- একই মাটি ও পানি থেকে বিভিন্ন রঙের ফসল ও বিভিন্ন স্বাদের ফল-মূল উৎপন্ন হয়। এটি আল্লাহ তায়ালার বিশাল ক্ষমতার নিদর্শন।

৩- এসব প্রাকৃতিক নিদর্শনের সূত্র ধরে এগুলোর মালিককে চেনা ও একমাত্র তাঁর ইবাদত করার মধ্যেই মানুষের সার্বিক কল্যাণ নিহিত রয়েছে। #