সূরা আশ-শূরা: আয়াত ৪৮-৫৩ (পর্ব-১১)
পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'তে সূরা আশ-শূরার অনুবাদ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। মক্কায় অবতীর্ণ এ সূরার আয়াত সংখ্যা ৫৩। সূরার ৩৮ নম্বর আয়াতের আলোচনার বিষয়বস্তু থেকে এই সূরার নামকরণ করা হয়েছে। এই আয়াতে মুমিন ব্যক্তিদেরকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার সময় শূরা বা পরামর্শ করে নিতে বলা হয়েছে। এই সূরার ৪৮ নং আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
فَإِنْ أَعْرَضُوا فَمَا أَرْسَلْنَاکَ عَلَیْهِمْ حَفِیظًا إِنْ عَلَیْکَ إِلا الْبَلاغُ وَإِنَّا إِذَا أَذَقْنَا الإنْسَانَ مِنَّا رَحْمَةً فَرِحَ بِهَا وَإِنْ تُصِبْهُمْ سَیِّئَةٌ بِمَا قَدَّمَتْ أَیْدِیهِمْ فَإِنَّ الإنْسَانَ کَفُورٌ ﴿٤٨﴾
“অতঃপর (হে রাসূল!) যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে (জেনে রাখুন) আপনাকে তো আমি এদের রক্ষক করে পাঠাইনি (যাতে আপনি তাদের হেদায়েত করতে বাধ্য হন)। বাণী পৌছে দেয়া ছাড়া আপনার আর কোনো দায়িত্ব নেই। আর আমি যখন আমার পক্ষ থেকে মানুষকে কোন রহমত আস্বাদন করাই তখন সে এতে উৎফুল্ল হয় ও দম্ভ করে এবং যখন তাদের কৃতকর্মের জন্য তাদের কোনো বিপদ ঘটে, তখন মানুষ নিঃসন্দেহে অত্যন্ত অকৃতজ্ঞ হয়ে পড়ে।”(৪২: ৪৮)
যুগে যুগে নবী-রাসূলগণ সব সময় জাহান্নামের আগুন থেকে তাদের উম্মতের মুক্তির কথা চিন্তা করতেন। এ কারণে সাধারণ মানুষ হেদায়েতের বাণী না শুনলে তারা অত্যন্ত দুঃখ পেতেন। এ কারণে যেকোনো উপায়ে তারা যাতে সৎপথ পেতে পারে সে চেষ্টা করতেন।
এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা তাঁর রাসূলকে (সা.) উদ্দেশ করে বলছেন: হে রাসূল আপনি যত চেষ্টাই করুন না কেন একদল মানুষ কখনোই সৎপথে আসবে না। কাজেই আপনি যখন রিসালাতের বাণী তাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন তখন আপনার আর কোনো দায়িত্ব নেই। তাদেরকে ঈমান আনতে বাধ্য করা আপনার দায়িত্ব নয়। আল্লাহ চান মানুষ নিজে বুঝেশুনে ঈমান আনুক এবং এ ধরনের ঈমানই আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য।
এরপর রাসূলুল্লাহ (সা.)কে সান্ত্বনা দিয়ে আল্লাহ বলছেন: কিছু মানুষ যদি আপনার সঙ্গে উগ্র আচরণ করে থাকে তাহলে তারা আল্লাহর সঙ্গেও এমনটি করে। যখন আল্লাহ তায়ালা মানুষকে কোনো নেয়ামত দান করেন তখন সে অহংকারী হয়ে পড়ে। আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পরিবর্তে সে আল্লাহকে ভুলে যায়। পক্ষান্তরে মানুষ যখন নিজের কৃতকর্মের কারণে বিপদে পড়ে তখনও তার চেতনা হয় না এবং তখনও সে অকৃতজ্ঞ থাকে।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১- বেশিরভাগ মানুষ খুশির দিনে অহংকারী হয়ে পড়ে এবং আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করে না।
