জুলাই ০৫, ২০২১ ১৪:৩৯ Asia/Dhaka

পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্ব থেকে সূরা আশ-শূরার অনুবাদ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। মক্কায় অবতীর্ণ এ সূরার আয়াত সংখ্যা ৫৩। সূরার ৩৮ নম্বর আয়াতের আলোচনার বিষয়বস্তু থেকে এই সূরার নামকরণ করা হয়েছে। এই আয়াতে মুমিন ব্যক্তিদেরকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার সময় শূরা বা পরামর্শ করে নিতে বলা হয়েছে। এই সূরার প্রথম চার আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

حم ﴿١﴾ عسق ﴿٢﴾ کَذَلِکَ یُوحِی إِلَیْکَ وَإِلَى الَّذِینَ مِنْ قَبْلِکَ اللَّهُ الْعَزِیزُ الْحَکِیمُ ﴿٣﴾ لَهُ مَا فِی السَّمَاوَاتِ وَمَا فِی الأرْضِ وَهُوَ الْعَلِیُّ الْعَظِیمُ ﴿٤﴾

“হা-মীম।” (৪২:১)

“আইন-সীন-কাফ।” (৪২:২)

“এমনিভাবে মহাপরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময় আল্লাহ আপনার এবং আপনার পূর্ববর্তীদের কাছে ওহী প্রেরণ করেন।” (৪২:৩)

“আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে তার মালিক তিনিই। তিনি সমুন্নত ও সুমহান।” (৪২:৪)

পবিত্র কুরআনের আরো ২৮টি সূরার মতো এই সূরাও হুরুফে মুকাত্তায়াত দিয়ে শুরু হয়েছে। পরবর্তী আয়াতের বিষয়বস্তু অনুযায়ী এসব হরফের মাধ্যমে মহান আল্লাহর বিশালত্ব ও মহিমা বর্ণনা করা হয়।  মহাপ্রজ্ঞাবান ও পরাক্রমশালী আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিল হওয়া এই মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের আয়াতগুলো এসব হরফেরই সমষ্টি। অথচ এসব হরফ একত্রিত করে কোনো মানুষের পক্ষে এরকম একটি আয়াতও সৃষ্টি করা সম্ভব নয়।

হুরুফে মুকাত্তায়াত বর্ণনা করার পরের আয়াতে বলা হচ্ছে: আপনার প্রতি যেমন ওহী বা প্রত্যাদেশ পাঠানো হয় আপনার পূর্ববর্তী নবী-রাসূলদের কাছেও তা পাঠানো হতো। যে আল্লাহ তায়ালা মানবজাতিকে হেদায়েত করার জন্য ইতিহাসের দীর্ঘ সময় ধরে পূর্ববর্তী নবী-রাসূলদের প্রতি ওহী পাঠিয়েছেন, তিনিই আপনার প্রতি পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ করেছেন। কাজেই সকল যুগে ও সকল স্থানে ওহীর উৎস একই। এ ছাড়া, ওহীর সার্বিক বিষয়বস্তু ও মূলনীতি সব নবী-রাসূলের জন্য ছিল সমান। অবশ্য মহান আল্লাহ তাঁর প্রজ্ঞা অনুযায়ী ওহীর মাধ্যমে প্রতিটি যুগের মানুষের জন্য যুগোপযোগী বিধিবিধান প্রদান করেন।

পরের আয়াতে বলা হচ্ছে, আসমানসমূহ ও ভূপৃষ্টে যা কিছু আছে তার সবকিছুই আল্লাহ তায়ালার পক্ষ হতে এসেছে। যে আল্লাহ বিশ্বজগত সৃষ্টি করেছেন, ভূমণ্ডল ও নভোমণ্ডলের সবকিছুর মালিকানা যার, তিনিই এসব কিছু পরিচালনা ও মানুষকে সঠিক পথের দিশা দেয়ার জন্য আসমানি কিতাব ও শরিয়ত প্রদান করেছেন। এর অর্থ হচ্ছে, এই প্রকৃতি ও শরিয়তের উৎস একই স্থানে এবং    জগত পরিচালনায় এই দুইয়ের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই।

এসব আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১- সব নবী-রাসূল এক উৎসের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত এবং সেই এক উৎস থেকে ওহী গ্রহণ করেন। কাজেই দাওয়াতের মূল বিষয়বস্তুর ক্ষেত্রে তাঁদের মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিল না এবং প্রথম নবী থেকে শুরু করে শেষ নবী পর্যন্ত সবাই আল্লাহর একত্ববাদ ও পরকালে বিশ্বাসের বাণী প্রচার করেছেন।

২- মহাপরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময় আল্লাহর পক্ষ থেকে দেয়া ওহী অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করলেই মানুষের মর্যাদা বৃদ্ধি পায় এবং সে পূর্ণতার দিকে ধাবিত হতে পারে।

৩- মানুষের জীবন পরিচালনার জন্য একমাত্র তিনিই বিধিবিধান দেয়ার অধিকার রাখেন যিনি মানুষসহ এই গোটা বিশ্বজগত যিনি সৃষ্টি করেছেন।

সূরা শুরার ৫ ও ৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:

تَکَادُ السَّمَاوَاتُ یَتَفَطَّرْنَ مِنْ فَوْقِهِنَّ وَالْمَلائِکَةُ یُسَبِّحُونَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَیَسْتَغْفِرُونَ لِمَنْ فِی الأرْضِ أَلا إِنَّ اللَّهَ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِیمُ ﴿٥﴾ وَالَّذِینَ اتَّخَذُوا مِنْ دُونِهِ أَولِیَاءَ اللَّهُ حَفِیظٌ عَلَیْهِمْ وَمَا أَنْتَ عَلَیْهِمْ بِوَکِیلٍ ﴿٦﴾

