সূরা আশ-শূরা: আয়াত ২৪-২৮ (পর্ব-৬)
পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'তে সূরা আশ-শূরার অনুবাদ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। মক্কায় অবতীর্ণ এ সূরার আয়াত সংখ্যা ৫৩। সূরার ৩৮ নম্বর আয়াতের আলোচনার বিষয়বস্তু থেকে এই সূরার নামকরণ করা হয়েছে। এই আয়াতে মুমিন ব্যক্তিদেরকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার সময় শূরা বা পরামর্শ করে নিতে বলা হয়েছে। এই সূরার ২৪ নং আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
أَمْ یَقُولُونَ افْتَرَى عَلَى اللَّهِ کَذِبًا فَإِنْ یَشَأِ اللَّهُ یَخْتِمْ عَلَى قَلْبِکَ وَیَمْحُ اللَّهُ الْبَاطِلَ وَیُحِقُّ الْحَقَّ بِکَلِمَاتِهِ إِنَّهُ عَلِیمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ ﴿٢٤﴾
“নাকি তারা বলে: সে আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা উদ্ভাবন করেছে। সুতরাং আল্লাহ ইচ্ছে করলে আপনার হৃদয়ে মোহর মেরে দিতেন। আর আল্লাহ মিথ্যাকে মুছে দেন এবং নিজ বাণী দ্বারা সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেন। নিশ্চয় অন্তরসমূহে যা আছে সে বিষয়ে তিনি সবিশেষ অবগত।”(৪২: ২৪)
এই আয়াতে বলা হচ্ছে: কিছু মুনাফিক আল্লাহর রাসূলের ওপর এই অপবাদ আরোপ করত যে, তিনি যেসব কথা বলেন সেগুলো তার নিজের কথা এবং এর সঙ্গে আল্লাহর কোনো সম্পর্ক নেই। মহান আল্লাহ এসব মানুষকে উদ্দেশ করে বলছেন: যদি বিশ্বনবী এ ধরনের কাজ করেন তাহলে আল্লাহ তার অন্তরে মোহর মেরে দেবেন যাতে তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে যা নাজিল হয়নি তা আল্লাহর নামে চালিয়ে দিতে না পারেন। কারণ, ওই অবস্থায় আল্লাহ যদি তাঁকে নিবৃত না রাখেন তাহলে মানুষ হেদায়েত হওয়ার পরিবর্তে পথভ্রষ্ট হয়ে যাবে।
যেমনটি সূরা হাক্কা’র ৪৪ থেকে ৪৬ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে বলা হয়েছে: “তিনি যদি আমার নামে কোন (মিথ্যা) কথা রচনা করে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করতেন, তবে অবশ্যই আমি তাকে পাকড়াও করতাম শক্তি দিয়ে, তারপর অবশ্যই আমি কেটে দিতাম তার হৃদপিণ্ডের শিরা।”
আয়াতের পরের অংশে বলা হচ্ছে: আল্লাহ তায়ালা বাতিলকে ধ্বংস করে দেন এবং তা যাতে ওহীর সঙ্গে মিশে যেতে না পারে সে ব্যবস্থা করেন। তিনি যেসব বাণী নাজিল করে সেগুলো সত্যকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১- একজন মুমিন ব্যক্তি আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূলের কাছে আসা সবকিছুকে সত্য বলে গ্রহণ করে। আমার ইচ্ছার সঙ্গে যতটুকু মিলে যায় আমি ততটুকু নেব আর বাকিটা বর্জন করব- এটা মুমিনের কথা হতে পারে না।
২- আল্লাহ তায়ালা সত্যের সঙ্গে আপোষ করেন না। তাঁর রাসূলও যদি ভুল কথা বলেন তাহলে আল্লাহ তাঁকেও ছাড় দেবেন না বরং প্রয়োজনে তাকে নবুওয়াতের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেবেন।
সূরা শুরার ২৫ ও ২৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
وَهُوَ الَّذِی یَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ وَیَعْفُو عَنِ السَّیِّئَاتِ وَیَعْلَمُ مَا تَفْعَلُونَ ﴿٢٥﴾ وَیَسْتَجِیبُ الَّذِینَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَیَزِیدُهُمْ مِنْ فَضْلِهِ وَالْکَافِرُونَ لَهُمْ عَذَابٌ شَدِیدٌ ﴿٢٦﴾
“আর তিনিই তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করেন ও পাপসমূহ মোচন করেন এবং তোমরা যা কর তিনি তা জানেন।” (৪২: ২৫)
“আর যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে তিনি তাদের আবেদনে সাড়া দেন এবং তাদের প্রতি নিজ অনুগ্রহ বাড়িয়ে দেন; আর কাফিরদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।” (৪২: ২৬)
মানবজাতির প্রতি আল্লাহ তায়ালার সবচেয়ে বড় অনুগ্রহ হচ্ছে তিনি তাঁর কাছে ক্ষমা চেয়ে সত্য পথে ফিরে আসার জন্য সব সময় পথ খোলা রেখেছেন। আমরা মানুষেরা সাধারণত কোনো অপরাধী ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ কয়েকবার পর্যন্ত সুযোগ দেয়ার পর আর ক্ষমা করি না; এমনকি তাকে আর ক্ষমা চাওয়ারও অনুমতি দেই না। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা বলছেন: মৃত্যুর ফেরেশতা আসার আগ পর্যন্ত যতবার ইচ্ছা তিনি তওবা কবুল করতেই থাকবেন। আর তিনি মানুষের অন্তরের সব খবর রাখেন। শুধু তিনি পাপ মোচন করেই ক্ষান্ত হবেন না বরং তার অন্যান্য চাহিদাও পূরণ করবেন। যে ব্যক্তি প্রকৃত ঈমানদার এবং যে নেক আমল করে তাকে আল্লাহ এমন কিছু দান করবেন যার কথা সে কল্পনাও করত না। মুমিন ব্যক্তিদের প্রতি এটি আল্লাহর মস্তবড় দয়া ও অনুগ্রহ।
