লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন ব্যাহত
গাড়ি নিয়ে ছোটাছুটি না করতে মন্ত্রীদের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
জ্বালানির ব্যবহার কমাতে মন্ত্রীদের গাড়ি নিয়ে বেশি ছোটাছুটি না করে ভার্চুয়ালি যোগাযোগ বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় কৃচ্ছ্রসাধনে যথাযথ উদ্যোগ নিতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
আজ (সোমবার) সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, তিনটি ক্যাটাগরি তৈরি করে টাকা খরচের সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছে। শিগগিরই দরকার নাই এমন সব জিনিসপত্র ক্রয় না করতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এছাড়া সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশে প্রশিক্ষণও আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
মন্ত্রিসভার বৈঠক থেকে বেরিয়ে এসে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, এখন যে সংকট হচ্ছে সেটা আসলে বৈশ্বিক, একইভাবে বাংলাদেশেরও। এই সংকট আরও বাড়বে কিনা, সেটা এখনই বলা যাচ্ছে না।
দেশে এখন জ্বালানি নিয়ে সংকট আছে স্বীকার করে সেতুমন্ত্রী বলেন, তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেকোনও সমস্যা সমাধানের জন্য পারদর্শী। তাই এই সমস্যাও বেশিদিন থাকবে না।
উল্লেখ্য, শিল্পে ব্যবহার্য গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটের কারণে কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তৈরি পোশাক, ইস্পাত, সার ও সিরামিক কারখানাগুলোতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে। লোডশেডিং ও গ্যাসের কম চাপ বেশিরভাগ কারখানার উৎপাদন ব্যাহত করছে। শক্তির বিকল্প উৎস ব্যবহার করে সংকট মোকাবিলার চেষ্টা করছেন মালিকরা। পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন রপ্তানিকারকরা।
গ্যাস স্বল্পতার কারণে গ্যাসনির্ভর বেশ কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকায় ঈদুল আজহার আগেই বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহে রাশ টানা হয়েছিল। বিশ্বে জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত গ্যাস বা এলএনজির দাম বাড়ায় বাংলাদেশে আমদানি কমেছে।
ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে দাম চড়ে যাওয়ায় খোলাবাজার বা স্পট মার্কেট থেকে বাংলাদেশ এলএনজি কেনা বন্ধ রাখে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডলারের দাম বৃদ্ধি। বাংলাদেশে চাহিদার তুলনায় জোগান কমে যাওয়ায় বাজারে ডলারের সংকট দেখা যাচ্ছে। আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় এ আন্তর্জাতিক মুদ্রার দাম বেড়েই চলেছে।
এ পরিস্থিতিতে সরকার জ্বালানি সাশ্রয়ে অর্থাৎ বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং করা হচ্ছে, সপ্তাহে এক দিন পাম্প বন্ধ রাখা হচ্ছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী ৭ জুলাই সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, সারা দেশে এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং করা, সরকারি অফিসের সময় সকাল ৯টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত করা, বিয়ের অনুষ্ঠান সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে শেষ করা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি) তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার ওপরে রাখা, আলোকসজ্জা না করা, রাত ৮টার মধ্যে শপিং মল বন্ধ, ঘরে বসে কাজ করা যায় কি না এসব ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। এসবের সঙ্গে মসজিদ-মন্দিরে বিদ্যুতের ও এসির ব্যবহার বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এভাবে বিদ্যুতের চাহিদা ৫০০ মেগাওয়াট কমে আসবে বলে আশা করছে সরকার।
তবে রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানার মালিকরা জানিয়েছেন, লোডশেডিংয়ের কারণে দিনে তিন-চার ঘণ্টা জেনারেটর চালু রাখতে হয়। ফলে ৩-৫ শতাংশ উৎপাদন ব্যাহত হয়। ফলে উৎপাদন খরচ প্রায় ১১ শতাংশ বেড়েছে। তাদের উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
এদিকে, পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে পরামর্শ দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশের ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই। এফবিসিসিআই মনে করছে, এ সংকট মোকাবিলায় সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকা উচিত ছিল।
এ প্রসঙ্গে, বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) ভাইস প্রেসিডেন্ট শহীদুল্লাহ আজিম গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে এবং উৎপাদন অনেক কমে গেছে। মেশিন বন্ধ রাখা হচ্ছে। কিছু কারখানা বন্ধও হয়ে গেছে। সরকারের কাছে পর্যাপ্ত গ্যাস ও বিদ্যুৎ নেই। আমরা চাইলেও এসবের জোগান দিতে পারব না। সরকারের একটা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকা উচিত ছিল। সকাল-বিকেলের পরিকল্পনা না। সারা জীবন আমাদের গ্যাস থাকবে না, বিদ্যুৎ থাকবে না, তাহলে বিকল্প কী? সব দেশই কিন্তু পরিকল্পনা করে রাখে। গ্যাসের মজুদ আরও বাড়াতে হবে।’
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি রিজওয়ান রাহমান বলেছেন, ‘আমাদের অপচয় বন্ধ করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় আমদানি কমানো এবং ব্যবসার খরচ কমিয়ে আনতে হবে। বাকিটা বেসরকারি খাত থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। ডলার ও জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে।
এফবিসিসিআইয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট আমিন হিলালী বলেছেন, ‘বিদ্যুতের ব্যবহার কীভাবে হওয়া উচিত, সে বিষয়ে অংশীজনদের মতামত নিয়ে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে সরকারকে সুপারিশ করা হবে। সরকার তা যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেবে বলে আশা করছি। সাধ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ পরিমাণ বিদ্যুৎ কীভাবে উৎপাদন করা যায় সে বিষয়ে একটি সেমিনার করবে এফবিসিসিআই।#
পার্সটুডে/আবদুর রহমান খান/আশরাফুর রহমান/২৫