কুরআনের আলো
সূরা আয-যুমার: আয়াত ৩৮-৪১ (পর্ব-১১)
পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা আয-যুমারের ৩৮ ও ৪১ নম্বর আয়াতের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ৩৮ নম্বর নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ مَنْ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ لَيَقُولُنَّ اللَّهُ قُلْ أَفَرَأَيْتُمْ مَا تَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ إِنْ أَرَادَنِيَ اللَّهُ بِضُرٍّ هَلْ هُنَّ كَاشِفَاتُ ضُرِّهِ أَوْ أَرَادَنِي بِرَحْمَةٍ هَلْ هُنَّ مُمْسِكَاتُ رَحْمَتِهِ قُلْ حَسْبِيَ اللَّهُ عَلَيْهِ يَتَوَكَّلُ الْمُتَوَكِّلُونَ (38)
“যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন, আসমানসমূহ ও যমীন কে সৃষ্টি করেছে? তারা অবশ্যই বলবে- আল্লাহ। বলুন, তোমরা ভেবে দেখেছ কি, যদি আল্লাহ আমার অনিষ্ট করার ইচ্ছা করেন, তবে তোমরা আল্লাহ ব্যতীত যাদেরকে ডাক, তারা কি সে অনিষ্ট দূর করতে পারবে? অথবা তিনি আমার প্রতি রহমত করার ইচ্ছা করলে তারা কি সে রহমত রোধ করতে পারবে? বলুন, আমার পক্ষে আল্লাহই যথেষ্ট। নির্ভরকারীরা শুধুমাত্র তাঁর উপর নির্ভর করে।” (৩৯:৩৮)
আগের আয়াতগুলোতে হেদায়েতপ্রাপ্ত ও পথভ্রষ্ট মানুষদের সম্পর্কে আলোচনা করার পর এই আয়াতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হচ্ছে: মক্কার মুশরিকরা সৃষ্টিকর্তা হিসেবে এক আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস করত। তারা এটাও মনে করত, মানুষসহ এই পৃথিবীতে যা কিছু আছে তার সবই আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু তারা পালনকর্তা হিসেবে আল্লাহকে মানত না। তাদের ধারনা ছিল, কিছু মানুষ ও মূর্তি তাদের ভাগ্য নির্ধারণে ভূমিকা রাখছে। তাদের এ বিভ্রান্ত বিশ্বাস অনুযায়ী, আল্লাহ তায়ালা বিশ্বজগত সৃষ্টি করে নিজে অবসর নিয়েছেন এবং বিশ্ব পরিচালনার দায়িত্ব এসব মানুষ ও মূর্তির কাছে হস্তান্তর করেছেন।
সেই যুগ থেকে এখন পর্যন্ত মুশরিকরা এমন কিছুর পূজা করে আসছে যারা তাদেরকে যেমন কোনো ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে পারে না তেমনি তাদের কোনো উপকার করারও ক্ষমতা রাখে না। মক্কার সেই ইট-কাঠ-পাথরের তৈরি মূর্তি কিংবা আজকের যুগের হিন্দু মন্দিরগুলোর মাটির তৈরি প্রতিমা- কারো পক্ষেই এগুলোর পূজাকারীদের বিন্দুমাত্র উপকার করার সামর্থ্য নেই। কিন্তু এসব মূর্তির সামনে মস্তক অবনত করার কারণে মানুষ চিরতরে হেদায়েতের নূর থেকে বঞ্চিত হয় এবং তার পরকাল বরবাদ হয়ে যায়।
আয়াতের শেষাংশে বলা হচ্ছে: মুমিন ব্যক্তিরা আল্লাহর কোনো সৃষ্টিকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হিসেবে মেনে না নিয়ে খোদ আল্লাহর ওপর নির্ভর করে। তারা সব কাজ সঠিকভাবে আঞ্জাম দেয়ার চেষ্টা করার পর কাজের ফলাফলের জন্য শুধুমাত্র আল্লাহর ওপর নির্ভর করে।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১- মূর্তিপূজকরা সৃষ্টিকর্তা হিসেবে এক আল্লাহর অস্তিত্ব স্বীকার করত। কিন্তু পালনকর্তা ও ত্রাণকর্তা হিসেবে আল্লাহর সঙ্গে আরো বহু মানুষ ও মূর্তিকে অংশীদার বানাতো। এরপর তারা আল্লাহ ও নিজেদের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে এসব অংশীদারের পূজা করত।
২- বাহ্যিকভাবে আমরা যেসব ঘটনা ঘটতে দেখি সেসবের লাভ-ক্ষতি আল্লাহর হাতে। কাজেই আল্লাহর কোনো সৃষ্টির প্রতি নির্ভরতা বাদ দিয়ে আমাদেরকে এক আল্লাহ তায়ালার ওপর পরিপূর্ণভাবে নির্ভর করতে হবে।
সূরা যুমারের ৩৯ ও ৪০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,
قُلْ يَا قَوْمِ اعْمَلُوا عَلَى مَكَانَتِكُمْ إِنِّي عَامِلٌ فَسَوْفَ تَعْلَمُونَ (39) مَنْ يَأْتِيهِ عَذَابٌ يُخْزِيهِ وَيَحِلُّ عَلَيْهِ عَذَابٌ مُقِيمٌ (40)
“বলুন, হে আমার কওম, তোমাদের পক্ষে (তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী) যা করা সম্ভব তা করে যাও, আমিও (আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব অনুযায়ী) কাজ করছি। অতঃপর সত্ত্বরই জানতে পারবে।” (৩৯:৩৯)
