যেসব কারণে ক্যাম্প থেকে পালাচ্ছে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা
নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ছাড়া মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো বা ভাষানচরে আশ্রয় কেন্দ্রে পাঠানোর ভয়ে এবং উন্নত জীবন-জীবিকার সন্ধানে উখিয়া-টেকনাফের ত্রাণ শিবির থেকে পালিয়ে যাচ্ছে রোহিঙ্গারা। অনেকে পালাতে গিয়ে ধরা পরার কারণে বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আসে।
রোহিঙ্গাদের মধ্যে শিবির পালানোর প্রবণতা ঠেকাতে নানাভাবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো উদ্যোগ নিলেও কোনোভাবেই প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না। রোহিঙ্গাদের আকার আকৃতি, ভাষা, পোশাক-পরিচ্ছদ, আচার-আচরণ স্থানীয়দের সামঞ্জস্যপূর্ণ হবার কারণে রোহিঙ্গা পুরুষ, নারী ও শিশুরা সহজেই স্থানীয় জনগনের মাঝে মিশে যাচ্ছে।
ওদিকে, সিয়ানমারে অব্যাহত নিপীড়ন-নির্যাতনের মুখে এখনো রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পালিয়ে আসা অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া, ভারত ও সৌদি আরবে আশ্রিত অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে চলে আসছে। এরই মধ্যে এক হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা ভারত থেকে কক্সবাজারে ট্রানজিট ক্যাম্পে এসে পৌঁছেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গতকাল শনিবার সকালে ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী ১০/১২ জন রোহিঙ্গা পায়ে হেঁটে উখিয়া সীমান্ত পার হয়ে দালালের মাধ্যমে কুতুপালং ক্যাম্পে তাদের স্বজনদের ঘরে আশ্রয় নিয়েছে।
এসব রোহিঙ্গারা জানিয়েছেন, তারা প্রাণ বাঁচাতে অনেক কষ্ট করে এখানে এসেছেন। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বুচিডং লাওয়াদক প্রাংন্সী গ্রামে তাদের বাড়ি। গত ৪ জানুয়ারি বিদ্রোহী রাখাইন সম্প্রদায় সেনা ক্যাম্পে হামলা চালায়। এরই জের ধরে সেনাবাহিনী ও বিজিপি সদস্যরা রোহিঙ্গাদের গণহারে গ্রেফতার, নির্যাতন ও ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে যুবকরা তাদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। তাই প্রাণ বাঁচাতে তারা এখানে পালিয়ে এসেছেন।
এসব রোহিঙ্গারা আরো জানিয়েছে, তাদের আত্মীয়-স্বজন চট্টগ্রামের হালিশহর, পাথরঘাটা, বাকলিয়া এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছে দীর্ঘদিন ধরে। তাদের আশা ওসব স্বজনদের বাড়িঘরে আশ্রয় নিয়ে বিভিন্ন শিল্প-কারখানা ও গার্মেন্টসে চাকরির চেষ্টা করবে।
এরইমধ্যে, গত শুক্রবার উখিয়া থানা পুলিশ মরিচ্যা এলাকায় যানবাহনে তল্লাশি চালিয়ে ১৮ জন রোহিঙ্গাকে আটক করে কুতুপালং ক্যাম্পে ফেরত পাঠিয়েছে। একই দিনে বিজিবি সদস্যরা তিনজন রোহিঙ্গাকে যাত্রীবাহী গাড়ী থেকে আটক করে উখিয়া থানা পুলিশের নিকট সোপর্দ করেছে। ১ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার উপজেলা প্রশাসন ১০ জন রোহিঙ্গাকে আটক করে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে রোহিঙ্গা এডুকেশন ডেভলপমেন্ট-এর সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ জমির উদ্দিন রেডিও তেহরানকে বলেন, নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ছাড়া তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হতে পারে অথবা সাগরের বুকে ভাষানচরে তাদের সরিয়ে নয়া হতে পারে এমন আতঙ্ক থেকে রোহিঙ্গারা ক্যাম্প থেকে পালিয়ে যাচ্ছে।
এসব রোহিঙ্গার মধ্যে অনেকে উন্নত জীবনযাপনের আশায় দেশের বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিচ্ছে। অনেকে আবার মালয়েশিয়া পাড়ি জমানোর উদ্দেশ্য নিয়ে দালালের খপ্পরে পড়ছে।
এ প্রসঙ্গে কক্সবাজারের স্থানীয় সাংবাদিক নুরুল ইসলাম রেডিও তেহরানকে জানান, এখন শীতকালে সমুদ্র শান্ত থাকার কারণে আনেক রোহিঙ্গা সমুদ্র পথে খাইল্যান্ড উপকূল ধরে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমাচ্ছে। সেখানে অনেকের আত্মীয়-স্বজন রয়েছে এবং কাজেরও সূযোগও আছে।
এদিকে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা দিন দিন কমে যাওয়ায় শিবিরের তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাসহ দেশি-বিদেশি এনজিওকর্মীরাও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। এ কারণে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে নতুন করে রোহিঙ্গাদের ভেরিফিকেশন (যাচাই) শুরু হয়েছে।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী শিবিরগুলো থেকে প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গার খোঁজ মিলছে না। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনসহ রোহিঙ্গা শিবির তদারকির দায়িত্বে থাকা সরকারের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ আবুল কালাম জানিয়েছন, ‘শিবিরে আশ্রয় নেওয়া বেশ কিছু রোহিঙ্গার খোঁজ মিলছে না। এ রকম নিখোঁজ রোহিঙ্গার কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে দুই লক্ষাধিক রোহিঙ্গার মধ্যে মাত্র এক লাখ ৬০ হাজারের মতো রোহিঙ্গা পরিবার বর্তমানে রেশন নিচ্ছে।
রোহিঙ্গাবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থার সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা ইন্টার সেক্টর কো-অর্ডিনেশন গ্রুপ (আইএসসিজি) সূত্রে জানা গেছে, শিবিরগুলোতে বায়োমেট্রিক পদ্ধতির আওতায় আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা রয়েছে ১১ লাখ ১৮ হাজার। অথচ বর্তমানে শিবিরে রোহিঙ্গার হদিস মিলছে ৯ লাখ ১৫ হাজার। আরো দুই লাখ রোহিঙ্গার হদিস না মেলায় শ্মরণার্থী কর্তৃপক্ষের মাঝেও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।#
পার্সটুডে/আবদুর রহমান খান/আশরাফুর রহমান/৩
খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন