দুই বছরেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সূত্র মেলেনি: বিভিন্ন মহলের প্রতিক্রিয়া
বাংলাদেশে আশ্রিত এগারো লাখ রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসনের বিষয়টি এখন দেশের রাজনৈতিক সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধনের পৈশাচিক হামলার দু'বছর পার হলেও তাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসন বিষয়ে বাস্তবসম্মত এবং সব পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য কোনো সমাধান মেলেনি।
গত ২২ আগস্ট রোহিঙ্গা প্রত্যাবসনের দ্বিতীয় দফা উদ্যোগ ব্যর্থ হবার পর বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপি অভিযোগ করেছে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় সরকার সম্পূর্ণভাবেই ব্যর্থ হয়েছে। মিয়ানমারের ইচ্ছা পূরণের ফর্মুলায় বাংলাদেশ সরকার কাজ করছে বলেই রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। গত দুই বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরত পাঠাতে পারেনি সরকার। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব, তাদের নিরাপত্তা, তাদের নিজের সম্পত্তির মালিক হয়ে বাসভূমিতে ফিরে যাওয়া, তাদের সম্পত্তির মালিক হওয়া- এই বিষয়গুলো নিশ্চিত হয়নি বলেই আস্থার অভাবে রোহিঙ্গারা ফেরত যায়নি।
বিএনপি’র এমন অভিযোগের মুখে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমার যে সুরে কথা বলছে বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক দল বিএনপিও সেই সুরে কথা বলছে।
সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীতে জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ওবায়দুল কাদের এ অভিযোগ করেন।
এর আগে শনিবার রাজধানীতে অপর একটি অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের এ মূখপাত্র বলেছেন, বিশ্বে মিয়ানমারেরও শক্তিশালী বন্ধু থাকার বিষয়টি মাথায় রেখে রোহিঙ্গাদের ফেরাতে সরকার কৌশলী অবস্থান নিয়েছে। অনেক সময় দুই পা এগিয়ে এক পা পিছিয়ে যেতে হয়। একে কূটনৈতিক ব্যর্থতা বলা যাবে না।
ওদিকে, রোববার উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্প সংলগ্ন মাঠে ‘রোহিঙ্গা গণহত্যা দিবস’ উপলক্ষে বিশাল সমাবেশ করেছে কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়া শরণার্থীরা। এতে রোহিঙ্গাদের নাগরিত্ব ফিরিয়ে দেয়াসহ মিয়ানমারের কাছে পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরা হয়।
এসব দাবির মধ্যে রয়েছে মিয়ানমারের নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, নির্যাতনের বিচার, বসতভিটা এবং মিয়ানমারের ক্যাম্পে থাকা রোহিঙ্গা রোহিঙ্গাদের স্বাধীনতা। এসময় তাদেরকে আশ্রয় দেবার জন্য বাংলাদেশের সরকার ও মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে রোহিঙ্গা নেতারা।
আয়োজক সংগঠন আরাকান সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটের সভাপতি মহিবুল্লাহ জানিয়েছেন, স্থানীয়দের ভয় দেখাতে নয়, মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের অস্তিত্ব বোঝানোর জন্য রোববারের বিক্ষোভ। এরকম একটি বিশাল সমাবেশ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে এম আবদুল মোমেন বলেছেন, সরকারের কাছে এ বিষয়ে আগাম তথ্য ছিল না।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু না হওয়ার মূল কারণ মিয়ানমার। প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে রাখাইনে কি কি কাজ করা হয়েছে তা রোহিঙ্গাদের বোঝাতে সক্ষম হয়নি প্রতিবেশী দেশটি। মিয়ানমারের বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে পারেনি। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার দায়িত্ব মিয়ানমারের।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ২৩ নভেম্বরে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে একটি দ্বি-পাক্ষিক চুক্তি হয়েছিল। সেই চুক্তির আলোকে একটি জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হয়। এই ওয়ার্কিং গ্রুপের বেশ কয়েকটি সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে। মিয়ানমারের স্বাধীন তথ্য অনুসন্ধানী দলও গত সপ্তাহে কক্সবাজারে রোহিঙ্গদের সাথে কথা বলেছেন। কিন্তু রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অনিশ্চিতই রয়ে গেছে।
এদিকে, আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠেয় সাধারণ পরিষদের ৭৪তম অধিবেশননে রোহিঙ্গা সংকট বিশেষ গুরুত্ব পাবে বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে।
জানা গেছে, আগামী মাসে সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে রোহিঙ্গা ইস্যুতে একাধিক আলোচনা অনুষ্ঠান হওয়ার কথা রয়েছে। এ ছাড়া জাতিসংঘের মিয়ানমারে মানবাধিকার পরিস্থিতিবিষয়ক স্পেশাল র্যাপোর্টিয়ার ইয়াংহি লি আগামী অক্টোবর মাসে সাধারণ পরিষদে তাঁর প্রতিবেদন উপস্থাপন করবেন। তখনো এ বিষয়ে আলোচনা হবে।#
পার্সটুডে/আবদুর রহমান খান/আশরাফুর রহমান/২৭
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।