নভেম্বর ১৩, ২০২০ ১৫:৩৭ Asia/Dhaka

পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা আয-যুমারের ২২ ও ২৩ নম্বর আয়াতের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ২২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

أَفَمَنْ شَرَحَ اللَّهُ صَدْرَهُ لِلْإِسْلَامِ فَهُوَ عَلَى نُورٍ مِنْ رَبِّهِ فَوَيْلٌ لِلْقَاسِيَةِ قُلُوبُهُمْ مِنْ ذِكْرِ اللَّهِ أُولَئِكَ فِي ضَلَالٍ مُبِينٍ (22)

“আল্লাহ যার বক্ষ ইসলাম (গ্রহণের) জন্য উম্মুক্ত করে দিয়েছেন, অতঃপর সে তার পালনকর্তার পক্ষ থেকে আগত আলোর মাঝে রয়েছে (সে কি তার সমান, যে বিদ্বেষ, গোঁড়ামি ও দাম্ভিকতার কারণে সত্য গ্রহণ থেকে বিরত রয়েছে?) মহা দুর্ভোগ তাদের জন্য যারা কঠিন হৃদয়ের কারণে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিরত রয়েছে।  তারা সুস্পষ্ট গোমরাহী বা বিভ্রান্তিতে রয়েছে।” (৩৯:২২)

পবিত্র কুরআনের আয়াতগুলো বৃষ্টির ফোঁটার মতো মানুষের অন্তরে নাজিল হয়। ভূপৃষ্ঠের সব মাটি বৃষ্টিতে প্রাণ ফিরে পায় না বরং সুনির্দিষ্ট কিছু উপযুক্ত মাটিই পানি পেলে চাষাবাদের জন্য উপযুক্ত হয়ে ওঠে। সব মানুষের অন্তরও কুরআনের আয়াতে সিক্ত হয় না বরং যে অন্তর নিজেকে কুরআনের আয়াত ধারণ করার জন্য প্রস্তুত করে এবং আল্লাহর হেদায়েত প্রাপ্ত হয় সেইসব অন্তর এসব আয়াতকে গ্রহণ করে। সব মানুষ সমানভাবে সত্যবাণী গ্রহণ করে না। পবিত্র কুরআন কোনো কোনো মানুষকে প্রশান্ত আত্মার অধিকারী বলেছে আবার কাউকে কাউকে সংকীর্ণ আত্মার অধিকারী বলে বর্ণনা করেছে।

এই আয়াতে মানুষের জীবনে আল্লাহর প্রতি ঈমানের প্রভাব বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হচ্ছে: মানুষ যখন তার দৃষ্টিসীমাকে এই পার্থিব জীবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলে তখন তার পক্ষে এর বাইরে কোনোকিছু কল্পনা করাও কঠিন হয়ে যায়। আল্লাহকে অস্বীকারকারী ব্যক্তি পার্থিব স্বার্থ ও ইন্দ্রীয়সুখের মধ্যে সৌভাগ্য খোঁজে; ফলে তার অন্তর সংকীর্ণ ও সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। পক্ষান্তরে পরকালে বিশ্বাসী ব্যক্তি পার্থিব জীবনকে চিরস্থায়ী জীবনে পদার্পনের সিঁড়ি মনে করে। এ কারণে তার অন্তর উন্মুক্ত ও প্রশান্ত হয়। কাজেই দেখা যাচ্ছে, আল্লাহর প্রতি ঈমান মানুষের অন্তরকে অনেক বেশি ধারণক্ষমতাসম্পন্ন করে তোলে। এ ধরনের মানুষ ৭০ বা ৮০ বছর সময়ের মধ্যে নিজের জীবনকে সীমাবদ্ধ রাখে না বরং সে অন্তকালের জীবনকে সামনে রেখে নিজের করণীয় ঠিক করে।

এ ধরনের মানুষের অন্তর কুরআনের আয়াত শোনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে এবং তা শোনামাত্র এর আদেশ-নিষেধগুলো গ্রহণ ও পালন করে। পার্থিব জীবনের দুঃখ-কষ্ট বা অন্ধকার সময়গুলোতে সে আল্লাহর কিতাব থেকে গ্রহণ করা নূর বা আলো দিয়ে সঠিক পথের সন্ধান পায় এবং জীবনের চলার পথ সঠিকভাবে বেছে নেয়।

এর বিপরীতে যাদের অবস্থান তাদের সামনে সুস্পষ্টতম যুক্তি ও শিক্ষা তুলে ধরা হলেও তাদের অন্তর তা গ্রহণ করে না। তারা কঠিন ও অন্ধকার হৃদয়ের অধিকারী যেখানে আল্লাহর হেদায়েতের বাণী প্রবেশ করতে পারে না। আল্লাহকে অস্বীকারকারী এসব মানুষ সব সময় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে থাকে ও অশান্ত আত্মার অধিকারী হয়। মৃত্যু এসে গেলে তাদের সবকিছুর ইতি ঘটবে- এই শঙ্কায় সারাক্ষণ তটস্থ থাকে।

এই আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে:

১- আল্লাহর আনুগত্যকারী মানুষ প্রশান্ত আত্মার অধিকারী এবং শয়তানের অনুসারী ব্যক্তি অশান্ত আত্মার অধিকারী হয়।

২- মুমিন ব্যক্তি আল্লাহর নূরের আলো দিয়ে কঠিন সময়গুলোতে সঠিক পথের দিশা পায়।

৩- শিরক ও কুফরের কারণে মানুষের অন্তর নির্দয় হয়ে যায় এবং সেই নির্দয় ও সংকীর্ণ অন্তরে নূরের আলো পড়ে না। ফলে মানুষ গোমরাহী ও পথভ্রষ্টতার অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে যায়।

