ঢাকায় অগ্নিকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি: করণীয় সম্পর্কে অভিমত
বাংলায় একটি প্রবাদ রয়েছে- চোর পালালে বুদ্ধি হয়। রাজধানী ঢাকায় পরপর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ ও সম্পদ নষ্ট হবার পর আমাদের নানারকম বুদ্ধি এলেও সেসব বুদ্ধি কাজে লাগাতে না পারার কারণে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয় নি।
তাছাড়া নাগরিকরা অসহায়ভাবে লক্ষ্য করছেন যে, যাদের কর্তব্যের অবহেলায় বারবার এ জাতীয় অগ্নি দুর্ঘটনা ঘটছে তাদের বিরুদ্ধেও কোনো কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। এরকম পরিস্থিতিতে আজ (শনিবার) ভোরে রাজধানীর গুলশান-১ এর সিটি কর্পোরেশন কাঁচাবাজারে আরো একটি আগুনের ঘটনা ঘটে।
গুলশান কাঁচাবাজারে আগুন নেভানোর কাজে নিযুক্ত হয়ে ফায়ার সার্ভসের কর্মকর্তারা বলেছেন, দু'বছর আগে একই মার্কেটে আগুন লাগার পর যেসব প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার সুপারিশ করা হয়েছিল তা মানা হয় নি বলে এবার আগুনের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে।
এ আগে বৃহস্পতিবার বনানীতে আগুনে পোড়া এফ আর টাওয়ার পরিদর্শন করেছে, স্বরাষ্ট্র ও ত্রাণ-দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের দুটি তদন্ত কমিটি। ভবনের ক্ষতিগ্রস্ত তলাগুলো পরিদর্শন শেষে তদন্ত কমিটি সাংবাদিকদের জানান, ভবনটিতে অগ্নি নির্বাপণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না। এছাড়া, সিঁড়িও ছিল সরু।
নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে ২০১১ সালেই এফ আর টাওয়ারের মালিককে নোটিশ দিয়েছিল ফায়ার সার্ভিস। কিন্তু তা আমলেই নেয়নি মালিকপক্ষ। ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা বলেছেন, এসব বহুতল ভবনের চারিদিকে যে ফাঁকা জায়গা রাখা দরকার ছিল তা রাখা হয় নি বলে আগুন নেভাতে তাদের বেগ পেতে হয়েছে।
আগুনে পোড়া এফ আর টাওয়ার পরিদর্শন করে বিশেষজ্ঞরা জানান, বিল্ডিং কোড অনুযায়ী নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থাই ছিলো না ভবনটিতে। এফ আর টাওয়ারের পুড়ে যাওয়া কয়েকটি তলা ঘুরে দেখে বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী হাসান আনসারি জানালেন, বিল্ডিং কোড অনুযায়ী আগুন নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থাই ছিল না এখানে।
পদ্মা সেতু প্রকল্পের নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে কর্মরত অগ্নি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ রাশেদুল ইসলাম এ সময় জানিয়েছেন, ঢাকার ভবনগুলোর অগ্নি নিরাপত্তা ঢেলে না সাজালে সমাধান আসবে না।
এদিকে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে বিল্ডিং কোড সঠিকভাবে মানা হচ্ছে কিনা তা কঠোরভাবে নজরদারির নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল শুক্রবার বিকেলে গণভবনে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সভায় এই নির্দেশ দেন তিনি।
তিনি বলেন, অগ্নিদুর্ঘটনাসহ সার্বিক নিরাপত্তায় ভবন মালিক ও ব্যবহারকারীদের যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। এছাড়া জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপরেও বিশেষ গুরুত্ব দেয়ার কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
আজ সকালে গুলশান কাঁচা বাজারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম সাংবাদিকদের বলেছেন, আগামীকাল থেকে টানা ১৫ দিন পর্যন্ত রাজধানী বহুতল ভবন গুলোতে অভিযান চালানো হবে।
শ ম রেজাউল করিম বলেন, অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা, জরুরি অবস্থায় দ্রুত নামার জন্য সিড়ি ও বিল্ডিং কোড মেনে যারা ভবন নির্মাণ করেননি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। মানব সৃষ্ট দুর্ঘটনার কারণে যদি কারো মৃত্যু হয় তাহলে এটাকে আমরা অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে বিবেচনা করব।“
উল্লেখ্য, অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি কমাতে ২০০৩ সালে অগ্নিপ্রতিরোধ ও নির্বাপণ নামে একটি আইন করে সরকার। এই আইন অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরে বহুতল ভবন নির্মাণে ফায়ার সার্ভিস থেকে ছাড়পত্র নিতে হবে। মূলত ভবনের সামনে সড়কের প্রশস্ততা, নকশা অনুসারে ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা, ভবন থেকে বের হওয়ার বিকল্প পথ, কাছাকাছি পানির সংস্থান, গাড়ি ঢুকতে পারবে কি না—এসব বিষয় পর্যবেক্ষণ করে ছাড়পত্রটি দেয় ফায়ার সার্ভিস। তারপর এই ছাড়পত্র দেখিয়ে রাজউক থেকে ভবনের নকশার অনুমোদন নিতে হয়। নির্মাণকাজ আংশিক বা পুরোপুরি শেষ হওয়ার পর ভবনটি ব্যবহারের জন্য আবার রাজউকের কাছ থেকে বসবাস বা ব্যবহারের সনদ নিতে হয়। এই সনদ দেওয়ার সময় আগে জমা দেওয়া নকশা অনুযায়ী ভবনটি নির্মিত হয়েছে কি না, তা দেখার দায়িত্ব রাজউক-এর।#
পার্সটুডে/আবদুর রহমান খান/আশরাফুর রহমান/৩০