২- আল্লাহ তায়ালা মানুষকে বিপদে ফেলতে চান না। কৃতকর্মের ফল হিসেবে বিপদ মানুষকে পাকড়াও করে।
সূরা শুরার ৪৯ ও ৫০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
لِلَّهِ مُلْکُ السَّمَاوَاتِ وَالأرْضِ یَخْلُقُ مَا یَشَاءُ یَهَبُ لِمَنْ یَشَاءُ إِنَاثًا وَیَهَبُ لِمَنْ یَشَاءُ الذُّکُورَ ﴿٤٩﴾ أَوْ یُزَوِّجُهُمْ ذُکْرَانًا وَإِنَاثًا وَیَجْعَلُ مَنْ یَشَاءُ عَقِیمًا إِنَّهُ عَلِیمٌ قَدِیرٌ ﴿٥٠﴾
“আসমানসমূহ ও যমীনের আধিপত্য একমাত্র আল্লাহর। তিনি যা ইচ্ছে তা-ই সৃষ্টি করেন। তিনি যাকে ইচ্ছে কন্যা সন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছে পুত্র সন্তান দান করেন।” (৪২: ৪৯)
“অথবা তাদেরকে দান করেন পুত্র ও কন্যা উভয়ই এবং যাকে ইচ্ছে তাকে করে দেন বন্ধ্যা; নিশ্চয় তিনি সর্বজ্ঞ, ক্ষমতাবান।” (৪২: ৫০)
এই দুই আয়াতে গোটা বিশ্বজগতের ওপর আল্লাহ তায়ালা নিজের আধিপত্যের ঘোষণা দিয়ে জানাচ্ছেন, তিনি শুধু অতীতে বিশ্বজগত সৃষ্টি করেই থেমে যাননি বরং এখনো যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। এরপর মানুষের প্রতি একটি বড় নেয়ামত অর্থাৎ সন্তানের প্রতি ইঙ্গিত করে বলছেন: সন্তান সৃষ্টি করার ক্ষমতা কোনো পিতামাতার নেই। আল্লাহর সৃষ্টি সন্তানকে পৃথিবীতে আনার ক্ষেত্রে তারা মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হন মাত্র। এই আয়াতে কন্যা ও পুত্র সন্তান উভয়কে আল্লাহর পক্ষ থেকে উপহার হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। আর যাকে বন্ধ্যা করা হয়েছে তার জন্যও আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রজ্ঞা অনুযায়ী এই ব্যবস্থা নিয়েছেন। তিনি সবকিছু জানেন এবং সবার ওপর ক্ষমতাবান।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১- আল্লাহ তায়ালা সারাক্ষণ সৃষ্টি করে যাচ্ছেন এবং পৃথিবীর যে প্রান্তে যে সন্তানই ভূমিষ্ট হোক না কেন তাকে আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন।
২- আল্লাহর মহাজ্ঞান ও ক্ষমতার ওপর যদি ঈমান থাকে তাহলে আমাদের উচিত ছেলে বা মেয়ে যে সন্তানই হোক না কেন তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা। সেইসঙ্গে সন্তান না হলেও এই বিশ্বাস রাখা যে, নিশ্চয় এতেই আমার কল্যাণ রয়েছে।
সূরা শুরার ৫১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
وَمَا کَانَ لِبَشَرٍ أَنْ یُکَلِّمَهُ اللَّهُ إِلا وَحْیًا أَوْ مِنْ وَرَاءِ حِجَابٍ أَوْ یُرْسِلَ رَسُولا فَیُوحِیَ بِإِذْنِهِ مَا یَشَاءُ إِنَّهُ عَلِیٌّ حَکِیمٌ ﴿٥١﴾
