জুলাই ০৭, ২০২১ ১৩:৫৬ Asia/Dhaka

পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'তে সূরা আশ-শূরার অনুবাদ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। মক্কায় অবতীর্ণ এ সূরার আয়াত সংখ্যা ৫৩। সূরার ৩৮ নম্বর আয়াতের আলোচনার বিষয়বস্তু থেকে এই সূরার নামকরণ করা হয়েছে। এই আয়াতে মুমিন ব্যক্তিদেরকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার সময় শূরা বা পরামর্শ করে নিতে বলা হয়েছে। এই সূরার ২৯ নং আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَمِنْ آيَاتِهِ خَلْقُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَثَّ فِيهِمَا مِنْ دَابَّةٍ وَهُوَ عَلَى جَمْعِهِمْ إِذَا يَشَاءُ قَدِيرٌ ﴿۲۹﴾

আর তাঁর [ক্ষমতার] অন্যতম নিদর্শন হচ্ছে আসমানসমূহ ও যমীনের সৃষ্টি এবং এই দুয়ের মধ্যে তিনি যে সকল জীব-জন্তু ছড়িয়ে দিয়েছেন সেগুলো; আর তিনি যখন ইচ্ছে তখনই তাদেরকে সমবেত করতে সক্ষম(৪২: ২৯)

এই আয়াতে বলা হচ্ছে: আকাশ ও যমিন সৃষ্টি এবং তাতে যত প্রাণী ছড়িয়ে আছে তার সবই আল্লাহ তায়ালার প্রজ্ঞা ও ক্ষমতার নিদর্শন  নভোমণ্ডলে ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার কোটি তারকা নিয়ে গবেষণা করতে করতে মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে; কিন্তু এর কোনো কুলকিনারা করতে পারেনি ভূপৃষ্ঠে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য উদ্ভিদ ও প্রাণীর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য সাগরে পানির নীচে থাকা ক্ষুদ্রাকৃতির মাছ থেকে শুরু করে বিশাল তিমি পর্যন্ত সবকিছুই মহান আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন যিনি এতসব বিস্ময়কর কিছু সৃষ্টি করেছেন তার পক্ষে কিয়ামতের দিন আবার এসব সৃষ্টিকে এক জায়গায় সমবেত করা অত্যন্ত সহজ ব্যাপার

এই আয়াতের দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে: এক, আল্লাহ তায়ালা এখানে পৃথিবী ছাড়া আসমানে থাকা অন্যান্য গ্রহেও প্রাণের অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনার কথা বলেছেন এবং দুই, কিয়ামতের দিন মানুষ ছাড়া অন্যান্য প্রাণীকেও সমবেত করার কথা জানিয়ে দিয়েছেন

এই আয়াতের শিক্ষণীয় কয়েকটি দিক হচ্ছে:

- যিনি অস্তিত্বহীন অবস্থা থেকে মানুষকে অস্তিত্বে আনতে পারেন কিয়ামতের দিন তাঁর পক্ষে আবার তাদেরকে সমবেত করা সম্ভব

- প্রাণের সঞ্চার অথবা তাদেরকে সমবেত করা একমাত্র আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল; এখানে মানুষের কোনো হাত নেই

সূরা শুরার ৩০ ও ৩১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:

وَمَا أَصَابَكُمْ مِنْ مُصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُو عَنْ كَثِيرٍ ﴿۳۰﴾ وَمَا أَنْتُمْ بِمُعْجِزِينَ فِي الْأَرْضِ وَمَا لَكُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ مِنْ وَلِيٍّ وَلَا نَصِيرٍ ﴿۳۱﴾

আর তোমাদের যে বিপদ-আপদ ঘটে তা তোমাদের কৃতকর্মের কারণেই হয় এবং তিনি অনেক (অপরাধ) ক্ষমা করে দেন।” (৪২: ৩০)

আর তোমরা যমীনে [আল্লাহ্‌কে] অপারগকারী নও [ফলে তাঁর আয়ত্বের বাইরে যেতে পারবে না] এবং আল্লাহ্‌ ছাড়া তোমাদের কোনো অভিভাবক এবং কোনো সাহায্যকারী নেই।(৪২: ৩১)