সূরা যুমারের ২৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,

اللَّهُ نَزَّلَ أَحْسَنَ الْحَدِيثِ كِتَابًا مُتَشَابِهًا مَثَانِيَ تَقْشَعِرُّ مِنْهُ جُلُودُ الَّذِينَ يَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ ثُمَّ تَلِينُ جُلُودُهُمْ وَقُلُوبُهُمْ إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ ذَلِكَ هُدَى اللَّهِ يَهْدِي بِهِ مَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُضْلِلِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِنْ هَادٍ (23)

“আল্লাহ সর্বোত্তম বাণী কিতাব আকারে নাযিল করেছেন, যার (আয়াতগুলো) সামঞ্জস্যপূর্ণ, পূনঃ পূনঃ পঠিত। এর (আয়াত তেলাওয়াত করে) যারা তাদের পালনকর্তাকে ভয় করে তাদের লোম কাঁটা দিয়ে ওঠে চামড়ার উপর।  এরপর আল্লাহর স্মরণে তাদের চামড়া ও অন্তর বিনম্র হয়। এটাই আল্লাহর পথ-নির্দেশ, এর মাধ্যমে তিনি যাকে ইচ্ছা পথ প্রদর্শন করেন। আর আল্লাহ যাকে (হেদায়েত থেকে বঞ্চিত ও) গোমরাহ করেন, তার কোন পথপ্রদর্শক নেই।" (৩৯:২৩)

এই আয়াতে পবিত্র কুরআনের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করার পর মুমিন ও কাফির ব্যক্তিদের মধ্যে তুলনা করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনের আয়াতগুলো একে অপরের পরিপূরক এবং কোনো আয়াতের বক্তব্যের সঙ্গে অন্য আয়াতের বক্তব্যের পরস্পর বিরোধিতা নেই। মহান আল্লাহ ও তার সৃষ্টির মধ্যে যেমন কোনো তুলনা চলে না তেমনি তাঁর বাণীর সঙ্গে কোনো মানুষের বক্তব্যের তুলনা করা যায় না। আল্লাহর বাণী হচ্ছে সর্বোত্তম কথা।  এই বাণীর সঙ্গে কারো বক্তব্যের মিল নেই এমনকি আল্লাহর রাসূলের বক্তব্যকেও কুরআনের বাণী থেকে সহজে আলাদা করে ফেলা সম্ভব।  আল্লাহর বাণী সর্বপ্রথম রাসূল (সা.)’র মুখ থেকেই উচ্চারিত হয়েছে। কিন্তু তারপরও এই রাসূলের মুখ থেকে উচ্চারিত তাঁর নিজস্ব বক্তব্যের সঙ্গে আল্লাহর বাণীর পার্থক্য রয়েছে।

মহান আল্লাহ তাঁর বাণীতে মানুষকে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য বোঝানোর জন্য একই বিষয়ের পরস্পর-বিরোধী দু’টি দিক বর্ণনা করেছেন। তিনি কিছু আয়াতে ঈমান ও মুমিনদের অবস্থা তুলে ধরেছেন এবং কিছু আয়াতে কুফর ও কাফেরদের অবস্থা বর্ণনা করেছেন। কোনো কোনো আয়াতে ঐশী পুরস্কারের আশার কথা শোনানো হয়েছে এবং কোথাও কোথাও শাস্তি ও আজাবের ভয় দেখানো হয়েছে।  পবিত্র কুরআনে একদিকে হালাল বিষয়গুলোর কথা উল্লেখ করে তা করতে বলা হয়েছে এবং অন্যত্র হারাম বিষয়গুলো তুলে ধরে তা করা থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কোনো কোনো আয়াতে হেদায়েত বা সৎপথ পাওয়ার উপায় বর্ণনা করা হয়েছে এবং কোনো কোনো আয়াতে গোমরাহী বা পথভ্রষ্টতার কারণ তুলে ধরা হয়েছে।  এভাবে আল্লাহ ভালো ও মন্দ দু’টি পথ যাচাই বাছাই করে তাঁর বান্দাকে সঠিক পথ গ্রহণ করতে উৎসাহিত করেছেন।

এখানে আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে: একজন মুমিন সারাক্ষণ আল্লাহর ভয় এবং তাঁর ক্ষমা পাওয়ার আশা- এই দুই অবস্থার মধ্যে জীবনযাপন করে। নিজের কৃতকর্মের কথা মনে হলে ভয়ে তার গায়ের চামড়া কাঁটা দিয়ে ওঠে কিন্তু পরক্ষণেই যখন মহান আল্লাহর বিশাল ক্ষমা ও মাগফেরাতের কথা মনে পড়ে তখন সেই ক্ষমা পাওয়ার আশায় তার অন্তর প্রশান্ত হয়। পবিত্র কুরআনের বাণী বিশ্বের সকল মানুষের জন্য নাজিল হলেও শুধুমাত্র তারাই এ বাণী থেকে উপকৃত হয় যাদের অন্তর সত্য গ্রহণের জন্য প্রস্তুত থাকে। কিন্তু যারা আল্লাহকে অস্বীকার করে তাদেরকে আল্লাহ সঠিক পথ দেখান না।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১- কুরআনের বাণীতে স্ববিরোধী কোনো বক্তব্য নেই বরং এর সকল আয়াত পরস্পরের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।

২- পবিত্র কুরআন বিশেষ কোনো জনগোষ্ঠীর জন্য নাজিল হয়নি। কিন্তু যাদের অন্তর নরম ও সত্যবাণী শুনতে ইচ্ছুক শুধুমাত্র তারাই এই মহাগ্রন্থ থেকে উপকৃত হয়। #

পার্সটুডে/এমএমআই/এআর/১৩

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।