বাংলাদেশে এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং শুরু: রাজনৈতিক অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
বাংলাদেশের সরকারের পক্ষ থেকে কিছুদিন আগেও দাবি করা হয়েছে যে, বিদ্যুতের 'লোডশেডিং' তারা জাদুঘরে পাঠিয়ে দিয়েছে। অথচ মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে দেশজুড়ে তীব্র গরমে মাঝে জনজীবনে দুর্ভোগ সৃষ্টি করে আজ (মঙ্গলবার) সকাল থেকে এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং শুরু হয়েছে।
জ্বালানি তেলের আমদানিতে লোকসান কমাতে গতকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে (পিএমও) বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিষয়ক সমন্বয় সভায় ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এ ছাড়াও মসজিদের নামাযের সময় ছাড়া এসি বন্ধ রাখা, রাত ৮টার পর দোকান ও শপিংমল বন্ধ রাখা এবং সপ্তাহে একদিন পেট্রল পাম্পও বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
সভা শেষে সংবাদ সম্মেলন করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ড. নসরুল হামিদ বলেন, প্রাথমিকভাবে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে ঘণ্টাব্যাপী লোডশেডিং চলবে এবং তা পর্যাপ্ত না হলে লোডশেডিংয়ের মেয়াদ বাড়ানো হবে।
প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী বলেন, ‘বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় ১,০০০ মেগাওয়াট থেকে ১,৫০০ মেগাওয়াট ঘাটতি হবে। ফলে কর্তৃপক্ষ সারা দেশে পর্যায়ক্রমে এক থেকে দুই ঘণ্টা বিদ্যুতের লোডশেডিং করতে বাধ্য হবেন।’ দেশে ফিলিং স্টেশনগুলোও সপ্তাহে এক দিন বন্ধ রাখা হবে। এ সিদ্ধান্ত সাময়িক বৈশ্বিক পরিস্থিতির উন্নতির পরপরই আমরা সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ উৎপাদনে ফিরে যাব।’
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে ১০টি। সেগুলোর মোট উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ২৯০ মেগাওয়াট। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকায় কয়েক মাস ধরে এসব কেন্দ্র চালিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচও ব্যাপক হারে বেড়ে গেছে। এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে যে পরিমাণ ডিজেল আমদানি হয়, তার ১০ শতাংশ ব্যবহার হয় বিদ্যুতে। ডিজেলচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচও অনেক বেশি। ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধের ফলে ১০ শতাংশ জ্বালানি সাশ্রয় হবে। একই সঙ্গে এসব কেন্দ্র বন্ধের ফলে এক-দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতিও তৈরি হবে।
মিতব্যয়ী হওয়ার আহ্বান শেখ হাসিনার
এদিকে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিদ্যুৎসহ সব ক্ষেত্রে জনগণকে মিতব্যয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। আজ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সভায় যুক্ত হয়ে প্রধানমন্ত্রী এ আহ্বান জানান।
সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ‘সরকারপ্রধান বলেছেন—বিদ্যুৎসহ সব ক্ষেত্রে আমাদের মিতব্যয়ী হতে হবে। আসুন সবাই মিতব্যয়ী হই। সরকারের বাইরে যারা সাধারণ নাগরিক আছেন সবাইকে মিতব্যয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।’
সরকার চোখে সর্ষে ফুল দেখছে: মির্জা ফখরুল
বিদ্যুৎসহ চলমান নানা সংকট সরকারকে পতনের দিকে নিয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার চোখে সর্ষে ফুল দেখছে। জনগণ ফুঁসে উঠছে এবং সরকারের পতন তরান্বিত হবে।
আজ (মঙ্গলবার) রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। গতকাল (সোমবার) রাতে অনুষ্ঠিত দলের স্থায়ী কমিটির সভার সিদ্ধান্ত জানাতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
মির্জা ফখরুল বলেন, সরকার বিশেষ কোম্পানিকে সুবিধা দিতে কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্ট করেছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, যার মূল কারণ চুরি ও দুর্নীতি। আর এর মূল্য দিতে হচ্ছে জনগণকে। সরকারের দুর্নীতি, পরিকল্পনার অভাব এবং অযোগ্যতার কারণেই লোডশেডিং ও জনভোগান্তি। এই সংকটের প্রভাব পড়বে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
সরকারের অতিকথন ও আত্মতুষ্টির খেসারত দিচ্ছে জনগণ: সাইফুল
