জুলাই ০৬, ২০২১ ১৩:০০ Asia/Dhaka

পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'তে সূরা আশ-শূরার অনুবাদ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। মক্কায় অবতীর্ণ এ সূরার আয়াত সংখ্যা ৫৩। সূরার ৩৮ নম্বর আয়াতের আলোচনার বিষয়বস্তু থেকে এই সূরার নামকরণ করা হয়েছে। এই আয়াতে মুমিন ব্যক্তিদেরকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার সময় শূরা বা পরামর্শ করে নিতে বলা হয়েছে। এই সূরার ১৯ ও ২০ নং আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

 اللَّهُ لَطِیفٌ بِعِبَادِهِ یَرْزُقُ مَنْ یَشَاءُ وَهُوَ الْقَوِیُّ الْعَزِیزُ ﴿١٩﴾ مَنْ کَانَ یُرِیدُ حَرْثَ الآخِرَةِ نَزِدْ لَهُ فِی حَرْثِهِ وَمَنْ کَانَ یُرِیدُ حَرْثَ الدُّنْیَا نُؤْتِهِ مِنْهَا وَمَا لَهُ فِی الآخِرَةِ مِنْ نَصِیبٍ ﴿٢٠﴾

“আল্লাহ্‌ তাঁর বান্দাদের সঙ্গে অত্যন্ত কোমল ও দয়ালু ব্যবহার করেন; তিনি যাকে ইচ্ছে (এবং যার জন্য কল্যাণ মনে করেন তাকে) রিযিক দান করেন। আর তিনি সর্বশক্তিমান, প্রবল পরাক্রমশালী।” (৪২: ১৯)

“যে কেউ আখিরাতের ফসল কামনা করে তার জন্য আমি তার ফসল বাড়িয়ে দেই এবং যে কেউ দুনিয়ার ফসল কামনা করে আমি তাকে তা থেকে (সামান্য কিছু) দেই। আর আখেরাতে তার জন্য কিছুই থাকবে না।” (৪২: ২০)

এই দুই আয়াতে বলা হচ্ছে: আল্লাহ তায়ালা তার প্রতিটি বান্দার প্রতি দয়ালু এবং তাদের সবাইকে রিজিক দান করেন। এমনকি যারা কাফের এবং তাঁর প্রতি ঈমান আনেনি তাদেরকেও তিনি এই অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত করেন না। তবে এই রিজিক বন্টন হয় আল্লাহ তায়ালার প্রজ্ঞা অনুযায়ী। দুনিয়া ও আখিরাতে তিনি যে নিয়ম বেধে দিয়েছেন তা দিয়েই সবকিছু পরিচালিত হয়।

আল্লাহর বিধান হচ্ছে যে কেউ আখিরাতের জন্য কাজ করবে সে পার্থিব জীবনেই তার সুফল ভোগ করবে এবং আখিরাতে উত্তম প্রতিদান পাবে। কিন্তু যে ব্যক্তি আখিরাতে বিশ্বাস করে না এবং যার সব কাজ দুনিয়ামুখী সে এই পার্থিব জীবনে নিজের সব লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না। আর আখিরাতে তার কোনো প্রতিদান পাওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না।

পরের আয়াতে আল্লাহ তায়ালা কৃষিকাজের মতো একটি চমৎকার উদাহরণ তুলে ধরে বলেছেন, একদল আখিরাতের জন্য ফসল ফলায় এবং আরেকদল ফসল ফলায় পার্থিব জীবনের জন্য। যে পরকালের জন্য ফসল কামনা করে তার ফসল আমি বাড়িয়ে দেই। অন্যদিকে যে ব্যক্তি কেবল পার্থিব জীবনের সুখ-সমৃদ্ধি কামনা করে তাকে তার কামনার কিয়দংশ দান করি। আর সে আখিরাতে কিছুই পাবে না।

কাজেই বলা যায়, পার্থিব জীবন হচ্ছে আমাদের জন্য কৃষিজমি এবং আমাদের সকল কাজ ওই জমিতে বীজ বপন করার সমতুল্য। তবে এই বীজ বিভিন্ন ধরনের। কোনো কোনো বীজের ফসল অফুরন্ত ও ফলন অনেক বেশী। আবার কোনো কোনো বীজের ফসল তিতা ও অপ্রীতিকর। 

