জেনারেল কাসেম সোলাইমানির শাহাদাত উপলক্ষে ঢাকায় প্রতিবাদী কবিতা পাঠ ও আলোচনা সভা
https://parstoday.ir/bn/news/bangladesh-i76682-জেনারেল_কাসেম_সোলাইমানির_শাহাদাত_উপলক্ষে_ঢাকায়_প্রতিবাদী_কবিতা_পাঠ_ও_আলোচনা_সভা
১১ জানুয়ারী ২০২০ শনিবার বিকাল চারটায় ঢাকাস্থ মীরপুর লালকুঠি দরবার শরীফ পাঠাগার মিলনায়তনে, লালকুঠি সাহিত্য পরিষদ-এর উদ্যেগে পরিষদ সভাপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্সি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও লালকুঠি দরবার শরীফের পীর অধ্যাপক আহসানুল হাদীর সভাপতিত্বে, আমেরিকার কাপুরুষোচিত ড্রোন হামলায় ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের আল কুদস ব্রিগেড-এর প্রধান জেনারেল কাসেম সোলাইমানির শাহাদাত এবং মুসলিম বিশ্বে ইহুদী মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও আধিপত্যবাদ বিরোধী কবিতা পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
(last modified 2026-03-14T11:23:49+00:00 )
জানুয়ারি ১৪, ২০২০ ০৮:০৪ Asia/Dhaka
  • কবি আবদুল হাই শিকদার
    কবি আবদুল হাই শিকদার

১১ জানুয়ারী ২০২০ শনিবার বিকাল চারটায় ঢাকাস্থ মীরপুর লালকুঠি দরবার শরীফ পাঠাগার মিলনায়তনে, লালকুঠি সাহিত্য পরিষদ-এর উদ্যেগে পরিষদ সভাপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্সি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও লালকুঠি দরবার শরীফের পীর অধ্যাপক আহসানুল হাদীর সভাপতিত্বে, আমেরিকার কাপুরুষোচিত ড্রোন হামলায় ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের আল কুদস ব্রিগেড-এর প্রধান জেনারেল কাসেম সোলাইমানির শাহাদাত এবং মুসলিম বিশ্বে ইহুদী মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও আধিপত্যবাদ বিরোধী কবিতা পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

বক্তব্য রাখছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরানী ভিজিটিং প্রফেসর ও ফার্সি ভাষায় নজরুল গবেষক ড. কাজেম কাহদুয়ী

সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশের শেকড় সন্ধানী কবি, নজরুল গবেষক ও সময়ের সাহসী কন্ঠস্বর কবি আবদুল হাই শিকদার বলেছেন, ‘জেনারেল কাসেম সোলাইমানি ছিলেন ইহুদী মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অকুতভয় সিপাহসালার।’ আর বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্সি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের ইরানী ভিজিটিং প্রফেসর ড. কাজেম কাহদুয়ী বলেছেন. ‘জেনারেল কাসেম সোলাইমানি শহীদী মৃত্যু কামনা করতেন’।

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরানী ভিজিটিং প্রফেসর ও ফার্সি ভাষায় নজরুল গবেষক ড. কাজেম কাহদুয়ী, আল কুদস কমিটি বাংলাদেশ-এর সেক্রেটারী জেনারেল জনাব মোস্তফা তারেকুল হাসান, নজরুল ফররুখ গবেষণা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি লেখক গবেষক এমদাদুল হক চৌধুরী। আলোচনায় অংশ নেন কবি ও আবৃত্তিশিল্পী আহমদ বাসির, ছড়াশিল্পী, কবি আতিক হেলাল, কবি আমিন আল আসাদ, মাওলানা আসাদুজ্জামান, লেখক অনুবাদক ক্বারী আলমগীর হোসেন মোল্লাহ।

ইহুদী মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী কবিতা পাঠ করেন যথাক্রমে, কবি আবদুল হাই শিকদার, কবি আতিক হেলাল, কবি আমিন আল আসাদ, কবি জামান সৈয়দী,  কবি আহমদ বাসির, কবি রবিউল মাশরাফি, কবি ইবনে আবদুর রহমান, কবি জাকারিয়া খান সেীরভ, কবি ও মর্সিয়া লেখক শাহনওয়াজ তাবীব, কবি মুহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ, মুক্তিযোদ্ধা কবি রফিক মিয়া, কবি মুহাম্মদ ইসমাইল, কবি নাসিমা আক্তার নিঝুম, কবি মৌ মাহমুদা, কবি আলমগীর হোসেন জোয়ার্দার, কবি জয়নাল আবেদিন, কন্ঠশিল্পী ও কবি হাবিবুর রহমান প্রমূখ।

