জুলাই ০৫, ২০২১ ১৪:৩৯ Asia/Dhaka

পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'তে সূরা আশ-শূরার অনুবাদ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। মক্কায় অবতীর্ণ এ সূরার আয়াত সংখ্যা ৫৩। সূরার ৩৮ নম্বর আয়াতের আলোচনার বিষয়বস্তু থেকে এই সূরার নামকরণ করা হয়েছে। এই আয়াতে মুমিন ব্যক্তিদেরকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার সময় শূরা বা পরামর্শ করে নিতে বলা হয়েছে। এই সূরার ৭ নং আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَکَذَلِکَ أَوْحَیْنَا إِلَیْکَ قُرْآنًا عَرَبِیًّا لِتُنْذِرَ أُمَّ الْقُرَى وَمَنْ حَوْلَهَا وَتُنْذِرَ یَوْمَ الْجَمْعِ لا رَیْبَ فِیهِ فَرِیقٌ فِی الْجَنَّةِ وَفَرِیقٌ فِی السَّعِیرِ ﴿٧﴾

“আর এভাবে আমি আপনার প্রতি কুরআন নাযিল করেছি (বিশুদ্ধ) আরবি (ভাষায়), যাতে আপনি মক্কা ও তার চারদিকের জনগণকে সতর্ক করতে পারেন এবং তাদেরকে ভয় দেখাতে পারেন একত্রিত হওয়ার (অর্থাৎ কিয়ামতের) দিন সম্পর্কে, যাতে কোন সন্দেহ নেই।  (যে দিন) একদল থাকবে জান্নাতে এবং আরেক দল জলন্ত আগুনে।” (৪২: ৭)

এই আয়াতে বিশ্বনবী (সা.)কে উদ্দেশ করে বলা হচ্ছে: আমি আপনার প্রতি এই কুরআন নাজিল করেছি মক্কা ও তার পার্শ্ববর্তী মানুষের ভাষায়। কারণ, আপনার প্রথম শ্রোতা হচ্ছে তারাই। আপনি তাদেরকে তাদের মন্দ ও অশ্লীল কর্ম সম্পর্কে সতর্ক করে দিন এবং বলুন এসব পরিত্যাগ না করলে তাদেরকে কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে।

আয়াতের পরবর্তী অংশে বলা হচ্ছে, কিয়ামতের দিন পৃথিবীর প্রথম মানুষ থেকে শুরু করে শেষ মানুষ পর্যন্ত সবাইকে একত্রিত করা হবে এবং তাদের সব কাজের হিসাব নেয়া হবে। সেখানে সব মানুষ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যাবে। একদল মানুষ ঈমান ও নেক আমলের কারণে জান্নাতে যাবে এবং অপর দল কুফর ও মন্দকর্মের জন্য জাহান্নামের জ্বলন্ত আগুনে নিক্ষিপ্ত হবে।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১- কুরআন আরবি ভাষায় নাজিল হলেও বিশেষ কোনো জাতি বা গোষ্ঠীর প্রতি নাজিল হয়নি। এই কিতাবের কোথাও ‘হে আরবের অধিবাসীরা’ বলে সম্বোধন করা হয়নি বরং গোটা মানবসমাজকে উদ্দেশ করে কথা বলেছেন আল্লাহ তায়ালা।

২- পবিত্র কুরআনের অনন্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী যেভাবে নাজিল হয়েছিল ঠিক সেভাবে তা যুগ যুগ ধরে সংরক্ষিত রয়েছে এবং মানুষের পক্ষে তাতে বিকৃতি আনা সম্ভব হয়নি।

সূরা শুরার ৮ ও ৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:

وَلَوْ شَاءَ اللَّهُ لَجَعَلَهُمْ أُمَّةً وَاحِدَةً وَلَکِنْ یُدْخِلُ مَنْ یَشَاءُ فِی رَحْمَتِهِ وَالظَّالِمُونَ مَا لَهُمْ مِنْ وَلِیٍّ وَلا نَصِیرٍ ﴿٨﴾ أَمِ اتَّخَذُوا مِنْ دُونِهِ أَوْلِیَاءَ فَاللَّهُ هُوَ الْوَلِیُّ وَهُوَ یُحْیِی الْمَوْتَى وَهُوَ عَلَى کُلِّ شَیْءٍ قَدِیرٌ ﴿٩﴾

