ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২১ ১৩:৩৫ Asia/Dhaka

পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা আয-যুমারের ৭১ ও ৭৫ নম্বর আয়াতের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ৭১ থেকে ৭২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَسِيقَ الَّذِينَ كَفَرُوا إِلَى جَهَنَّمَ زُمَرًا حَتَّى إِذَا جَاءُوهَا فُتِحَتْ أَبْوَابُهَا وَقَالَ لَهُمْ خَزَنَتُهَا أَلَمْ يَأْتِكُمْ رُسُلٌ مِنْكُمْ يَتْلُونَ عَلَيْكُمْ آَيَاتِ رَبِّكُمْ وَيُنْذِرُونَكُمْ لِقَاءَ يَوْمِكُمْ هَذَا قَالُوا بَلَى وَلَكِنْ حَقَّتْ كَلِمَةُ الْعَذَابِ عَلَى الْكَافِرِينَ (71) قِيلَ ادْخُلُوا أَبْوَابَ جَهَنَّمَ خَالِدِينَ فِيهَا فَبِئْسَ مَثْوَى الْمُتَكَبِّرِينَ (72)

“কাফেরদেরকে দলে দলে জাহান্নামের দিকে হাঁকিয়ে নেয়া হবে। তারা যখন সেখানে পৌছাবে, তখন তার দরজাসমূহ খুলে দেয়া হবে এবং জাহান্নামের রক্ষীরা তাদেরকে বলবে, তোমাদের কাছে কি তোমাদের মধ্য থেকে নবীগণ আগমন করেনি, যারা তোমাদের কাছে তোমাদের পালনকর্তার আয়াতসমূহ আবৃত্তি করত এবং এ দিনের সাক্ষাতের ব্যাপারে সতর্ক করত? তারা বলবে,  হ্যাঁ (তারা এসেছিল। কিন্তু আমরা তাদের কথা শুনিনি বরং তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করেছি) কিন্তু কাফেরদের প্রতি শাস্তির হুকুমই বাস্তবায়িত হয়েছে।” (৩৯:৭১)

“তাদেরকে বলা হবে, তোমরা জাহান্নামের দরজা দিয়ে প্রবেশ কর, সেখানে চিরকাল অবস্থানের জন্য। কত নিকৃষ্ট অহংকারীদের আবাসস্থল।” (৩৯:৭২)

গত আসরে আমরা বলেছি, কিয়ামতের দিন বিভিন্ন সাক্ষীর উপস্থিতিতে মানুষের আমলনামা নিয়ে আল্লাহর আদালতে শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে সম্পূর্ণ ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে প্রতিটি মানুষ জান্নাতে নাকি জাহান্নামে যাবে তা নির্ধারিত হবে। এরপর এই দুই আয়াতে বলা হচ্ছে: আল্লাহর আদালতের রায় ঘোষিত হওয়ার পর জাহান্নামবাসীকে দলে দলে তাদের চিরস্থায়ী আবাসের দিকে নিয়ে ধাক্কা দিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে।  তারা জাহান্নামের দরজায় পৌঁছোলে সেখানকার প্রহরী ফেরেশতারা তাদেরকে ভর্ৎসনা করে বলবে: তোমাদের কাছে কি তোমাদের মধ্য থেকে নবী-রাসূল আসেননি এবং তারা কি আল্লাহর আয়াত পাঠ করে আজকের দিনের ব্যাপারে তোমাদেরকে সতর্ক করেননি? তাহলে কেন তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করেছো এবং এসব সতর্কবার্তায় কান দাওনি? যা খুশি তাই করার জন্যই কি তোমরা আল্লাহর দাওয়াতের বাণী প্রত্যাখ্যান করেছিলে? আজকের এই করুণ পরিণতিতে তোমরা কেন পতিত হলে বলে তোমাদের মনে হয়?