“আর কোন মানুষেরই এমন মর্যাদা নেই যে, আল্লাহ তার সাথে কথা বলবেন ওহীর মাধ্যম ছাড়া, অথবা পর্দার আড়াল ছাড়া, অথবা এমন দূত প্রেরণ ছাড়া, যে দূত (বা ফেরেশতা) তাঁর অনুমতিক্রমে তিনি যা চান তা ওহী করেন, নিঃসন্দেহে তিনি সমুন্নত, প্রজ্ঞাময়।”(৪২:৫১)
সূরা শূরা নবী-রাসূলগণের প্রতি ওহী প্রেরণ সংক্রান্ত বিষয় দিয়ে শুরু হয়েছিল এবং একই বিষয়ে আলোচনা করে শেষ হয়েছে। এই আয়াতের শুরুতে বলা হচ্ছে: মানুষ সরাসরি আল্লাহর সঙ্গে কথা বলতে পারে না। কারণ, আল্লাহ মানুষের মতো কোনো দেহ ধারণ করেন না যে, তিনি মুখ দিয়ে কথা উচ্চারণ করবেন আর মানুষ কান দিয়ে তা শুনবে। আল্লাহ বরং তিন মাধ্যমে তার নবীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন। এর একটি পন্থা হচ্ছে আল্লাহর বাণী নবীদের অন্তরে এলহাম হওয়া। দ্বিতীয় পন্থা হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা বাতাসে শব্দতরঙ্গ তৈরি করেন এবং নবীরা সে তরঙ্গ শুনতে পান কিন্তু কাউকে দেখতে পান না। যেমনটি ঘটেছে হযরত মূসা (আ.)-এর ক্ষেত্রে।
তৃতীয় পন্থা হচ্ছে ওহীর ফেরেশতা হযরত জিব্রাইল সরাসরি আল্লাহর বাণী নিয়ে নবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। কিন্তু এর যে পন্থায়ই নবী-রাসূলগণ ওহী পেতেন না কেন, তারা একথা বুঝতে পারতেন যে এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিল হয়েছে।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১- আল্লাহ তায়ালা মানুষের কাছে তাঁর বাণী পৌঁছে দেয়ার জন্য নবীদের কাছে বিভিন্ন মাধ্যমে ওহী পাঠান।
২- কাকে নবী হিসেবে নির্বাচিত করা হবে সেটি আল্লাহ তায়ালা তাঁর মহাজ্ঞান ও প্রজ্ঞা দিয়ে নির্ধারণ করেন। এখানে মানুষের কোনো হাত নেই।
সূরা শুরার ৫২ ও ৫৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
وَکَذَلِکَ أَوْحَیْنَا إِلَیْکَ رُوحًا مِنْ أَمْرِنَا مَا کُنْتَ تَدْرِی مَا الْکِتَابُ وَلا الإیمَانُ وَلَکِنْ جَعَلْنَاهُ نُورًا نَهْدِی بِهِ مَنْ نَشَاءُ مِنْ عِبَادِنَا وَإِنَّکَ لَتَهْدِی إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِیمٍ ﴿٥٢﴾ صِرَاطِ اللَّهِ الَّذِی لَهُ مَا فِی السَّمَاوَاتِ وَمَا فِی الأرْضِ أَلا إِلَى اللَّهِ تَصِیرُ الأمُورُ ﴿٥٣﴾
“আর এভাবে আমি আপনার প্রতি আমার নির্দেশ থেকে রূহকে ওহী করেছি; আপনি তো জানতেন না কিতাব কি এবং ঈমান কি! কিন্তু আমি এটাকে করেছি নূর, যা দ্বারা আমি আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছে হেদায়াত দান করি; আর আপনি তো অবশ্যই সরল পথের দিকে দিকনির্দেশ করেন।”(৪২:৫২)
