ঋণখেলাপিদের জন্য সময় বাড়ালো বাংলাদেশ ব্যাংক, পুঁজিবাজারে অস্থিরতা
বাংলাদেশে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করে যারা ঋণখেলাপি হয়ে রয়েছেন, তাদের ঋণ পুনঃতফসিল করার জন্য আর একদফা সময় বাড়িয়ে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
গতকাল (বুধবার) কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করতে ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত সময় বৃদ্ধি করেছে। এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা নির্দেশনা অনুযায়ী, পুনঃতফসিলের সুবিধা নিতে ঋণখেলাপিদের ২০ অক্টোবর পর্যন্ত সময় বেধে দেওয়া হয়েছিল।
এর আগে, চলতি বছরের ১৬ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে ঋণ পুনঃতফসিলের বিশেষ নীতিমালা জারি করা হয়। এই নীতিমালা অনুযায়ী ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ৯ শতাংশ সরল সুদে ১০ বছরের জন্য ঋণ পরিশোধের সুযোগ পাবেন ঋণখেলাপিরা। প্রথম একবছর তাদের কোনো কিস্তিও দিতে হবে না। এই নীতিমালার আওতায় সুবিধা দিয়ে চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) ব্যাংকগুলো ৫ হাজার ৮৩৯ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করেছে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) পুনঃতফসিল করেছে ১৫ হাজার ৪৬৯ কোটি টাকা।
এ প্রসঙ্গে বাসদের কেন্দ্রীয় নেতা রাজেকুজ্জামান রতন রেডিও তেহরানকে বলেন, দেশে উন্নয়নের নামে একটা লুটপাটের অর্থনীতি চালু করা হয়েছে। ব্যাংকগুলো জনগণের আমানত রক্ষা না করে তা ঋণখেলাপিদের পকেটে তুলে দিচ্ছে। আর সরকার তাদের বারবার সুযোগ করে দিচ্ছে। এ অবস্থার পরিবর্তনের জন্য জনগণকেই সোচ্চার হতে হবে।
ওদিকে, ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন, তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবিরতার ফলে লোকসানের বোঝা ভারী হওয়ায় ব্যাংকের ঋণ পরিশোধে সমস্যা হচ্ছে। কিন্তু ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, তাদের অভিজ্ঞতা অনুসারে, প্রকৃত ঋণখেলাপির চেয়ে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির সংখ্যাই বেশি।
তবে, ঋণ ফেরত না দেয়ার কারণ যেটাই হোক ব্যাংকে অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। এর সামগ্রিক প্রভাব পড়ছে ব্যাংকিং খাতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদন অনুসারে, শুধু এক বছরেই শিল্প খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এ খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ৩৮ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে (২০১৮-২০১৯) তা বেড়ে হয়েছে ৫৭ হাজার ২০১ কোটি টাকা।
রাস্তায় নেমেছেন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা
এদিকে, দেশের পুঁজিবাজারে চলছে অস্থিরতা। গত কয়েকমাস ধরে দরপতন চলছে। এর বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছেন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা। সেখানেও মামলা দিয়ে হয়রানি করার অভিযোগ করেছেন বিনিয়োগকারীরা।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পুঁজির সংকটের কারণে নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন একেবারে কমে গেছে। ফলে যে পরিমাণ শিল্পঋণ বিতরণ করা হচ্ছে তার বেশির ভাগই চলতি মূলধন খাতে বিতরণ করা হচ্ছে। নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন কমে যাওয়ায় কাঙ্ক্ষিত হারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, গত অর্থবছর শেষে এ খাতে বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৯৯ হাজার ৮৫৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে বেশির ভাগই চলতি মূলধন খাতে বিতরণ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত অর্থবছর শেষে চলতি মূলধন খাতে বিতরণকৃত ঋণের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই চলতি মূলধন খাতের ঋণ। আর বাকি ২০ শতাংশ ঋণ হলো মেয়াদি ঋণ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিল্প ঋণের মধ্যে বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে বড় বড় উদ্যোক্তাদের হাতে। তাদের চেয়ে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা অধিক হারে ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করছেন। যেমন- মোট ৫৭ হাজার ২০১ কোটি টাকার শিল্প খেলাপি ঋণের মধ্যে প্রায় ৬৭ শতাংশই বড় উদ্যোক্তাদের দখলে। বাকি ২২ শতাংশ মাঝারি উদ্যোক্তা ও ১১ শতাংশ রয়েছে ছোট উদ্যোক্তাদের কাছে।
শিল্প খাতে খেলাপি ঋণ বেশি
এদিকে, খেলাপি ঋণের মধ্যে বেসরকারি মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকের চেয়ে সরকারি মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকের শিল্প খাতে খেলাপি ঋণ বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, শিল্প খেলাপি ঋণের মধ্যে সরকারি মালিকানাধীন পাঁচ বাণিজ্যিক ব্যাংকের দখলে রয়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের দখলে ৪২ শতাংশ, বিদেশি ব্যাংকের দখলে ১ শতাংশ, বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর ১ শতাংশ এবং ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দখলে রয়েছে ৬ শতাংশ।
সরকারও ঋণ করছে ব্যাংক থেকে
চলতি অর্থবছরে (২০১৯-২০) সরকারের ব্যাংক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা। অন্যদিকে, জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে (তিন মাসে) সরকার এ খাত থেকে ঋণ নিয়েছে ২৮ হাজার ৭১০ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রথম তিন মাসেই পুরো অর্থবছরের জন্য প্রক্ষেপিত ব্যাংক ঋণের ৬১ শতাংশ নিয়ে ফেলেছে সরকার।
মূলত রাজস্ব আদায়ে হতাশাজনক পরিস্থিতি এবং সঞ্চয়পত্র বিক্রি ব্যাপক হারে কমে যাওয়ায় সরকারকে অনেকটা বাধ্য হয়েই এখন ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বেশি ঋণ নিতে হচ্ছে। আর এই ঋণ গ্রহণের ফলে দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। কারণ সরকার ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলে সে ক্ষেত্রে বেসরকারি উদ্যোক্তারা ব্যাংক ঋণ থেকে বঞ্চিত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।#
পার্সটুডে/আবদুর রহমান খান/আশরাফুর রহমান/২৪
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।