“আর আল্লাহ ইচ্ছা করলে মানুষকে একই জাতিভুক্ত করতে (এবং সবাইকে বাধ্যতামূলক হেদায়েত দান করতে) পারতেন; কিন্তু তিনি যাকে ইচ্ছা (এবং যাকে যোগ্য মনে করেন) তাকে স্বীয় অনুগ্রহের অধিকারী করে থাকেন। আর সীমালংঘনকারীদের কোন অভিভাবক ও সাহায্যকারী নেই।” (৪২: ৮)

“তারা কি আল্লাহ্‌র পরিবর্তে অন্যদেরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করেছে? যদিও একমাত্র আল্লাহ্‌ই হচ্ছেন (প্রকৃত) অভিভাবক এবং তিনি মৃতদেরকে জীবিত করেন। আর তিনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।” (৪২: ৯)

এই দুই আয়াতে বলা হচ্ছে: পার্থিব জীবনেও মানুষ দুই ভাগে বিভক্ত। একদলের অন্তর পবিত্র এবং তারা সব সময় সৎ কাজ করে এবং আরেকদলের অন্তর কলুষিত এবং তারা মন্দ কর্মে লিপ্ত থাকে। এখানে যে প্রশ্নটি সামনে আসে তা হলো- সব মানুষ যাতে নেক আমল করার মাধ্যমে জান্নাত লাভ করতে পারে সেজন্য আল্লাহ কেন সবার অন্তর পরিশুদ্ধ করে দেন না?

এ সম্পর্কে এই আয়াতে বলা হচ্ছে: আল্লাহ তায়ালা ইচ্ছা করলে সব মানুষকে সৎকর্ম করতে বাধ্য করতে পারতেন। কিন্তু বাধ্যতামূলক ঈমানের কোনো মূল্য নেই। মানুষকে কর্মের স্বাধীনতা দেয়া হচ্ছে আল্লাহর নীতি এবং এর মাধ্যমেই জান্নাতের প্রকৃত হকদারকে বাছাই করা সম্ভব। 

প্রকৃত অর্থে কর্মের এই স্বাধীনতা মানব জাতির প্রতি আল্লাহর শ্রেষ্ঠ নেয়ামত। এর মাধ্যমেই মানুষ পূর্ণতায় পৌঁছার সুযোগ পায়। আল্লাহ তায়ালা ন্যায়পরায়ণ ও প্রজ্ঞাবান বলে প্রত্যেকে যে পথ বেছে নেয় তিনি তার সঙ্গে সে অনুযায়ী আচরণ করেন। যে ব্যক্তি দ্বীনের পথ অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত নেয় সে আল্লাহ তায়ালার বিশেষ রহমত লাভ করে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি আল্লাহর দেয়া স্বাধীনতার অপব্যবহার করে নিজের ও অপরের প্রতি জুলুম করে সে দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহর দয়া থেকে বঞ্চিত হয়।

যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো অভিভাবকত্ব গ্রহণ করে, মানবতৈরি আইনকে খুশিমনে মাথাপেতে নেয় সে আল্লাহর অভিভাবকত্বের ছায়াতল থেকে বেরিয়ে যায়। পার্থিব জীবন ও পরকালে তার কোনো আশ্রয়দাতা থাকে না।

পরের আয়াতে বিস্ময় প্রকাশ করে আল্লাহ বলছেন: তারা কি গয়রুল্লাহ বা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো অভিভাবকত্ব মেনে নিয়েছে? অথচ প্রকৃত অভিভাবক ও আশ্রয়দাতা হচ্ছেন একমাত্র আল্লাহ।