এই দুই আয়াতের শুরুতে বলা হচ্ছে: বিষয়টি এমন নয় যে, কৃতকর্মের সব বিচার পরকালে হবে এবং পার্থিব জীবনে অপরাধী ব্যক্তি ছাড়া পেয়ে যাবে পৃথিবীতে মানুষ জেনেবুঝে যেসব অপকর্ম করে তার কিছু পরিণতি এখানেই ভোগ করে যেতে হয়  সূরা রুমের ৪১ নম্বর আয়াতেও যেমনটি বলা হয়েছে: “স্থলে ও জলে মানুষের কৃতকর্মের দরুন বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে। আল্লাহ তাদেরকে তাদের কর্মের শাস্তি আস্বাদন করাতে চান, যাতে তারা (আল্লাহর দিকে) ফিরে আসে।”

আজকের পরের আয়াতে বলা হচ্ছে: কোনো কোনো মানুষ মনে করে তারা পৃথিবীতে তাদের কৃতকর্মের পরিণতি থেকে পালিয়ে বাঁচতে পারবে। তারা আরো ভাবে, তারা আল্লাহ তায়ালার সৃষ্ট নিয়ম ও বিধিবিধান পরিবর্তন করে দেয়ার মাধ্যমে কোনো ধরনের বিপদ-আপদের সম্মুখীন না হয়েও তাদের যা খুশি তাই করে যেতে পারবে।

অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, তারা ভূপৃষ্ঠে অবস্থান করুক অথবা আসমানে গিয়ে লুকিয়ে থাকুক, আল্লাহর বিধান সর্বত্র প্রযোজ্য এবং তিনি ছাড়া এই সৃষ্টিজগতের আর কোনো অভিভাবক ও সাহায্যকারী নেই।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১- পার্থিব জীবনে মানুষ যত বিপদ-আপদ ও দুর্ভোগের সম্মুখীন হয় তা তার অতীত কৃতকর্মের ফল।

২- অবশ্য এসব বিপদ-আপদ তার কৃতকর্মের আংশিক ফল মাত্র। আল্লাহ তায়ালা অসীম দয়ালু বলে মানুষের বহু অপরাধ ক্ষমা করে দেন। তা না হলে সব কৃতকর্মের ফল এক জীবনে ভোগ করা মানুষের পক্ষে সম্ভব ছিল না।

৩- মানুষ আল্লাহর ক্ষমতার সামনে সম্পূর্ণ অসহায় এবং তাঁর আয়ত্বের বাইরে চলে যাওয়া মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।

সূরা শুরার ৩২ থেকে ৩৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:

وَمِنْ آيَاتِهِ الْجَوَارِ فِي الْبَحْرِ كَالْأَعْلَامِ ﴿۳۲﴾ إِنْ يَشَأْ يُسْكِنِ الرِّيحَ فَيَظْلَلْنَ رَوَاكِدَ عَلَى ظَهْرِهِ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِكُلِّ صَبَّارٍ شَكُورٍ ﴿۳۳﴾ أَوْ يُوبِقْهُنَّ بِمَا كَسَبُوا وَيَعْفُ عَنْ كَثِيرٍ ﴿۳۴﴾ وَيَعْلَمَ الَّذِينَ يُجَادِلُونَ فِي آيَاتِنَا مَا لَهُمْ مِنْ مَحِيصٍ ﴿۳۵﴾

“আর তাঁর অন্যতম নিদর্শন হচ্ছে সাগরে [চলমান] পর্বতসদৃশ নৌযানসমূহ।” (৪২:৩২)

“তিনি ইচ্ছে করলে বায়ুকে স্তব্ধ করে দিতে পারেন; ফলে নৌযানসমূহ সমুদ্রপৃষ্ঠে নিশ্চল হয়ে পড়বে। নিশ্চয় এতে অনেক নিদর্শন রয়েছে, প্রত্যেক চরম ধৈর্যশীল ও একান্ত কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য।” (৪২:৩৩)

“অথবা তিনি ইচ্ছে করলে জাহাজকে [এর আরোহীরা] যে কর্ম করেছে তার কারণে বিধ্বস্ত করে দিতে পারেন। আর অনেক (অর্জিত অপরাধ) তিনি ক্ষমা করেন।” (৪২:৩৪)