এ অবস্থায় কাফেরদের পক্ষে সত্য স্বীকার করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় থাকবে না। ফেরেশতাদের সঙ্গে তাদের এ কথোপকথোন শেষ হয়ে গেলে তাদেরকে জাহান্নামে প্রবেশ করতে বলা হবে। এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে: আল্লাহ বলছেন, জাহান্নাম অহংকারীদের জন্য কত নিকৃষ্ট আবাসস্থল। এই কথা থেকে বোঝা যায়, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে প্রত্যাখ্যান করার পেছনে মূল কারণ ছিল অহংকার। তারা পার্থিব জীবনে সব সময় সত্যের দাওয়াতের সামনে আত্মম্ভরিতা দেখাত এবং তারা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই অহংকারি মনোভাব পরিত্যাগ করেনি বলে আজ তাদেরকে জাহান্নামে প্রবেশ করতে হয়েছে।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১- দুনিয়ার জীবনে যারা অহংকার করে নবীদের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছে কিয়ামতের দিন তারা অপমানিত হবে। তাদেরকে ধাক্কা মেরে জাহান্নামে ঢুকিয়ে দেয়া হবে।

২- পার্থিব জীবনে আল্লাহর আজাব সম্পর্কে সতর্ক না করে কাউকে পরকালে জাহান্নামে পাঠানো হবে না। সেদিন অপরাধীরা একথা স্বীকার করবে যে, তারা সত্যের দাওয়াত পেয়েও প্রত্যাখ্যান করার কারণে এই ভয়াবহ পরিণতির সম্মুখীন হয়েছে।

৩- মানুষ তার কুফরের কারণেই আল্লাহর আজাবে নিপতিত হবে এবং কুফরের মূলে রযেছে সত্যের সামনে অহংকার ও আত্মম্ভরিতা।

সূরা যুমারের ৭৩ ও ৭৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

 وَسِيقَ الَّذِينَ اتَّقَوْا رَبَّهُمْ إِلَى الْجَنَّةِ زُمَرًا حَتَّى إِذَا جَاءُوهَا وَفُتِحَتْ أَبْوَابُهَا وَقَالَ لَهُمْ خَزَنَتُهَا سَلَامٌ عَلَيْكُمْ طِبْتُمْ فَادْخُلُوهَا خَالِدِينَ (73) وَقَالُوا الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي صَدَقَنَا وَعْدَهُ وَأَوْرَثَنَا الْأَرْضَ نَتَبَوَّأُ مِنَ الْجَنَّةِ حَيْثُ نَشَاءُ فَنِعْمَ أَجْرُ الْعَامِلِينَ (74)  

“যারা তাদের পালনকর্তাকে ভয় করত তাদেরকে দলে দলে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। যখন তারা সেখানে পৌঁছাবে জান্নাতের দরজা উম্মুক্ত থাকবে এবং জান্নাতের রক্ষীরা তাদেরকে বলবে: তোমাদের প্রতি সালাম, তোমরা নেককার ও পবিত্র ছিলে, অতঃপর অনন্তকাল বসবাসের জন্য তোমরা জান্নাতে প্রবেশ কর।” (৩৯:৭৩)

“এবং (জান্নাতবাসী) বলবে: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদের প্রতি তার ওয়াদা পূর্ণ করেছেন এবং আমাদেরকে এ ভূমির (অর্থাৎ জান্নাতের) উত্তরাধিকারী করেছেন। আমরা জান্নাতের যেখানে ইচ্ছা সেখানে বসবাস করব। সুতরাং মেহনতকারীদের পুরস্কার কতই চমৎকার।” (৩৯:৭৪)