“আসমানসমূহ ঊর্ধ্বদেশ থেকে ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়, আর ফেরেশতাগণ সার্বক্ষণিকভাবে তাদের রবের সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে এবং যমীনে যারা আছে তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। জেনে রাখুন, আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (৪২:৫)

“আর যারা তাঁর পরিবর্তে অন্যদেরকে (উপাসনা করার জন্য) অভিভাবকরূপে গ্ৰহণ করে, আল্লাহ তাদের প্রতি কঠোর দৃষ্টি রেখেছেন।  আর আপনি তো তাদের উপর কর্মবিধায়ক নন (অর্থাৎ তাদেরকে ঈমান আনতে বাধ্য করা আপনার কাজ নয়)।” (৪২:৬)

এই আয়াতে বলা হচ্ছে: আল্লাহ তায়ালার বাণী বা ওহীর মাহাত্ম্য এত বেশি যে, তা যদি আসমানসমূহের উপর নাজিল করা হতো তাহলে সেগুলো ভেঙেচুড়ে খান খান হয়ে যেত। যেমনটি সূরা হাশরের ২১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: যদি কুরআন পাহাড়ের উপর নাজিল হতো তাহলে পাহাড় আল্লাহর ভয়ে ধুলিস্যাত হয়ে যেত। আল্লাহ তায়ালা মানব জাতিকে হেদায়েত করার জন্য নবী-রাসূলগণের প্রতি ওহী নাজিল করেছেন বলে ফেরেশতারা সারাক্ষণ আল্লাহর প্রশংসা ও তসবীহ পাঠে মশগুল রয়েছেন। তারা আল্লাহকে সব ধরনের ভুলভ্রান্তি ও ত্রুটির ঊর্ধ্বে বলে সাক্ষ্য দিচ্ছেন।

যেসব মানুষ মন্দকর্ম করে আল্লাহর দরবারে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ফেরেশতারা তাদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকেন। কারণ, ফেরেশতারা জানে যে, আল্লাহ তায়ালা অনেক বড় দয়ালু ও ক্ষমাশীল এবং তিনি তাঁর বান্দাদেরকে ক্ষমা করার জন্য প্রস্তুত। অবশ্য মনে রাখতে হবে, যারা জেনেবুঝে এবং হঠকারিতার সঙ্গে গোনাহ করেনি তারাই আল্লাহ তায়ালার ক্ষমা লাভ করে। কিন্তু যারা গোঁড়ামি ও হঠকারিতায় লিপ্ত এবং ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহর অবাধ্যতা করে তাদেরকে আল্লাহ ক্ষমা করেন না।

পরের আয়াতে এই বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হচ্ছে: একদল মানুষ আছে যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে নিজেদের অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ কিংবা তাঁদের আনুগত্য করার পরিবর্তে অন্য কারো কাছে ধর্না দেয় এবং জীবনে তাদের আদেশনিষেধ মেনে চলে। এসব মানুষ প্রকৃতপক্ষে শিরক ও কুফরে লিপ্ত এবং তারা নবী-রাসূলগণের শিক্ষা প্রত্যাখ্যান করে।

স্বাভাবিকভাবে মানবতার মুক্তির দূত এবং মানবদরদি নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) মনে করতেন সকল মানুষকে হেদায়েতের দায়িত্ব তাঁর। তিনি মনেপ্রাণে চাইতেন সব মানুষ যেন হেদায়াতের ছায়াতলে আশ্রয় লাভ করে এক আল্লাহর আনুগত্য করুক। কিন্তু তিনি যখন দেখতে পান একদল মানুষ তাঁর দাওয়াতের বাণীতে কর্ণপাত করছে না তখন তিনি ভীষণভাবে ব্যথিত ও দুঃখিত হন।

এ কারণে এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বিশ্বনবীকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন: আপনি একথা মনে করবেন না যে, আপনি সকল মানুষের কর্মবিধায়ক এবং তারা আপনার দাওয়াতের বাণী শুনতে বাধ্য। তাদের কৃতকর্মের জন্য আপনাকে জবাবদিহী করতে হবে না এবং তাদেরকে বাধ্য করার জন্যও আপনাকে নবুওয়াত দেয়া হয়নি। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে কর্মের স্বাধীনতা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন এবং পৃথিবীতে ভালো বা খারাপ- কোনো কাজ করতেই তিনি বাধা দেন না। 

তবে মূল বিষয় হচ্ছে, প্রত্যেককে তার ভালো বা খারাপ কাজের পরিণতি ভোগ করতে হবে। সে পরিণতির একটি অংশ পার্থিব জীবনেই পাওয়া যাবে; আর মূল পুরস্কার বা শাস্তি নির্ধারিত থাকবে পরকালের জন্য।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১- কোনো কোনো মানুষের অন্তর পাথরের চেয়ে কঠিন। যে কুরআন পাহাড়ের উপর নাজিল হলে পাহাড় ধসে যেত সেই কুরআন এসব মানুষের অন্তরে কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না।

২- ফেরেশতারা যেমন পৃথিবীর সব মানুষের জন্য দোয়া করে আমরাও যেন দোয়া করার সময় সব মানুষকে দোয়ায় শামিল করতে ভুলে না যাই। #

পার্সটুডে/এমএমআই/আবুসাঈদ/০৫

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।