ক্বারী ও কন্ঠশিল্পী হবিবুর রহমানের কন্ঠে পবিত্র কালামের ‘আল্লাহর পথে যারা শহীদ হয়েছে তাদের মৃত বলো না’ এই আয়াতাংশ সহ তেলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে কবি আবদুল হাই শিকদার বলেন, ‘শহীদ জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে নিয়ে আমরা গর্বিত কারণ তিনি মারা যাননি। তিনি পৃথিবীর ইতিহাসে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অকুতোভয় সিপাহসালার হিসেবে অমরত্ব লাভ করেছেন। ইতিহাসে ঘৃণিত হয়েছে সাম্রাজ্যবাদের খলনায়ক কাপুরুষ ট্রাম্প। কাসেম সোলাইমানি এক ক্ষণজন্মা বুদ্ধিদীপ্ত সমরবিদ ছিলেন যিনি মধ্যাপ্রাচ্যে সাম্রাজ্যবাদের বিষ দাঁত সমূলে উপড়ে ফেলতে সক্ষম হয়েছিলেন।  সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামের ইতিহাসে বিশ্বের মানুষ এতোদিন চেগুয়েভারার কথা শুনে এসেছে। নিঃসন্দেহে চেগুয়েভারা সংগ্রামী। কিন্ত কাসেম সোলায়মানী চেগুয়োভারার চেয়েও বড় বিপ্লবী এবং ইতিহাস সৃষ্টিকারী। একথা আমার নয়। স্বয়ং বাংলাদেশের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সমাজতান্ত্রিক চিন্তাবিদ বদর উদ্দিন ওমর স্বীকার করেছেন।

কবি আবদুল হাই শিকদার বলেন, আদর্শের জন্যে কিভাবে জীবন দিতে হয় তা জতি হিসেবে ইসলামী ইরান আমাদেরকে অর্ধশতাব্দি কাল জুড়ে দেখিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। যে জাতি জীবন দিতে শেখে সে জাতির মৃত্যু বা ধ্বংস নেই। ইরানের ইসলামী বিপ্লবের শুরু থেকে এ পর্যন্ত বহু প্রাণ আর রক্ত দিয়ে দিয়ে তারা অজেয় হয়েছে। মার্কিন আধিপত্যবাদ আর আরবের ভোগবাদী রাজা-বাদশাদের সীমাহীন ষড়যন্ত্র সহ দুনিয়ার তাবৎ অশুভ শক্তির সম্মিলিত আক্রমণ প্রতিরোধ করে ইরান এগিয়ে এসেছে। ইরানের ইসলামী বিপ্লবের ইতিহাস বিশ্ববাসী জানে। ইরাকের সাদ্দামের মাধ্যমে আট বছর ব্যাপী এক যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া হয়। ইরানের কেবিনেটে বোমা হামলা করে প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী সহ শতাধিক সংসদ সদস্যকে হত্যা করা হয়। হত্যা করা হয় বিপ্লবে বুদ্বিবৃত্তিক অগ্রনায়ক ইরানী বুদ্ধিজীবীদের।  ড. আয়াতুল্লাহ বেহেশতী, শহীদ আয়াতুল্লাহ মুর্তাজা মোতাহারীসহ অনেককে শহীদ করা হয়। বিগত কয়েক বছরে ইরানের বেশ কয়েকজন বিজ্ঞানীকেও হত্যা করা হয়েছে।

ইরান কারবালার জাতি। তারা কারবালা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছে। সাম্রাজ্যবাদ একথা জানেনা যে, তাদেরকে পরাস্ত করা যাবেনা  কারণ ইরান সঠিক পথে আছে। যে পথ আল্লাহর পথ। তিনি বলেন, ইরানের সমৃদ্ধ সাহিত্য সম্পর্কে আমরা ওয়াকিবহাল। যে দেশে জন্ম নিয়েছিলেন ইমাম খোমেনী (র)-এর মত ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ। জন্মেছিলেন আলী শরিয়তির মত বিংশ শতকের শক্তিমান চিন্তাবিদ। ফেরদৌসী, শেখ সাদী, রুমী, হাফিজ, ওমর খৈয়াম, ফরিদুদ্দিন আত্তার, আল ফারাবী, আল কিন্দি, ইমাম গাজ্জালী প্রমূখ তো আছেনই।

