ইমামতই ইসলামী রাষ্ট্র-ব্যবস্থার মডেল : ইরানের সর্বোচ্চ নেতা
সম্প্রতি (গত ২০ সেপ্টেম্বর,২০১৬) পবিত্র ঈদে গাদিরের দিনে সর্বস্তরের জনগণকে দেয়া এক সাক্ষাতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ইসলামী রাষ্ট্রের বিধি-বিধান ও আমীরুল মু’মিনিন হযরত আলী (আ)’র কয়েকটি অসাধারণ বৈশিষ্টসহ নানা বিষয়ে বক্তব্য রেখেছেন। এখানে তার ওই ভাষণের গুরুত্বপূর্ণ কিছু অংশ তুলে ধরা হল:
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী পবিত্র ঈদে গাদির উপলক্ষে সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেছেন, গাদির দিবসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হল ইমামত। আর এই ইমামত ইসলামী শাসন-ব্যবস্থার আইন ও নীতি-নির্ধারক এবং নেতৃত্বদানকারীর ভূমিকা পালন করে। গাদির দিবসে ইসলামী সমাজের জন্য এই ইমামত বা নেতৃত্বই নির্ধারণ করা হয়েছিল যা মেনে নেয়া ছিল সবার জন্যই অত্যাবশ্যক। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে গাদিরের ঘটনার পরই নাজিল হয়েছিল সুরা মায়েদার একটি আয়াতের বিশেষ অংশ। এ সুরার তৃতীয় আয়াতে মহান আল্লাহ বলছেন, ‘যারা কাফির তারা আজ তোমাদের ধর্মের (পথে বাধা সৃষ্টির) ব্যাপারে নিরাশ হয়ে গেছে।’ –তাহলে এই দিনে কী এমন বিষয় ইসলামের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যা শত্রুকে নিরাশ করেছে? এই আয়াতের আগে ও পরে যেসব মাসলা-মাসায়েল বর্ণনা করা হয়েছে সেসব কতটা গুরুত্বপূর্ণ? ইসলামের ব্যাপারে কাফিরদের নিরাশ হওয়ার বিষয়টি নামাজ সম্পর্কে বলা হয়নি, জাকাত ও জিহাদ এবং এমনকি হজ সম্পর্কেও বলা হয়নি। তাহলে ইসলামের গৌণ বিধানগুলো এ বক্তব্যের উদ্দেশ্য নয়। বরং এখানে ইসলামী সমাজের নেতৃত্ব তথা ইমামতের দিকেই ইশারা করা হয়েছে।
আসলে এই ইমামত নির্ধারণের কাজ তথা বিশ্বনবীর (সা) খলিফা নির্ধারণের বিষয়টি প্রকাশ্যে ঘোষণা দেয়ার জন্যই মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর সর্বশেষ রাসুলের প্রতি নির্দেশ এসেছিল। এই নির্দেশে মহান আল্লাহ বলছেন (সুরা মায়েদার ৬৭ নম্বর আয়াতে): ‘হে রাসুল! পৌঁছে দিন আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আপনার ওপর যা নাজিল হয়েছে। আর যদি আপনি এরূপ না করেন, তবে আপনি তাঁর পয়গাম কিছুই পৌঁছালেন না। আল্লাহ আপনাকে মানুষের কাছ থেকে রক্ষা করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ কাফেরদেরকে পথ প্রদর্শন করেন না।’এ নির্দেশের কারণেই বিশ্বনবী (সা) বিদায় হজ শেষে গাদিরে খুম নামক স্থানে হাজিদের কাফেলাগুলোকে থামতে বলেন এবং তাদের সমাবেশে হযরত আলী (আ)’র হাত উঁচু করে তুলে ধরে তাঁকে নিজের খলিফা বা স্থলাভিষিক্ত বলে ঘোষণা করেন। আর এরপরই নাজিল হল কুরআনের আয়াত তথা সুরা মায়েদার ৩ নম্বর আয়াতের অংশ। মহান আল্লাহ এ আয়াতে বলেছেন,