কাফেরদের বিপরীতে ঈমানদার ও নেক আমলকারী জান্নাতবাসীকে অত্যন্ত সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে জান্নাতে নিয়ে যাওয়া হবে। তাদের জন্য আগে থেকে জান্নাতের দরজা খোলা থাকবে।  সেখানে জান্নাতের রক্ষী রহমতের ফেরেশতরা তাদেরকে সালাম দেবে এবং তাদেরকে স্বাগত জানাবে এবং বলবে, এখানে আপনারা চিরকাল অবস্থান করুন। এ সময় জান্নাতবাসী তাদের প্রতি আল্লাহর প্রতিশ্রুতিকে সত্য হতে দেখে মহান আল্লাহর প্রতি চরম কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, ঈমানদার ও নেককার বান্দারা অন্যসব মানুষের মতোই অল্প কিছুদিন পৃথিবীতে অবস্থান করলেও তারা তাদের পরিশ্রম ও নেক আমলের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে একথাই প্রমাণ করেছে যে, পৃথিবীতে হাজার হাজার বছর বেঁচে থাকলেও তারা এভাবেই আল্লাহর ইবাদত করে যেত এবং তার সব আদেশ-নিষেধের সামনে আনুগত্যশীল থাকত। আল্লাহর প্রতি আনুগত্য তাদের রক্তমাংস ও অস্তিত্বের সঙ্গে একাকার হয়ে গিয়েছে বলেই তারা জান্নাতে প্রবেশের অধিকার লাভ করেছে।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হচ্ছে:

১- জান্নাতে যাওয়ার জন্য শুধু ঈমান যথেষ্ট নয়। ঈমানের পাশাপাশি নেক আমল, তাকওয়া এবং পবিত্র জীবনযাপনও জরুরি। আল্লাহ এখানে জান্নাত লাভের জন্য মেহনত করার শর্ত জুড়ে দিয়েছেন। অর্থাৎ আল্লাহর ইবাদতের ক্ষেত্রে শরীর কষ্ট পায় এতখানি পরিশ্রম করতে হবে। আরাম-আয়েশের জীবন কাটিয়ে জান্নাতের আশা করা বৃথা।

২- জান্নাতবাসী বেহেশতে প্রবেশ করে প্রথমেই আল্লাহর শোকর আদায় করবে। প্রতিটি নেয়ামতের জন্যই শোকরগুজার করা দরকার। আর জান্নাত হচ্ছে মানুষের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামত যা তিনি তার একান্ত দয়ায় মানুষকে দান করবেন।

সূরা যুমারের শেষ আয়াত অর্থাৎ ৭৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  وَتَرَى الْمَلَائِكَةَ حَافِّينَ مِنْ حَوْلِ الْعَرْشِ يُسَبِّحُونَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَقُضِيَ بَيْنَهُمْ بِالْحَقِّ وَقِيلَ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ (75)

“আপনি ফেরেশতাগণকে দেখবেন, তারা আরশের চার পাশ ঘিরে তাদের পালনকর্তার পবিত্রতা ঘোষণা করছে। তাদের সবার মাঝে ন্যায়বিচার করা হবে। বলা হবে, সমস্ত প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা বিশ্বপালক আল্লাহর।” (৩৯:৭৫)

এই আয়াতে রাসূল (সা.)কে উদ্দেশ করে আল্লাহ পাক বলছেন, কিয়ামতের দিন দেখবেন ফেরেশতারা মানুষ সম্পর্কে আল্লাহর নির্দেশ পালনের জন্য তাঁর আরশের চারপাশ বেষ্টন করে রয়েছে। সেদিন মানুষের বিচার করার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ন্যায়পূর্ণ আচরণ করা হবে এবং সেদিন ফেরেশতা ও জান্নাতবাসীর মুখ থেকে শুধু আল্লাহর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা বের হতে থাকবে।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১- জান্নাত ও জাহান্নাম উভয় স্থানের প্রহরীর দায়িত্ব পালন করবে ফেরেশতারা এবং তারা আল্লাহর নির্দেশ ছাড়া কোনো কাজ করে না।

২- প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা পরস্পরের পরিপূরক। যিনি বিশ্বজগতের স্রষ্টা ও প্রতিপালক এবং যার কাজে বিন্দুমাত্র খুঁত নেই সেই আল্লাহই সকল প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা পাওয়ার উপযুক্ত।#

পার্সটুডে/এমএমআই/এআর/২৩

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।