আব্দুল হাই শিকদার বলেন, আমরা ইরানের সাথে আছি এবং থাকবো। কারণ আমাদের সংস্কৃতির  সাথে মিশে আছে ইরানী ঐতিহ্য। আমরা ইসলাম পেয়েছি ইরানের ভেতর দিয়ে। এদেশে আগত সুফিদের থেকে। বাংলা ভাষায় সাত হাজার শব্দ আছে ফার্সি যা সরাসরি প্রবেশ করেছে।

ইরানে যেমন ইসলামের বৈপ্লবিক উত্থান ঘটেছে এবং বিশ্বব্যাপী এর আলো ছড়িয়েছে এর আগে ইরানের সভ্যতার আরো দার্শনিক বিপ্লব বিশ্বকে প্রভাবিত করেছে। এই প্রভাবকে কখনো বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব নয়। ইরানের জনগণ যে নবী বংশ বা আহলে বাইতকে অনুসরণ করে ও ভালবাসে আমরাও সেই আহলে বাইতকে ভালবাসি। আমাদের বাংলাদেশের মুসলমানদের মাঝে হাজারো আলী, হাসান, হোসাইন, ফাতেমা রয়েছেন। তাদের নামের সাথে যুক্ত রয়েছে এই সব পবিত্র নামগুলো। কাজেই কোন চক্রান্ত বা ষড়যন্ত্রই আমাদেরকে ইরান থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারবে না। ইরানি জাতির আত্মার স্পন্দনের সাথে আমাদের আত্মার স্পন্দন অবিচ্ছেদ্য থাকবে।

তিনি বলেন, ইরানের অপরাধ ইরান নিজের পায়ে দাড়িয়েছে নিজস্ব বোধ বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির উপর। আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জন করেছে। পরাশক্তি আমেরিকার প্রভুত্ব ইরান মেনে নেয়নি। মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা ইসাইলের স্বার্থে বাধা সৃষ্টি করেছে। কাসেম সোলাইমানি তো সে কারণেই শাহাদাত বরণ করেছেন।

তিনি বলেন ইরান মজলুম। ইরান নিজে কোন দেশকে আক্রমণ করেনি। ইরান নিজে আক্রান্ত হয়েছে। ইয়ামেনে কে আক্রমণ করেছে? ইরান নাকি সৌদী আরব? সিরিয়া ইরাকসহ পূর্ব এশিয়াকে কে অস্থির করেছে ইরান নাকি আমেরিকা? ইসরাইলের সাথে কে বন্ধুত্ব করেছে ইরান নাকি সৌদি আরব?আমরা ইরানী জেনারেল সোলাইমানি এবং ইরাকী বাহিনী প্রধান আবু মাহদী আল মুহাদ্দিসসহ যারা শহীদ হয়েছেন তাদের হত্যার নিন্দা জ্ঞাপন করছি।