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১- পার্থিব জীবনে মুমিন ও কাফির নির্বিশেষে সব বান্দার প্রতি আল্লাহ তায়ালা অনুগ্রহ দান করেন।

২- যারা আখিরাত কামনা করে তারা পরকালে চিরসুখের আবাস লাভ করার পাশাপাশি পার্থিব জীবনেও উত্তম রিজিক পেয়ে যায়; তবে এই রিজিক সীমিত পরিমাণে হলেও সে বঞ্চিত হয় না। কিন্তু যারা দুনিয়া কামনা করে তারা পরকালে পুরোপুরি বঞ্চিত হয়।

সূরা শুরার ২১ ও ২২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:

 أَمْ لَهُمْ شُرَکَاءُ شَرَعُوا لَهُمْ مِنَ الدِّینِ مَا لَمْ یَأْذَنْ بِهِ اللَّهُ وَلَوْلا کَلِمَةُ الْفَصْلِ لَقُضِیَ بَیْنَهُمْ وَإِنَّ الظَّالِمِینَ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِیمٌ ﴿٢١﴾ تَرَى الظَّالِمِینَ مُشْفِقِینَ مِمَّا کَسَبُوا وَهُوَ وَاقِعٌ بِهِمْ وَالَّذِینَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ فِی رَوْضَاتِ الْجَنَّاتِ لَهُمْ مَا یَشَاءُونَ عِنْدَ رَبِّهِمْ ذَلِکَ هُوَ الْفَضْلُ الْکَبِیرُ ﴿٢٢﴾

“মুশরিকদের কি এমন কতকগুলি উপাস্য আছে যারা আল্লাহর অনুমতি ব্যতিরেকে এদের জন্য ধর্মীয় বিধান দিয়েছে? আর [পথভ্রষ্টদেরকে ফিরে আসার জন্য সুযোগ দেয়ার] চূড়ান্ত ঘোষণা না থাকলে এদের বিষয়ে অবশ্যই [ধ্বংসের] ফায়সালা হয়ে যেত। নিশ্চয়ই সীমালংঘনকারীদের জন্য রয়েছে কষ্টদায়ক শাস্তি।” (৪২:২১)

“[কিয়ামতের দিন] আপনি যালিমদেরকে ভীত-সন্ত্রস্ত দেখবেন তাদের কৃতকর্মের জন্য; অথচ এর (শাস্তি) আপতিত হবে তাদেরই উপর। আর যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে তারা থাকবে জান্নাতের উদ্যানসমূহে। তারা তাদের রবের কাছে যা কিছু চাইবে তাদের জন্য তা-ই থাকবে। এটাই তো সেই মহা অনুগ্রহ।” (৪২: ২২)

এই দুই আয়াতের শুরুতে মুশরিকদের উদ্দেশ করে বলা হচ্ছে: তাদের কি অদ্বিতীয় আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য আছে যারা নিজেদের পক্ষ থেকে কিতাব ও ধর্মীয় বিধিবিধান নিয়ে এসেছে? অথচ আইন ও বিধিবিধান দিতে পারেন একমাত্র তিনি যিনি এই বিশ্বজগত সৃষ্টি করেছেন ও প্রতিপালন করছেন।

আজকের পৃথিবীতেও জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যদি মানবসৃষ্ট কোনো আইন আল্লাহর বিধানের পরিপন্থি হয় তাহলে ইসলামের দৃষ্টিতে তা গ্রহণযোগ্য নয়। প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের আইন মানবজাতির প্রতি এক ধরনের অবিচার। কারণ, এই আইন এমন কেউ তৈরি করেছে, মানুষের প্রকৃত কল্যাণ কিসে হয় তার কোনো ধারনা যাদের নেই।                    

