আসমাউল হুসনা (পর্ব-২৮)
মহান আল্লাহর আসমাউল হুসনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নাম হাকাম। এর আভিধানিক অর্থ বাধা দানকারী বা প্রতিরোধকারী।
যিনি মানুষের মধ্যে বিচারের দায়িত্ব পালন করেন এবং জালিম বা বিবাদমান দুই পক্ষকে জুলুম করা থেকে বিরত রাখেন তাঁকে হাকিম বলা হয়। হিকমাত শব্দটিও একই পরিবারভুক্ত শব্দ। হিকমাত শব্দের অর্থ অজ্ঞতা থেকে দূরে থাকা বা রাখা!
পবিত্র কুরআনের আয়াতের আলোকে মহান আল্লাহ নিরঙ্কুশ হাকাম বা বিচারক। তাঁর রায় বা হুকুমের মধ্যে অন্য কারো অংশীদারিত্ব নেই। কেউই মহান আল্লাহ'র রায় বা হুকুম বাস্তবায়নের পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে না। সুরা আনআমের ৬২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলছেন: ফয়সালা বা হুকুম কেবল তাঁরই।
সুরা কাহাফের ২৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন: আল্লাহ কাউকে নিজ কর্তৃত্বে শরীক করেন না। সুরা মায়েদার প্রথম আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা যা ইচ্ছা করেন তথা যাতে কল্যাণ মনে করেন,তা-ই নির্দেশ দেন।-সুরা রা'দ-এর ৪১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন, আল্লাহ নির্দেশ দেন। তাঁর নির্দেশকে পশ্চাতে নিক্ষেপকারী কেউ নেই।-
ঠিক এ কারণেই মহান আল্লাহ সবাইকে ও নবী-রাসুলগণকে, বিশেষ করে মহানবী (সা)-কে নির্দেশ দিয়েছেন যাতে তাঁরা কেবলই আল্লাহর ওহির সূত্রকে গুরুত্ব দেন এবং নিজ থেকে কোনো বিধান রচনা না করেন। যখন মহানবী (সা) ওহির সঙ্গে যুক্ত হওয়া সত্ত্বেও মানুষের জন্য নিজের থেকে বিধান রচনার অধিকার রাখেন না তখন অন্য মানুষেরা বা প্রতিভাবান মানুষেরাও যে সে অধিকার রাখেন না তা সুস্পষ্ট।
মহান আল্লাহ সুরা ক্বিয়ামাতের ১৬ নম্বর আয়াতে মহানবীকে বলছেন: তাড়াতাড়ি শিখে নেয়ার জন্যে আপনি দ্রুত ওহী আবৃত্তি করবেন না। এর সংরক্ষণ ও আপনাকে শেখানো বা পাঠ দেয়া আমারই দায়িত্ব।– এখানে এটা বোঝানো হচ্ছে যে মহানবী -সা. যেন ওহি লাভের আগেই ও আল্লাহর নির্দেশ আসার আগেই মুখ না খোলেন! অবশ্য মহানবী (সা) খোদায়ি এই নির্দেশনার আলোকেই সব সময় আচরণ করে এসেছেন। আর এ জন্য মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে মহানবীর প্রশংসামূলক ও সম্মানসূচক আয়াতও নাজিল করেছেন। যেমন সুরা নাযম্-এর তিন নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ মহানবীর সব বক্তব্যকে সুস্পষ্টভাবে স্বীকৃতি দিয়ে বলেছেন, তিনি অর্থাৎ নবী কখনও নিজ ইচ্ছার আলোকে বা প্রবৃত্তির তাড়নায় কথা বলেন না, বরং তাঁর ওপর যে ওহি নাজিল হয় তারই আলোকে তিনি কথা বলেন।

মহান আল্লাহ সুরা 'তিন'-এ নিজেকে আহকামুল হাকিমিন তথা সর্বশ্রেষ্ঠ হুকুমকারী বলে উল্লেখ করেছেন। মানুষের সর্বোত্তম কল্যাণ ও সৌভাগ্য বা পরিণতির জন্য তিনিই সর্বোত্তম বিধান রচনাকারী। মানুষ যাতে সাফল্য অর্জন করতে পারে সে জন্য মহান আল্লাহ নামাজ, রোজা, খুম্স্ ও যাকাত-এর বিধান থেকে শুরু করে মাথার চুল ও দাঁতের যত্ন নেয়া- এসবই মানুষকে জানিয়ে দিয়েছেন কুরআনের মাধ্যমে অথবা নবীজির ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের সুন্নাতের মাধ্যমে। সুরা নুরের ৫১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: মুমিনদের বক্তব্য কেবল এ কথাই যখন তাদের মধ্যে ফয়সালা করার জন্যে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের দিকে তাদেরকে আহবান করা হয়, তখন তারা বলে: আমরা শুনলাম ও আদেশ মান্য করলাম। তারাই প্রকৃত সফলকাম।