যিনি একচ্ছত্র ক্ষমতার মালিক অভিভাবক হওয়ার যোগ্যতা একমাত্র তাঁরই। তিনি মৃতকে জীবিত করাসহ যেকোনো কাজ করার ক্ষমতা রাখেন। কাজেই প্রতিটি মানুষের উচিত অভিভাবক হিসেবে এক আল্লাহর আশ্রয়ে যাওয়া এবং অন্য কারো কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা থেকে বিরত থাকা।  

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১- আল্লাহ তায়ালা মানুষকে কর্মের স্বাধীনতা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। কাজেই এই স্বাধীনতা কেড়ে নেয়ার অধিকার কারো নেই।

২- কাফির ও মুশরিকরা অন্য সবার আগে নিজেদের প্রতি জুলুম করে। কারণ তারা শ্রেষ্ঠতম আশ্রয়স্থল মহান আল্লাহর অভিভাবকত্ব থেকে বেরিয়ে যায়।

সূরা শুরার ১০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:

 وَمَا اخْتَلَفْتُمْ فِیهِ مِنْ شَیْءٍ فَحُکْمُهُ إِلَى اللَّهِ ذَلِکُمُ اللَّهُ رَبِّی عَلَیْهِ تَوَکَّلْتُ وَإِلَیْهِ أُنِیبُ ﴿١٠﴾

“তোমরা যে বিষয়েই মতভেদ কর না কেন- ওর মীমাংসা তো আল্লাহরই নিকট (রয়েছে)। তিনিই আল্লাহ- আমার প্রতিপালক; আমি ভরসা রাখি একমাত্র তাঁরই ওপর এবং আমি তাঁরই অভিমুখী হই।” (৪২:১০)

এই আয়াতে আল্লাহর অভিভাবকত্বের একটি দিকের প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হচ্ছে: যে ব্যক্তি আল্লাহকে নিজের অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করে তার উচিত যেকোনো মতবিরোধসহ প্রতিটি বিষয়ে আল্লাহর বিধান ও তাঁর মীমাংসা মেনে চলা। আল্লাহর বিধান লঙ্ঘন করে নিজের ইচ্ছেমতো বা বন্ধুবান্ধব কিংবা আত্মীয়-স্বজনের কথামতো সে চলতে পারবে না।

দুঃখজনকভাবে আমরা বেশিরভাগ মানুষ যেকোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে নিজের প্রবৃত্তির চাহিদাকে প্রাধান্য দেই। এ কারণে যেকোনো বিষয়ে সঠিক কথা বলা বা সঠিক আচরণ করার পরিবর্তে আমরা ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেই। অথচ প্রকৃত ঈমানের নিদর্শন হচ্ছে এই যে, ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আইনগত বিষয়সহ সব বিষয়ে আমাদেরকে আল্লাহর বিধানের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে।

অন্য কথায় যেকোনো দিক-নির্দেশনা আমাদেরকে পবিত্র কুরআন, আল্লাহর রাসূলের সূন্নাহ ও তাঁর আহলে বাইতের জীবনচরিত থেকে গ্রহণ করতে হবে। এটি করতে গিয়ে কোনো নির্দেশ আমাদের ইচ্ছার বিপরীতে গেলেও তা পালন করতে হবে।

স্বাভাবিকভাবেই আল্লাহর নির্দেশ পালন করতে গেলে নানা বিপদআপদে পড়তে হতে পারে, সমাজ বা পরিবারের বিরোধিতার সম্মুখীন হওয়া লাগতে পারে। এরকম অবস্থায় আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলার ক্ষেত্রে সব প্রতিবন্ধকতা দূর করে দেয়ার জন্য আল্লাহর সাহায্য চাইতে হবে।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১- আমাদেরকে ধর্মীয় কর্তব্য পালন ছাড়াও জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে চলার জন্য আল্লাহ তায়ালার বিধিবিধান মেনে চলতে হবে।

২- পার্থিব জীবনের ক্ষণস্থায়ী শক্তির অধিকারীদের কাছে আশ্রয় চাওয়ার পরিবর্তে এক আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণ নির্ভরশীল হতে হবে এবং বিপদে আপদে তাঁর কাছে সাহায্য চাইতে হবে।#

পার্সটুডে/এমএমআই/আবুসাঈদ/০৫

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।