কুরআনের আলো
সূরা আয-যুমার: আয়াত ২৪-২৮ (পর্ব-৮)
পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা আয-যুমারের ২৪ ও ২৮ নম্বর আয়াতের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ২৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
أَفَمَنْ يَتَّقِي بِوَجْهِهِ سُوءَ الْعَذَابِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَقِيلَ لِلظَّالِمِينَ ذُوقُوا مَا كُنْتُمْ تَكْسِبُونَ (24)
“যে ব্যক্তি তার মুখ দ্বারা কেয়ামতের দিনের কঠিন আযাব ঠেকাবে (সে কি তার সমান যে আল্লাহর আজাব থেকে মুক্ত?) এবং (সেদিন) জালেমদেরকে বলা হবে, তোমরা যা করতে (আজ) তার স্বাদ আস্বাদন কর।”(৩৯:২৪)
পৃথিবীতে হেদায়েতপ্রাপ্ত ও পথভ্রষ্ট মানুষদের পরিণতি কিয়ামতের দিন কেমন হবে এই আয়াতে সে বিষয়ের প্রতি আলোকপাত করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলছেন: যে ব্যক্তি কিয়ামতের দিন তার মুখমণ্ডল দিয়ে আল্লাহর ভয়াবহ আজাব ঠেকানোর চেষ্টা করবে সে কি তার সমান যে সেদিন চরম নিরাপত্তা ও শান্তিতে থাকবে? সেদিন জাহান্নামবাসীকে শিকল দিয়ে বেধে রাখা হবে বলে তারা হাত-পা দিয়ে আজাবের আগুন ঠেকাতে পারবে না। তাই তারা মুখমন্ডল দিয়ে আগুন ঠেকানোর চেষ্টা করবে।
জাহান্নামের ভেতরে অপরাধী ব্যক্তিদের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আগুনে জ্বলবে। কিন্তু এখানে বিশেষভাবে মুখমণ্ডলের কথা এজন্য উল্লেখ করা হয়েছে যে, মানুষের অন্য সব অঙ্গ-প্রতঙ্গের চেয়ে মুখমণ্ডলের গুরুত্ব বেশি। একজন মানুষকে তার মুখ দেখেই চেনা যায়। এ ছাড়া, অন্য কোনো অঙ্গের আগুন সহ্য করার চেয়ে মুখমণ্ডলে লেগে যাওয়া আগুন সহ্য করা কঠিন।
আয়াতের পরের অংশে বলা হচ্ছে: কিয়ামতের দিন অপরাধীদের উদ্দেশ করে বলা হবে, পৃথিবীতে যা কিছু করেছিলে তার স্বাদ ভোগ করো। দেখো, তোমরা যা করতে তার পরিণতি কতো ভয়ঙ্কর। এখানে একথা বলা হয়নি যে, তোমাদের কৃতকর্মের শাস্তি ভোগ করো; বরং বলা হচ্ছে, কৃতকর্মের স্বাদ ভোগ করো। এর উদাহরণ হচ্ছে সেই বাবুর্চির মতো যে বিস্বাদ খাবার রান্না করার পর তাকে বলা হয়: তুমি একটু খেয়ে দেখো তো কেমন খাবার রান্না করেছো!
এই আয়াতের দু’টি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:
১- জাহান্নামের আগুন হচ্ছে দুনিয়ায় মানুষের কৃতকর্মের ফল। আল্লাহর নির্দেশ অমান্যকারী ব্যক্তিরা পার্থিব জীবনে নিজের হাতে ওই আগুন জ্বালায়।
২- কিয়ামতের দিন মানুষ পৃথিবীর জীবনের সব কৃতকর্ম নিজের চোখে দেখতে পাবে।
সূরা যুমারের ২৫ ও ২৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
كَذَّبَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ فَأَتَاهُمُ الْعَذَابُ مِنْ حَيْثُ لَا يَشْعُرُونَ (25) فَأَذَاقَهُمُ اللَّهُ الْخِزْيَ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَلَعَذَابُ الْآَخِرَةِ أَكْبَرُ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ (26)
“তাদের পূর্ববর্তীরাও (আমার আয়াতকে) মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল, ফলে তাদের কাছে এমন জায়গা থেকে আজাব আসল, যা তারা কল্পনাও করতে পারেনি।” (৩৯:২৫)
“অতঃপর আল্লাহ তাদেরকে পার্থিব জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমানের স্বাদ আস্বাদন করালেন, আর নিঃসন্দেহে পরকালের আযাব হবে আরও গুরুতর, যদি তারা জানত!” (৩৯:২৬)
এই দুই আয়াতে পার্থিব জীবনে কাফেরদের অবস্থা বর্ণনা করে বলা হচ্ছে: ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমায় যারা নবী-রাসূল ও ঐশী শিক্ষাকে প্রত্যাখ্যান করেছে তাদেরকে এই দুনিয়াতেই শাস্তি দেয়া হয়েছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ জান-মালের প্রকাশ্য ক্ষতির মধ্যে পড়েছে আবার কেউ কেউ চরম মনোকষ্ট পেয়েছে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, কোনো কোনো আজাব শরীরবৃত্তি দিয়ে উপলব্ধি করা যায়। যেমন হযরত নুহ ও হযরত লুতের জাতি কিংবা ফেরাউন ও কারুনের মতো ব্যক্তিরা এ ধরনের শাস্তি পেয়ে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।
