বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে প্রিয়া সাহার অভিযোগ: বইছে সমালোচনার ঝড়
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিষয়ে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেত্রী প্রিয়া সাহার অভিযোগ নিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় বইছে। এ নিয়ে সোচ্চার হয়ে উঠেছে গণমাধ্যম এবং নানা সামাজিক মাধ্যম।
ক্ষমতাসীন দলের নেতা ও সরকারের মন্ত্রীরা এই ঘটনার পেছনে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বড় কোনো ষড়যন্ত্রের আভাস পাচ্ছেন। দেশে ফিরে আসলে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হবে বলে আজ ঘোষণা দিয়েছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেছেন, ‘প্রিয়া যা বলেছেন সম্পূর্ণ অসত্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কেন তিনি অন্য রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতির কাছে এসব কথা বলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করার অপচেষ্টা করেছেন সে বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এর পরই তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এ দিকে আজ শনিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে প্রিয়া সাহার অভিযোগের তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। প্রিয়া সাহার এই মিথ্যা ও বানোয়াট বক্তব্যের পেছনে বাংলাদেশের ক্ষতি করার অসৎ উদ্দেশ্য রয়েছে বলেও মনে করছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
প্রসঙ্গত, গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় হোয়াইট হাউসে ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হওয়া ১৯টি দেশের ২৭ জন ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওই সাক্ষাৎকালে ট্রাম্পের কাছে নিজের দেশ সম্পর্কে ‘ভয়ঙ্কর’ অভিযোগ করেন প্রিয়া।
তিনি ট্রাম্পকে বলেন, ‘স্যার, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। সেখানে ৩৭ মিলিয়ন হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান বিলীন হয়ে গেছে। দয়া করে আমাদের সাহায্য করুন। আমরা বাংলাদেশেই থাকতে চাই। সেখানে এখনো ১৮ মিলিয়ন সংখ্যালঘু মানুষ রয়েছে। আমার অনুরোধ, দয়া করে আমাদের সাহায্য করুন। আমরা আমাদের দেশ ছাড়তে চাই না। দেশে থাকার জন্য সাহায্য করুন।’
ওই নারী আরও বলেন, ‘আমি আমার ঘরবাড়ি হারিয়েছি, তারা আমার ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে। তারা আমার জমিজমা দখল করে নিয়েছে। কিন্তু তারা (প্রশাসন বা সরকার) কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি এখন পর্যন্ত।’
এ সময় ট্রাম্প তাকে প্রশ্ন করেন, ‘কারা জমি দখল করেছে, কারা ঘরবাড়ি দখল করেছে?’ উত্তরে প্রিয়া বলেন, ‘তারা মুসলিম মৌলবাদি গ্রুপ। তারা সব সময় রাজনৈতিক আশ্রয় পায়। সব সময়ই পায়।’
এদিকে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রাণা দাশ গুপ্ত বলেছেন, প্রিয়া সাহা তাদের প্রতিনিধি হয়ে ওখানে যান নি। তবে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের আদমশুমারী রিপোর্ট উল্লেখ করে রাণা দাশগুপ্ত বলেন, শতকরা ২০ শতাংশ সংখ্যালঘু বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে গেছে।
অন্যদিকে, শনিবার দুপুরে ধানমন্ডিতে প্রিয়ার বাড়ির সামনে ‘সচেতন ছাত্র সমাজ’ ব্যানারে একদল যুবক মানববন্ধন করেছে।
মানববন্ধনে অংশ নেয়া যুবক শুভ অধিকারী বলেন, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। আমরা সব ধর্মের লোক মিলেমিশে বসবাস করছি। প্রিয়া ট্রাম্পের কাছে এদেশে ৩ কোটি ৭০ লাখ সংখ্যালঘু নিখোজ হবার নালিশ করেছেন। আমরা তা মানতে পারিনি। তাই আমাদের অবস্থান জানাতে তার বাসার সামনে দাঁড়িয়েছি।
বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক প্রিয়া সাহা ‘দলিত কণ্ঠ’ নামের একটি মাসিক পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশকের দায়িত্বও পালন করছেন। এ পত্রিকার অনলাইন ভার্সনও রয়েছে। এতে সংখ্যালঘু এবং দলিত সম্প্রদায়ের খবর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়।
গত জুন মাসের ১২ তারিখে ঢাকা জেলার অতিরিক্ত ম্যাজিস্ট্রেট কাজী নাহিদ রসুল পত্রিকাটি প্রকাশের ঘোষণাপত্র প্রদান করেন। পত্রিকাটির ঘোষণাপত্রে সম্পাদকের জায়গায় তার ছবিসহ নাম উল্লেখ করা হয়েছে ‘প্রিয়া বালা বিশ্বাস'। রাষ্ট্রবিরোধী কোনো সংবাদ ছাপানো হবে না বলে অঙ্গীকার করা হয়েছে পত্রিকার ঘোষণাপত্রে। কিন্তু এখন খোদ সম্পাদকের বিরুদ্ধেই রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ উঠেছে।
প্রিয়ার বাবার বাড়ি পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার চরবানিয়ারী গ্রামে। শ্বশুর বাড়ি বৃহত্তর যশোরে। প্রিয়ার স্বামী মলয় কুমার সাহা দুদকের সদর দফতরে উপপরিচালক পদে কর্মরত রয়েছেন। তার দুই মেয়ে প্রজ্ঞা পারমিতা সাহা ও ঐশ্বর্য লক্ষ্মী সাহা যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করেন।
পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অমূল্য রঞ্জন হালদার আজ শনিবার দুপুরে স্থানীয় সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ‘নাজিরপুরে কোনো সংখ্যালঘু নির্যাতন বা গুমের ঘটনা নেই। প্রিয়া সাহার বক্তব্য নিজ স্বার্থ হাসিলের জন্য ও উসকানিমূলক। তার ভাইয়ের জমি নিয়ে বিরোধের জেরে স্থানীয় কয়েকজন হিন্দু ও মুসলমানকে হয়রানি করে আসছে প্রিয়া সাহা।'#
পার্সটুডে/আবদুর রহমান খান/আশরাফুর রহমান/২০