কুরআনের আলো
সূরা আয-যুমার: আয়াত ৫৪-৫৮ (পর্ব-১৫)
পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা আয-যুমারের ৫৪ ও ৫৮ নম্বর আয়াতের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ৫৪ ও ৫৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَأَنِيبُوا إِلَى رَبِّكُمْ وَأَسْلِمُوا لَهُ مِنْ قَبْلِ أَنْ يَأْتِيَكُمُ الْعَذَابُ ثُمَّ لَا تُنْصَرُونَ (54) وَاتَّبِعُوا أَحْسَنَ مَا أُنْزِلَ إِلَيْكُمْ مِنْ رَبِّكُمْ مِنْ قَبْلِ أَنْ يَأْتِيَكُمُ الْعَذَابُ بَغْتَةً وَأَنْتُمْ لَا تَشْعُرُونَ (55)
“এবং তোমরা তোমাদের পালনকর্তার অভিমুখী হও এবং তার আজ্ঞাবহ হও তোমাদের কাছে আযাব আসার পূর্বে। এরপর তোমরা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে না।”(৩৯:৫৪)
“এবং তোমাদের প্রতি অবতীর্ণ সর্বোত্তম বিষয়ের অনুসরণ করো তোমাদের কাছে অতর্কিতে ও অজ্ঞাতসারে আযাব আসার পূর্বেই।” (৩৯:৫৫)
গত আসরে মহান আল্লাহর দয়া ও ক্ষমা নিয়ে কথা হয়েছে যা তাঁর সকল বান্দা পেতে পারে। এরপর আজকের এই দুই আয়াতে আল্লাহর রহমত লাভের দু’টি উপায় বর্ণনা করা হয়েছে। এর একটি হচ্ছে, কৃতকর্মের জন্য তওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার আদেশ-নিষেধ মেনে চলা। এখানে মহান আল্লাহর ক্ষমা ও দয়ার ব্যাপারে আশাবাদী হতে বলার পাশাপাশি তাঁর ক্রোধের ব্যাপারেও সাবধান করে দেয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, যদি তোমরা অতীতের গোনাহের পথ পরিহার না করো এবং গোনাহ করতেই থাকো তাহলে তোমরা আল্লাহর মহা আযাবের সম্মুখীন হবে। দুনিয়াতে তোমাদের কাছে আজাব আসবে হঠাৎ করে এবং না জানিয়ে। আর কিয়ামতের দিনের আযাব তো হবে আরো বেশি ভয়ঙ্কর। সেদিনের আযাব থেকে কেউ বাঁচতে পারবে না।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১- প্রকৃত তওবাকারী আল্লাহর আদেশ ও নিষেধ অক্ষরে অক্ষরে পালন করার চেষ্টা করে।
২- হঠাৎ করে যেকোনো সময় মৃত্যু এসে যেতে পারে। তাই তওবা করার জন্য কালক্ষেপণ না করে আমাদের উচিত এখনই তওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা।
৩- আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পনের পর নেক আমল করাও জরুরি।
সূরা যুমারের ৫৬ জন আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
أَنْ تَقُولَ نَفْسٌ يَا حَسْرَتَا عَلَى مَا فَرَّطْتُ فِي جَنْبِ اللَّهِ وَإِنْ كُنْتُ لَمِنَ السَّاخِرِينَ (56)
“যাতে কেউ না বলে, হায়! আল্লাহর কাছে আমি কর্তব্যে অবহেলা করেছি এবং আমি (দুনিয়াতে তার আয়াত নিয়ে) ঠাট্টা-বিদ্রুপকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।” (৩৯:৫৬)
কিয়ামতের দিন পুজি হিসেবে পার্থিব জীবনের নেক আমল না থাকার জন্য একদল মানুষ অনুশোচনা করবে। এজন্য কিয়ামত দিবসের আরেক নাম ‘অনুশোচনা দিবস।”
মানুষ কিয়ামতের দিন আল্লাহর সামনে উপস্থিত হয়ে পৃথিবীর যাবতীয় কৃতকর্ম দেখতে পাবে। এ সময় নিজের গোনাহর পাহাড় দেখে অনেকে গগনবিদারি আওয়াজ তুলবে। তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রদত্ত বিধান নিয়ে দুনিয়ায় ঠাট্টা করার কারণে এরকম বিপদের মুখোমুখি হবে। এ সময় তারা প্রচণ্ড রকম অনুতপ্ত হবে। কারণ, আল্লাহর আয়াত নিয়ে ঠাট্টাবিদ্রূপ করার কারণেই তাদেরকে আল্লাহ গোমরাহ বা পথভ্রষ্ট করে দিয়েছিলেন।
সেদিন সব মানুষ পৃথিবীতে ফিরে এসে নেক আমল করার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করবে। কিন্তু সেদিনের অনুতাপ বা আকাঙ্ক্ষা কোনো কাজে আসবে না। কাউকেই পার্থিব জীবনে ফেরত পাঠানো হবে না। সেদিন কিছু আলেমে দ্বীন অন্য সবার চেয়ে বেশি অনুশোচনা করবে। কারণ, তারা তাদের ধর্মীয় জ্ঞান অনুযায়ী আমল করেনি। তারা আল্লাহর আদেশ-নিষেধ যতখানি জানতে পেরেছিল সে তুলনায় নেক আমল করেছে অনেক কম।