সভাপতির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্সি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক, লালকুঠি দরবার শরীফের পীর সাহেব ও লালকুঠি সাহিত্য পরিষদ সভাপতি জনাব আহসানুল হাদী বলেন, রাসুল (সা.) ইরানী জাতি সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, ঈমান যদি আকাশের সুরাইয়া তারকাতেও ঝুলে থাকে তবে সালমান ফারসী (রা.)’র জাতি তা পাবে। কাজেই ইরান হকের পথে আছে এবং ইরান হকের পথেই থাকবে ইনশাল্লাহ। আপনারা লক্ষ্য করে থাকবেন ইরানী জাতি আশুরা উপলক্ষে একটা স্লোগান দেয় মুহাররম তরবারীর উপর রক্তের বিজয়ের মাস। এছাড়া ইরান বিপ্লব চলাকালিন সময়ে একটা স্লোগান দিত ‘হররোজ আশুরা হরজমিন কারবালা’ (প্রতিদিন আশুরা প্রতিটি জমিন কারবালা)। এই শ্লোগান ও চেতনাই তাদের আত্মবিশ্বাস। তারা দশকের পর দশক যাবত রক্ত দিয়ে আগ্রাসী অস্ত্রকে পরাভূত করে চলেছে। ইনশাল্লাহ ইরান অজেয় থাকবে মাহদী (আ)-এর আগমন পর্যন্ত।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরানী ভিজিটিং প্রফেসর এবং ফার্সি ভাষায় নজরুল গবেষক ড কাজেম কাহদুয়ী বলেন,‘ পবিত্র কোরানে রয়েছে আল্লাহর পথে যারা শহীদ তাদেরকে তোমরা মৃত বলোনা বরং তারা জীবিত’। তিনি হাদিসে কুদসী থেকে পাঠ করে বলেন,‘যারা আল্লাহর পথে এগিয়ে যায় আল্লাহও তার দিকে এগিয়ে আসেন। যিনি আল্লাহকে ভালবাসেন আল্লাহও তাকে ভালবাসেন।  যিনি আল্লাহর পথে এক পা আগান, আল্লাহ তার দিকে দুই পা অগ্রসর হন। যারা আল্লাহর পথে হেঁটে যান আল্লাহ তার দিকে দৌড়িয়ে আসেন। যিনি আল্লার হয়ে যান, আল্লাহ তার হয়ে যান, যিনি আল্লাহর জন্যে নিজেকে উৎসর্গ করেন আল্লাহ তাকে তাঁর নিকটে তুলে নেন। জেনারেল কাসেম সোলাইমানি আল্লাহর রাহে নিজের জীবনকে বিলিয়ে দিয়েছেন। তাঁর জনপ্রিয়তা এতো ছিল যে তাঁকে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হতে বলায় তিনি বলেছিলেন আমি তো শহীদ হতে চাই। আল্লাহ তাঁর মনের ইচ্ছা পূরণ করেছেন।

আল কুদস কমিটি বাংলাদেশ-এর সেক্রেটারী জেনারেল মোস্তফা তারেকুল হাসান বলেন, ‘আপনারা কারবালার ইতিহাস জানেন। শহীদে কারবালা ইমাম হোসাইন (আ) সম্পর্কে বিখ্যাত উর্দু কবি শওকত আলী জরহর লিখেছেন, 'ক্বাতলে হোসাইন আসল যে মরগে ইয়াজিদ হায়/ ইসলাম জিন্দা হোতা হায় হার কারবালা কি বাদ’ অর্থাৎ ‘হোসাইনের শাহাদাত সে তো ইয়াজিদের মৃত্যু/ ইসলাম কারবালার মাধ্যয়ে বিজয় লাভ করেছে’। খুবই তাৎপর্যপূণ একটি কথা। আজ পর্যন্ত কোন মুসলমান তা শিয়া হোক বা সুন্নি হোক কারো নাম ইয়াজিদ রাখা হয়েছে এমন কোথাও নেই। ইমাম হোসাইন মুমিন হৃদয়ে ইসলামের ইতিহাসে অমর হয়ে রয়েছেন। কারবালার ইতিহাস কালবালার তাৎপর্য দিনে দিনে বিকশিত হচ্ছে, উজ্জ্বল হচ্ছে, আলোকিত হচ্ছে, আলোচিত হচ্ছে যুগের পর যুগ। আর ইয়াজিদ ঘৃণিত হচ্ছে। আমাদের জাতীয় ইতিহাসে যেমন পলাশীর যুদ্ধের খলনায়ক মীরজাফর, জগত শেঠ প্রমূখেরা ঘৃণিত বর্জিত নামের অধিকারী তেমনি ইয়াজিদ একটি ঘৃণিত নাম। হোসাইন এক আলোকিত নাম। তেমনি দেখুন আজ কাসেম সোলাইমানি এক আলোকিত নাম। আলোচিত নাম। ট্রাম্প ঘৃণিত হয়েছে। খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়েছে। ট্রাম্পকে পাগল এবং ঠাণ্ডা মাথার খুনি আখ্যা দেয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে তো ইম্পিচমেন্ট হয়েই আছে। মার্কিন পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে তার যুদ্ধ ক্ষমতাকে সীমিত করা হয়েছে। কারণ এর আগে বুশ ইরাকে যে মানবতাবিরোধী যুদ্ধ করেছিল সেখানে ২০ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছিল। ট্রাম্প যাতে সেই রকম যুদ্ধ করতে না পারে সেজন্যে তার বাজেট কমিয়ে  দেয়া হয়েছে।