“সেটি আল্লাহর পথ, যিনি আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে তার মালিক। জেনে রাখুন, সব বিষয় আল্লাহরই দিকে ফিরে যাবে।”(৪২:৫৩)
এই দুই আয়াতে বিশ্বনবী(সা.)কে উদ্দেশ করে বলা হচ্ছে: অতীতের নবী-রাসূলদের প্রতি আমি যেমন ওহী প্রেরণ করেছি তেমনি আপনার অন্তরে আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি। এই কুরআন রুহ বা আত্মার মতো মানব সমাজের অন্তরে প্রাণসঞ্চার করে। সূরা আনফালের ২৪ নম্বর আয়াতের একাংশে যেমনটি বলা হয়েছে: “হে ঈমানদারগণ, রাসূল যখন তোমাদেরকে এমন কিছুর দিকে ডাকে যা তোমাদেরকে প্রাণবন্ত করে তখন তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ডাকে সাড়া দেবে।”
এরপর বলা হচ্ছে: ওহী নাজিল আল্লাহ তায়ালার একটি বিশাল নেয়ামত যার অবগাহনে প্রথমে রাসূল (সা.) শিক্ত হন। তিনি এই ওহীর প্রতিটি বাণী মনেপ্রাণে ধারণ করেন এবং তার প্রতি ঈমান আনেন। এরপর মানুষ এই ওহীর প্রতি ঈমান আনে এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে ব্রতী হয়।
একই বিষয়ে এখানে রাসূলে আকরাম (সা.)কে উদ্দেশ করে বলা হচ্ছে: পবিত্র কুরআন শুধু আপনার প্রতিই নূর বা আলো নয় বরং এটি এমন এক নূর যার মাধ্যমে গোটা বিশ্ববাসী সিরাতুল মুস্তাকিমের প্রতি হেদায়েতপ্রাপ্ত হয় এবং আপনিই মানুষকে জীবনের সঠিক পথ প্রদর্শন করেন।
সিরাতুল মুস্তাকিমের ব্যাখ্যায় এই আয়াতে বলা হয়েছে: আসমানসমূহ ও জমিনের যিনি মালিক সেই আল্লাহ তায়ালার পথই হচ্ছে সিরাতুল মুস্তাকিম। প্রকৃত অর্থেই এই পথের গন্তব্য আল্লাহ তায়ালা। একমাত্র আল্লাহর কাছে যে রাস্তায় পৌঁছে যাওয়া যাবে সেটিই সিরাতুল মুস্তাকিম বা সরল পথ। আর যে পথে বিশ্বজগতের স্রষ্টা, পরিচালক ও প্রতিপালকের কাছে পৌঁছে যাওয়া যায় তার চেয়ে সরল ও উজ্জ্বল পথ আর কি হতে পারে?
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১- নবী-রাসূলগণেরও হেদায়েতের প্রয়োজন রয়েছে যাতে তাঁরা সাধারণ মানুষের পথপ্রদর্শক হতে পারেন। এই হেদায়েত আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে এবং নিজেদের হেদায়েত করার ক্ষমতা তাঁদেরও নেই।
২- পবিত্র কুরআনের শিক্ষায় মানুষের জন্য রয়েছে হেদায়েত এবং মানব সমাজের জন্য রয়েছে প্রাণ সঞ্চারকারী উপাদান। অবশ্য আল্লাহর বাণী গ্রহণ করে সে অনুযায়ী আমল করলেই কেবল তা সমাজে প্রাণসঞ্চার করে।
৩- হেদায়েতের জন্য শুধুমাত্র কুরআন যথেষ্ট নয় বরং তা শিক্ষা দেয়ার জন্য শিক্ষক বা নবী প্রয়োজন; যিনি এই কুরআনের প্রাণসঞ্চারণকারী শিক্ষা সমাজে বাস্তবায়ন করবেন এবং নিজে সিরাতুল মুস্তাকিমের পথে আমলকারী হিসেবে সমাজের জন্য আদর্শস্থানীয় হবেন।#
পার্সটুডে/এমএমআই/আবুসাঈদ/০৭
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।