কিয়ামতের দিন মানুষ বুঝতে পারবে, পৃথিবীর জীবনের সেই কাজটি আখেরাতে কাজে লাগে যা একনিষ্ঠ চিত্তে শুধুমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে করা হয়। সেদিন তারা আরো বুঝতে পারবে, তাদের বহু কাজ যা দৃশ্যত নেক আমল ও দান-খয়রাত হিসেবে গণ্য হতো কিন্তু লৌকিকতা ও মানুষকে প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে এসব কাজ করা হয়েছিল বলে তা দুনিয়াতেই রয়ে গেছে এবং কিয়ামতের ময়দানে পৌঁছেনি।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১- দুনিয়াতে আল্লাহর উদ্দেশ্যে নেক আমল যত কম করব কেয়ামতের দিন আমাদেরকে তত বেশি অনুতপ্ত হতে হবে।
২- যারা পার্থিব জীবনে আল্লাহ আয়াত ও বিধিবিধান নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে তারা কিয়ামতের দিন মারাত্মক অনুতাপের শিকার হবে। কিন্তু সেদিনের অনুশোচনা কোনো কাজে আসবে না।
সূরা যুমারের ৫৭ ও ৫৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
أَوْ تَقُولَ لَوْ أَنَّ اللَّهَ هَدَانِي لَكُنْتُ مِنَ الْمُتَّقِينَ (57) أَوْ تَقُولَ حِينَ تَرَى الْعَذَابَ لَوْ أَنَّ لِي كَرَّةً فَأَكُونَ مِنَ الْمُحْسِنِينَ (58)
“অথবা একথা বলে যে, আল্লাহ যদি আমাকে পথপ্রদর্শন করতেন, তবে আমি পরহেযগারদের একজন হতাম।” (৩৯:৫৭)
“অথবা আযাব প্রত্যক্ষ করার সময় বলে, যদি কোনরূপে একবার (দুনিয়ায়) ফিরে যেতে পারতাম, তবে আমি সৎকর্মপরায়ণ হয়ে যেতাম।” (৩৯:৫৮)
আগের আয়াতগুলোতে কিয়ামতের দিন গোনাহগার মানুষের অনুশোচনার কথা বর্ণনা করার পর এই দুই আয়াতে জাহান্নামবাসীর মনের কথা বর্ণনা করে বলা হচ্ছে: যখন সে দেখবে জান্নাতবাসী অগণিত নেক আমলকে পুজি করে জান্নাতের দিকে অগ্রসর হচ্ছে তখন তার মনেও জান্নাতে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা জাগবে। জান্নাতের অসংখ্য নেয়ামতরাজি সে দেখতে পাবে যা পাওয়ার জন্য সে উগদ্রীব হয়ে উঠবে। সে তখন একথা বলবে যে, আল্লাহ তায়ালা যদি দুনিয়াতে আমাকে হেদায়েত দান করতেন তাহলে আমি সৎকর্মপরায়ণ হয়ে যেতাম এবং আজ নেক আমল নিয়ে পরহেজগারদের সঙ্গে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারতাম। সেদিন অপরাধীরা এ ধরনের কথাবার্তা বলে নিজেদের অপরাধ ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করবে।
তারা জাহান্নামের আগুন প্রত্যক্ষ করার পর তাতে নিক্ষিপ্ত হওয়ার ভয়ে একথাও বলবে যে, একটিবার যদি তাকে দুনিয়াতে ফেরত যাওয়ার সুযোগ দেয়া হতো তাহলে অতীতের গোনাহর কাজগুলোর পরিবর্তে অনেক নেক আমল ও সৎকাজ করে জান্নাতে যাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারতাম।
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, তাদের এই বক্তব্যগুলো যেমন ভ্রান্ত তেমনি তাদের এই মনোবাসনাও অসমীচীন। কারণ, দুনিয়ার জীবনে মানুষকে হেদায়েত করার জন্য আল্লাহ তায়ালা নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন। সবার সামনে হেদায়েত পাওয়ার মতো উপযুক্ত পরিবেশ ছিল। কিন্তু দুনিয়ার জীবনে গোনাহগার বান্দা জেনেবুঝে গোনাহের পথে পা বাড়িয়েছিল। মহান আল্লাহ কুরআনের অন্যত্র বলেছেন, কিয়ামতের দিন যারা এরকম আক্ষেপ করবে তাদেরকে আরেকবার পৃথিবীতে আসার সুযোগ দেয়া হলে তারা আবারও গোনাহের কাজে লিপ্ত হতো। কাজেই কিয়ামতের দিন গোনাহগার বান্দাদের আকাঙ্ক্ষা কোনো অবস্থায় পূরণ হবে না এবং তারা তাদের জন্য নির্মিত চিরকালীন আবাস জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।
এই দুই আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:
১- কিয়ামতের দিন তাকওয়ার মর্যাদা সবার সামনে উন্মোচিত হবে। সেদিন বোঝা যাবে, মানুষকে মহাবিপদ থেকে বাঁচানোর একমাত্র হাতিয়ার হচ্ছে তাকওয়া বা খোদাভীতি। ধন-সম্পদ, ক্ষমতা, মর্যাদা, প্রভাব-প্রতিপত্তি ইত্যাদি কিয়ামতের দিন কোনো কাজে আসবে না।
২- আল্লাহর হেদায়েতের পথ ছেড়ে মানুষ অন্য যে পথেই চলে যাক তা তাকে জাহান্নামে টেনে নিয়ে যাবে।
৩- কিয়ামতের দিন একমাত্র তাকওয়া ও নেক আমল মানুষের মুক্তি ও সৌভাগ্যের কারণ হবে।#
পার্সটুডে/এমএমআই/এআর/১৩
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।