অবশ্য আল্লাহ তায়ালা পার্থিব জীবনে মানুষকে তার চলার পথ বেছে নেয়ার স্বাধীনতা দেন। এই স্বাধীনতা ভোগ করে সে যে পথ বেছে নেবে পরকালে তার পরিণতি তাকে ভোগ করতে হবে। কাফির ও সীমালঙ্ঘনকারীরা জাহান্নামের কঠিন আযাবে পতিত হবে। অন্যদিকে ঈমানদার ও সৎকর্ম সম্পাদনকারীরা জান্নাতের উদ্যানসমূহে প্রবেশ করবে।  শুধু তাই নয়, তারা আল্লাহর কাছে যা কিছু চাইবে তা-ই তাদেরকে দেয়া হবে। তাদের পুরস্কার অফুরন্ত। আর তাদের সবচেয় বড় পুরস্কার হচ্ছে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১- মানুষের জীবন চলার জন্য আইন ও বিধিবিধান প্রয়োজন। আমরা যদি আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছ থেকে সে আইন গ্রহণ করি তাহলে তা হবে নিজেদের পাশাপাশি মানবজাতির প্রতি অবিচার।

২- ধর্মের নামে যেকোনো কুসংস্কার ও বিদআত- শিরক ও জুলুম হিসেবে পরিগণিত।

৩- আল্লাহর শাস্তির ভয় পার্থিব জীবনেই পেতে হবে এবং সে ভয়ে খারাপ কাজ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। তা না করে কিয়ামতের দিন ভয় পেলে তাতে কোনো লাভ হবে না।

সূরা শুরার ২৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:

ذَلِکَ الَّذِی یُبَشِّرُ اللَّهُ عِبَادَهُ الَّذِینَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ قُلْ لا أَسْأَلُکُمْ عَلَیْهِ أَجْرًا إِلا الْمَوَدَّةَ فِی الْقُرْبَى وَمَنْ یَقْتَرِفْ حَسَنَةً نَزِدْ لَهُ فِیهَا حُسْنًا إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ شَکُورٌ ﴿٢٣﴾

“এটা হলো তা, [যার] সুসংবাদ আল্লাহ দেন তার [সেই] বান্দাদেরকে যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে। [হে রাসূল আপনি] বলুন, আমি এই [রিসালাতের] বিনিময়ে তোমাদের কাছ থেকে ঘনিষ্ঠজনদের সৌহার্দ্য ছাড়া অন্য কোন প্রতিদান চাই না।  আর যে উত্তম কাজ করে আমি তার জন্য এতে কল্যাণ বাড়িয়ে দেই। নিশ্চয় আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও গুণগ্ৰহী।”(৪২:২৩)

এই আয়াতের শুরুতে বলা হয়েছে, মুমিন ব্যক্তিরা পার্থিব জীবনে যদি তাদের ঈমান রক্ষার স্বার্থে কিছু দুঃখ-কষ্ট সহ্য করে আল্লাহ তায়ালা তার ক্ষতিপূরণ হিসেবে তাদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন।

এরপর মুমিন ব্যক্তিদেরকে জানিয়ে দেয়ার জন্য আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবীকে বলছেন: আপনি জানিয়ে দিন, আমি আমার রিসালাতের বিনিময়ে তোমাদের কাছে অন্য কোনো প্রতিদান চাই না; তোমরা শুধু আমার ঘনিষ্ঠজনদের ভালোবাসো, আমার আহলে বাইতকে নিজেদের জীবনের জন্য আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করো এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্য নির্ণয় করতে গিয়ে তাদের দিক-নির্দেশনা মেনে চলো।

পবিত্র কুরআনের অন্যত্র বলা হয়েছে: আমি আমার রিসালাতের বিনিময়ে তোমাদের কাছে যা চাই তা তোমাদেরই স্বার্থ রক্ষা করবে এবং তোমাদেরকে আল্লাহমুখী হতে সহায়তা করবে।

আয়াতের শেষাংশে বলা হচ্ছে: ঈমানদার ব্যক্তিদেরকে নেক আমল এবং পরোপকার করতে হবে। তাহলেই তারা আল্লাহর অনুগ্রহের ছায়াতলে আশ্রয়লাভ করবে।  আল্লাহ তাদের সৎকাজের সওয়াব বাড়িয়ে দেবেন এবং তাদের গোনাহ মাফ করে দেবেন।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১- নবী-রাসূলগণ মানুষের কাছে পার্থিব পুরস্কার কামনা করেন না। তারা বরং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য এবং রাসূলের আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসা চান।

২- আল্লাহর দয়া ও ক্ষমা পেতে চাইলে নেক আমল ও আল্লাহর বান্দাদের উপকার করতে হবে।#

পার্সটুডে/এমএমআই/আবুসাঈদ/০৬

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।