মোস্তফা তারেকুল হাসান বলেন, দেখুন এই হত্যাকাণ্ডের পর বৃটেন, ফ্রান্স, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সংগঠন এর নিন্দা করেছে। এতো গেল পশ্চিমা বিশ্বের খবর। মুসলিম বিশ্বে কাসেম সোলাইমানির নাম কে জানতো ইরানের বাইরে। আমরা জানতাম কারণ আমাদের জানতে হতো। কিন্তু তাঁর শাহাদাতের ঘটনার পর সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে তাঁর নাম। আমাদের দেশের আনাচে কানাচে, হাটে মাঠে, হোটেলে, চায়ের দোকানে, বাসে, ট্রেনে,অফিসে, আদালতে এখন কাসেম সোলাইমানির নাম উচ্চারিত হচ্ছে। কাসেম সোলাইমানি মুসলিম ইতিহাসের একবিংশ  শতকের হিরো হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। ইরানের পাশে দাড়িয়েছে তুরস্ক, মালয়েশিয়া। পাকিস্তান বলেছে, ইরানের উপর আমেরিকা হামলা করতে  চাইলে পাকিস্তান তার আকাশ ও ভুখণ্ড দেবে না। এই কাসেম সোলাইমানি কতটা জনপ্রিয় ছিলেন মুসলমানদের কাছে তা তাঁর শাহাদাতের পর পৃথিবীর মানুষ জানতে পারে।  ইরাকের বাগদাদে লক্ষ লক্ষ লোক নেমে আসে তার কফিনের পাশে। আর আপনারা দেখেছেন, ইরানে তার জানাযায় ৭০ লক্ষ লোক জড়ো হয়েছে।  ৫০ জন পদপিষ্ট হয়ে মারা গেছে এবং শতাধিক আহত। ইমাম খোমেনী (র)-এর জানাজার পর এতো বিশাল জনপ্লাবন দেখেনি বিশ্ব কারো জানাজায়। সোলাইমানির কন্যা যে অগ্নিঝরা ভাষণ দিয়েছেন এতে মুক্তিকামী মুসলমানরা আরো উদ্দীপ্ত হয়েছে। ট্রাম্প পরাজিত হয়েছে। ইরাকের পার্লামেন্টে সর্বসম্মতভাবে ইরাকে মার্কিন সেনা উপস্থিতিকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।

ইরান ক্ষেপনাস্ত্র হামলা করেছে ইরাকের মার্কিন সেনা ঘাটিতে। ৮০ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে। তিন শতাধিক আহত হয়েছে। আমেরিকা এটা স্বীকার করুক আর নাই করুক। ইসরাইলের পত্রিকা বলেছে ইসরাইলের হাসপাতালে আড়াই শত মার্কিনী সেনার চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। মার্কিন রাডার ব্যবস্থা   সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়েছে। আমাদের দেশ সহ সারা বিশ্বে প্রচারিত হয়েছে যে ইরান মেরে দিয়েছে। শতাধিক মিজাইল আঘাত করেছে মার্কিন গোয়েন্দা রাডারকে ফাঁকি দিয়ে। ট্রাম্প চুপসে গেছে। এভাবেই কারবালায় ইমাম হোসাইনের শাহাদাত যেমন মুসলমানদের বিজয় এনে দিয়েছে তেমনি সোলাইমানির শাহাদাত মুসলমানদের মনোবল বাড়িয়ে দিয়েছে। সত্যের জয় হবেই ইনশাল্লাহ্ । কারণ জেতা শুধু জেতা নয় হারা নয় হারা/ সময় যে বলে দেয় বিজয়ী সে কারা’।

জেনারেল কাসেম সোলাইমানি ইরাকে গিয়েছিলেন ইরাকি প্রশাসনের সাথে ইরান-ইরাক দু-দেশীয় বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি শৃঙ্খলায় সৌদী সহ অন্যান্য আরব রাষ্ট্রের সাথে সমন্নয়ের বার্তা ইরাকের মাধ্যেমে পৌছে দেয়ার ইরানী প্রতিনিধি হিসেবে। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী একথা বলেছেন যে সকাল ৮টায় তার সাথে সোলাইমানির বৈঠক হওয়ার কথ। তিনি বাগদাদ বিমানবন্দরে অবতরণ করেছেন এই সংবাদ সিআইএ প্রেরণ করেছে পেন্টাগনের কাছে এবং ট্যাম্পের কাছে। সোলাইমানির গাড়ি বিমানবন্দরের  বাইরে বেরুবার সাথে সাথে  ট্রাম্পের তাৎক্ষণিক হুকুমে তাকে ড্রোন হামলা করে শহীদ করা হয়।