- তাই যারা আল্লাহর হুকুম ও বিধানের প্রতি বিনম্র ও তা বাস্তবায়ন করে তাদের থেকে অপিবত্রতা, দুর্নীতি এসব দূর হয় এবং তাদের কাজ হয় সংশোধিত। তাদের কাজগুলো সুশৃঙ্খলভাবে ও নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী সমাধান হয়। খোদার বিধান বাস্তবায়িত হলে মানুষের ওপর জুলুম ও হত্যাকাণ্ড ঠেকানো যায় ও মানুষের সম্পদ রক্ষা পায়। রক্ষা পায় মানুষের মুখ ও হাতগুলো অনুপযুক্ত কাজ হতে। মানুষেরা আল্লাহর বিধানের আনুগত্যের আওতায় পরস্পর ভাইয়ের মত হয়ে যায়।
মহান আল্লাহ মানুষের মধ্যে মতভেদ ও দ্বন্দ্ব নিরসনের জন্য পৃথিবীতে নবী-রাসুল ও তাঁদের স্থলাভিষিক্তকে নিজের খলিফা করেছেন। সুরা সোয়াদের ২৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ এ প্রসঙ্গে বলেছেন, হে দাউদ! আমি তোমাকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছি, অতএব, তুমি মানুষের মাঝে ন্যায়বিচারের মাধ্যমে তথা ন্যায়সঙ্গতভাবে রাজত্ব কর এবং খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করো না। তা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে দেবে। নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত হয়, তাদের জন্যে রয়েছে কঠোর শাস্তি, এ কারণে যে, তারা হিসাব দিবসকে ভূলে যায়।
সুরা নিসার ৫৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন: যখন তোমরা মানুষের কোন বিচার-মীমাংসা করতে আরম্ভ কর, তখন মীমাংসা কর ন্যায় ভিত্তিক। -তাই যারা মহান আল্লাহর হাকাম নামের রঙ্গে রঙ্গিন হতে চান তাদের উচিত ন্যায়সঙ্গত ও সঠিক বিচার-কাজে অভ্যস্ত হওয়া। প্রকৃত হাকাম নিজের স্বার্থের দিকে লক্ষ্য রেখে নিজের ও অন্যদের মধ্যে মীমাংসা করেন না।
মহান আল্লাহর হাকাম নামটি কিয়ামত তথা পুনরুত্থান ও বিচার দিবসে এই দুনিয়ার চেয়েও বেশি প্রোজ্জ্বল হয়ে উঠবে। সেদিন মহান আল্লাহ সকল মতবিরোধের নিষ্পত্তি করবেন বিচারের মাধ্যমে। যে কোনো আদালতে সাক্ষী ও বাঁদি-বিবাদী উপস্থিত থাকতে পারে। কিন্তু মহান আল্লাহর নিরঙ্কুশ ন্যায়বিচারের আদালতে ঘটনাগুলোর সময় ও স্থান উল্লেখ করবেন স্বয়ং ফেরেশতাকুল এবং এমনকি মানুষের শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও সাক্ষ্য দিবে। অবশ্য সবচেয়ে বড় সাক্ষী মহান আল্লাহ নিজেই! মহান আল্লাহর কিতাবে সব কিছুই রেকর্ড হয়ে আছে সামান্যতম কোনো ভুল ছাড়াই! তাই কিয়ামতে মহান আল্লাহর বিচার হবে পুরোপুরি যথাযথ! মানুষ সেদিন তাই পাবে যা সে করেছে! যদি সে খারাপ বা মন্দ কাজ করে থাকে তা সে সেদিন দেখতে পাবে এবং তা সেদিন প্রকাশ পাবে। মানুষের রেকর্ডগুলো সেদিন মূর্তমান হবে ও অস্বীকার করারও কোনো উপায় থাকবে না।
মানুষ এ পৃথিবীতে যেসব নামাজ পড়েছে সেসব পরকালে সুন্দর-শুভ্র চেহারার মানুষের রূপ নিয়ে কবরে হাজির হবে ও তার সঙ্গে বন্ধুর মত হয়ে থাকবে যাতে তার মধ্যে নতুন স্থানে আসাজনিত কোনো ভয় না থাকে। এ ছাড়াও নামাজ কিয়ামতের দিন মুমিনের নুর হয়ে দেখা দেবে। -এসবের আলোকে মুমিনের উচিত দুনিয়াতেই নিজ বিশ্বাসগুলোকে শুদ্ধ করে নেয়া ও সব ধরনের বিচ্যুতি ও খোদায়ি প্রকৃতির বিকৃত অবস্থাকে নিজ থেকে দূর করা। #
পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/২৪
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।