“কার কাছে (দুনিয়ায়) অবমাননাকর আযাব আসে এবং কার কাছে (কিয়ামতের দিন) চিরস্থায়ী শাস্তি নেমে আসে।" (৩৯:৪০)
এই দুই আয়াতে বলা হচ্ছে, আমাদেরকে সমাজে প্রচলিত ভুল ধারনা ও রীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। মহানবী (সা.) আল্লাহর নির্দেশে তাঁর আত্মীয়-স্বজন ও ঘনিষ্ঠজনদের সুস্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, আমি তোমাদের মূর্তির পূজা করব না বরং শুধুমাত্র আমার অদ্বিতীয় আল্লাহর সামনে মাথানত করব। যদি তোমরা তোমাদের পথকে সঠিক মনে করো তাহলে সে পথে চলতে থাকো। আমিও আমার ঈমানের ভিত্তিতে আমার পথচলা অব্যাহত রাখি। এরপর দেখা যাবে কাদের পরিণতি শুভ হয়। এই আয়াতের সঙ্গে সূরা কাফিরুনের শেষ আয়াতের মিল রয়েছে যেখানে বলা হচ্ছে, তোমাদের ধর্ম তোমাদের কাছে আমার ধর্ম আমার কাছে। এই ঘোষণার মাধ্যমে বিশ্বনবী (সা.) মুশরিকদের ভ্রান্ত বিশ্বাস কঠোর ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেন।
পরের আয়াতে আল্লাহর রাসূল (সা.) মুশরিকদের হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেন, তোমরা তোমাদের কাজের পরিণতির ব্যাপারে সতর্ক থেকো। কারণ তোমরা তোমাদের ভ্রান্ত বিশ্বাস ও আমলের কারণে এই পৃথিবীতেও কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হবে এবং পরকালেও ঘোরতর আজাবে ডুবে থাকবে। অবশ্য তোমাদেরকে এই শাস্তি দেয়া হবে তোমাদেরই কাজের পরিণতি হিসেবে।আল্লাহ তায়ালা কারো ওপর অন্যায়ভাবে আজাব চাপিয়ে দেবেন না।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১- মুমিন ব্যক্তি দৃঢ় প্রত্যয়ের অধিকারী হয় এবং সে অন্যায়, অনাচার ও পাপাচারে ভরা সমাজে হারিয়ে যায় না বরং সারাক্ষণ ঈমানের বলে বলীয়ান থাকে। পরিবেশ তার বিশ্বাস ও আমলের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে না।
২- নবী-রাসূলগণ মুশরিকদের সঙ্গে বিন্দুমাত্র আপোস করেননি বরং তাদের সামনে নিজেদের অবস্থান সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন।
এই সূরার ৪১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
إِنَّا أَنْزَلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَابَ لِلنَّاسِ بِالْحَقِّ فَمَنِ اهْتَدَى فَلِنَفْسِهِ وَمَنْ ضَلَّ فَإِنَّمَا يَضِلُّ عَلَيْهَا وَمَا أَنْتَ عَلَيْهِمْ بِوَكِيلٍ (41)
"আমি (এই) কিতাব মানুষের (হেদায়েতের জন্য) আপনার প্রতি সত্য ধর্মসহ নাযিল করেছি। অতঃপর যে হেদায়েত পায়, সে নিজের কল্যাণের জন্যেই হেদায়েতপ্রাপ্ত হয়, আর যে পথভ্রষ্ট হয়, সে নিজেরই অনিষ্টের কারণেই পথভ্রষ্ট হয়। আপনি তাদের জন্যে দায়ী নন।” (৩৯:৪১)
এই আয়াতে বলা হচ্ছে: মানুষের হেদায়েতের জন্য যা কিছু প্রয়োজন ছিল তার সবকিছু আল্লাহ তায়ালা রাসূলের প্রতি ওহী হিসেবে নাজিল করেছেন। আল্লাহর রাসূলও সে ওহীকে বিন্দুমাত্র কমবেশি না করেই মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন এবং কিতাব আকারে সেসব ওহী মানুষের জন্য সংরক্ষিত রয়েছে। মানুষের মধ্যে একটি দল আল্লাহর রাসূলের কথা মেনে নিয়ে হেদায়েতপ্রাপ্ত হয় এবং অন্য দল গোঁড়ামি, অহংকার কিংবা জেদের বশবর্তী হয়ে সত্যবাণী প্রত্যাখ্যান করে এবং পথভ্রষ্ট হয়ে যায়।
কিন্তু মহানবী (সা.) মানুষের প্রতি আন্তরিক শিক্ষক হিসেবে সব মানুষের হেদায়েত প্রাপ্তি চান। এ কারণে যখন কিছু মানুষ আল্লাহর বানী প্রত্যাখ্যান করে তখন তিনি মারাত্মক মনোকষ্টে ভোগেন। এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবীকে মনোকষ্টে না ভোগার আহ্বান জানিয়েছেন।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১- পবিত্র কুরআনের প্রতিটি বাণী সত্য এবং এতে বিন্দুমাত্র সংশয়ের অবকাশ নেই।মানুষ যাতে এই কিতাবের বক্তব্য শুনে সঠিক পথ গ্রহণ করতে পারে সেজন্য এই মহাগ্রন্থ নাজিল হয়েছে।
২- নিজের জীবনের পথ বেছে নেয়ার ক্ষেত্রে মানুষ স্বাধীন। তবে যে পথেই সে চলুক না কেন তার পরিণতির জন্য সে নিজে দায়ী থাকবে।
৩- নবী-রাসূলের দায়িত্ব আল্লাহর বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া, কাউকে তা পালন করতে বাধ্য করা নয়।#
পার্সটুডে/এমএমআই/এআর/২৯
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।