আমাদের জানা প্রয়োজন কেন ট্রাম্প এই পরিকল্পিত হটকারী কাণ্ডটি করলো। আমেরিকায় নির্বাচন এলেই একটা যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা ক্ষমতাসীনরা খেলে থাকে। আমেরিকার শত্রু  নিধন করে তারা মার্কিনীদের বাহাবা কুড়াতে চায়। যেমনটি ওবামা চেয়েছিল লাদেন হত্যা করে। অথচ লাদেন তৈরি করেছিলো আমেরিকানরাই। আমেরিকানদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার জন্যই লাদেন জীবন দেন। কিন্ত ব্যাতিক্রম হলো কাসেম সোলাইমানি। তিনিতো আমেরিকার তৈরি নন। তাঁকে শহীদ করার কারণ হলো তিনি মধ্যাপ্রাচ্যে আমেরিকার খেলা খতম করে দিয়েছেন। ইসলামের নামে নকল ইসলামের জঙ্গী সন্ত্রাসী আই এস যে আমেরিকার তৈরী এ ব্যাপারে কারো কি সন্দেহ আছে?  আপনারা মাঝে কিছুদিন শুনেছেন যে আমেরিকা আল কায়েদা, আই এস সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলো। তারা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছে। তাহলে তো তাদের উচিত ছিলো তাকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেয়া! তাহলে হত্যা করলো কেনো। আপনারা তো এও জানেন দুনিয়াতে আমেরিকার অস্ত্র বিক্রি করা ছাড়া আর কোন শিল্প নাই । মধ্যপ্রাচ্যের তেল তার দরকার।  আর অস্ত্র বিক্রয় করা দরকার। মধ্যপ্রাচ্যে যদি রাজা বাদশাদের ঘুম হারাম করা সন্ত্রাসী না থাকে তবে রাজা বাদশা আর স্বৈরশাসকদের কাছে অস্ত্র বেচবে কি করে। কিংবা সন্ত্রাসীই যদি না থাকে তবে সন্ত্রাস কার্যের জন্যে অস্ত্র কার কাছে বিক্রয় করবে?

আল কুদস কমিটি বাংলাদেশ-এর সেক্রেটারী জেনারেল গর্বের সাথে বলেন যে সোলাইমানি কুদস ব্রিগেডের প্রধান ছিলেন। আমরাও আল কুদস কমিটির সৈনিক্। আমি মনে করি যে আমার নেতা শহীদ হয়েছেন। মহান আল্লাহ যেন তাকে জান্নাতের সবচেয়ে উচু মাকাম দান করেন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে নজরুল ফররুখ গবেষণা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, লেখক, গবেষক এমদাদুল হক চৌধুরী বলেন, সাম্রাজ্যবাদীরা মুসলমানদেরকে বিভক্ত করে, ভাইয়ে ভাইয়ে দ্বন্দ্ব বাধিয়ে দিয়ে মুসলিম দেশগুলোকে শোষণ করে খাচ্ছে। শিয়া ও সুন্নি দুই ভাই। সবাই মুসলমান। আমাদের আল্লাহ এক, রাসুল এক, কলেমা এক, কিতাব এক, কিবলা এক, আমরা পাচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি, ৩০ দিন রোজা রাখি ( ফরজ রোজা) মাসলা মাসায়ালগত, মাজহাবী ভিন্নতা তো থাকতেই পারে। তাহলে কিজন্য আমরা কাউকে অমুসলিম কাফের মনে করবো? একে অপরের বিরুদ্ধাচারণ করবো? ইহুদী মার্কিনীরা বাতিল শক্তিগুলো আমাদেরকে এক হতে দিচ্ছে না  বলেই আজকে এতো সমস্য তৈরী হয়েছে মুসলিম বিশ্বে।

কবি ও আবৃত্তি শিল্পী আহমদ বাসির বলেন,‘ আমি শিয়াও নই সুন্নিও নই আমি মুসলমান। আমাদের বিভিন্ন পরিচয় থাকতেই পারে এবং থাকবে। কিন্তু পরিচয়কে পরিচয়ের জায়গায় রেখে ইতিহাসকে ইতিহাসের জায়গায় রেখে আমরা আদর্শের প্রশ্নে এক থাকবো সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে। জেনালের কাসেম সোলাইমানি ছিলেন ঐক্যের প্রতিক। তিনি সুন্নি হামাস ও শিয়া হিজবুল্লাহ উভয়ের সামরিক প্রশিক্ষক ছিলেন। তার শাহাদাতের পর  হামাস ও হিজবুল্লাহ একই সাথে প্রতিশোধের হুমকি দিয়েছে। হামাস নেতা গিয়েছেন ইরানে তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাতে।