তবে কিছু আজাব আছে যা শরীরবৃত্তি দিয়ে অনুভব করা যায় না বরং তার প্রভাব পড়ে শুধু মনোবৃত্তিতে। উদাহরণস্বরূপ, আজকের দুনিয়ায় বিজ্ঞান এতটা অগ্রসর হয়েছে যে, মানুষের ভোগবিলাসের সামগ্রীর কোনো অভাব নেই। কিন্তু এত ভোগবিলাসে ডুবে থেকেও মানুষের মনে শান্তি নেই। প্রাচুর্যের মধ্যে ডুবে থাকা বহু মানুষ আজ অবসাদ ও হতাশগ্রস্ত। অর্থাৎ আল্লাহ ও পরকালকে ভুলে থাকা ব্যক্তি পৃথিবীর ভোগবিলাস দিয়ে নিজের আত্মাকে তৃপ্ত করতে পারবে না বরং সে কিছুদিন ভোগবিলাস করার পর অবসাদে ভুগবে।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১- অপরাধী ব্যক্তিদের কাজের কিছু পরিণতি দুনিয়ায় এবং কিছু পরিণতি আখেরাতে দেয়া হবে। পাশাপাশি কিছু শাস্তি আছে শরীরবৃত্তীয় এবং কিছু শাস্তি মনোবৃত্তীয়।
২- পার্থিব জীবনে যে শাস্তি দেয়া হয় তার তুলনায় পরকালের শাস্তি অনেক বেশি ভয়াবহ ও কঠিন এবং সে শাস্তির মেয়াদ কখনো শেষ হবে না।
৩- আল্লাহ তায়ালা অপরাধী ব্যক্তিদের বহু উপায়ে শাস্তি দিতে পারেন। তিনি তাদেরকে এমন সব উপায়ে শাস্তি দিতে পারেন যা তাদের পক্ষে কল্পনা করাও সম্ভব নয়।
এই সূরার ২৭ ও ২৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:
وَلَقَدْ ضَرَبْنَا لِلنَّاسِ فِي هَذَا الْقُرْآَنِ مِنْ كُلِّ مَثَلٍ لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ (27) قُرْآَنًا عَرَبِيًّا غَيْرَ ذِي عِوَجٍ لَعَلَّهُمْ يَتَّقُونَ (28)
“নিশ্চয় আমি এ কুরআনে মানুষের জন্য সব দৃষ্টান্তই বর্ণনা করেছি, যাতে তারা শিক্ষা গ্রহণ করে।” (৩৯:২৭)
“আরবি (ও শুদ্ধ) ভাষায় (নাজিলকৃত) এ কুরআন (সব ধরনের) বক্রতামুক্ত, যাতে তারা সাবধান হয়ে চলে।” (৩৯:২৮)
এই দুই আয়াতে পবিত্র কুরআনের অনন্য বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হচ্ছে: মানুষকে সঠিক পথ নির্দেশ করতে পাঠানো এই কিতাবে মানুষের চূড়ান্ত সাফল্য অর্জনের লক্ষ্যে হেদায়েত পাওয়ার জন্য যা কিছু প্রয়োজন তার সবকিছুই রয়েছে। পবিত্র কুরআন অন্ধকার রাতে পথ চলার জন্য আলোকবর্তিকা হিসেবে মানুষকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়। সৌভাগ্য অর্জন ও মুক্তির লক্ষ্যে মানুষের যেসব বিষয় জানা প্রয়োজন তার সবকিছু উপযুক্ত উদাহরণসহ আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বর্ণনা করেছেন যাতে সে উদাসীনতার অন্ধকার থেকে ফিরে আসে। কুরআনে বর্ণিত এসব বিষয়ের মধ্যে রয়েছে- বিশ্বজগত ও এর সৃষ্টি রহস্য, জীবনে চলার জন্য সঠিক গাইডলাইন, ভালো ও খারাপ মানুষের পরিণতি এবং মৃত্যু পরবর্তী জীবনে কি হবে তার আগাম বর্ণনা ইত্যাদি।
এরপর পবিত্র কুরআনের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে আরো বলা হচ্ছে: এই কিতাবের ভাষা স্পষ্ট, বোধগম্য ও শুদ্ধ। এর আয়াতগুলো পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও সাবলীল। এতে কোনো ধরনের বক্রতা বা বিভ্রান্তি নেই এবং এর বিষয়বস্তুতে স্ববিরোধী বা পরস্পরবিরোধী কিছুও পাওয়া যাবে না। সার্বিকভাবে বলা যায়, এতগুলো উন্নত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন একটি গ্রন্থ নাজিল করার একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে, মানুষ মুত্তাকি বা খোদাভীরু হবে এবং গোনাহ ও মন্দকর্ম থেকে বিরত থাকবে।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১- পবিত্র কুরআন একটি বিস্তৃত ও পরিপূর্ণ গ্রন্থ। মানুষের প্রয়োজনীয় সবকিছু এতে রয়েছে এবং কোনো কিছুই বাদ পড়েনি।
২- কখনো কখনো যুক্তি উপস্থাপনের চেয়ে চাক্ষুস প্রমাণ বা উদাহরণ মানুষের বেশি বোধগম্য হয়। এ কারণে পবিত্র কুরআনে মানুষকে বোঝানোর জন্য অসংখ্য উদাহরণ পেশ করা হয়েছে।#
পার্সটুডে/এমএমআই/এআর/১৩
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।