দেশজুড়ে মারাত্মক লোডশেডিংয়ের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। সম্প্রতি গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, বিদ্যুৎ নিয়ে সরকারের অতিকথন ও আত্মতুষ্টির খেসারত দিচ্ছে জনগণ। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ দম্ভ করে বলে আসছিলেন, শতভাগ বিদ্যুৎ নিশ্চিত করে লোডশেডিং জাদুঘরে পাঠানো হয়েছে। তাই কেবল ইউক্রেনের যুদ্ধ বা আন্তর্জাতিক বাজারের কথা বলে মারাত্মক বিদ্যুৎ ঘাটতির দায় এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। বিদ্যুৎ ঘাটতির এই পরিস্থিতি চলতে দিলে শিল্প উৎপাদন থেকে শুরু করে জরুরি সেবা খাতেও বড় সংকট দেখা দেবে।
রিজার্ভে টান পড়েছে বলে লোডশেডিং: টুকু
শতভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদন সত্বেও কেন এলাকাভিত্তিক লোডশেডিংয়ের সিদ্ধান্তে আসতে হলো সরকারকে এমন প্রশ্ন তুলেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক বিদ্যুত প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
তিনি দাবি করেন, বিদ্যুৎ সঙ্কট মোকাবেলা করার জন্য এলাকাভিত্তিক লোকশেডিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয়নি। রিজার্ভে টান পড়েছে বলে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রিজার্ভ সংকটের কারণে এখন তেল, গ্যাস আমদানি করতে পারছে না।
সোমবার বিকালে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে টুকু বলেন, সরকার এতো ঢোল পেটালো সিঙ্গাপুর, ব্যাংককে ছাড়িয়ে গেছি। সেই রিজার্ভ এখন কোথায়? হঠাৎ করে নাই হয়ে গেলো কেন? আজকে দেশ অর্থনৈতিক ক্রাইসিসে দাঁড়িয়ে গেছে। শতভাগ বিদ্যুতের দেশ বলে হাতিরঝিলে অনেক ফানুস উড়লো, কিন্তু আজকে এসে আমরা বিদ্যুৎ পাচ্ছি না। আর এজন্য পুরোপুরি সরকার দায়ী।
তিনি বলেন, সরকারের পরিকল্পনায় বলা ছিল ৬৪ ভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদন থাকবে সরকারের হাতে, আর ৩৬ ভাগ থাকবে বেসরকারি হাতে। সরকার তড়িঘড়ি করে বেজ প্লান্টগুলো বেসরকারি সেক্টরে দিয়ে দিল। সবকিছু মিলিয়ে আমি মনে করি এই পরিকল্পনা খারাপ, দূরভিসন্ধিমূলক এবং দুর্নীতিগ্রস্তু ছিল। যার ফলে বিদ্যুতের যে আইন তা জলাঞ্জলি দিয়ে সংসদে আইন পাস করে যাকে ইচ্ছে তাকে পাওয়ার স্টেশন দিয়েছে।
তিনি বলেন, আমাদের সরকারি কোষাগার থেকে টাকা যাবে পাওয়ার স্টেশন মালিকদের কাছে,তারা পাওয়ার স্টেশন না চালিয়ে টাকা নিয়ে যাবে। আর শতভাগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের জনগণ। এ যে সরকার অনিয়ম করে গেলো, এটা আমাদের দেশ ও জাতিকে অনেকদিন বহন করতে হবে।
‘এটি বড় ধরনের কূটচাল’ মন্তব্য করে টুকু বলেন, জনগণের টাকা অন্যের পকেটে দিয়ে দেওয়া বড় ধরনের কূটচাল। যেটি দুর্নীতিগ্রস্থ, ফ্যাসিস্ট সরকারই করে।’
বিএনপি দিয়েছে বিদ্যুৎ সংযোগহীন খাম্বা: কাদের
তবে খানিকটা সাফাই গেয়ে উদোর পিন্ডি বুদোর ঘারে চাপিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, জনগণ বিদ্যুৎ সংযোগহীন খাম্বা দুর্নীতির কথা এখনো ভুলে যায়নি। ভুলে যায়নি বিদ্যুতের দাবিতে মিছিলে গুলির কথা, হ্যারিকেন-কুপি নিয়ে বিক্ষোভ এবং বিদ্যুৎ ভবন ঘেরাওয়ের কথা। বিএনপি আমলে জনগণ বিদ্যুৎ পায়নি, পেয়েছিলো শুধু খাম্বা।
আজ সকালে তার বাসভবনে ব্রিফিংকালে বিএনপি নেতাদের উদ্দেশে তিনি এই মন্তব্য করেন। মন্ত্রী বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে সরকারের পতন হবে- বিএনপি নেতাদের এমন রঙিন খোয়াব অচিরেই দুঃস্বপ্নে পরিণত হবে। বিদ্যুৎ নিয়ে তারা কোন মুখে বড় কথা বলে? তাদের কি বিন্দুমাত্র লাজ-শরম নেই?
তিনি বলেন, যারা দেশকে অন্ধকারে নিমজ্জিত করেছিলো, দিনের পর দিন যাদের শাসনামলে দিনের অর্ধেক সময় লোডশেডিং চলতো, শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছিলো, তারা আজ বিদ্যুৎ নিয়ে কথা বলে।
ওবায়দুল কাদের বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আবারও কিছুটা হুমকির মুখে ফেলেছে। যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি মার্কেট চরম অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে, এই পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনীতি যাতে বড় কোন ক্ষতির সম্মুখীন না হয় সে লক্ষ্যে সরকারকে আগেভাগেই কিছু সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। সাময়িক অসুবিধায় ধৈর্য ধরার এবং সহযোগিতা করার জন্য দেশবাসীকে আহবান জানিয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, যিনি সংকটকে সম্ভাবনায় রূপ দেন তার ওপর অতীতে যেমন আস্থা রেখেছেন, এখনও রাখুন।#
পার্সটুডে/আবদুর রহমান খান/আশরাফুর রহমান/১৯
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।