‘আজ কাফেররা তোমাদের দ্বীন (বিরোধী তৎপরতা) থেকে নিরাশ হয়ে গেছে। অতএব তাদেরকে ভয় করো না বরং আমাকে ভয় কর। আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পূর্নাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অবদান সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্যে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম।’
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা গাদির দিবসে অনুষ্ঠিত ওই সমাবেশে আরও বলেছেন, গাদিরের ঘটনা ছিল রাসুল-পরবর্তী মুসলিম সমাজে ইসলামী শাসন-ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আইনি-ভিত্তি। আর এ থেকে বোঝা যায় বিশ্বনবীর (সা) পর ইসলামী রাষ্ট্র-ব্যবস্থার মডেল হল ইমামত ও বেলায়াত বা অভিভাবকত্ব। রাজতান্ত্রিক, ব্যক্তিতান্ত্রিক ও অভিজাততন্ত্র-ভিত্তিক রাষ্ট্র-ব্যবস্থাকে ইসলাম অনুমোদন দেয় না।
[শিয়া মাজহাব অনুযায়ী বিশ্বনবী (সা) তাঁর পর কে মুসলমানদের নেতা হবেন তা মহান আল্লাহর নির্দেশে ঘোষণা করে গেছেন এবং মুসলমানদের জন্য এই ইমামত বা নেতৃত্বের বিষয়টি নির্বাচন-ভিত্তিক নয়। খোদায়ী নির্দেশের ভিত্তিতে বিশ্বনবী (সা)’র পবিত্র আহলে বাইতের মধ্য থেকে ১২ জন ইমামই মুসলমানদের নেতা বা খলিফা। এই ১২ জনের প্রথম হলেন হযরত আলী (আ) এবং সর্বশেষ ব্যক্তি হলেন হযরত ইমাম মাহদি (আ)। আর এই মাসুম ইমামদের অনুপস্থিতিতে একজন যোগ্য ফকিহ বা ইসলামী আইনবিদ ও ইসলাম-বিশেষজ্ঞ ইসলামী সমাজ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবেন। এই ফকিহ বা বিশেষজ্ঞকে বলা হয় ওলিয়ে ফকিহ। তিনি ইমাম মাহদির (আ) প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচিত হন। ওলিয়ে ফকিহকে হতে হয় দূরদর্শী, বিচক্ষণ, ন্যায়-বিচারক এবং ইসলামী সমাজ পরিচালনার সমস্ত যোগ্যতাগুলোর অধিকারী। প্রকৃতপক্ষে মহান আল্লাহই হচ্ছেন প্রকৃত শাসক। ইমাম এবং ওলিয়ে ফকিহ মহান আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নের নির্বাহী মাত্র। তাঁরা নিজের খেয়াল-খুশির আলোকে শাসন পরিচালনা করতে পারেন না। তাই মাসুম ইমাম বা নিষ্পাপ ইমামদের শাসন-পদ্ধতির সঙ্গে ওলিয়ে ফকিহর শাসন-পদ্ধতির কোনো পার্থক্য নেই। যদিও শাসনের মান ও জনগণকে সুপথ দেখানোর ক্ষেত্রে মাসুম ইমামদের শাসন অনেক বেশি উন্নত।]
হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী গাদির দিবসের ভাষণে আরও বলেছেন, বিশ্বনবী (সা)’র পর মাসুম ইমামদের নেতৃত্বের বিষয়টি শক্ত ও অকাট্য দলিল-প্রমাণ-ভিত্তিক। কিন্তু এই বিশ্বাসটি এমনভাবে প্রচার করা ঠিক হবে না যে তাতে আহলে সুন্নাতের অনুসারী ভাইরা উত্তেজিত হতে পারেন। আহলে সুন্নাতের সম্মানিত ব্যক্তিবর্গের অবমাননা করা মাসুম ইমামদের আদর্শের খেলাপ বলে তিনি মনে করেন।আহলে সুন্নাতের সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ সম্পর্কে অশালীন কথা বলা হলে তাতে তাদের মধ্যে ক্রোধ ও ক্ষোভের এক প্রাচীর বা বেষ্টনী তৈরি হয় এবং এর ফলে তা ইমামতের সত্যতা ও যৌক্তিকতা তুলে ধরার পথে বাধা সৃষ্টি করে বলে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মনে করেন। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেছেন, শিয়া মাজহাবের নাম ভাঙ্গিয়ে অন্যান্য ইসলামী মাজহাবের অবমাননার কাজে জড়িত ব্যক্তিরা আসলে ‘ব্রিটিশ শিয়া’ (তারা প্রকৃত শিয়া নয়)। আর এরই পরিণতিতে গড়ে উঠেছে মার্কিন ও ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অনুচর হিসেবে সক্রিয় দায়েশ ও আননুসরার মত খবিস নানা গোষ্ঠী। এইসব গোষ্ঠী মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক অপরাধ ও ধ্বংসযজ্ঞে জড়িত হয়েছে।
উল্লেখ্য, বর্তমানে ১৭টি স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল শিয়া মাজহাবের নাম ভাঙ্গিয়ে শিয়া মাজহাবের সুনাম ক্ষুণ্ণ করার জন্য তৎপরতা চালাচ্ছে। এই টেলিভিশনগুলোর অর্থ যোগাচ্ছে ব্রিটিশ ও মার্কিন সরকার। মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি ও শিয়া মাজহাবের চেহারাকে বিকৃতভাবে তুলে ধরা তথা এই মাজহাবকে খুবই হিংস্র প্রকৃতির মাজহাব হিসেবে তুলে ধরার জন্য সক্রিয় রয়েছে এইসব টেলিভিশন। আহলে-বাইত, ফাদাক ও আনোয়ার টিভি এই চ্যানেলগুলোর অন্যতম।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা গাদির দিবসে আরও বলেছেন, ঈদে গাদির দিবসে শাসন-ব্যবস্থার নীতি নির্ধারণের পাশাপাশি হযরত আলী (আ)-কে ইমামতের মডেল হিসেবেও তুলে ধরা হয়েছে। আর হযরত আলী (আ)’র আলোকোজ্জ্বল ও পবিত্র ব্যক্তিত্বকে বিন্দুমাত্রও বিকৃত করার সাধ্য কারো নেই। তিনি এ প্রসঙ্গে আরও বলেছেন, আলী (আ)’র নজিরবিহীন আধ্যাত্মিক নানা বৈশিষ্ট্য, গভীর ঈমান ও আন্তরিকতাকে উপলব্ধি করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়, কিন্তু এ মহাপুরুষের উচ্চতর মানবীয় গুণগুলোকে বোঝা ও অনুসরণ করা সম্ভব। সাহসিকতা, দয়া, আত্মত্যাগ ও ক্ষমাশীলতা ছিল আলী (আ)’র কয়েকটি মানবীয় গুণ। মানুষের প্রিয় ও সম্মানসূচক সব গুণের সমাবেশ ঘটেছিল হযরত আলীর মধ্যে। তিনি ছিলেন এমন এক ব্যক্তিত্ব যাকে শিয়া ও সুন্নি সবাইই সম্মান করে এবং এমনকি কোনো ধর্মেই বিশ্বাস করে না- এমন ব্যক্তিরাও হযরত আলীর (আ) মহত গুণগুলোর বিষয়ে জানার পর বিনয়াবনত চিত্তে তাঁর প্রশংসা করতে বাধ্য হন।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আমীরুল মু’মিনিনের রাষ্ট্র-সম্পর্কিত নানা বৈশিষ্ট্য তুলে ধরতে গিয়ে তাঁর ন্যায়বিচার, দুনিয়া-বিমুখতা, সর্বোত্তম পরিচালনা, দায়িত্ব পালনে দ্রুতগতি-সম্পন্ন হওয়া এবং সমাজকে খোদাভীতি ও ন্যায়বিচারের পথে পরিচালনার ক্ষেত্রে নির্ভিকতার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, এটা ঠিক যে আলী (আ)’র মত পরিপূর্ণ গুণগুলোর অধিকারী হওয়া অসম্ভব, কিন্তু সাধ্য ও ঈমান অনুযায়ী মানবতার এই উচ্চ-শিখরের অনুসরণ করার চেষ্টা চালাতে হবে। হযরত আলী (আ)’র অনুসারীদেরকে আমানতদার, দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরোধী এবং অপচয়-প্রতিরোধকারী হতে হবে বলেও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা তার ভাষণে ইঙ্গিত করেছেন। #
পার্সটুডে/মু.আ.হুসাইন/২৫