“আর যারা আমার নিদর্শন সম্পর্কে বিতর্ক করে তারা যেন জেনে রাখে, তাদের পালিয়ে যাওয়ার কোনো স্থান নেই।”(৪২:৩৫)

এখানে মানুষের জীবনে বাতাসের ভূমিকা সম্পর্কে বলা হচ্ছে: হাজার হাজার মানুষ নিয়ে বিশাল উঁচু যেসব জাহাজ সাগরে চলাচল করে সেগুলোর পানিতে ডুবে না যাওয়া আল্লাহ তায়ালার নিদর্শন। কারণ আল্লাহই এই নিয়ম সৃষ্টি করেছেন যে, যে লোহার পাতগুলো আলাদা আলাদাভাবে পানিতে ফেলে দিলে ডুবে যায় সেই পাতগুলোই পরস্পরের সঙ্গে জোড়া লেগে জাহাজের আকৃতিতে পানিতে ভেসে থাকে। এ ছাড়া, জাহাজের পালে হাওয়া লেগে এগুলো এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যে যাতায়াত করে তাও আল্লাহ তায়ালার নিদর্শন। বর্তমান যুগেও মানুষ শক্তিশালী ইঞ্জিন দিয়ে বিশালাকৃতির যেসব জাহাজ মহাসাগর পাড়ি দিয়ে পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে নিয়ে যায় তাও সম্ভব হয়েছে আল্লাহর দেওয়া ব্যবস্থা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করার মাধ্যমে। এই প্রাকৃতিক ব্যবস্থা মানুষ তৈরি করেনি বরং মানুষ এর নিয়মকানুনগুলো শিখেছে মাত্র; তাও আবার আল্লাহরই দেয়া জ্ঞান দ্বারা।

পরের আয়াতে বলা হচ্ছে: আল্লাহ চাইলে বাতাসকে থামিয়ে দিতে পারেন এবং সেক্ষেত্রে জাহাজগুলো আর নড়াচড়া করতে পারবে না। প্রকৃত অর্থেই জাহাজের থেমে থাকা বা সামনে এগিয়ে যাওয়া দু’টোই আল্লাহর হাতে। তিনি চাইলে জাহাজের আরোহীরা জীবনে যত অপরাধ করেছে তার শাস্তি হিসেবে জাহাজসহ তাদেরকে ডুবিয়ে দিতে পারেন। কিন্তু আল্লাহ তা করেন না কারণ, তিনি তাঁর বান্দাদের বহু গোনাহ ক্ষমা করে দেন। এ ছাড়া, অপরাধ করার সঙ্গে সঙ্গে শাস্তি দিলে এই পৃথিবীতে কারো পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব হবে না।

কিন্তু আত্মাভিমানী ও একগুঁয়ে কাফেররা প্রকৃতিতে ছড়িয়ে থাকা এতসব নিদর্শন দেখা সত্ত্বেও আল্লাহর অস্তিত্বকে স্বীকার করে না বরং উল্টো এসব বিষয় নিয়ে তর্ক জুড়ে দেয়। তাদের উদ্দেশ করে আল্লাহ বলছেন: তারা একদিন উপলব্ধি করবে যে, আল্লাহর শাস্তির হাত থেকে পালিয়ে বাঁচা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

এই চার আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হলো:

১- শুধুমাত্র প্রাণী নয় বরং জড় পদার্থের ওপরও আল্লাহর বেধে দেয়া নিয়ম কার্যকর। প্রাণহীন পানির উপর দিয়ে বিশালাকৃতির জাহাজের চলাচল আল্লাহর শক্তিমত্তা ও অনুগ্রহেরই নিদর্শন।

২- আল্লাহর অনুগ্রহ পেলে যেমন শুকরিয়া আদায় করা উচিত তেমনি বিপদ-আপদে ধৈর্যধারণ করে আল্লাহর সাহায্য কামনা করতে হবে।

৩- প্রকৃতিতে যা কিছু ঘটে তা শুধুমাত্র বস্তুগত দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিশ্লেষণ না করে এর পেছনে আল্লাহ তায়ালার বেঁধে দেয়া নিয়মের কথাও বিবেচনা করা উচিত। তাহলেই এসব ঘটনার প্রকৃত রহস্য উপলব্ধি করা সম্ভব।#

পার্সটুডে/এমএমআই/আবুসাঈদ/০৭

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।