কবি আতিক হেলাল বলেন,‘ মুসলমাদেরকে এখনি ঐক্যবদ্ধ হওয়া দরকার যাতে আমরা আর কোন কাসেম সোলাইমানিকে না হারাই। তিনি বলেন যত মতপার্থক্যই থাকুক সেগুলোকে খুচিয়ে খুচিয়ে না বাড়িয়ে মৌলিক শর্তে সবাইকে এক হতে হবে। তিনি কাসেম সোলাইমানির শাহাদাতের ঘটনায় জাতিসংঘের নিন্দা না জানানোয় দুঃখ প্রকাশ করে ‘হাতিসংঘ’ নামে এক ব্যাঙ্গ ছড়া পেশ করেন।

অনুষ্ঠানের সঞ্চালক কবি আমিন আল আসাদ তার স্বাগত বক্তব্যে বলেন, ফররুখ আহমদ বলেছেন, ‘জীবনের চেয়ে দীপ্ত মৃত্যু তখনি জানি/ শহিদী রক্তে হেসে উঠে যবে জিন্দেগানি’ এমনি এক দীপ্ত জীবন পেয়েছেন সোলাইমানি। শহীদে কারবালা ইমাম হোসাইনকে যেমন শহীদ করে নিঃশেষ করা যায়নি তেমনি কাসেম সোলাইমানিদেরকেও শহীদ করে শেষ করে দেয়া যাবে না। বাংলাদেশের কবিরা সব সময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কবিতা লিখেছেন। আমাদের পূর্বসুরী কবিরা যেমন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, ফররুখ আহমদ, আল মাহমুদ, ফজল শাহাবুদ্দিন, রফিক আজাদ, হেলাল হাফিজ, আবিদ আজাদ সহ অনেকেই সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কবিতা লিখেছেন। আল মাহমুদ আমেরিকাকে তার কবিতায় শিখিয়ে দিয়েছেন ইসলাম কি। হেলাল হাফিজ লিখেছেন ’ নিউট্রন বোমা বোঝো? মানুষ বোঝোনা’। কবি আবিদ আজাদ লিখেছিলেন,‘ আমেরিকা আমি তোমায় কোনদিন ক্ষমা করব না’ ইত্যাদি। কাজেই আমরা কবিতার সৈনিক, শব্দই হচ্ছে আমাদের হাতিয়ার। জেনারেল কাসেম সোলাইমানির শাহাদাত সহ সকল অন্যায় অবিচার অত্যাচার, আধিপত্যবাদ, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আমরা সাংস্কৃতিক ভাবে প্রতিবাদ জানাচ্ছি। তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করছি। আর ঐক্য চাচ্ছি মনুষত্ব ও মানবতার। ঐক্য চাচ্ছি বিবেকের ও নৈতিকতার। সুবিচারের জন্যে। শান্তিময় পৃথিবীর জন্যে । নিপীড়িত নির্যাতিত, অধিকার বঞ্চিত মানুষের অধিকারের জন্যে আজকে আমাদের এই অবস্থান।

মাওলানা আসাদুজ্জামান বলেন,‘পবিত্র কোরানে আল্লাহ পাক আমাদেরকে যেখানে বলেছেন,‘তোমরা আল্লাহর রুজ্জুকে ঐক্যবদ্ধ ভাবে আকড়ে থাকো, কখনো বিচ্ছিন্ন হয়ো না।’ কিন্তু আমরা আল্লাহর আদেশ মানছিনা বলেই আর সঠিক রজ্জু চিনতে পারছিনা বলেই আমরা বিভক্তি রেখা বাড়িয়ে তুলছি। বাড়াচ্ছি আমাদের দুর্যোগ।

ক্বারী আলমগীর হোসেন মোল্লাহ বলেন,‘ কাসেম সোলাইমানির শাহাদাতের জাগতিক মূল্য ও মোজেজা তো আমরা সপ্তাহ না ঘুরতেই দেখলাম। কিন্তু এর আধ্যাত্মিক মূল্য আরো গভীর ও সুদূর প্রসারী।               

পার্সটুডে/এআর/এমএমআই/১৪

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।