এই দুই আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে:
১- যেকোনো অপরাধীর পাপের পথ ছেড়ে সৎপথে আসার দরজা সার্বক্ষণিকভাবে উন্মুক্ত করে রেখেছে ইসলাম।
২- আল্লাহ পাপী ব্যক্তিদের বলেছেন, যদি তওবা করো তাহলে তোমাদের পাপ ক্ষমা করে দেব। তবে তওবা কবুল করার শর্ত হচ্ছে ঈমান ও নেক আমল।
সূরা শুরার ২৭ ও২৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
وَلَوْ بَسَطَ اللَّهُ الرِّزْقَ لِعِبَادِهِ لَبَغَوْا فِی الأرْضِ وَلَکِنْ یُنَزِّلُ بِقَدَرٍ مَا یَشَاءُ إِنَّهُ بِعِبَادِهِ خَبِیرٌ بَصِیرٌ ﴿٢٧﴾ وَهُوَ الَّذِی یُنَزِّلُ الْغَیْثَ مِنْ بَعْدِ مَا قَنَطُوا وَیَنْشُرُ رَحْمَتَهُ وَهُوَ الْوَلِیُّ الْحَمِیدُ ﴿٢٨﴾
“আর যদি আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের রিযিক প্রশস্ত করে দেন, তবে তারা যমীনে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে; কিন্তু তিনি তাঁর ইচ্ছেমত নির্দিষ্ট পরিমাণেই নাযিল করেন। কারণ, তিনি তার বান্দাদের সম্পর্কে সম্যক অবহিত ও সর্বদ্ৰষ্টা।” (৪২:২৭)
“আর (বৃষ্টি আসার ব্যাপারে) তারা নিরাশ হওয়ার পর তিনিই বৃষ্টি প্রেরণ করেন এবং তাঁর রহমত ছড়িয়ে দেন; এবং তিনিই অভিভাবক, অত্যন্ত প্রশংসিত।” (৪২:২৮)
বিশ্বজগত পরিচালনার প্রতিটি ক্ষেত্রে যে আল্লাহ তায়ালার প্রজ্ঞা কাজ করছে তার প্রতি ইঙ্গিত করে এখানে বলা হচ্ছে: আল্লাহ ইচ্ছা করলে যে কাউকে অনেক বেশী ধন-সম্পদ, ক্ষমতা ও শক্তি দিতে পারেন। কিন্তু এটি তাঁর প্রজ্ঞার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ এটি করা হলে মানুষ পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং সামাজিক শৃঙ্খলা বিনষ্ট হবে। পৃথিবীর সব মানুষ আল্লাহর কাছে রিজিকের প্রশস্ততা চায় এবং এই চাওয়া পূর্ণ করা আল্লাহর জন্য মোটেও অসম্ভব ব্যাপার নয়। কিন্তু প্রত্যেক বান্দা সম্পর্কে আল্লাহর যে জ্ঞান রয়েছে তার ওপর ভিত্তি করে তিনি যার যতটুকু প্রাপ্ত ও যার জন্য যতটুকু কল্যাণকর তাকে শুধুমাত্র ততটুকুই দান করেন। কারণ, ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমায় দেখা গেছে, যাদেরকে আল্লাহ তায়ালা অধিক ধন-সম্পদ দান করেছেন তারাই আল্লাহকে ভুলে গেছে এবং ভূপৃষ্ঠে ধৃষ্টতাপূর্ণ আচরণ করেছে।
অবশ্য কখনো কখনো বান্দার অলসতার কারণেই তার রিজিক সংকীর্ণ হয়ে আসে। আল্লাহ তায়ালা এমনটি চান না বরং কোনো কোনো মানুষের কর্মফল হিসেবেই তার জীবনে দুর্গতি নেমে আসে। কাজেই শুধুমাত্র আল্লাহর ওপর নির্ভর করে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলে রিজিক স্বয়ংক্রিয়ভাবে হাতে এসে ধরা দেবে না। কারণ, আল্লাহই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন অকর্মন্য লোককে তিনি রিজিক প্রদান করবেন না।
মানুষের রিজিক যে কেবলমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিল হয় তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার জন্য তিনি বৃষ্টিকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। বৃষ্টি আসা না আসায় মানুষের কোনো হাত নেই বরং এটি আল্লাহ তায়ালার জ্ঞান ও ক্ষমতার নিদর্শন। বৃষ্টি আসলে ভূপৃষ্ঠ সুজলা সুফলা হয় আর না আসলে খরা ও দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। আল্লাহ তায়ালা বৃষ্টিবর্ষণের মাধ্যমে তাঁর রহমত পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেন। এখান থেকে বোঝা যায়, গোটা মানবজাতিকে তিনি একটি বিশাল পরিবারের অভিভাবক হিসেবে ভালোবাসেন, তাদের যত্ন নেন, তাদের সব প্রয়োজন পূরণ করেন। কাজেই প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য একমাত্র তিনিই।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১- আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রজ্ঞা অনুযায়ী মানুষের আবেদন কবুল করেন।
২- বৃষ্টি আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহের নিদর্শন।
৩- মানুষের যেকোনো সমস্যা, বিপদ ও হতাশার দিনে আল্লাহ তায়ালাই হতে পারেন একমাত্র আশার আলো।#
পার্সটুডে/এমএমআই/আবুসাঈদ/০৬
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।